📄 রোমক সম্রাটের দরবারে কুরায়শ কাফেলা
বিশপ পাদ্রী তখন আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তুমি আমার এই পত্রখানা গ্রহণ কর, ইহা তুমি তোমার মনিবকে দিবে। তাঁহাকে আমার সালাম জানাইবে এবং তাঁহাকে অবশ্যই বলিবে যে, আমি সাক্ষ্য দিতেছি, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই এবং নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আমি তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছি এবং সর্বান্তকরণে তাঁহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি। আমি তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিতেছি। আমার এই ইসলাম গ্রহণে উহারা ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছে যাহা তুমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিতেছ। তুমি তাঁহাকে এই সংবাদ জানাইবে। অতঃপর তিনি হুজরা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। আর যায় কোথায়! বিক্ষুব্ধ খৃস্টান জনতা মুহূর্তে চতুর্দিক হইতে তাহার উপর ঝাপাইয়া পড়িল এবং তাহাকে শহীদ করিয়া ফেলিল (হায়াতুস-সাহাবা, ২খ., পৃ. ২১৬)।
দিয়া কালবী (রা) কায়সারের নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া যখন তহাকে এই বৃত্তান্ত শুনাইলেন, তখন কায়সার তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমার তো আশংকা হয়, লোকে আমার সহিতও এইরূপ আচরণই করিবে। আমি তোমাকে পূর্বেই বলিয়াছিলাম, বিশপ দুগাতির তাহাদের কাছে আমার চেয়েও বেশী বরেণ্য ছিলেন (তাবারী, ৩খ., পৃ. ৮৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬২-২৬৮; আল-জাওয়াবুস সাহীহ্ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ (ইব্ তায়মিয়্যা), ১খ., পৃ. ৯৪; ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৪০)।
রোমক সম্রাট কায়সার হযরত দিয়াকে বলেন, আমি সম্যক জ্ঞাত আছি যে, সত্যিই তিনি নবী— যেমনটি বিশপ দুগাতির বলিয়াছেন। কিন্তু আমি যদি তাহা প্রকাশ করিতে চাই তাহা হইলে আমার রাজত্ব হাতছাড়া হইয়া যাইবে এবং রোমকগণ আমাকে বধ করিবে। আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) এই ঘটনা বিবৃত করিয়া মন্তব্য করেন, মহানবী যে বলিয়াছেন "তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর তাহা হইলে সার্বিক নিরাপত্তা লাভ করিবে”, উহা সে বিস্মৃত হইল (সীরাতুল মুস্তাফা, ২ খ., পৃ. ৭৭)।
আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) পূর্ণ সনদসহ আবু সুফয়ানের যবানী বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, "আমরা ছিলাম ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। যুদ্ধ আমাদের দ্বারপ্রান্তে ছিল এবং আমাদের সম্পদরাশি প্রায় নিঃশেষ হইয়া আসিয়াছিল। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ ও আমাদের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হইল তখন আমাদের অবস্থা এই ছিল যে, আমরা কাহারও নিকট হইতে নিরাপত্তা প্রাপ্ত হইলেও আমরা নিজেরা কাহাকেও নিরাপত্তা দিতাম না। সন্ধির পর কয়েকজন কুরায়শ ব্যবসায়ীসহ ব্যবসা ব্যাপদেশে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া পড়িলাম। আমার জানামতে কুরায়শের সকল নারী বা পুরুষের ব্যবসা সামগ্রী ঐ কাফেলায় আমাদের সহিত ছিল। ফিলিস্তীনের গাযা এলাকা ছিল আমাদের বাণিজ্যকেন্দ্র। আমরা সেখানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। ঐ সময় রোমক সম্রাট পারস্যবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছেন। তিনি তাহাদেরকে তাহাদের দখলকৃত এলাকা হইতে বহিষ্কার করিয়া দিয়াছেন। তাহারাও রোমক এলাকা হইতে ছিনাইয়া নেওয়া ক্রুশটি সম্রাটকে ফেরত দিয়াছে। ক্রুশ ফেরত পাওয়ার পর সম্রাট হিমসের তাঁহার আবাসস্থল হইতে প্রার্থনার উদ্দেশ্যে পদব্রজে বায়তুল মুকাদ্দাসের
উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। তাঁহাকে সেখানে স্বাগত জানান হয় এবং তাঁহার চলার পথে পুষ্প বর্ষণ করা হয়। তিনি জলিয়ায় (বায়তুল মাকদিস) পৌছিলেন এবং সেখানে সালাত আদায় ও রাত্রিযাপন করিলেন।
পরদিন ভোরে অত্যন্ত বিষন্ন মুখে তিনি নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইলেন। তাঁহার বিষন্নতা দর্শনে উৎসুক পাদ্রিগণ তাঁহার এই বিষন্ন ভাবের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। জবাবে তিনি বলিলেন, গতরাত্রে তারকারাজি পর্যবেক্ষণ করিয়া আমি দেখিতে পাইলাম যে, খতনাকারীদের বাদশাহ্ আবির্ভাব ঘটিয়াছে। উপস্থিত সভাসদগণ বলিলেন, ইহাতে জাহাঁপনার আশঙ্কার কোন কারণ নাই। আমাদের জানা মতে, ইয়াহুদীরাই কেবল খতনা করিয়া থাকে। তাহারা তেমন কোন শক্তিশালী জাতি নহে। উহারা আপনার অধীনস্থ প্রজামাত্র। ইহার পরও যদি জাহাঁপনা তাহাদের পক্ষ হইতে কোনরূপ অনিষ্টের আশঙ্কা করেন, তাহা হইলে সারা দেশে লোক প্রেরণ পূর্বক ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করিয়া তাহাদের নিকট হইতে স্বস্তি লাভ করিতে পারেন।
তাহারা যখন এইরূপ সলাপরামর্শ করিতেছিল তখনই বসরার শাসনকর্তার একজন দূত আরবের এক ব্যক্তিসহ সম্রাটের দরবারে আসিয়া উপস্থিত হয়। দূত বলিল, জাহাঁপনা! এই লোকটি আরব হইতে আসিয়াছে। তাহারা ভেড়া-বকরী ও উট প্রভৃতির মালিক। তাহাদের দেশে এক অভিনব ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। জাহাপনা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে তাহার বর্ণনা দিবে।
লোকটি যখন সম্রাটের নিকট আগমন করিয়া এইরূপ নিবেদন করিল তখন সম্রাট দোভাষীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তাহাকে জিজ্ঞাসা কর তাহাদের দেশে কী অভিনব ব্যাপার ঘটিয়াছে? তাহাকে প্রশ্ন করা হইলে জবাবে সে জানাইল, আরবদেশের কুরায়শ বংশের এক ব্যক্তি নবৃওয়াতের দাবি করিয়াছেন, কিছু সংখ্যক লোক তাঁহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিলেও আমরা তাঁহার ঘোর বিরোধী। অনেক স্থানে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হইয়াছে। আমি তাহাদেরকে এই অবস্থায় রাখিয়াই আপনার সদনে উপস্থিত হইয়াছি।
এইরূপ সংবাদ শ্রবণ করিয়া রোমক সম্রাট তাহাকে বিবস্ত্র করার নির্দেশ দিলেন। দেখা গেল তাহার খতনা করা হইয়াছে। সম্রাট বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি ইহাই স্বপ্নে দেখিয়াছি। ইতোপূর্বে তোমরা যাহা বলিয়াছ তাহা যথার্থ নহে। তাহাকে তাহার বস্ত্র ফেরত দাও। অতঃপর আগন্তুককে লক্ষ্য করিয়া সম্রাট বলিলেন, হে আগন্তুক! তুমি তোমার পথে চলিয়া যাও। তারপর তিনি তাহার পুলিশ প্রধানকে ডাকাইয়া বলিলেন, গোটা সিরিয়া প্রদেশে খোঁজাখুঁজি করিয়া এমন একটি লোক আন যে ঐ কথিত নবীর স্বগোত্রীয় এবং তাঁহার সম্পর্কে আমাদেরকে সঠিক তথ্য দিতে সক্ষম হইবে। পুলিশের লোকেরা আমাদের কাফেলার সকল লোককে সম্রাটের দরবারে নিয়া উপস্থিত করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৪৫৪-৫) ৮
📄 নবুওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে হিরাক্লিয়াস ও আবূ সুফ্যানের কথোপকথন
সহীহ্ বুখারীতে স্বয়ং আবূ সুফয়ানের ভাষ্য হইতে এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। তাহাতে আছে, রোমের প্রধানগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় হিরাক্স তাঁহার দরবারে বসিয়া কুরায়শগণকে ডাকাইলেন এবং নিজের দোভাষীকেও ডাকিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন, বংশের দিক দিয়া কে ঐ ব্যক্তির অধিকতর ঘনিষ্ঠ যিনি নবুওয়াতের দাবি করিতেছেন?
আবূ সুফয়ান বলেন, তখন আমি জবাব দিলাম, বংশের দিক হইতে আমিই তাঁহার ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তি। হিরাক্লিয়াস আদেশ করিলেন, এই লোকটাকে আমার নিকটে লইয়া আস এবং অন্যদেরকে তাঁহার পিছনে বসাও। তারপর তিনি দোভাষীকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, উহাদেরকে বলিয়া দাও, আমি তাহাকে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করিব। যদি সে আমার কাছে কোন বিষয় মিথ্যা কথা বলে তবে তাহারা যেন তাহা আমাকে অবগত করে।
আবূ সুফয়ান বলেন, আল্লাহ্র কসম, যদি লোকে আমাকে মিথ্যার কলঙ্ক দিবে বলিয়া আশঙ্কা না করিতাম, তবে নিশ্চয় আমি তাঁহার সম্পর্কে মিথ্যাই বলিতাম। তারপর তাহাদের উভয়ের মধ্যে যে কথোপকথন হয়, আবূ সুফয়ানের বর্ণনা অনুসারে তাহা নিম্নরূপ:
হিরাক্লিয়াস- তোমাদের মধ্যে তাঁহার বংশমর্যাদা কীরূপ?
আবূ সুফয়ান- তিনি আমাদের মধ্যে উচ্চ বংশজাত।
হিরাক্লিয়াস- তাঁহার পূর্বপুরুষগণের মধ্যে কেহ বাদশাহ ছিলেন কি?
আবূ সুফয়ান- না।
হিরাক্লিয়াস- সম্ভ্রান্ত লোকগণ তাঁহার অনুসরণ করেন, নাকি দরিদ্র ব্যক্তিরা?
আবূ সুফ্যান- গরীবরাই তাঁহার অনুসরণ করিয়া থাকে।
হিরাক্লিয়াস- তাঁহার অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে, নাকি হ্রাস পাইতেছে?
আবূ সুফ্যান- তাহাদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধিই পাইতেছে।
হিরাক্লিয়াস- তাহাদের মধ্যকার কেহ কি অসন্তুষ্ট হইয়া তাঁহার ধর্ম ত্যাগ করে?
আবূ সুফ্যান- না।
হিরাক্লিয়াস- তোমরা কি তাঁহার এই কথা বলার (অর্থাৎ নবুওয়াত দাবির পূর্বে তাঁহাকে মিথ্যা বলার অপবাদ দিতে?
আবূ সুফ্যান- না।
হিরাক্লিয়াস- তিনি কি তাঁহার কথার খেলাফ করেন?
আবূ সুফ্যান- না, তবে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ইদানীং তাঁহার সহিত আমাদের একটি চুক্তি হইয়াছে। এইবার যে তিনি কী করিবেন তাহা বলিতে পারি না।
আবু সুফিয়ান পরবর্তী কালে বলেন, ঐ সময়টাতে তাঁহার প্রতি চরম বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও এই সামান্য একটু অসম্মানসূচক কথা ছাড়া আর কিছুই যোগ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। তারপরও জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত থাকে।
হিরাক্লিয়াস- তিনি তোমাদেরকে কী আদেশ করেন?
আবূ সুফ্যান- তিনি বলেন, এক আল্লাহ্ ইবাদত কর। তাঁহার সহিত আর কাহাকেও শরীক করিও না। তোমাদের পিতৃপুরুষগণ যে সকল দেবদেবীর পূজা করিত তোমরা সেইগুলি ত্যাগ কর। তিনি আমাদেরকে আদেশ দেন সালাত আদায় করিতে, সত্য কথা বলিতে, গুনাহ হইতে আত্মরক্ষা করিতে এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করিতে।
📄 নবুওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে রোম সম্রাটের স্বীকারোক্তি
রোম সম্রাট তখন দোভাষীকে বলিলেন, তুমি উহাদেরকে বল, আমি তোমাকে তাঁহার বংশ-মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। জবাবে তুমি বলিলে, তিনি তোমাদের মধ্যে উচ্চ বংশজাত। এই রূপই হইয়া থাকে। নবীগণকে তাঁহাদের জাতির উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হইয়া থাকে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমাদের মধ্যে অপর কেহ কি এইরূপ নবৃওয়াতের দাবি করিয়াছে? তুমি বলিলে, না। আমি বলি, তাহার পূর্বে কেহ যদি এইরূপ কথা বলিয়া থাকিত তাহা হইলে আমি বলিতাম, এই ব্যক্তি এমন একটি কথার অনুসরণ করিতেছে, যাহা পূর্বেও কথিত হইয়াছে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহার পূর্বপুরুষগণের কেহ কি বাদশাহ ছিলেন? তুমি বলিলে, 'না'। আমি বলি, যদি তাহার পূর্বপুরুষগণের কেহ বাদশাহ থাকিতেন তবে আমি বলিতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি তাহার পিতৃরাজ্য ফেরত পাইতে আগ্রহী।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহার নবৃওয়াত দাবির পূর্বে তোমরা তাঁহার প্রতি মিথ্যার অপবাদ দিতে কি? তুমি বলিলে, না। এতদ্বারা আমি এই কথাই বুঝিয়াছি যে, এমনটি হইতেই পারে না যে, তিনি মানুষের সম্বন্ধে তো মিথ্যা পরিহার করেন আর স্বয়ং আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা বলেন?
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, বড়লোকগণ তাঁহার অনুসরণ করেন, নাকি দরিদ্ররা? তুমি বলিলে, দুর্বল দরিদ্ররাই তাঁহার অনুসরণ করে। আর দুর্বল দরিদ্ররাই রাসূলগণের অনুসারী হইয়া থাকে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে, নাকি হ্রাস পাইতেছে? তুমি বলিলে, ক্রমেই বৃদ্ধি পাইয়া চলিয়াছে। পূর্ণতা লাভ পর্যন্ত ঈমানের ব্যাপারটা এমনই হইয়া থাকে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কেহ কি তাঁহার ধর্ম গ্রহণের পর অসন্তুষ্ট হইয়া তাহা ত্যাগ করিয়াছে? তুমি বলিলে, না। আর ঈমান এইরূপই হইয়া থাকে- যখন উহার সজীবতা অন্তরের সহিত যুক্ত হয়।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কি তাঁহার কথার খেলাফ করেন? তুমি বলিলে, না। রাসূলগণ এইরূপই হইয়া থকেন। তঁহারা কস্মিনকালেও কথার খেলাফ করেন না।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি তোমাদেরকে কী আদেশ করেন? তুমি বলিলে, তিনি তোমাদেরকে আদেশ করেন এক আল্লাহর ইবাদত করিতে এবং তাঁহার সহিত অন্য কাহাকেও শরীক না করিতে। আর তিনি তোমদেরকে মূর্তিপূজা করিতে বারণ করেন, আদেশ করেন সালাত কায়েম করিতে, সত্য কথা বলিতে এবং পাপকার্যাদি হইতে বিরত থাকিতে।
তোমার এই কথাগুলি যদি সত্য হইয়া থাকে, তবে অচিরেই তিনি আমার পদযুগলের নিচের এই স্থানেরও কর্তৃত্ব লাভ করিবেন। তিনি যে আবির্ভূত হইবেন তাহা আমি জানিতাম, কিন্তু
তোমাদের মধ্যেই যে তাঁহার আবির্ভাব ঘটিবে তাহা আমি পূর্বে ধারণা করি নাই। যদি তাঁহার কাছে পৌঁছিতে পারিব বলিয়া জানিতাম তবে তাঁহার সহিত সাক্ষাতের জন্য যে কোন কষ্ট স্বীকার করিতাম। আর যদি আমি তাঁহার নিকটে থাকিতাম, তবে নিশ্চয় তাঁহার পূত চরণযুগল স্বহস্তে ধৌত করিয়া দিতাম।
তারপর তিনি দিয়ার মারফতে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ -এর সেই পত্রখানা, যাহা বুসরার শাসকের মাধ্যমে তাঁহার নিকট পৌঁছিয়াছিল, তাহা পাঠ করিলেন। এই পত্রখানা পাঠের পূর্বে হিরাক্লিয়াস তাঁহার অমাত্যবর্গের নিকট যে ভূমিকা দিয়াছিলেন, যে প্রস্তাব রাখিয়াছিলেন আর তাহার যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছিল, তাহার বিস্তারিত বিবরণ পরে আসিতেছে।
আরববাসিগণ খতনা করিয়া থাকে, এই সংবাদে হিরাক্লিয়াস যখন নিশ্চিত হইলেন যে, নবীরূপে আত্মপ্রকাশকারী এবং তাঁহার নিকট পত্র প্রেরণকারীই ঐ যুগের বাদশাহ, তখন তিনি রোমবাসী তাহার সমপর্যায়ের জ্যেতির্বিদ্যা বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে তাঁহার ব্যাপারে পত্র লিখেন। হিরাক্লিয়াসের হিমসে অবস্থানকালেই তাঁহার বন্ধুটির জবাবও এই মর্মে আসিল যে, নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে তিনিও তাঁহার সহিত সম্পূর্ণ একমত (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪-৫; বাংলা ভাষ্য, তাজরীদুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৯-১১, বাংলা একাডেমী প্রকাশিত, ১৯৫২ খৃ.; সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৫; কানযুল উম্মাল, ৫খ., পৃ. ২৪৬; ইব্ন তায়মিয়্যা, আল-জাওয়াবুস্ সাহীহ্ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ, ৪খ., পৃ. ৩১৬-৩১৯)।
ঐ যুগের পৃথিবীর প্রায় জাতির মধ্যেই সচরাচর একটি আলোচানা শোনা যাইত যে, আখেরী যমানার রাসূলের আবির্ভাব অত্যাসন্ন। সকলের মনেই প্রত্যাশা ছিল যে, শেষ নবী তাহাদের মধ্যেই আবির্ভূত হইবেন। এই ব্যাপারে সর্বাধিক আশাবাদী ছিল ইয়াহুদী জাতি। তাহাদের প্রত্যাশা ছিল যে, রাসূল অবশ্যই তাহাদের মধ্য হইতে আবির্ভূত হইবেন এবং তাহাদেরকে অন্যান্য জাতির অত্যাচার হইতে নিষ্কৃতি দান করিবেন। অনুরূপ খৃস্টান জাতিও আশা করিত যে, তাহাদের মধ্যে বিরাজমান দলাদলি ও কোন্দল দূর করিয়া দিয়া প্রতীক্ষিত নবী আগমন করিয়া তাহাদের মধ্যে তাহাদেরকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিরূপে গড়িয়া তুলিবেন। তারপর সমগ্র বিশ্ব জুড়িয়া কেবল একটিমাত্র জাতিরই অস্তিত্ব থাকিবে, আর তাহারা হইবে খৃস্টান জাতি। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসও তাহার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর পত্র পাইয়া, আবু সুফ্যানের সহিত আলাপ-আলোচনা করিয়া, নিজে নক্ষত্র দেখিয়া, সর্বোপরি হিসে অবস্থানকারী তদীয় রোমীয় জ্যোতিষী পণ্ডিত বন্ধুর পত্র পাইয়া তাঁহার সেই ভুলটি ভাঙ্গিল। সমস্ত লক্ষণদৃষ্টে তাঁহার দৃঢ় প্রতীতি জন্মাইল যে, মুহাম্মাদ যে নবুওয়াতের দাবি করিয়াছেন তাহা যথার্থ। তিনিই সেই প্রেরিত পুরুষ যাঁহার সুসমাচার যুগ-যুগান্তর ধরিয়া আসমানী কিতাবসমূহের মাধ্যমে এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের মুখে মুখে প্রচারিত হইয়া আসিতেছে। রোমক সম্রাট তাই বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁহার বিজয় ও শোকরানা উৎসকালে উচ্চ পর্যায়ের একটি ধর্মীয় সম্মেলনও আহ্বান করেন। বুখারী শরীফের পূর্বোল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে রোমের প্রধানগণ, অমাত্যবর্গ, পাদ্রীবর্গ সকলেই সেই মজলিসে হাযির ছিলেন।
সকলের উপস্থিতিতে মজলিস যখন জমজমাট তখন তিনি দরবার কক্ষের দরজা-জানালা অর্গলাবদ্ধ করাইয়া দিলেন। তারপর সর্বসমক্ষে পত্রখানি পাঠ করিয়া শুনাইলেন। রোমীয় সেই
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের পত্রখানাও তিনি তাঁহার বক্তব্যের সমর্থনে সকলের সম্মুখে পেশ করিলেন, তারপর তিনি বলিলেন, এই সমস্ত নিদর্শন যদি নবৃওয়াতের এই নূতন দাবিদারের মধ্যে পাওয়া যায়, তবে তাঁহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনই কি আমাদের কর্তব্য হইয়া দাঁড়ায় না? হে রোমবাসিগণ! সফলতা, সুপথ এবং রাজ্যের স্থায়িত্ব যদি তোমাদের অভীষ্ট হইয়া থাকে, তবে কালবিলম্ব না করিয়া এই নবীর আনুগত্য স্বীকার করিয়া লও।
যেদিন খাস দরবারে আবূ সুফ্যানের সহিত সম্রাট ঐভাবে কথাটা শুরু হইয়া গিয়াছিল। এইবার যখন মুখ খুলিয়া পরিষ্কারভাবে তিনি এই কথাটা বলিয়াই ফেলিলেন তখন আর তাহারা ধৈর্য রক্ষা করিতে পারিল না। আবু সুফ্যানের ভাষায়:
রোম সম্রাট যখন তাঁহার বক্তব্য পেশ করিলেন এবং পত্র পাঠ সমাপ্ত করিলেন, তখন দরবারে কোলাহল বৃদ্ধি পাইল এবং মহা হৈ চৈ শুরু হইয়া গেল। রাবী তাহাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে : তাহারা দরজার দিকে বন্য গর্দভের ন্যায় ধাবিত হইল। (কিন্তু মজলিস হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতে পারিল না) কারণ তাহারা দেখিতে পাইল, দরজাগুলি অর্গলাবদ্ধ রহিয়াছে (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪-৫)।
হিরাক্লিয়াস যখন তাহাদের এই প্রতিক্রিয়া ও দ্রুত পলায়ন প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করিলেন তখন তিনি কথা পাল্টাইয়া তাহাদেরকে পুনরায় আসন গ্রহণ করিতে বলিলেন। সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে এইবার তিনি বলিলেন, এইমাত্র আমি আপনাদেরকে যাহা বলিতেছিলাম, তাহা ছিল নিছক একটি পরীক্ষা। আপনাদের ঈমান ও মনোবল কতটুকু, তাহা দেখাই ছিল আমার উদ্দিষ্ট। এইবার আমার দৃঢ় প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, আপনাদের ধর্মের প্রতি আপনাদের অবিচল আস্থা রহিয়াছে। তারপর খৃষ্টধর্মের প্রতি যে কোন ছদ্মবিদা মুকাবিলায় তাঁহার নিজের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সচেতন থাকার কথা দৃঢ় প্রত্যয়ের সুরে ঘোষণা করিলেন। তাঁহার বাগ্মীসুলভ বক্তৃতা শ্রবণে তাঁহার প্রতি সমবেত পাদ্রী ও অমাভ্যবর্ণের আস্থা ফিরিয়া আসিল। তাহাদের উপাসনালয়গুলির জন্য বহু অর্থ বরাদ্দ করিয়া তিনি তাহাদেরকে বিদায় করিলেন।
📄 রোমক সম্রাটের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বিতীয় পত্র
রাসূলুল্লাহ নবম হিজরীর রজব মাসে রোমক সম্রাটের উদ্দেশ্যে তাঁহার শেষ হুঁশিয়ারী পত্রটি প্রেরণ করিলেন- বাহা প্রথম পত্রের বাহক দিয়া কালবী (রা)-ই কায়সারের নিকট বহন করিয়া লইয়া যান। সেই পরখানির পাঠ ছিল নিম্নরূপ:
من محمد رسول الله الى صاحب الروم اني ادعوك الى الاسلام فان اسلمت فلك ما للمسلمين وعليك ما عليهم فان لم تدخل في الاسلام فاعط الجزية بالله تبارك وتعالى يقول قاتلوا الذين لا يؤمنون ولا يدينون دين الحق من الذين أوتوا الكتاب حتى يعطوا الجزية عن يد وهم صاغرون والا فلا تحل بين الفلاحين وبين الاسلام ان يدخلوا فيه أو يعطوا الجزية. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হইতে রোম-অধিপতির প্রতি— আমি আপনাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতেছি। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া লন তবে আপনার অধিকারও অন্য দশজন মুসলমানের মত হইবে, সাথে সাথে মুসলমান হিসাবে দায়িত্বও আপনার উপর বর্তাইবে। ইসলামে যদি একান্তই আপনি প্রবিষ্ট না হন, তাহা হইলে আল্লাহ্ নামে জিযয়া প্রদান করুন। আমাদের প্রতি আল্লাহ্র নির্দেশ হইতেছে, "কিতাবীদের মধ্যে যাহারা (আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি) ঈমান আনয়ন করিবে না এবং সত্য ধর্মকে বরণ করিবে না তাহাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করিবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা জিযয়া প্রদান করে এবং বশ্যতা স্বীকার করে" (৯:২৯)। যদি একান্তই আপনি তাহাতে সম্মত না হন, তাহা হইলে অন্তত (আপনার অধীনস্ত) আরব প্রজাদের ইসলাম গ্রহণে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইবেন না" [দ্র. কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ২৬ (১৯৮ সং), মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৬৬]।
উক্ত পত্রে আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাসের এবং আল্লাহর আইন মানিয়া লওয়ার দাওয়াতই ছিল মুখ্য। দ্বিতীয় বিকল্প ব্যবস্থারূপে বলা হয়, সম্রাট যেন আল্লাহ্ আইনের কাছে নতিস্বীকার করিয়া জিযয়া প্রদান করেন, আর সাথে সাথে এই দাওয়াতও ছিল যে, তিনি ইসলাম গ্রহণে একান্তই অনিচ্ছুক হইলে সম্রাট যেন তাঁহার অধীনস্থ সিরীয় এলাকার ছোট ছোট আরব রাজ্যগুলির উপর ক্ষমতা প্রয়োগ হইতে বিরত থাকেন, যাহাতে তাহারা ইসলামী প্রথা বা জিযয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত নিজেরা স্বাধীনভাবে নিতে সমর্থ হয়।