📄 রোমের রাজপ্রাসাদে মহানবী (সা)-এর কল্পচিত্র
ফেলিয়া দেয়। আল্লাহ্ তাহার রাজত্বকেও খণ্ডবিখণ্ড করিয়া দিবেন। তারপর তোমার মনিবকেও পত্র লিখিয়াছি, তিনি তো তাহা লইয়া চুপচাপ বসিয়া রহিয়াছেন।"
আমি মনে মনে বলিালাম, ইহা হইতেছে সেই বিষয়ত্রয়ের একটি যেগুলির কথা খেয়াল রাখিবার কথা আমাকে বলিয়া দেওয়া হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার তৃণ হইতে তীর খুলিয়া উহার খাপে এই কথাটি টুকিয়া রাখিলাম। তারপর তিনি তদীয় বাম পার্শ্বে উপবিষ্ট একটি লোকের নিকট পত্রখানা অর্পণ করিয়া তাহা পাঠ করিতে বলিলেন। আমি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ঐ পত্র পাঠকারী ভদ্রলোকটির নাম কি? তাহারা জবাব দিল, ইনি হইতেছেন মু'আবিয়া।
আমার মনিব কায়সার তাঁহার প্রেরিত পত্রে এই প্রশ্নটিও করিয়াছিলেন, আপনি আমাকে যে বেহেশতের দিকে আহ্বান জানাইতেছেন (আপনার বক্তব্য অনুসারে), উহা আসমান-যমীন ব্যাপী বিস্তৃত- যাহা ধর্মপ্রাণ ও আল্লাহভীরুগণের জন্য সজ্জিত করিয়া রাখা হইয়াছে। তাহা হইলে দোযখ কোথায়? রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার জবাবে বলিলেন: সুবহানাল্লাহ্! যখন দিবস আসে, তখন রাত্রি কোথায় পালায়? আমি চট করিয়া তৃণ হইতে তীর খুলিয়া খাপের উপর এই কথাটিও টুকিয়া রাখিলাম।
পত্রপাঠ পর্ব শেষ হইলে তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, তুমি বার্তাবাহক দূত। তোমার যথেষ্ট হক রহিয়াছে। কিন্তু উপঢৌকনস্বরূপ দেওয়ার মত তেমন কিছুই আমার কাছে নাই। কেননা আমরা এখন সফরে রহিয়াছি। আমাদের সফরের সম্বলটুকুও নিঃশেষিত প্রায়। এতদশ্রবণে সমবেত জনতার মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিলেন, আমি তাহাকে উপঢৌকন দিতেছি। অতঃপর সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি তাঁহার নিজের জাম্বিলটি খুলিয়া জরদ রঙের একটি চোগা বাহির করিয়া তাহা আমার থলের মধ্যে পুরিয়া দিলেন। আমি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই প্রবীণ ভদ্রলোকটি কে? তাহারা জবাব দিল, ইনি হইতেছেন উছমান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলিয়া উঠিলেন, কে এই দূতকে আতিথ্য প্রদান করিবে? জনৈক আনসারী যুবক দাঁড়াইয়া বলিলেন, আমি, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেই আনসারী ব্যক্তিটি তৎক্ষণাৎ উঠিয়া পড়িলেন আর আমি তাঁহার পশ্চাতে পশ্চাতে চলিলাম। আমরা যখন মজলিস হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতে উদ্যত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ আমাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন: হে আমার তানূখী ভ্রাতা! একটু নিকটে আইস তো! আমি ফিরিয়া গিয়া তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ামাত্র তিনি তদীয় পৃষ্ঠদেশ হইতে বস্ত্র অপসারণ পূর্বক বলিলেন, এই হইতেছে সেই বিশেষ বস্তুটি যাহা দেখিয়া যাওয়ার জন্য তোমার মনিব তোমাকে বলিয়া দিয়াছিলেন।
আমি একটু অবনমিত হইয়া তদীয় পবিত্র পৃষ্ঠদেশে মোহরে নবুওয়াত প্রত্যক্ষ করিলাম- স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি মাংসপিণ্ড-যাহা একটু উত্থিত অবস্থায় ছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।
ইবনুল জাওযী (র) তদীয় সীরাত উমার ইবনুল খাত্তাব গ্রন্থে হযরত দিয়া কালবী (রা)-এর দৌত্যকর্ম সংক্রান্ত একটি বিস্ময়কর ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন বলিয়া আল-বালাগুল মুবীনে, পৃ. ৯২০-১ বর্ণিত হইয়াছে। হযরত দিয়া কালবী বলেন, কায়সার যখন লক্ষ্য করিলেন, তদীয়
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রের প্রতি কায়সারের সম্ভ্রম প্রদর্শন
অমাত্যবর্গ ইসলামের দাওয়াত গ্রহণে একান্তই অনীহ তখন তিনি সেই দিনের মত দরবার মুলতবী করিলেন। পরদিন তিনি আমাকে একটি আলীশান মহলে নিভৃতে একান্তে ডাকিলেন। আমি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করিলাম, প্রাসাদ প্রাচীরে তিন শত তেরটি চিত্র শোভা পাইতেছে। কায়সার আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, এইগুলি হইতেছে নবী-রাসূলগণের চিত্র। এখানে তোমাদের নবীর চিত্র ঠিক কোন্টি তাহা কি আমাকে বলিতে পার? আমি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করিয়া একটি ছবির দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিলাম, এই তো আমাদের নবীর প্রতিকৃতি। কায়সার বলিলেন, নিঃ সন্দেহে ইহাই শেষ নবীর প্রতিকৃতি। আচ্ছা, ঐ তাঁহার দক্ষিণ পার্শ্বে একটি চিত্র দৃষ্ট হইতেছে, ইহা কাহার প্রতিকৃতি?
আমি জবাব দিলাম, ইহা আখেরী যামানার নবীর ঘনিষ্ঠতম সহচর আবু বকরের প্রতিকৃতি। কায়সার আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, আর তাঁহার বাম পার্শ্বে যে চিত্রটি শোভা পাইতেছে, ঐটা কাহার প্রতিকৃতি? আমি বলিলাম, এইটি তাঁহার অপর ঘনিষ্ঠ সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাবের প্রতিকৃতি। এইবার কায়সার বলিলেন, তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে এই দুই ব্যক্তির হাতেই ধর্মের চরম উৎকর্ষ সাধিত হইবে। দিহ্ইয়া (রা) বলেন, আমার মিশন সমাপ্ত করত নবী দরবারে প্রত্যাবর্তন করিয়াই আমি তাহা আনুপূর্বিক তাঁহার নিকট বর্ণনা করি। সবকিছু শ্রবণ করিয়া তিনি বলিলেন, কায়সার যথার্থই বলিয়াছে, ঐ দুইজনের হাতেই ধর্মের চরম উৎকর্ষ সাধিত হইবে।
মওলানা হিফযুর রহমান সিওহারভী বলেন, হাদীছের যাচাই-বাছাইয়ের ব্যাপারে ইবনুল জাওযী (র)-এর কঠোরতা সর্বজনবিদিত। তাই তাঁহার বর্ণিত কোন রিওয়ায়াতকে ভিত্তিহীন বলিয়া উড়াইয়া দেওয়ার উপায় নাই। সম্ভবত ফটোগ্রাফী আবিষ্কারের পূর্ববর্তী চিত্রকল্পের চরম উৎকর্ষের যুগে যখন কাহারও বাচনিক বর্ণনা শ্রবণ করিয়াই শিল্পিগণ হুবহু তাহার চিত্র অঙ্কন করিতে পূর্ণ সক্ষম ছিলেন সেই যুগে তাওরাত-ইঞ্জীল তথা বাইবেলের পুরাতন ও নূতন নিয়মে নবী-রাসূলগণের বর্ণনাসম্বলিত বিবরণ অবলম্বনে রোমের ঈসায়ী সম্রাটগণ এইসব চিত্রকল্প উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন। দিহয়া কালবী (রা) রোমক সম্রাটের দরবারে সেইগুলিই প্রত্যক্ষ করিয়া থাকিবেন। হযরত আবূ বকর (রা) তদীয় খিলাফত আমলে হিশাম আল-'আসকে রোমের রাজদরবারে দূতরূপে প্রেরণ করিলে হিরাক্লিয়াস তদীয় লোকজনকে একটি বড় সিন্দুক তাঁহার কাছে আনয়নের নির্দেশ দেন। উহার মধ্যে অনেকগুলি ছোট ছোট খোপ এবং সেইগুলিতে দরজাও ছিল। হিরাক্লিয়াসের নিকট তাহা আনীত হইলে তিনি তাহার তালা খুলিয়া রেশমী বস্ত্রাচ্ছাদিত অনেকগুলি প্রতিকৃতি বাহির করিলেন, প্রত্যেকটি খোপ হইতে একটি করিয়া প্রতিকৃতি বাহির করিয়া তিনি বলিলেন, এইগুলি হইতেছে নবী-রাসূলগণের প্রতিকৃতি। তন্মধ্যে একটি উজ্জল শ্বেত বর্ণের প্রতিকৃতিও দেখা গেল। হিরাক্লিয়াস হিশামকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আপনি কি এই ব্যক্তিকে চিনেন? হিশাম বলিলেন, ইনিই তো আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনি এই প্রতিকৃতিগুলি কোথায় পাইলেন ? হিশামের এই প্রশ্নের জবাবে সম্রাট জানাইলেন, হযরত আদম (আ) তদীয় সন্তানদের মধ্যকার যাঁহারা নবী-রাসূল হইবেন তাঁহাদেরকে দেখাইয়া দেওয়ার জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তখন এই প্রতিকৃতিগুলি তাঁহার নিকট নাযিল করেন। সূর্যের অস্তাচলে অবস্থিত আদম (আ)-এর হিফাযতখানায় এইগুলি সুসংরক্ষিত অবস্থায় ছিল। যুল-কারনায়ন
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১৫৭ সেইগুলি উদ্ধার পূর্বক হযরত দানিয়াল-এর নিকট সমর্পণ করেন। তিনি আবার সেইগুলিকে নূতন রূপ দান করেন (ই'লামুস্ সাইলীন, পৃ. ৭৬-৭৮)।
হিদায়াতের মালিক আল্লাহ্ তা'আলা। তিনি যাহাকে ইচ্ছা সুপথ প্রদর্শন করেন এবং সুবুদ্ধি সুমতি দান করেন, যাহাকে ইচ্ছা এই পরম ঈঙ্গিত দৌলত হইতে বঞ্চিত রাখেন। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস পার্থিব লোভ ও রাজত্বের মোহে বিভোর থাকার দরুন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আহ্বানে সাড়া দানে ব্যর্থ হইলেও তিনি মনেপ্রাণে তাঁহার সত্যতার কথা উপলব্ধি করিয়াছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর পবিত্র পত্রখানা শিরে ধারণ করেন, চোখে-মুখে লাগান এবং চুম্বনের মাধ্যমে তিনি তাঁহার সেই ঐকান্তিক ভক্তির অভিব্যক্তিও ঘটাইয়াছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁহার নিকট প্রেরিত মহানবীর এই পত্রখানা একটি স্বর্ণ-নির্মিত পাত্রে সসম্মানে সংরক্ষণও করেন।
আমীর সায়ফুদ্দীন মনসূরী বলেন, একদা খলীফা মানসূর কিছু উপঢৌকনসহ আমাকে মরক্কোর বাদশাহ্র নিকট প্রেরণ করেন। এই শেষোক্ত বাদশাহ্ একটি সুপারিশের জন্য আমাকে ফিরিঙ্গী বাদশাহের দরবারে প্রেরণ করেন— যিনি ছিলেন রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অধস্তন বংশধর। দৌত্যকর্ম সম্পন্ন করিয়া আমি যখন তাঁহার দরবার হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতেছিলাম তখন তিনি আমাকে একটু থামিতে বলিলেন। সাথে সাথে তিনি বলিলেন, আপনি যদি আজকের দিনটি থাকিয়া যান তাহা হইলে আমি আপনাকে একটি মহান স্মৃতি ও দুর্লভ বস্তু দেখাইব। তাঁহার কথায় আমি সেই দিনের মত সেখানে রহিয়া গেলাম।
নির্দিষ্ট সময়ে তিনি একটি স্বর্ণের পাতে মোড়া সিন্দুক আনাইলেন। উহার মধ্য হইতে একটি স্বর্ণ নির্মিত পাত্র বাহির করিলেন। অতঃপর তাহা খুলিয়া রেশমী বস্ত্রে মোড়া একখানা পত্র বাহির করিলেন। পত্রখানার অধিকাংশ অক্ষরই মিটিয়া গিয়াছে।
বাদশাহ্ আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ইহা হইতেছে আমার পিতামহ হিরাক্লিয়াসকে লিখিত আপনার নবীর পত্র। উত্তরাধিকার সূত্রে আমি এখন ইহার স্বত্বাধিকারী। আমার পিতামহ বলিয়া গিয়াছেন, যতদিন এই পত্রখানা তোমাদের নিকট সংরক্ষিত থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত এই রাজত্ব টিকিয়া থাকিবে। সুতরাং এই সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে আমরা পত্রখানার প্রতি পূর্ণ সম্ভ্রম পোষণ করিয়া থাকি। কিন্তু সাথে সাথে খৃস্টান সাধারণের নিকট তাহা গোপন রাখি (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৭৭-৭৮; যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৪২)।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণী ও হিরাক্লিয়াসের আশঙ্কার বাস্তবায়ন
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক জনৈক প্রবীণ সিরিয়াবাসীর বরাতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংবাদ হিরাক্লিয়াসের নিকট পৌঁছিলে তিনি সিরিয়াভূমি ত্যাগ করিয়া কন্সটান্টিনোপল চলিয়া যাইতে মনস্থ করেন। উহার প্রাক্কালে তিনি মহানবীর সত্যতা বর্ণনা করিয়া তাঁহার আনুগত্য অবলম্বনে রোমবাসীদেরকে উদ্বুদ্ধ করিতে প্রয়াস পান। ইহাতে তাহারা অসম্মতি প্রকাশ করিলে তিনি জিয়া দানের মাধ্যমে আক্রমণ হইতে নিষ্কৃতি লাভের প্রস্তাব দেন। তাহাতেও যখন তাহারা চরম অনীহা প্রকাশ করিল তখন তিনি প্রস্তাব দিলেন, তাহা হইলে চল আমরা তাঁহার সাথে এই মর্মে সন্ধি
করিয়া লই যে, দক্ষিণ সিরিয়া আমরা মুহাম্মাদকে ছাড়িয়া দিব এবং তিনি আমাদেরকে শামে (উত্তর সিরিয়ায়) থাকিতে দিবেন।
রাবী বলেন, ঐ সময়কার সিরিয়া প্রদেশটি ফিলিস্তীন, জর্দান, দামিশক, হিস্স এবং সীমান্তবর্তী গিরিপথের (যতদূর মনে হয় গোলান উপত্যকা) এই পার লইয়া গঠিত ছিল। আর গিরিপথের ঐ পার ছিল শাম। রোমবাসিগণ ইহাতে আপত্তি জানাইয়া বলিল, আমরা মুহাম্মাদকে সিরিয়া ছাড়িয়া দিব অথচ আপনি সম্যক জ্ঞাত রহিয়াছেন যে, সিরিয়া ভূখণ্ডটি শামেরই অবিচ্ছেদ অঙ্গ। আমরা ইহা কোনমতেই পরিত্যাগ করিতে পারিব না।
তাহাদের এইরূপ অস্বীকৃতি লক্ষ্য করিয়া হিরাক্লিয়াস বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! তোমরা তোমাদের ভূখণ্ডে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিয়া নিজেদেরকে সফল বলিয়া ভাবিতে পসন্দ করিতেছ মাত্র, ইহার অধিক কিছু নহে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৪৬৪-৫)। রাসূলুল্লাহ বলেনঃ
قد مات کسری ولا کسری بعده واذا هلك قيصر نلا قيصر بعده والذي نفسي بيده لتنفقن كنوزهما في سبيل الله "কিসরার মৃত্যু হইয়াছে। তাহার পর আর কোন কিসরা পারস্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইবে না। অতঃপর যখন কায়সার নিপাত যাইবে, তাহার পর আর কোন কায়সার রোমক সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন হইবে না। যে পবিত্র সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁহার শপথ, তাহাদের উভয়ের ধনভাণ্ডারসমূহ তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করিবে" (মুসলিম, জিল্দ ২)।
সত্যসত্যই হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে (হি. ১৪/৬৩ খৃ.) সিরিয়ার উপর উপর্যুপরি মুসলিম হামলা চলিতে থাকে এবং হযরত উমর (রা)-এর খিলাফত আমলে গোটা বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সর্বাধিক সমৃদ্ধ সিরিয়া প্রদেশ মুসলমানদের পদানত হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ -এর ভবিষ্যদ্বাণীর মাত্র ছয় বৎসরের মধ্যেই সেখান হইতে রোমক শাসনের অবসান ঘটে (দ্র. যায়নী দালান, ফুতুহাতে ইসলামিয়া, ১খ., বালাযুরী, ফুতূহুল বুলদান, গীবন, Decline and Fall of the Byzantine Empire প্রভৃতি)।
📄 আরীসিয়্যীন কাহারা?
রোমান সম্রাটকে লিখিত পত্রে রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলেন:
فان توليت فعليك اثم الاريسيين. এই اریسیین শব্দটির আসল রূপ সম্পর্কে নানা আলিমের নানা মত। ইমাম মুসলিম (র)-সহ একদল মুহাদ্দিছ মনে করেন, শব্দটি আসলে الاريسيين )আল-ইরীসিয়্যীন), কিন্তু ইমাম বুখারী (র) বলেন, শব্দটি আসলে আল-ইয়ারীসিয়্যীন। আবার অনেকে ইহাকে আল-আরীসিয়্যীন বলিয়াছেন। তাঁহাদের মতে, প্রাচীন যুগের কোন এক নবীকে অস্বীকারকারী আবদুল্লাহ ইব্ন আরীসের নাম হইতেই উহার উৎপত্তি— যাহার অর্থ, ব্যাপকভাবে নবীকে অস্বীকারকারী দল। আবার অন্য কেহ বলিয়াছেন, ইহারা হইতেছে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আরূস )عبد الله بن عروس(-এর অনুসারী খৃস্ট ধর্মাবলম্বী যাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র মনে করেন না।
বিখ্যাত আরবী অভিধান আল-কামূস আল-মুহীতে শব্দটির আলোচনায় আছেঃ
ارس (الارس) بالكسر الاصل الطيب والأرس والاريسن كجليس وسكيت الاكار اليسون واريسون وارارسة وأرارسة وأرارس وأرس يأرس أرسا وارس تأريسا صار أرسيا وكسكيت الامير وارسه تأريسا استعمله واستخدمه. মোটকথা, কৃষককূল, সেবক ও ভৃত্য শ্রেণীর লোকজন (তারতীবু'ল-কামূসিল মুহীত আলা তারীকাতি'ল-মিস বাহি'ল-মুনীর ও আসাসি'ل-বালাগা, ১খ., পৃ. ১৩২-৩; 'ঈসা আল-বারী আল-হালাবী ও শুরাকাউহু বি-মিস'র)।
হাদীছের অন্য একটি বর্ণনা হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়, যাহাতে এই ক্ষেত্রে বলা হইয়াছে:
فلا تحل بين الفلاحين والانتلام. "আপনি আপনার কৃষক প্রজাদের এবং ইসলামের মধ্যে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইবেন না" (জামহারাতু রাসাইলিল আরাব, ১খ., পৃ. ৩৯; সুবহু'ল-আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৭; কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ৫৫; কায়রো ১৯৩৪ খৃ.; আল-মিস-বাহু'ল-মুদী, ২খ., পৃ. ১০৩; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮২)।
আল্লামা ইবন কাছীরের রিওয়ায়াতেও এই স্থলে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হইয়াছে:
فان ابيت فان اثم الاكاريين عليك. "আপনি যদি অগ্রাহ্য করেন তবে কৃষককুলের পাপের বোঝা আপনার উপরই বর্তাইবে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৪৫৭; বাংলা ভাষ্য, ইফাবা, প্রকাশিত ২০০৪)।
কিতাবুল আমওয়ালের সংকলক আবূ 'উবায়দ শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, শব্দটির অর্থ কৃষক হইলেও এখানে কেবল কৃষকদের কথা বুঝান হয় নাই। ব্যাপক অর্থে সমস্ত প্রজাকুলকেই বুঝান হইয়াছে। কেননা আরবগণ অনারব সকল জাতিকেই একান্তই কৃষিনির্ভর চাষাভূষা জাতি মনে করিত। ঐ সকল জাতির লোকজন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপরই নির্ভরশীল ছিল। কাযী ইয়ায (র) রাসূলুল্লাহ-এর এই বাক্যটিকে আরও বর্ধিত কলেবরে রিওয়ায়াত করিয়াছেন এইভাবে:
فان ابيت فانا نهدم الكفور ونقتل الارسيين واني اجعل ذلك في رقبتك. "আপনি যদি অগ্রাহ্য করেন, তাহা হইলে আমরা পল্লীসমূহ ধ্বংস করিব এবং (এইগুলির অধিবাসী) কৃষককুলকে হত্যা করিব, আর ইহার তাবৎ দায়দায়িত্ব আপনার ঘাড়েই চাপাইব” (কাযী ইয়ায, মাশারিকুল আনওয়ার আলা সিহাহিল আছার, ২খ., পৃ. ৮৩-৮৪; ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৭০)।
উক্ত হাদীছে کفور শব্দটি পল্লী-গ্রাম অর্থে এবং আরীব আরীসিয়্যীন কৃষককুল অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইবনুল মানযূরও 'লিসানুল 'আরাব' গ্রন্থে শব্দটিকে কৃষিজীবীর সম-অর্থের বলিয়া উল্লেখ করিয়া ইহার সমর্থনে ইমাম ছা'লাব-এর বরাত দিয়াছেন। এই ব্যাপারে তিনি ইবনুল 'আরাবীর অনুরূপ উক্তিও উদ্ধৃত করিয়াছেন। আবূ উবায়দার এরূপ উদ্ধৃতিও তিনি ব্যবহার করিয়াছেন,