📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বিতীয় পত্রের জবাবে হিরাক্লিয়াস
রাসূলুল্লাহ -এর দ্বিতীয় পত্রের জবাবে হিরাক্লিয়াস إلى احمد رسول الله الذي بشر به عيسى من قيصر ملك الروم انه جائني كتابك مع رسولك واني اشهد انك رسول الله نجدك عندنا في الانجيل بشرنا بك عيسى بن مريم واني دعوت الروم الى أن يؤمنوا بك فابوا ولو اطاعو ني لكان خيرا لهم ولوددت اني عندك فاخدمك واغسل قدميك. "আহমাদ রাসূলুল্লাহ্র প্রতি— যাঁহার সুসমাচার 'ঈসা (আ) দিয়াছিলেন, রোমক সম্রাট কায়সারের পক্ষ হইতে— আপনার পত্রখানা আপনার দূতের মাধ্যমে আমার নিকট পৌছিয়াছে। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহ্র সত্য রাসূল। আমাদের কাছে রক্ষিত ইঞ্জীল কিতাবে . আমরা আপনার উল্লেখ পাই। মারয়াম-তনয় 'ঈসা (আ) আপনার শুভাগমনের সুসমাচার দিয়াছেন। আমি রোমবাসীদেরকে আপনার প্রতি ঈমান আনয়নের দাওয়াত দিয়াছি, কিন্তু তাহারা তাহাতে সম্মত হয় নাই। তাহারা যদি আমার কথা মানিয়া লইত, তাহা হইলে নিঃসন্দেহে তাহা তাহাদের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর হইত। আমার মন চাহে, আমি যদি আপনার খিদমতে উপস্থিত হইতে পারিতাম আর আপনার পবিত্র চরণযুগল স্বহস্তে ধৌত করিয়া দিতে পারিতাম” (আল-ইয়া'কূবী, ২খ., পৃ. ৬২; সীরাতে যায়নী দালান, (সীরাতে হালাবিয়্যার পাদটীকায়), ৩খ., পৃ. ৬৪; সীরাতে হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৭; মাজমু'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮২)।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, মহানবী-এর তাবূক অবস্থানকালে হিরাক্লিয়াস জনৈক দূত মারফত তাঁহার কাছে প্রেরিত পত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রশ্ন করেন :
📄 রোমক সম্রাটের দূতের ঘটনা তাহার নিজের যবানে
تَدْعُونِي إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ فَأَيْنَ النَّارُ ؟ ১৫৩ "আপনি আমাকে এমন বেহেশতের দিকে আহ্বান জানাইতেছেন যাহার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও যমীনব্যাপী, তাহা হইলে দোযখ কোথায় (মাজমূআতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮৫)?
অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র প্রাপ্তির পর সভাসদবর্গের বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্যে হিরাক্লিয়াস দূতকে বলেন, انی اخاف علی ملکی "আমি আমার রাজত্ব হারানোর আশঙ্কা করিতেছি”। মহানবী (স)-কে দেওয়ার জন্য তিনি একটি কাগজে লিখিয়া দেন, انی مسلم ولكنى مغلوب "আমি মুসলিম কিন্তু পরিস্থিতির শিকার, পরাজিত” (প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট প্রেরিত পত্রের সহিত হিরাক্লিয়াস তাঁহার জন্য কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রাও প্রেরণ করেন। রাসূলুলুল্লাহ (স) বলেন:
يبقى ملكهم ما بقى كتابي عندهم. "আমার পত্রখানা যতদিন তাহাদের নিকট সংরক্ষিত থাকিবে ততদিন তাহাদের রাজত্ব টিকিয়া থাকিবে।"
হিরাক্লিয়াসের মুসলিম বলিয়া পরিচয় দেওয়া সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করিলেন, আল্লাহ্র দুশমন মিথ্যা বলিয়াছে। আদতে সে মুসলিম নহে (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮৬; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১১৪)।
আবূ সুফয়ান প্রমুখাৎ বর্ণিত পূর্বোক্ত বর্ণনার সহায়ক বিধায় দূতের বর্ণনাটি নিম্নে হুবহু প্রদত্ত হইল। মু'আবিয়া-পরিবারের আযাদকৃত দাস সাঈদ ইবন আবী রাশিদ বর্ণনা করেন, আমি যখন সিরিয়ায় (হিমসে) উপনীত হইলাম তখন আমাকে বলা হইল, পাশের গীর্জায়ই সেই লোকটি বাস করে, যে ব্যক্তিটি রোমক সম্রাটের দূতরূপে মহানবী-এর দরবারে প্রেরিত হইয়াছিলেন-। কৌতূহলবশে আমি সেই গীর্জায় প্রবেশ করিলাম। সেখানে ঢুকিয়াই দেখিলাম এক বৃদ্ধ বসিয়া রহিয়াছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনিই কি রোমক সম্রাটের দূতরূপে রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে গমন করিয়াছিলেন? বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়া বলিলেন, হাঁ, আমিই গিয়াছিলাম। আমি বলিলাম, অনুগ্রহপূর্বক সেই ঘটনা বিবৃত করুন তো।
বৃদ্ধ বলিলেন, রাসূলুল্লাহ যখন তাবুকে আসেন, তখন দিহ্ইয়া কালবীকে তাঁহার দূতরূপে হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেন। সম্রাট পত্রখানা পাইয়াই রোমের বিশপ ও পাদ্রিগণকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহারা আসিয়া পৌছিলে তিনি দরবারকক্ষের দরজাসমূহে অর্গলাবদ্ধ করাইয়া দিয়া তাহাদেরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, আপনারা তো দেখিতেই পাইতেছেন যে, সেই বিদেশীটি ইতোমধ্যেই আমাদের মাতৃভূমিতে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। সে আমার নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছে। তাহার দাবি তিনটি: হয় আমরা তাহার ধর্মে দীক্ষিত হইব, নতুবা তাহার বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইয়া তাহাকে আমাদের রাজ্যের পক্ষ হইতে রাজস্ব প্রদান করিব। আর যদি তাহাও আমরা গ্রহণ না করি তবে তৃতীয় বিকল্প ব্যবস্থা হইতেছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা। আল্লাহর কসম! এই
পত্রখানা পাঠে আমার কেন যেন মনে হইতেছে, আমার পদতলের এইসব কিছুই কাড়িয়া লওয়া হইবে। এমতাবস্থায় তাহার ধর্মে দীক্ষিত হওয়া অথবা তাহার রাজস্ব প্রদানে স্বীকৃত হইয়া যাওয়াটাই কি বুদ্ধিমানের মত কাজ হইবে না!
এই কথা শ্রবণ করিয়া দরবার ভর্তি লোকজন চীৎকার করিয়া উঠিল, তাহা হইলে কি আমাদের খৃষ্ট ধর্ম বিসর্জন দিয়া হেজায হইতে আগত এই ব্যক্তিটির বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইতে আপনি আমাদেরকে পরামর্শ দিতেছেন? রোমক সম্রাট যখন মজলিসের এই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করিলেন তখন তাঁহার আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, মজলিসের এই লোকগুলি বাহির হইয়া গেলেই গোটা সাম্রাজ্যব্যাপী উহার তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইবে। এই কথা উপলব্ধি করামাত্র তিনি ভোল পাল্টাইয়া সমবেত অমাত্যবর্গ ও ধর্মযাজকগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমি আপনাদেরকে একটু পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম যে, আপনারা স্বধর্মে কতটুকু অবিচল আছেন।
তারপর তিনি জনৈক আরব খৃস্টান ভৃত্যকে ডাকিয়া বলিলেন, আমার নিকট এমন একটি লোককে নিয়া আইস যাহার স্মরণশক্তি প্রখর, অথচ সে স্বচ্ছন্দে আরবী বলিতে সক্ষম। তাহার মাধ্যমেই আমি পত্রের জবাব প্রেরণ করিব। ভৃত্যটি আমার নিকট ছুটিয়া আসিল এবং সে আমাকে ধরিয়া লইয়া সম্রাটের সমীপে উপস্থিত করিল।
সম্রাট আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তুমি ঐ ব্যক্তিটির নিকট আমার পত্রসহ গমন করিবে এবং তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করিবে। প্রথমত, আমার নিকট তাহার (প্রথম) পত্রটির কথা সে-কিছু বলে কি না? দ্বিতীয়ত, পত্রপাঠের সময় সে দিবস বা রজনীর কোন উল্লেখ করে কি না? তৃতীয়ত, একটি বিশেষ বস্তু তাহার মধ্যে দৃষ্ট হয় কি না?
আমি যথারীতি সম্রাটের পত্রসহ তাবুকে গিয়া উপনীত হইলাম। আমি লক্ষ্য করিলাম, তিনি (রাসূলুল্লাহ) তদীয় সঙ্গী-সাহাবীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় কুয়ার পাড়ে উপবিষ্ট। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনাদের মনিব কোথায়? আমাকে বলা হইল, এই যে তিনি বসিয়া রহিয়াছেন। আমি অগ্রসর হইয়া তাঁহার নিকট গিয়া বসিয়া পড়িলাম। তিনি আমার নিকট হইতে সম্রাটের পত্রখানা গ্রহণ করিয়া তাঁহার পাশেই রাখিয়া দিলেন। তারপর আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন: তুমি কোন্ গোত্রের লোক হও? আমি জবাব দিলাম, 'তানূখ গোত্রে'। এই কথা কি তোমার মনপূত হয় না যে, তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম (আ)-এর সনাতন সত্য ধর্ম কবূল করিয়া তুমি মুসলমান হইয়া যাও?
আমি জবাব দিলাম, এখন তো একটি জাতির দূতরূপে আমি আপনার দরবারে আগমন করিয়াছি। দৌত্যকর্মের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তো আমি মতাদর্শ পরিত্যাগ করিতে পারি না। আমার এই জবাব শুনিয়া স্মিতহাস্য করিয়া তিনি বলিলেনঃ "তুমি যাহাকে চাহিবে তাহাকেই হিদায়াত করিতে পারিবে না, বরং আল্লাহই সেই পবিত্র সত্তা তিনি যাহাকে ইচ্ছা হিদায়াত করিতে পারেন। আর তিনিই হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে সম্যক অবগত” (২৮:৪৬)।
তিনি তাঁহার বক্তব্য প্রদান অব্যাহত রাখিলেন এবং আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: “হে আমার তানূখী ভ্রাতা! আমি পারস্য-সম্রাট কিস্সার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে আমার পত্রখানা ছিড়িয়া ফেলিয়া দেয়। আল্লাহ্ তাহার রাজত্বকেও খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিবেন। আমি ইথিওপিীয় সম্রাট নাজাশীর উদ্দেশ্যেও পত্র প্রেরণ করিয়াছি। সেও আমার পত্রখানা ছিড়িয়া
📄 রোমের রাজপ্রাসাদে মহানবী (সা)-এর কল্পচিত্র
ফেলিয়া দেয়। আল্লাহ্ তাহার রাজত্বকেও খণ্ডবিখণ্ড করিয়া দিবেন। তারপর তোমার মনিবকেও পত্র লিখিয়াছি, তিনি তো তাহা লইয়া চুপচাপ বসিয়া রহিয়াছেন।"
আমি মনে মনে বলিালাম, ইহা হইতেছে সেই বিষয়ত্রয়ের একটি যেগুলির কথা খেয়াল রাখিবার কথা আমাকে বলিয়া দেওয়া হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার তৃণ হইতে তীর খুলিয়া উহার খাপে এই কথাটি টুকিয়া রাখিলাম। তারপর তিনি তদীয় বাম পার্শ্বে উপবিষ্ট একটি লোকের নিকট পত্রখানা অর্পণ করিয়া তাহা পাঠ করিতে বলিলেন। আমি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ঐ পত্র পাঠকারী ভদ্রলোকটির নাম কি? তাহারা জবাব দিল, ইনি হইতেছেন মু'আবিয়া।
আমার মনিব কায়সার তাঁহার প্রেরিত পত্রে এই প্রশ্নটিও করিয়াছিলেন, আপনি আমাকে যে বেহেশতের দিকে আহ্বান জানাইতেছেন (আপনার বক্তব্য অনুসারে), উহা আসমান-যমীন ব্যাপী বিস্তৃত- যাহা ধর্মপ্রাণ ও আল্লাহভীরুগণের জন্য সজ্জিত করিয়া রাখা হইয়াছে। তাহা হইলে দোযখ কোথায়? রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার জবাবে বলিলেন: সুবহানাল্লাহ্! যখন দিবস আসে, তখন রাত্রি কোথায় পালায়? আমি চট করিয়া তৃণ হইতে তীর খুলিয়া খাপের উপর এই কথাটিও টুকিয়া রাখিলাম।
পত্রপাঠ পর্ব শেষ হইলে তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, তুমি বার্তাবাহক দূত। তোমার যথেষ্ট হক রহিয়াছে। কিন্তু উপঢৌকনস্বরূপ দেওয়ার মত তেমন কিছুই আমার কাছে নাই। কেননা আমরা এখন সফরে রহিয়াছি। আমাদের সফরের সম্বলটুকুও নিঃশেষিত প্রায়। এতদশ্রবণে সমবেত জনতার মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিলেন, আমি তাহাকে উপঢৌকন দিতেছি। অতঃপর সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি তাঁহার নিজের জাম্বিলটি খুলিয়া জরদ রঙের একটি চোগা বাহির করিয়া তাহা আমার থলের মধ্যে পুরিয়া দিলেন। আমি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই প্রবীণ ভদ্রলোকটি কে? তাহারা জবাব দিল, ইনি হইতেছেন উছমান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলিয়া উঠিলেন, কে এই দূতকে আতিথ্য প্রদান করিবে? জনৈক আনসারী যুবক দাঁড়াইয়া বলিলেন, আমি, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেই আনসারী ব্যক্তিটি তৎক্ষণাৎ উঠিয়া পড়িলেন আর আমি তাঁহার পশ্চাতে পশ্চাতে চলিলাম। আমরা যখন মজলিস হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতে উদ্যত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ আমাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন: হে আমার তানূখী ভ্রাতা! একটু নিকটে আইস তো! আমি ফিরিয়া গিয়া তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ামাত্র তিনি তদীয় পৃষ্ঠদেশ হইতে বস্ত্র অপসারণ পূর্বক বলিলেন, এই হইতেছে সেই বিশেষ বস্তুটি যাহা দেখিয়া যাওয়ার জন্য তোমার মনিব তোমাকে বলিয়া দিয়াছিলেন।
আমি একটু অবনমিত হইয়া তদীয় পবিত্র পৃষ্ঠদেশে মোহরে নবুওয়াত প্রত্যক্ষ করিলাম- স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি মাংসপিণ্ড-যাহা একটু উত্থিত অবস্থায় ছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।
ইবনুল জাওযী (র) তদীয় সীরাত উমার ইবনুল খাত্তাব গ্রন্থে হযরত দিয়া কালবী (রা)-এর দৌত্যকর্ম সংক্রান্ত একটি বিস্ময়কর ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন বলিয়া আল-বালাগুল মুবীনে, পৃ. ৯২০-১ বর্ণিত হইয়াছে। হযরত দিয়া কালবী বলেন, কায়সার যখন লক্ষ্য করিলেন, তদীয়
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রের প্রতি কায়সারের সম্ভ্রম প্রদর্শন
অমাত্যবর্গ ইসলামের দাওয়াত গ্রহণে একান্তই অনীহ তখন তিনি সেই দিনের মত দরবার মুলতবী করিলেন। পরদিন তিনি আমাকে একটি আলীশান মহলে নিভৃতে একান্তে ডাকিলেন। আমি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করিলাম, প্রাসাদ প্রাচীরে তিন শত তেরটি চিত্র শোভা পাইতেছে। কায়সার আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, এইগুলি হইতেছে নবী-রাসূলগণের চিত্র। এখানে তোমাদের নবীর চিত্র ঠিক কোন্টি তাহা কি আমাকে বলিতে পার? আমি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করিয়া একটি ছবির দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিলাম, এই তো আমাদের নবীর প্রতিকৃতি। কায়সার বলিলেন, নিঃ সন্দেহে ইহাই শেষ নবীর প্রতিকৃতি। আচ্ছা, ঐ তাঁহার দক্ষিণ পার্শ্বে একটি চিত্র দৃষ্ট হইতেছে, ইহা কাহার প্রতিকৃতি?
আমি জবাব দিলাম, ইহা আখেরী যামানার নবীর ঘনিষ্ঠতম সহচর আবু বকরের প্রতিকৃতি। কায়সার আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, আর তাঁহার বাম পার্শ্বে যে চিত্রটি শোভা পাইতেছে, ঐটা কাহার প্রতিকৃতি? আমি বলিলাম, এইটি তাঁহার অপর ঘনিষ্ঠ সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাবের প্রতিকৃতি। এইবার কায়সার বলিলেন, তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে এই দুই ব্যক্তির হাতেই ধর্মের চরম উৎকর্ষ সাধিত হইবে। দিহ্ইয়া (রা) বলেন, আমার মিশন সমাপ্ত করত নবী দরবারে প্রত্যাবর্তন করিয়াই আমি তাহা আনুপূর্বিক তাঁহার নিকট বর্ণনা করি। সবকিছু শ্রবণ করিয়া তিনি বলিলেন, কায়সার যথার্থই বলিয়াছে, ঐ দুইজনের হাতেই ধর্মের চরম উৎকর্ষ সাধিত হইবে।
মওলানা হিফযুর রহমান সিওহারভী বলেন, হাদীছের যাচাই-বাছাইয়ের ব্যাপারে ইবনুল জাওযী (র)-এর কঠোরতা সর্বজনবিদিত। তাই তাঁহার বর্ণিত কোন রিওয়ায়াতকে ভিত্তিহীন বলিয়া উড়াইয়া দেওয়ার উপায় নাই। সম্ভবত ফটোগ্রাফী আবিষ্কারের পূর্ববর্তী চিত্রকল্পের চরম উৎকর্ষের যুগে যখন কাহারও বাচনিক বর্ণনা শ্রবণ করিয়াই শিল্পিগণ হুবহু তাহার চিত্র অঙ্কন করিতে পূর্ণ সক্ষম ছিলেন সেই যুগে তাওরাত-ইঞ্জীল তথা বাইবেলের পুরাতন ও নূতন নিয়মে নবী-রাসূলগণের বর্ণনাসম্বলিত বিবরণ অবলম্বনে রোমের ঈসায়ী সম্রাটগণ এইসব চিত্রকল্প উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন। দিহয়া কালবী (রা) রোমক সম্রাটের দরবারে সেইগুলিই প্রত্যক্ষ করিয়া থাকিবেন। হযরত আবূ বকর (রা) তদীয় খিলাফত আমলে হিশাম আল-'আসকে রোমের রাজদরবারে দূতরূপে প্রেরণ করিলে হিরাক্লিয়াস তদীয় লোকজনকে একটি বড় সিন্দুক তাঁহার কাছে আনয়নের নির্দেশ দেন। উহার মধ্যে অনেকগুলি ছোট ছোট খোপ এবং সেইগুলিতে দরজাও ছিল। হিরাক্লিয়াসের নিকট তাহা আনীত হইলে তিনি তাহার তালা খুলিয়া রেশমী বস্ত্রাচ্ছাদিত অনেকগুলি প্রতিকৃতি বাহির করিলেন, প্রত্যেকটি খোপ হইতে একটি করিয়া প্রতিকৃতি বাহির করিয়া তিনি বলিলেন, এইগুলি হইতেছে নবী-রাসূলগণের প্রতিকৃতি। তন্মধ্যে একটি উজ্জল শ্বেত বর্ণের প্রতিকৃতিও দেখা গেল। হিরাক্লিয়াস হিশামকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আপনি কি এই ব্যক্তিকে চিনেন? হিশাম বলিলেন, ইনিই তো আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনি এই প্রতিকৃতিগুলি কোথায় পাইলেন ? হিশামের এই প্রশ্নের জবাবে সম্রাট জানাইলেন, হযরত আদম (আ) তদীয় সন্তানদের মধ্যকার যাঁহারা নবী-রাসূল হইবেন তাঁহাদেরকে দেখাইয়া দেওয়ার জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তখন এই প্রতিকৃতিগুলি তাঁহার নিকট নাযিল করেন। সূর্যের অস্তাচলে অবস্থিত আদম (আ)-এর হিফাযতখানায় এইগুলি সুসংরক্ষিত অবস্থায় ছিল। যুল-কারনায়ন
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১৫৭ সেইগুলি উদ্ধার পূর্বক হযরত দানিয়াল-এর নিকট সমর্পণ করেন। তিনি আবার সেইগুলিকে নূতন রূপ দান করেন (ই'লামুস্ সাইলীন, পৃ. ৭৬-৭৮)।
হিদায়াতের মালিক আল্লাহ্ তা'আলা। তিনি যাহাকে ইচ্ছা সুপথ প্রদর্শন করেন এবং সুবুদ্ধি সুমতি দান করেন, যাহাকে ইচ্ছা এই পরম ঈঙ্গিত দৌলত হইতে বঞ্চিত রাখেন। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস পার্থিব লোভ ও রাজত্বের মোহে বিভোর থাকার দরুন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আহ্বানে সাড়া দানে ব্যর্থ হইলেও তিনি মনেপ্রাণে তাঁহার সত্যতার কথা উপলব্ধি করিয়াছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর পবিত্র পত্রখানা শিরে ধারণ করেন, চোখে-মুখে লাগান এবং চুম্বনের মাধ্যমে তিনি তাঁহার সেই ঐকান্তিক ভক্তির অভিব্যক্তিও ঘটাইয়াছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁহার নিকট প্রেরিত মহানবীর এই পত্রখানা একটি স্বর্ণ-নির্মিত পাত্রে সসম্মানে সংরক্ষণও করেন।
আমীর সায়ফুদ্দীন মনসূরী বলেন, একদা খলীফা মানসূর কিছু উপঢৌকনসহ আমাকে মরক্কোর বাদশাহ্র নিকট প্রেরণ করেন। এই শেষোক্ত বাদশাহ্ একটি সুপারিশের জন্য আমাকে ফিরিঙ্গী বাদশাহের দরবারে প্রেরণ করেন— যিনি ছিলেন রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অধস্তন বংশধর। দৌত্যকর্ম সম্পন্ন করিয়া আমি যখন তাঁহার দরবার হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতেছিলাম তখন তিনি আমাকে একটু থামিতে বলিলেন। সাথে সাথে তিনি বলিলেন, আপনি যদি আজকের দিনটি থাকিয়া যান তাহা হইলে আমি আপনাকে একটি মহান স্মৃতি ও দুর্লভ বস্তু দেখাইব। তাঁহার কথায় আমি সেই দিনের মত সেখানে রহিয়া গেলাম।
নির্দিষ্ট সময়ে তিনি একটি স্বর্ণের পাতে মোড়া সিন্দুক আনাইলেন। উহার মধ্য হইতে একটি স্বর্ণ নির্মিত পাত্র বাহির করিলেন। অতঃপর তাহা খুলিয়া রেশমী বস্ত্রে মোড়া একখানা পত্র বাহির করিলেন। পত্রখানার অধিকাংশ অক্ষরই মিটিয়া গিয়াছে।
বাদশাহ্ আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ইহা হইতেছে আমার পিতামহ হিরাক্লিয়াসকে লিখিত আপনার নবীর পত্র। উত্তরাধিকার সূত্রে আমি এখন ইহার স্বত্বাধিকারী। আমার পিতামহ বলিয়া গিয়াছেন, যতদিন এই পত্রখানা তোমাদের নিকট সংরক্ষিত থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত এই রাজত্ব টিকিয়া থাকিবে। সুতরাং এই সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে আমরা পত্রখানার প্রতি পূর্ণ সম্ভ্রম পোষণ করিয়া থাকি। কিন্তু সাথে সাথে খৃস্টান সাধারণের নিকট তাহা গোপন রাখি (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৭৭-৭৮; যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৪২)।