📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণী ও হিরাক্লিয়াসের আশঙ্কার বাস্তবায়ন
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক জনৈক প্রবীণ সিরিয়াবাসীর বরাতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংবাদ হিরাক্লিয়াসের নিকট পৌঁছিলে তিনি সিরিয়াভূমি ত্যাগ করিয়া কন্সটান্টিনোপল চলিয়া যাইতে মনস্থ করেন। উহার প্রাক্কালে তিনি মহানবীর সত্যতা বর্ণনা করিয়া তাঁহার আনুগত্য অবলম্বনে রোমবাসীদেরকে উদ্বুদ্ধ করিতে প্রয়াস পান। ইহাতে তাহারা অসম্মতি প্রকাশ করিলে তিনি জিয়া দানের মাধ্যমে আক্রমণ হইতে নিষ্কৃতি লাভের প্রস্তাব দেন। তাহাতেও যখন তাহারা চরম অনীহা প্রকাশ করিল তখন তিনি প্রস্তাব দিলেন, তাহা হইলে চল আমরা তাঁহার সাথে এই মর্মে সন্ধি
করিয়া লই যে, দক্ষিণ সিরিয়া আমরা মুহাম্মাদকে ছাড়িয়া দিব এবং তিনি আমাদেরকে শামে (উত্তর সিরিয়ায়) থাকিতে দিবেন।
রাবী বলেন, ঐ সময়কার সিরিয়া প্রদেশটি ফিলিস্তীন, জর্দান, দামিশক, হিস্স এবং সীমান্তবর্তী গিরিপথের (যতদূর মনে হয় গোলান উপত্যকা) এই পার লইয়া গঠিত ছিল। আর গিরিপথের ঐ পার ছিল শাম। রোমবাসিগণ ইহাতে আপত্তি জানাইয়া বলিল, আমরা মুহাম্মাদকে সিরিয়া ছাড়িয়া দিব অথচ আপনি সম্যক জ্ঞাত রহিয়াছেন যে, সিরিয়া ভূখণ্ডটি শামেরই অবিচ্ছেদ অঙ্গ। আমরা ইহা কোনমতেই পরিত্যাগ করিতে পারিব না।
তাহাদের এইরূপ অস্বীকৃতি লক্ষ্য করিয়া হিরাক্লিয়াস বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! তোমরা তোমাদের ভূখণ্ডে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিয়া নিজেদেরকে সফল বলিয়া ভাবিতে পসন্দ করিতেছ মাত্র, ইহার অধিক কিছু নহে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৪৬৪-৫)। রাসূলুল্লাহ বলেনঃ
قد مات کسری ولا کسری بعده واذا هلك قيصر نلا قيصر بعده والذي نفسي بيده لتنفقن كنوزهما في سبيل الله "কিসরার মৃত্যু হইয়াছে। তাহার পর আর কোন কিসরা পারস্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইবে না। অতঃপর যখন কায়সার নিপাত যাইবে, তাহার পর আর কোন কায়সার রোমক সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন হইবে না। যে পবিত্র সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁহার শপথ, তাহাদের উভয়ের ধনভাণ্ডারসমূহ তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করিবে" (মুসলিম, জিল্দ ২)।
সত্যসত্যই হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে (হি. ১৪/৬৩ খৃ.) সিরিয়ার উপর উপর্যুপরি মুসলিম হামলা চলিতে থাকে এবং হযরত উমর (রা)-এর খিলাফত আমলে গোটা বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সর্বাধিক সমৃদ্ধ সিরিয়া প্রদেশ মুসলমানদের পদানত হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ -এর ভবিষ্যদ্বাণীর মাত্র ছয় বৎসরের মধ্যেই সেখান হইতে রোমক শাসনের অবসান ঘটে (দ্র. যায়নী দালান, ফুতুহাতে ইসলামিয়া, ১খ., বালাযুরী, ফুতূহুল বুলদান, গীবন, Decline and Fall of the Byzantine Empire প্রভৃতি)।
📄 আরীসিয়্যীন কাহারা?
রোমান সম্রাটকে লিখিত পত্রে রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলেন:
فان توليت فعليك اثم الاريسيين. এই اریسیین শব্দটির আসল রূপ সম্পর্কে নানা আলিমের নানা মত। ইমাম মুসলিম (র)-সহ একদল মুহাদ্দিছ মনে করেন, শব্দটি আসলে الاريسيين )আল-ইরীসিয়্যীন), কিন্তু ইমাম বুখারী (র) বলেন, শব্দটি আসলে আল-ইয়ারীসিয়্যীন। আবার অনেকে ইহাকে আল-আরীসিয়্যীন বলিয়াছেন। তাঁহাদের মতে, প্রাচীন যুগের কোন এক নবীকে অস্বীকারকারী আবদুল্লাহ ইব্ন আরীসের নাম হইতেই উহার উৎপত্তি— যাহার অর্থ, ব্যাপকভাবে নবীকে অস্বীকারকারী দল। আবার অন্য কেহ বলিয়াছেন, ইহারা হইতেছে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আরূস )عبد الله بن عروس(-এর অনুসারী খৃস্ট ধর্মাবলম্বী যাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র মনে করেন না।
বিখ্যাত আরবী অভিধান আল-কামূস আল-মুহীতে শব্দটির আলোচনায় আছেঃ
ارس (الارس) بالكسر الاصل الطيب والأرس والاريسن كجليس وسكيت الاكار اليسون واريسون وارارسة وأرارسة وأرارس وأرس يأرس أرسا وارس تأريسا صار أرسيا وكسكيت الامير وارسه تأريسا استعمله واستخدمه. মোটকথা, কৃষককূল, সেবক ও ভৃত্য শ্রেণীর লোকজন (তারতীবু'ল-কামূসিল মুহীত আলা তারীকাতি'ল-মিস বাহি'ল-মুনীর ও আসাসি'ل-বালাগা, ১খ., পৃ. ১৩২-৩; 'ঈসা আল-বারী আল-হালাবী ও শুরাকাউহু বি-মিস'র)।
হাদীছের অন্য একটি বর্ণনা হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়, যাহাতে এই ক্ষেত্রে বলা হইয়াছে:
فلا تحل بين الفلاحين والانتلام. "আপনি আপনার কৃষক প্রজাদের এবং ইসলামের মধ্যে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইবেন না" (জামহারাতু রাসাইলিল আরাব, ১খ., পৃ. ৩৯; সুবহু'ল-আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৭; কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ৫৫; কায়রো ১৯৩৪ খৃ.; আল-মিস-বাহু'ল-মুদী, ২খ., পৃ. ১০৩; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮২)।
আল্লামা ইবন কাছীরের রিওয়ায়াতেও এই স্থলে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হইয়াছে:
فان ابيت فان اثم الاكاريين عليك. "আপনি যদি অগ্রাহ্য করেন তবে কৃষককুলের পাপের বোঝা আপনার উপরই বর্তাইবে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৪৫৭; বাংলা ভাষ্য, ইফাবা, প্রকাশিত ২০০৪)।
কিতাবুল আমওয়ালের সংকলক আবূ 'উবায়দ শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, শব্দটির অর্থ কৃষক হইলেও এখানে কেবল কৃষকদের কথা বুঝান হয় নাই। ব্যাপক অর্থে সমস্ত প্রজাকুলকেই বুঝান হইয়াছে। কেননা আরবগণ অনারব সকল জাতিকেই একান্তই কৃষিনির্ভর চাষাভূষা জাতি মনে করিত। ঐ সকল জাতির লোকজন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপরই নির্ভরশীল ছিল। কাযী ইয়ায (র) রাসূলুল্লাহ-এর এই বাক্যটিকে আরও বর্ধিত কলেবরে রিওয়ায়াত করিয়াছেন এইভাবে:
فان ابيت فانا نهدم الكفور ونقتل الارسيين واني اجعل ذلك في رقبتك. "আপনি যদি অগ্রাহ্য করেন, তাহা হইলে আমরা পল্লীসমূহ ধ্বংস করিব এবং (এইগুলির অধিবাসী) কৃষককুলকে হত্যা করিব, আর ইহার তাবৎ দায়দায়িত্ব আপনার ঘাড়েই চাপাইব” (কাযী ইয়ায, মাশারিকুল আনওয়ার আলা সিহাহিল আছার, ২খ., পৃ. ৮৩-৮৪; ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৭০)।
উক্ত হাদীছে کفور শব্দটি পল্লী-গ্রাম অর্থে এবং আরীব আরীসিয়্যীন কৃষককুল অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইবনুল মানযূরও 'লিসানুল 'আরাব' গ্রন্থে শব্দটিকে কৃষিজীবীর সম-অর্থের বলিয়া উল্লেখ করিয়া ইহার সমর্থনে ইমাম ছা'লাব-এর বরাত দিয়াছেন। এই ব্যাপারে তিনি ইবনুল 'আরাবীর অনুরূপ উক্তিও উদ্ধৃত করিয়াছেন। আবূ উবায়দার এরূপ উদ্ধৃতিও তিনি ব্যবহার করিয়াছেন,
📄 ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেযের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
যাহাতে তিনি বলেন, আমার মতে 'আরবীস সর্দার ও বড়দেরকে বলা হইয়া থাকে যাহাদের হুকুম তামিল করা হয় এবং যখন তাহারা আনুগত্য চাহে তখন তাহাদের আনুগত্য করা হয় (দ্র. লিসানুল আরাব ارس ধাতু)।
ইবনুল মানযূর (র) আযহাবীর বরাতে লিখেন: "ইরাকের সাওয়াদ এলাকার লোক যাহারা পারসিক সম্রাটের ধর্মের অনুসারী ছিল, তাহারা কৃষিজীবী ছিল। রোমকরা সাজ-সরঞ্জাম তৈরী ও শিল্পকর্মে নিয়োজিত ছিল। এইজন্য তাহারা অগ্নিউপাসকদেরকে আরীসিয়্যীন বা কৃষককুল বলিয়া অভিহিত করিত। আরবগণও ইরানীদেরকে ফাল্লাহীন বা কৃষককুল বলিয়া অভিহিত করিত" (নবীয়ে রহমত, পৃ. ৩১৫, ১ম সং ১৯৯৭ খৃ.)।
লক্ষণীয়, এহেন ইরানীদের সম্রাটের নামে প্রেরিত পত্রে রাসূলুল্লাহ কিন্তু উক্ত শব্দটি ব্যবহার করেন নাই। আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (র) তাই মন্তব্য করেন, উল্লেখিত কারণে আমাদের নিকট অগ্রাধিকারযোগ্য অভিমত এই যে, ইরীসিয়্যীন-এর অর্থ এইখানে আরিয়ুস মিসরী (২৮০-৩৩৬ খৃ.)-এর অনুসারীবর্গ যিনি একটি খৃস্টান উপদলের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি খৃস্টীয় আকীদা-বিশ্বাস ও সংস্কারে গোত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এই উপদল বায়যান্টাইন সাম্রাজ্য ও খৃস্টান গীর্জাকে দীর্ঘকাল পেরেশান করিয়া রাখিয়াছিল। আরিয়ূস তাওহীদ ও একত্ববাদের ধ্বনি উচ্চারিত কণ্ঠে তুলিয়া ধরেন এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টি ভাষায়) পিতা ও পুত্রের মধ্যে পার্থক্য করার দাওয়াত দেন (Encyclopaedia of Religion and Ethics, ১খ.)।
এইজন্য অগ্রাধিকারযোগ্য ও অনুমানসিদ্ধ কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ-এর সতর্ক বাণী : -فان تولیت فان علیک اثم الاریسيين বুঝান হইয়াছে। কেননা সেই যুগের খৃস্টান জগতের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব এবং বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের ক্ষমতা যাহার হাতে ছিল তিনি ছিলেন হিরাক্লিয়াস। তখনকার খৃস্টানদের মধ্যে এই ফেরকাই তুলনামূলকভাবে নির্ভেজাল তাওহীদের ধারক-বাহক এবং তাহারাই ঐ পর্যন্ত তাহার উপর কায়েম ছিল (The New Catholic Encyclopaedia, ১৪খ., পৃ. ২৯০, Holy Trenity শীর্ষক নিবন্ধ)।
ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজের নামে রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
খসরু পারভেজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: পারসিক ভাষায় খসরু শব্দের আরবী রূপ হইতেছে কিস্সা আরবীতে খসরু শব্দের সহীহ উচ্চারণ খুসরাত। ইহা সেই যুগের পারস্য সম্রাটগণের উপাধি ছিল, যেমনটি ছিল মিসরের 'ফিরআউন ও ইথিওপিয়ার সম্রাটগণের নাজাশী উপাধি। রাসূলুল্লাহ-এর পত্র প্রাপক কিস্সার নাম ছিল খসরু পারভেজ। তিনি বিশ্ববিখ্যাত ন্যায়পরায়ণ পারস্য সম্রাট প্রথম খসরু নওশেরোয়ার পৌত্র ছিলেন। তাহার পিতা হুরমুজ ৫৯০ খৃস্টাব্দে নিহত হওয়ার পর তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৬২৮ খৃস্টাব্দে (৭ম হিজরীর ১১ জুমাদাল উলা) নিহত হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বৎসরকাল ধরিয়া তিনি রাজ্য শাসন করেন। তিনি পারসিক সাম্রাজ্যের ইতিহাসে ২য় খসরু নামে বিখ্যাত।
সিংহাসনে আরোহণের অব্যবহিত পরেই বিদ্রোহী বাহ্রাম চুবীনের হাতে পরাস্ত হইয়া তিনি সাসানী রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া বায়ান্টাইন সম্রাট মরীস (Maurice)-এর আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং স্বীয় রাজ্য পুনরুদ্ধারে তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করেন। মরিস বিশাল সৈন্যবাহিনীর দ্বারা সাহায্য
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র প্রেরণ
করিলে তিনি তাহার পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধরে সক্ষম হন এবং পুনর্বার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁহার বিপদের বন্ধু সম্রাট মরিস বিদ্রোহী কোকাসের হাতে নিহত হইলে কোকাসই বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট হইয়া যায়। তিনি তাহার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ৬১২ খৃ. রোমান সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ চালান। কোকাসের নিহত হওয়ার পরও তাঁহার সেই প্রতিশোধস্পৃহা স্তিমিত হয় নাই। তাঁহার বিজয় অভিযান রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। মিসর, সিরিয়া ও ফিলিস্তীনসহ বিশাল ভূভাগ তিনি রোমকদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লন। সেইজন্য তাঁহার উপাধি হয় পারভেজ বা বিজয়ী (আর-রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ২৫২; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ১৫১)।
ইরানের ঐতিহাসিকগণ একমত যে, সম্রাট ২য় খসরু পারভেজ ইরানের ইতিহাসের সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী ও শান-শওকতের অধিকারী সম্রাট ছিলেন। তাহার শাসনামলে সাসানী সাম্রাজ্য উন্নতি, বিলাস ব্যসন ও সৌন্দর্য উপকরণে সমৃদ্ধির শিখরে উপনীত হইয়াছিল। ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমের রাজ্যগুলি অবধি তাহার মুদ্রা চালু ছিল তাঁহার নামের সঙ্গে যেইসব শানদার পদবী ও বিশেষণ তিনি নিজে ব্যবহার করিতেন তাহা এইরূপ, ঈশ্বরগণের মধ্যে অবিনশ্বর মানব, মনুষ্যগণের মধ্যে অদ্বিতীয় ঈশ্বর, তাঁহার ক্ষমতা ও মর্যাদা সর্বোচ্চে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বপ্রভায় উদিত হন, তাঁহার প্রভাব তিনি অন্ধকার রাত্রিসমূহকে প্রোজ্জ্বল করিয়া তোলেন (ইরান ব-'আহ্দে সাসানিয়া, পৃ. ৬০; থিওনীলেক্টিস-এর বরাতে); আস্-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যা, সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, পৃ. ২৫১, ষষ্ঠ মুদ্রণ, বৈরূত, ১৯৮৪ খৃ.)। ঐতিহাসিক তাবারী তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করেন:
كان من اشد ملوكهم بطشا وانفذهم رأيا وأبعدهم غورا وبلغ خيما ذكر من البأس والنجدة والنصر والظفر وجمع الاموال والكنوز ومساعدة القدر ومماعدة الدهر اياه مالم يتهيأ لملك اكثر منه ولذلك سمى ابرويز وتفسيره بالعربية المظفر. "সর্বাধিক পরাক্রমশালী, সর্বাধিক সিদ্ধান্ত প্রদানক্ষম ও দূরদর্শী, বীরত্বে, শৌর্যবীর্যে, বিজয় সাফল্যে, ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যে ভাগ্যের আনুকূল্যে অদ্বিতীয় ও অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত - যাহা অন্য কোন সম্রাটের ভাগ্যে ইতোপূর্বে জুটে নাই। এইজন্য তাঁহার লকব হয় পারভেজ আরবীতে যাহাকে মুজাফ্ফার বা বিজয়মণ্ডিত বলা হইয়া থাকে” (তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, পৃ. ৯৯৫; আস্-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৫২)।
ষষ্ঠ হিজরীর শেষদিকে রোমক বাহিনী ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজকে নিনোভার যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া টাইগ্রীস (দিজলা) নদীর অপর পাড়ে ঠেলিয়া দেয়। খসরু পারভেজের তখন চরম সঙ্কটকাল। রোমকদের হাতে পরাজয়ের গ্লানি তাঁহার মনমেজাজকে রুক্ষ করিয়া তুলিয়াছিল। দরবারের অমাত্যবর্গ এবং সেনাধ্যক্ষগণের প্রতি কথায় কথায় তাঁহার ক্রোধ প্রকাশ পাইতেছিল। কেননা তাঁহার ধারণা ছিল, এই অমাত্যবর্গ ও সেনাধ্যক্ষগণের কর্তব্যে উদাসীনতা, কাপুরুষতা ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই তাঁহাকে হিরাক্লিয়াসের হাতে পরাজয় বরণ করিতে হইল। তাহাদেরকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার তাঁহার ইচ্ছা ছিল। গোটা পারসিক সাম্রাজ্যের সকলেই তখন সম্ভ্রান্ত।
প্রতিদিন কোন না কোন আমীর বা অমাত্যের গ্রেফতারীর, কোন না কোন উযীরের ফাঁসির এবং কোন না কোন সেনাপতির পলায়নের খবর রাখিতেছিল। শাহানশাহ একটা ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফুঁসিয়া উঠিতেছিলেন। পরাজিত জাতি যেন চরম হতাশা ও আতঙ্কে শ্বাসরুদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল।
ঠিক এমনি পরিস্থিতিতে একজন ভিনদেশী লোক অদ্ভুত পোষাক পরিহিত অবস্থায় শ্বেত প্রাসাদের নিকটে দাঁড়াইয়া শাহানশাহে ইরানের রক্ষী অফিসারদের নিকট বারবার প্রাসাদ অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমাত প্রার্থনা করিতেছিল। তাহার গায়ে ছিল এক পশুর কম্বল যাহা সে কাকনের মত গলায় জড়াইয়া রাখিয়াছিল- তাহার বগলদ্বয়ের নীচ দিয়া দামন পর্যন্ত যাহা ছিল বাবুল কাটায় সেলাই করা, যাহার কোমরে বাঁধা ছিল একটা রজ্জু আর তাহার সাথে ঝুলতেছিল কোষ আবদ্ধ তাহার তলোয়ারখানা। তাহার মাথায় বাঁধা ছিল এক প্রস্থ রুমাল, কিন্তু পদযুগল ছিল পাদুকাশূন্য। এই অবস্থায় শ্বেত প্রাসাদের রক্ষীগণ কোনমতেই তাহাকে প্রাসাদ অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দিতেছিল না।
এমন সময় একদিন স্বয়ং শাহানশাহ খররু পারভেজ যখন আরবদের অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য করিতেছিলেন তখন সুযোগ পাইয়া জনৈক পরিষদ তাঁহাকে জানাইলেন যে, এমনি এক অদ্ভুত বেশভূষার লোক গত কয়েকদিন ধরিয়া দরবারে প্রবেশের অনুমতি দানের জন্য প্রহরীদেরকে অনুরোধ করিতেছে। সে নিজেকে মদীনার দূত বলিয়া পরিচয় দিতেছে। খসরু পারভেজ তখনই তাহাকে দরবারে প্রবেশের অনুমতি দান করিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাসেদ আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা সাহী (রা) তখন তাঁহার সেই দরবেশসুলভ বেশভূষায় খসরু পারভেজের সম্মুখে উপনীত হইলেন। পরিষদবর্গতো এই কম্বল পরিহিত আগন্তুকের নির্ভীক পদক্ষেপে দরবারে প্রবেশের ধরন-ধারণ দেখিয়াই অবাক। যে মহান শাহানশাহে ইরানের দরবারে প্রবেশের সময় বড় বড় রাজা-বাদশাহগণ পর্যন্ত থাকেন ভীত-সন্ত্রস্ত, কুর্ণিশরত, এই লোকটির মধ্যে তাহার কোন লক্ষণই দেখা যাইতেছে না। যেন ইহা সম্রাটের দরবার নহে, সরাইখানা। কিছু একটা জাতীয় প্রহরীগণ তাঁহাকে সতর্ক করিলেন, শাহানশাহের দরবারে প্রবেশকালে কুর্ণিশ করিতে হয় হে! কিন্তু আগন্তুক তাহাতে অসম্মতি প্রকাশ করিলেন, আল্লাহ্ ছাড়া কাহাকেও মোরা করিনাকো কুর্নিশ!"
আগন্তুকের এইরূপ বেপরোয়া উক্তি শ্রবণে রুক্ষ মেজাজের শাহানশাহ খসরু পারভেজ অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিলেন। কী, স্বয়ং শাহানশাহের মুখের উপর একটা গ্রাম্য মানুষের এত বড় স্পর্ধা! দরবারের লোকজন শাহানশাহের অগ্নিমূর্তি দর্শনে ভয়ে জড়সড় হইয়া তোল। কিন্তু আগন্তুক নির্বিকার। তিনি তাঁহার জামার আস্তিন হইতে পত্রখানা বাহির করিয়া নির্ভয়ে খসরু পারভেজের সন্মুখে রাখিয়া দিলেন। নকীব পত্রখানা লইয়া সসম্ভ্রমে বাদশাহর সন্মুখে দাঁড়াইয়া গেল। অতঃপর খসরু পারভেজের নির্দেশে উচ্চকণ্ঠে সে তাহা পড়িয়া শুনাইল। পত্রের পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى كسرى عظيم فارس سلام على من اتبع الهدى وامن بالله ورسوله واشهد ان لا اله الا الله وانى رسول الله الى الناس كافة لينذر من كان حيا اسلم تسلم فان ابيت فعليك اثم المجوس.
১৬৩ "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহ্ নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্র পক্ষ হইতে পারস্য প্রধান কিসরার প্রতি। যে হিদায়াতের অনুসরণ করে, আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে তাহার প্রতি সালাম। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, লা-শরীক আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি এই উদ্দেশ্যে প্রেরিত আল্লাহ্র রাসূল। যেন আমি সমগ্র জীবিত মানবজাতিকে সতর্ক করিয়া দেই। ইসলাম গ্রহণ করুন শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন, আর যদি অগ্রাহ্য করেন তাহা হইলে সমগ্র অগ্নি উপাসক জাতির পাপের বোঝা আপনার উপর বর্তাইবে"।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
সহীহ বুখারী, কিতাবু আখবারিল আহাদ, ৪র্থ অধ্যায়, ২খ., পৃ. ২৯৫-২৯৬; 'জামহারাতুর রাসাইলিল 'আরাব, ১খ., পৃ. ৩৫; সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৭; ইজাযুল কুরআন, পৃ. ১১২; আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬৯; সুব্হুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৭; মুসনাদে আহমাদ, ৪খ., পৃ. ৭৫; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯০; মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া লিল-কাস্তাল্লানী, শারহে যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৮৯; দালাইলুন নুবৃয়্যা (আবূ নুআয়ম), পৃ. ২৯৩, তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯৫-৬।
উপরিউক্ত পাঠ তাবারীর বর্ণনা হইতে লওয়া হইয়াছে। পক্ষান্তরে হামদুল্লাহ আল-মুস্তাওফীর উদ্ধৃত পত্রের পাঠ ও বর্ণনা বর্ধিত অংশসহ এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم. من محمد رسول الله الى يرويزبن هریز اما بعد مانی احمد الله لا اله الا هو الحي القيوم الذي ارسلني بالحق بشيرا ونذيرا الى قوم غلبهم السفه وسلب عقولهم ومن يهدى الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له ان اللله بصيرا بالعباد ليس كمثله شئ وهو السميع البصير اما بعد فاسلم تسلم او ائذن بحرب من الله ورسوله ولم تعجزهما - "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহ্ নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ হইতে হুরমুজ পুত্র পারভেজের প্রতি। সেই আল্লাহ্ প্রশংসা বর্ণনা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক- যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে সেই জাতির প্রতি, যাহারা অজ্ঞতার মধ্যে ডুবিয়া রহিয়াছে এবং যাহাদের বিবেকবুদ্ধি লোপ পাইয়াছে। যাহাকে আল্লাহ্ হিদায়াত দান করেন তাহাকে কেহই পথভ্রষ্ট করিতে পারে না, এবং যাহাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন কেহই তাহাকে হিদায়াত করিতে পারে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাঁহার বান্দাদের ব্যাপারে সম্যক অবগত। কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা (৪২: ১১)। অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ
করিবেন, নতুবা আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন। আল্লাহ্ ও রাসূলকে আপনি অপারগ করিতে সক্ষম হইবেন না।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
ফাদিল সাবরী হামদানী, মুহাম্মাদ ও যেমামদারা (মুহাম্মাদ ইব্ন বালাআমী কৃত তাবারীর অনুবাদের বরাতে ভারতীয় মুদ্রণ, পৃ. ৩৬১; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৬)।
এই ব্যাপারে শী'আ আলিম ও গবেষক 'আলী ইবন হুসায়ন 'আলী আল-আহমাদীর মন্তব্য প্রতিধানযোগ্য। তিনি লিখেন: আমার দৃঢ় ধারণা, প্রথমোক্ত পত্রখানিই সঠিক যাহা বড় বড় ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিছগণ বর্ণনা করিয়াছেন। আমার শায়খ (ইব্ন শাহ্ আশূব) এইজন্য তদীয় মানাকিব গ্রন্থে কেবল প্রথম রিওয়ায়াতই উদ্ধৃত করিয়াছেন- যদিও তাঁহার উদ্ধৃত পত্রের বক্তব্য অধিকাংশের বর্ণনার পরিপন্থী। ইহা সেই যুগের ইসলামের অবস্থার পরিপন্থীও বটে। কেননা পত্রখানি ষষ্ঠ বা সপ্তম হিজরীর, মুসলমানগণ সেই যুগে অর্থাভাব, সংখ্যাস্বল্পতা এবং রণসম্ভারের দিক হইতে অনেকটা রিক্ত ছিলেন। সুতরাং জিযয়াদান বা যুদ্ধ ঘোষণার জন্য পারসিক সম্প্রদায়ের মত বিপুল শক্তিধর সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ করার মত অবস্থা তখন ছিল না।
অধিকন্তু নবী করীম -এর রোমক সম্রাট, ইথিওপীয় সম্রাট ও মিসর-রাজ প্রমুখকে লিখিত পত্রে যাহা ঐ একই সময়ে লিখিত হইয়াছিল- এই বক্তব্য নাই। তবে হাঁ, ইহা অপর পত্র হইতে পারে- যাহা জিয়া সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর লিখিত হইয়া থাকিবে। যেমন কিতাবুল আমওয়াল (পৃ. ২০)-এ রহিয়াছে, কিন্তু তাহাও বিশুদ্ধ হইবার উপায় নাই। কেননা কিসরা ইবন হুরমুজ যাহার কথা পত্রে উল্লিখিত হইয়াছে, ইহার পূর্বেই নিহত হইয়াছেন। আর জিয়ার আয়াত নাযিল হইয়াছে নবম হিজরীতে। আর কিতাবুল আমওয়ালে যাহা এককভাবে বর্ণিত হইয়াছে তাহাও নাজাশীকে লিখিত পত্রের বিপরীত। আর কিসরা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন না। তবে তাহা দশম হিজরীতে বা উহার কাছাকাছি সময়ে কিসরাকে লিখিত পত্র হইয়া থাকিতে পারে যখন ইসলাম বেশ শক্তি সঞ্চয় করিয়াছে এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে, শক্তি-সামর্থ্য ও প্রস্তুতি উন্নত হইয়াছে, যাহা জ্ঞানীগণের নিকট বিদিত (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৭)।
(৩) উপরিউক্ত বর্ণনাদ্বয় ছাড়াও খতীব বাগদাদী, আলী মুত্তাকী আল-হিন্দী (বুরহানপুরী) পত্রের পাঠ উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে:
من محمد رسول الله الى كسرى عظيم فارس أن اسلم تسلم من شهد شهادتنا واستقبل قبلتنا واكل ذبيحتنا فله ذمة الله وذمة رسوله. "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -এর পক্ষ হইতে পারস্য প্রধান কিসরার প্রতি- ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। যে ব্যক্তি আমাদের এই সাক্ষ্য দেয় (কলেমা শাহাদাত পাঠ করে) আমাদের কিবলাকে কিবলারূপে অনুসরণ করে, আমাদের যবেহকৃত গোস্ত খায়,