📄 নবুওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে রোম সম্রাটের স্বীকারোক্তি
রোম সম্রাট তখন দোভাষীকে বলিলেন, তুমি উহাদেরকে বল, আমি তোমাকে তাঁহার বংশ-মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। জবাবে তুমি বলিলে, তিনি তোমাদের মধ্যে উচ্চ বংশজাত। এই রূপই হইয়া থাকে। নবীগণকে তাঁহাদের জাতির উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হইয়া থাকে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমাদের মধ্যে অপর কেহ কি এইরূপ নবৃওয়াতের দাবি করিয়াছে? তুমি বলিলে, না। আমি বলি, তাহার পূর্বে কেহ যদি এইরূপ কথা বলিয়া থাকিত তাহা হইলে আমি বলিতাম, এই ব্যক্তি এমন একটি কথার অনুসরণ করিতেছে, যাহা পূর্বেও কথিত হইয়াছে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহার পূর্বপুরুষগণের কেহ কি বাদশাহ ছিলেন? তুমি বলিলে, 'না'। আমি বলি, যদি তাহার পূর্বপুরুষগণের কেহ বাদশাহ থাকিতেন তবে আমি বলিতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি তাহার পিতৃরাজ্য ফেরত পাইতে আগ্রহী।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহার নবৃওয়াত দাবির পূর্বে তোমরা তাঁহার প্রতি মিথ্যার অপবাদ দিতে কি? তুমি বলিলে, না। এতদ্বারা আমি এই কথাই বুঝিয়াছি যে, এমনটি হইতেই পারে না যে, তিনি মানুষের সম্বন্ধে তো মিথ্যা পরিহার করেন আর স্বয়ং আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা বলেন?
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, বড়লোকগণ তাঁহার অনুসরণ করেন, নাকি দরিদ্ররা? তুমি বলিলে, দুর্বল দরিদ্ররাই তাঁহার অনুসরণ করে। আর দুর্বল দরিদ্ররাই রাসূলগণের অনুসারী হইয়া থাকে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে, নাকি হ্রাস পাইতেছে? তুমি বলিলে, ক্রমেই বৃদ্ধি পাইয়া চলিয়াছে। পূর্ণতা লাভ পর্যন্ত ঈমানের ব্যাপারটা এমনই হইয়া থাকে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কেহ কি তাঁহার ধর্ম গ্রহণের পর অসন্তুষ্ট হইয়া তাহা ত্যাগ করিয়াছে? তুমি বলিলে, না। আর ঈমান এইরূপই হইয়া থাকে- যখন উহার সজীবতা অন্তরের সহিত যুক্ত হয়।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কি তাঁহার কথার খেলাফ করেন? তুমি বলিলে, না। রাসূলগণ এইরূপই হইয়া থকেন। তঁহারা কস্মিনকালেও কথার খেলাফ করেন না।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি তোমাদেরকে কী আদেশ করেন? তুমি বলিলে, তিনি তোমাদেরকে আদেশ করেন এক আল্লাহর ইবাদত করিতে এবং তাঁহার সহিত অন্য কাহাকেও শরীক না করিতে। আর তিনি তোমদেরকে মূর্তিপূজা করিতে বারণ করেন, আদেশ করেন সালাত কায়েম করিতে, সত্য কথা বলিতে এবং পাপকার্যাদি হইতে বিরত থাকিতে।
তোমার এই কথাগুলি যদি সত্য হইয়া থাকে, তবে অচিরেই তিনি আমার পদযুগলের নিচের এই স্থানেরও কর্তৃত্ব লাভ করিবেন। তিনি যে আবির্ভূত হইবেন তাহা আমি জানিতাম, কিন্তু
তোমাদের মধ্যেই যে তাঁহার আবির্ভাব ঘটিবে তাহা আমি পূর্বে ধারণা করি নাই। যদি তাঁহার কাছে পৌঁছিতে পারিব বলিয়া জানিতাম তবে তাঁহার সহিত সাক্ষাতের জন্য যে কোন কষ্ট স্বীকার করিতাম। আর যদি আমি তাঁহার নিকটে থাকিতাম, তবে নিশ্চয় তাঁহার পূত চরণযুগল স্বহস্তে ধৌত করিয়া দিতাম।
তারপর তিনি দিয়ার মারফতে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ -এর সেই পত্রখানা, যাহা বুসরার শাসকের মাধ্যমে তাঁহার নিকট পৌঁছিয়াছিল, তাহা পাঠ করিলেন। এই পত্রখানা পাঠের পূর্বে হিরাক্লিয়াস তাঁহার অমাত্যবর্গের নিকট যে ভূমিকা দিয়াছিলেন, যে প্রস্তাব রাখিয়াছিলেন আর তাহার যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছিল, তাহার বিস্তারিত বিবরণ পরে আসিতেছে।
আরববাসিগণ খতনা করিয়া থাকে, এই সংবাদে হিরাক্লিয়াস যখন নিশ্চিত হইলেন যে, নবীরূপে আত্মপ্রকাশকারী এবং তাঁহার নিকট পত্র প্রেরণকারীই ঐ যুগের বাদশাহ, তখন তিনি রোমবাসী তাহার সমপর্যায়ের জ্যেতির্বিদ্যা বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে তাঁহার ব্যাপারে পত্র লিখেন। হিরাক্লিয়াসের হিমসে অবস্থানকালেই তাঁহার বন্ধুটির জবাবও এই মর্মে আসিল যে, নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে তিনিও তাঁহার সহিত সম্পূর্ণ একমত (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪-৫; বাংলা ভাষ্য, তাজরীদুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৯-১১, বাংলা একাডেমী প্রকাশিত, ১৯৫২ খৃ.; সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৫; কানযুল উম্মাল, ৫খ., পৃ. ২৪৬; ইব্ন তায়মিয়্যা, আল-জাওয়াবুস্ সাহীহ্ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ, ৪খ., পৃ. ৩১৬-৩১৯)।
ঐ যুগের পৃথিবীর প্রায় জাতির মধ্যেই সচরাচর একটি আলোচানা শোনা যাইত যে, আখেরী যমানার রাসূলের আবির্ভাব অত্যাসন্ন। সকলের মনেই প্রত্যাশা ছিল যে, শেষ নবী তাহাদের মধ্যেই আবির্ভূত হইবেন। এই ব্যাপারে সর্বাধিক আশাবাদী ছিল ইয়াহুদী জাতি। তাহাদের প্রত্যাশা ছিল যে, রাসূল অবশ্যই তাহাদের মধ্য হইতে আবির্ভূত হইবেন এবং তাহাদেরকে অন্যান্য জাতির অত্যাচার হইতে নিষ্কৃতি দান করিবেন। অনুরূপ খৃস্টান জাতিও আশা করিত যে, তাহাদের মধ্যে বিরাজমান দলাদলি ও কোন্দল দূর করিয়া দিয়া প্রতীক্ষিত নবী আগমন করিয়া তাহাদের মধ্যে তাহাদেরকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিরূপে গড়িয়া তুলিবেন। তারপর সমগ্র বিশ্ব জুড়িয়া কেবল একটিমাত্র জাতিরই অস্তিত্ব থাকিবে, আর তাহারা হইবে খৃস্টান জাতি। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসও তাহার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর পত্র পাইয়া, আবু সুফ্যানের সহিত আলাপ-আলোচনা করিয়া, নিজে নক্ষত্র দেখিয়া, সর্বোপরি হিসে অবস্থানকারী তদীয় রোমীয় জ্যোতিষী পণ্ডিত বন্ধুর পত্র পাইয়া তাঁহার সেই ভুলটি ভাঙ্গিল। সমস্ত লক্ষণদৃষ্টে তাঁহার দৃঢ় প্রতীতি জন্মাইল যে, মুহাম্মাদ যে নবুওয়াতের দাবি করিয়াছেন তাহা যথার্থ। তিনিই সেই প্রেরিত পুরুষ যাঁহার সুসমাচার যুগ-যুগান্তর ধরিয়া আসমানী কিতাবসমূহের মাধ্যমে এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের মুখে মুখে প্রচারিত হইয়া আসিতেছে। রোমক সম্রাট তাই বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁহার বিজয় ও শোকরানা উৎসকালে উচ্চ পর্যায়ের একটি ধর্মীয় সম্মেলনও আহ্বান করেন। বুখারী শরীফের পূর্বোল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে রোমের প্রধানগণ, অমাত্যবর্গ, পাদ্রীবর্গ সকলেই সেই মজলিসে হাযির ছিলেন।
সকলের উপস্থিতিতে মজলিস যখন জমজমাট তখন তিনি দরবার কক্ষের দরজা-জানালা অর্গলাবদ্ধ করাইয়া দিলেন। তারপর সর্বসমক্ষে পত্রখানি পাঠ করিয়া শুনাইলেন। রোমীয় সেই
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের পত্রখানাও তিনি তাঁহার বক্তব্যের সমর্থনে সকলের সম্মুখে পেশ করিলেন, তারপর তিনি বলিলেন, এই সমস্ত নিদর্শন যদি নবৃওয়াতের এই নূতন দাবিদারের মধ্যে পাওয়া যায়, তবে তাঁহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনই কি আমাদের কর্তব্য হইয়া দাঁড়ায় না? হে রোমবাসিগণ! সফলতা, সুপথ এবং রাজ্যের স্থায়িত্ব যদি তোমাদের অভীষ্ট হইয়া থাকে, তবে কালবিলম্ব না করিয়া এই নবীর আনুগত্য স্বীকার করিয়া লও।
যেদিন খাস দরবারে আবূ সুফ্যানের সহিত সম্রাট ঐভাবে কথাটা শুরু হইয়া গিয়াছিল। এইবার যখন মুখ খুলিয়া পরিষ্কারভাবে তিনি এই কথাটা বলিয়াই ফেলিলেন তখন আর তাহারা ধৈর্য রক্ষা করিতে পারিল না। আবু সুফ্যানের ভাষায়:
রোম সম্রাট যখন তাঁহার বক্তব্য পেশ করিলেন এবং পত্র পাঠ সমাপ্ত করিলেন, তখন দরবারে কোলাহল বৃদ্ধি পাইল এবং মহা হৈ চৈ শুরু হইয়া গেল। রাবী তাহাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে : তাহারা দরজার দিকে বন্য গর্দভের ন্যায় ধাবিত হইল। (কিন্তু মজলিস হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতে পারিল না) কারণ তাহারা দেখিতে পাইল, দরজাগুলি অর্গলাবদ্ধ রহিয়াছে (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪-৫)।
হিরাক্লিয়াস যখন তাহাদের এই প্রতিক্রিয়া ও দ্রুত পলায়ন প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করিলেন তখন তিনি কথা পাল্টাইয়া তাহাদেরকে পুনরায় আসন গ্রহণ করিতে বলিলেন। সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে এইবার তিনি বলিলেন, এইমাত্র আমি আপনাদেরকে যাহা বলিতেছিলাম, তাহা ছিল নিছক একটি পরীক্ষা। আপনাদের ঈমান ও মনোবল কতটুকু, তাহা দেখাই ছিল আমার উদ্দিষ্ট। এইবার আমার দৃঢ় প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, আপনাদের ধর্মের প্রতি আপনাদের অবিচল আস্থা রহিয়াছে। তারপর খৃষ্টধর্মের প্রতি যে কোন ছদ্মবিদা মুকাবিলায় তাঁহার নিজের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সচেতন থাকার কথা দৃঢ় প্রত্যয়ের সুরে ঘোষণা করিলেন। তাঁহার বাগ্মীসুলভ বক্তৃতা শ্রবণে তাঁহার প্রতি সমবেত পাদ্রী ও অমাভ্যবর্ণের আস্থা ফিরিয়া আসিল। তাহাদের উপাসনালয়গুলির জন্য বহু অর্থ বরাদ্দ করিয়া তিনি তাহাদেরকে বিদায় করিলেন।
📄 রোমক সম্রাটের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বিতীয় পত্র
রাসূলুল্লাহ নবম হিজরীর রজব মাসে রোমক সম্রাটের উদ্দেশ্যে তাঁহার শেষ হুঁশিয়ারী পত্রটি প্রেরণ করিলেন- বাহা প্রথম পত্রের বাহক দিয়া কালবী (রা)-ই কায়সারের নিকট বহন করিয়া লইয়া যান। সেই পরখানির পাঠ ছিল নিম্নরূপ:
من محمد رسول الله الى صاحب الروم اني ادعوك الى الاسلام فان اسلمت فلك ما للمسلمين وعليك ما عليهم فان لم تدخل في الاسلام فاعط الجزية بالله تبارك وتعالى يقول قاتلوا الذين لا يؤمنون ولا يدينون دين الحق من الذين أوتوا الكتاب حتى يعطوا الجزية عن يد وهم صاغرون والا فلا تحل بين الفلاحين وبين الاسلام ان يدخلوا فيه أو يعطوا الجزية. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হইতে রোম-অধিপতির প্রতি— আমি আপনাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতেছি। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া লন তবে আপনার অধিকারও অন্য দশজন মুসলমানের মত হইবে, সাথে সাথে মুসলমান হিসাবে দায়িত্বও আপনার উপর বর্তাইবে। ইসলামে যদি একান্তই আপনি প্রবিষ্ট না হন, তাহা হইলে আল্লাহ্ নামে জিযয়া প্রদান করুন। আমাদের প্রতি আল্লাহ্র নির্দেশ হইতেছে, "কিতাবীদের মধ্যে যাহারা (আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি) ঈমান আনয়ন করিবে না এবং সত্য ধর্মকে বরণ করিবে না তাহাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করিবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা জিযয়া প্রদান করে এবং বশ্যতা স্বীকার করে" (৯:২৯)। যদি একান্তই আপনি তাহাতে সম্মত না হন, তাহা হইলে অন্তত (আপনার অধীনস্ত) আরব প্রজাদের ইসলাম গ্রহণে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইবেন না" [দ্র. কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ২৬ (১৯৮ সং), মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৬৬]।
উক্ত পত্রে আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাসের এবং আল্লাহর আইন মানিয়া লওয়ার দাওয়াতই ছিল মুখ্য। দ্বিতীয় বিকল্প ব্যবস্থারূপে বলা হয়, সম্রাট যেন আল্লাহ্ আইনের কাছে নতিস্বীকার করিয়া জিযয়া প্রদান করেন, আর সাথে সাথে এই দাওয়াতও ছিল যে, তিনি ইসলাম গ্রহণে একান্তই অনিচ্ছুক হইলে সম্রাট যেন তাঁহার অধীনস্থ সিরীয় এলাকার ছোট ছোট আরব রাজ্যগুলির উপর ক্ষমতা প্রয়োগ হইতে বিরত থাকেন, যাহাতে তাহারা ইসলামী প্রথা বা জিযয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত নিজেরা স্বাধীনভাবে নিতে সমর্থ হয়।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বিতীয় পত্রের জবাবে হিরাক্লিয়াস
রাসূলুল্লাহ -এর দ্বিতীয় পত্রের জবাবে হিরাক্লিয়াস إلى احمد رسول الله الذي بشر به عيسى من قيصر ملك الروم انه جائني كتابك مع رسولك واني اشهد انك رسول الله نجدك عندنا في الانجيل بشرنا بك عيسى بن مريم واني دعوت الروم الى أن يؤمنوا بك فابوا ولو اطاعو ني لكان خيرا لهم ولوددت اني عندك فاخدمك واغسل قدميك. "আহমাদ রাসূলুল্লাহ্র প্রতি— যাঁহার সুসমাচার 'ঈসা (আ) দিয়াছিলেন, রোমক সম্রাট কায়সারের পক্ষ হইতে— আপনার পত্রখানা আপনার দূতের মাধ্যমে আমার নিকট পৌছিয়াছে। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহ্র সত্য রাসূল। আমাদের কাছে রক্ষিত ইঞ্জীল কিতাবে . আমরা আপনার উল্লেখ পাই। মারয়াম-তনয় 'ঈসা (আ) আপনার শুভাগমনের সুসমাচার দিয়াছেন। আমি রোমবাসীদেরকে আপনার প্রতি ঈমান আনয়নের দাওয়াত দিয়াছি, কিন্তু তাহারা তাহাতে সম্মত হয় নাই। তাহারা যদি আমার কথা মানিয়া লইত, তাহা হইলে নিঃসন্দেহে তাহা তাহাদের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর হইত। আমার মন চাহে, আমি যদি আপনার খিদমতে উপস্থিত হইতে পারিতাম আর আপনার পবিত্র চরণযুগল স্বহস্তে ধৌত করিয়া দিতে পারিতাম” (আল-ইয়া'কূবী, ২খ., পৃ. ৬২; সীরাতে যায়নী দালান, (সীরাতে হালাবিয়্যার পাদটীকায়), ৩খ., পৃ. ৬৪; সীরাতে হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৭; মাজমু'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮২)।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, মহানবী-এর তাবূক অবস্থানকালে হিরাক্লিয়াস জনৈক দূত মারফত তাঁহার কাছে প্রেরিত পত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রশ্ন করেন :
📄 রোমক সম্রাটের দূতের ঘটনা তাহার নিজের যবানে
تَدْعُونِي إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ فَأَيْنَ النَّارُ ؟ ১৫৩ "আপনি আমাকে এমন বেহেশতের দিকে আহ্বান জানাইতেছেন যাহার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও যমীনব্যাপী, তাহা হইলে দোযখ কোথায় (মাজমূআতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮৫)?
অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র প্রাপ্তির পর সভাসদবর্গের বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্যে হিরাক্লিয়াস দূতকে বলেন, انی اخاف علی ملکی "আমি আমার রাজত্ব হারানোর আশঙ্কা করিতেছি”। মহানবী (স)-কে দেওয়ার জন্য তিনি একটি কাগজে লিখিয়া দেন, انی مسلم ولكنى مغلوب "আমি মুসলিম কিন্তু পরিস্থিতির শিকার, পরাজিত” (প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট প্রেরিত পত্রের সহিত হিরাক্লিয়াস তাঁহার জন্য কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রাও প্রেরণ করেন। রাসূলুলুল্লাহ (স) বলেন:
يبقى ملكهم ما بقى كتابي عندهم. "আমার পত্রখানা যতদিন তাহাদের নিকট সংরক্ষিত থাকিবে ততদিন তাহাদের রাজত্ব টিকিয়া থাকিবে।"
হিরাক্লিয়াসের মুসলিম বলিয়া পরিচয় দেওয়া সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করিলেন, আল্লাহ্র দুশমন মিথ্যা বলিয়াছে। আদতে সে মুসলিম নহে (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮৬; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১১৪)।
আবূ সুফয়ান প্রমুখাৎ বর্ণিত পূর্বোক্ত বর্ণনার সহায়ক বিধায় দূতের বর্ণনাটি নিম্নে হুবহু প্রদত্ত হইল। মু'আবিয়া-পরিবারের আযাদকৃত দাস সাঈদ ইবন আবী রাশিদ বর্ণনা করেন, আমি যখন সিরিয়ায় (হিমসে) উপনীত হইলাম তখন আমাকে বলা হইল, পাশের গীর্জায়ই সেই লোকটি বাস করে, যে ব্যক্তিটি রোমক সম্রাটের দূতরূপে মহানবী-এর দরবারে প্রেরিত হইয়াছিলেন-। কৌতূহলবশে আমি সেই গীর্জায় প্রবেশ করিলাম। সেখানে ঢুকিয়াই দেখিলাম এক বৃদ্ধ বসিয়া রহিয়াছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনিই কি রোমক সম্রাটের দূতরূপে রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে গমন করিয়াছিলেন? বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়া বলিলেন, হাঁ, আমিই গিয়াছিলাম। আমি বলিলাম, অনুগ্রহপূর্বক সেই ঘটনা বিবৃত করুন তো।
বৃদ্ধ বলিলেন, রাসূলুল্লাহ যখন তাবুকে আসেন, তখন দিহ্ইয়া কালবীকে তাঁহার দূতরূপে হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেন। সম্রাট পত্রখানা পাইয়াই রোমের বিশপ ও পাদ্রিগণকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহারা আসিয়া পৌছিলে তিনি দরবারকক্ষের দরজাসমূহে অর্গলাবদ্ধ করাইয়া দিয়া তাহাদেরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, আপনারা তো দেখিতেই পাইতেছেন যে, সেই বিদেশীটি ইতোমধ্যেই আমাদের মাতৃভূমিতে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। সে আমার নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছে। তাহার দাবি তিনটি: হয় আমরা তাহার ধর্মে দীক্ষিত হইব, নতুবা তাহার বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইয়া তাহাকে আমাদের রাজ্যের পক্ষ হইতে রাজস্ব প্রদান করিব। আর যদি তাহাও আমরা গ্রহণ না করি তবে তৃতীয় বিকল্প ব্যবস্থা হইতেছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা। আল্লাহর কসম! এই
পত্রখানা পাঠে আমার কেন যেন মনে হইতেছে, আমার পদতলের এইসব কিছুই কাড়িয়া লওয়া হইবে। এমতাবস্থায় তাহার ধর্মে দীক্ষিত হওয়া অথবা তাহার রাজস্ব প্রদানে স্বীকৃত হইয়া যাওয়াটাই কি বুদ্ধিমানের মত কাজ হইবে না!
এই কথা শ্রবণ করিয়া দরবার ভর্তি লোকজন চীৎকার করিয়া উঠিল, তাহা হইলে কি আমাদের খৃষ্ট ধর্ম বিসর্জন দিয়া হেজায হইতে আগত এই ব্যক্তিটির বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইতে আপনি আমাদেরকে পরামর্শ দিতেছেন? রোমক সম্রাট যখন মজলিসের এই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করিলেন তখন তাঁহার আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, মজলিসের এই লোকগুলি বাহির হইয়া গেলেই গোটা সাম্রাজ্যব্যাপী উহার তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইবে। এই কথা উপলব্ধি করামাত্র তিনি ভোল পাল্টাইয়া সমবেত অমাত্যবর্গ ও ধর্মযাজকগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমি আপনাদেরকে একটু পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম যে, আপনারা স্বধর্মে কতটুকু অবিচল আছেন।
তারপর তিনি জনৈক আরব খৃস্টান ভৃত্যকে ডাকিয়া বলিলেন, আমার নিকট এমন একটি লোককে নিয়া আইস যাহার স্মরণশক্তি প্রখর, অথচ সে স্বচ্ছন্দে আরবী বলিতে সক্ষম। তাহার মাধ্যমেই আমি পত্রের জবাব প্রেরণ করিব। ভৃত্যটি আমার নিকট ছুটিয়া আসিল এবং সে আমাকে ধরিয়া লইয়া সম্রাটের সমীপে উপস্থিত করিল।
সম্রাট আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তুমি ঐ ব্যক্তিটির নিকট আমার পত্রসহ গমন করিবে এবং তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করিবে। প্রথমত, আমার নিকট তাহার (প্রথম) পত্রটির কথা সে-কিছু বলে কি না? দ্বিতীয়ত, পত্রপাঠের সময় সে দিবস বা রজনীর কোন উল্লেখ করে কি না? তৃতীয়ত, একটি বিশেষ বস্তু তাহার মধ্যে দৃষ্ট হয় কি না?
আমি যথারীতি সম্রাটের পত্রসহ তাবুকে গিয়া উপনীত হইলাম। আমি লক্ষ্য করিলাম, তিনি (রাসূলুল্লাহ) তদীয় সঙ্গী-সাহাবীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় কুয়ার পাড়ে উপবিষ্ট। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনাদের মনিব কোথায়? আমাকে বলা হইল, এই যে তিনি বসিয়া রহিয়াছেন। আমি অগ্রসর হইয়া তাঁহার নিকট গিয়া বসিয়া পড়িলাম। তিনি আমার নিকট হইতে সম্রাটের পত্রখানা গ্রহণ করিয়া তাঁহার পাশেই রাখিয়া দিলেন। তারপর আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন: তুমি কোন্ গোত্রের লোক হও? আমি জবাব দিলাম, 'তানূখ গোত্রে'। এই কথা কি তোমার মনপূত হয় না যে, তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম (আ)-এর সনাতন সত্য ধর্ম কবূল করিয়া তুমি মুসলমান হইয়া যাও?
আমি জবাব দিলাম, এখন তো একটি জাতির দূতরূপে আমি আপনার দরবারে আগমন করিয়াছি। দৌত্যকর্মের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তো আমি মতাদর্শ পরিত্যাগ করিতে পারি না। আমার এই জবাব শুনিয়া স্মিতহাস্য করিয়া তিনি বলিলেনঃ "তুমি যাহাকে চাহিবে তাহাকেই হিদায়াত করিতে পারিবে না, বরং আল্লাহই সেই পবিত্র সত্তা তিনি যাহাকে ইচ্ছা হিদায়াত করিতে পারেন। আর তিনিই হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে সম্যক অবগত” (২৮:৪৬)।
তিনি তাঁহার বক্তব্য প্রদান অব্যাহত রাখিলেন এবং আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: “হে আমার তানূখী ভ্রাতা! আমি পারস্য-সম্রাট কিস্সার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে আমার পত্রখানা ছিড়িয়া ফেলিয়া দেয়। আল্লাহ্ তাহার রাজত্বকেও খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিবেন। আমি ইথিওপিীয় সম্রাট নাজাশীর উদ্দেশ্যেও পত্র প্রেরণ করিয়াছি। সেও আমার পত্রখানা ছিড়িয়া