📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রোমক সম্রাটের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূত দিহয়া কালবী (রা)

📄 রোমক সম্রাটের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূত দিহয়া কালবী (রা)


(মাজমু'আতু'ল-ওয়াছাইক, পৃ. ৭৯; যুরকানী, আল-মাওয়াহিবু'ল-লাদুন্নিয়া, ৩খ., পৃ. ৩৪৩-৩৪)।
ইতিহাস গ্রন্থসমূহ ঘাটিলে অনুমিত হয়, এই পত্রখানাও যেন আসহামা নাজাশীর নামে লিখিত হইয়াছিল। পত্রশীর্ষে আসহামা নামটিও উৎকীর্ণ ছিল। কিন্তু পত্রের পাঠে এই বিবরণ লিপিবদ্ধ নাই যে, কখন কাহার মাধ্যমে তাহা প্রেরিত হইয়াছিল। কেননা, আসহামার নামে লিখিত প্রথম পত্রখানা হইতেছে যাহা নবৃওয়াতের পঞ্চম বর্ষে জা'ফার তায়‍্যার (রা) আবিসিনিয়ায় হিজরতকালে সঙ্গে লইয়া গিয়াছিলেন অথবা উহার স্বল্পকাল পরে তাঁহাদের ব্যাপারে লিখিত হইয়াছিল। দ্বিতীয় পত্রখানি হইতেছে যাহা 'আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা) হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সপ্তম হিজরীতে বহন করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন। তৃতীয় পত্রখানাও উক্ত আমর (রা)-এর মাধ্যমেই প্রেরিত হইয়াছিল- যাহাতে উম্মে হাবীবা (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ-এর পরিণয় এবং মুহাজিরগণের ইথিওপিয়া হইতে রওয়ানা হওয়ার উল্লেখ রহিয়াছে। মুহাজিরগণের প্রত্যাবর্তনকাল পর্যন্ত এই পূর্ণ মেয়াদের মধ্যে এই শেষোক্ত পত্রের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। হাদীছে অবশ্য উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ এক বা একাধিক নাজাশীর উদ্দেশ্যে পত্র প্রেরণ করিয়াছেন। হযরত আনাস (রা)-এর বরাতে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীছে আছে:
عن انس ان النبي ﷺ كتب الى كسرى والى قيصر والى النجاشي والى كل جبار يدعوهم الى الله عز وجل وليس بالنجاشي الذي صلى عليه النبي ﷺ -
"রাসূলুল্লাহ (স) কিসরা, কায়সার, নাজাশী এবং প্রতাপশালী রাজন্যবর্গের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইয়া পত্র প্রেরণ করেন, তবে ঐ নাজাশী নহে, রাসূলুল্লাহ যাঁহার জানাযার নামায পড়িয়াছিলেন" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৯)।
কিন্তু ঐ নাজাশীর নাম, পত্র প্রেরণের তারিখ বা পত্রবাহক কে ছিলেন তাহার কোন হদিস পাওয়া যায় না। পত্রখানার মর্ম হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যদি উহা নাজাশী আসহামের নামেই লিখিত হইয়া থাকে, তবে তাহা নিশ্চয়ই সপ্তম হিজরীতে হইয়া থাকিবে, যখন রাসূলুল্লাহ বিশ্বের অন্যান্য রাজা-বাদশাহর নামে পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। কিন্তু ঐ পত্রখানা যে প্রথমোক্ত পত্র ছিল এই ব্যাপারে সীরাতবেত্তা ও ঐতিহাসিকগণের কোন দ্বিমত নাই। সুতরাং আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হইতে হয় যে, এই শেষোক্ত পত্রখানা দ্বিতীয় নাজাশীর উদ্দেশ্যে লিখিত হইয়াছিল-যিনি আসহামা নাজাশীর ইন্তিকালের পর তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন। বাক্যটিও- যাহা সাধারণত বিধর্মীদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতেন- এই সত্যকে জোরদার করে। প্রমাণবশত ইহাতে নাজাশী আসহামের নাম লিখিত হইয়াছে (যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৪৬; সীরাতুল মুস্তাফা, কান্ধলভী, ২খ., পৃ. ৩৯৭-৯৮)।
হিজরী ৫ম/৬২৩ খৃ. সালে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস নিনেভার যুদ্ধে ইরানীদেরকে পরাস্ত করিয়া টাইগ্রীস নদীর অপর পাড়ে ঠেলিয়া দেন। শেষ পর্যন্ত খসরু পারভেযকে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে রাজস্ব প্রদানে সম্মত হইতে হয় এবং পবিত্র ক্রুশও তাঁহাকে ফেরত দিতে হয়। এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয় উপলক্ষে খৃস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাসে একটি উৎসবের আয়োজন করে। বিধ্বস্ত
কিয়ামাতা দুর্গ পুনর্নির্মিত হয়। স্বয়ং সম্রাট হিরাক্লিয়াস পবিত্র ক্রুশ সেখানে পৌছাইয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে এন্টিয়ক হইতে অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে বাহির হইলেন। পবিত্র ক্রুশের এই মিছিল এবং বিজয় উৎসবে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে উত্তর আফ্রিকা, মিসর, ইরাক ও আরবের রোমক শাসিত এলাকাসমূহ এবং রোমান সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যসমূহের রাষ্ট্রদূতগণ রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে অভিনন্দন জানাইবার উদ্দেশ্যে সেখানে আসিয়া পৌঁছেন। তাহাদের কাফেলাসমূহ এই মিছিলে অংশগ্রহণ করিয়া তাহার জৌলুস বর্ধিত করে।
রাসূলুল্লাহ-এর দূত দিহ্ইয়া আল-কালবীর স্বয়ং সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হইয়া পত্র হস্তান্তর যেহেতু রীতিমত এক অসম্ভব ব্যাপার ছিল তাই তিনি এই উদ্দেশ্যে গাস্সানীদের প্রাচীন রাজধানী বুসরার শাসক হারিছের সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁহার দৌত্যকার্যের কথা তাঁহাকে অবহিত করেন।
লক্ষ ভক্ত অনুরক্ত পরিবেষ্টিত অবস্থায় কায়সার যখন পবিত্র ক্রুশসহ হিমসে উপনীত হইলেন, তখন দিহ্ইয়া আল-কালবী (রা) বুসরার শাসনকর্তার মাধ্যমে কায়সারের দরবারে উপনীত হইলেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা তাঁহার নিকট পেশ করিলেন। সেই পত্রখানার পাঠ ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد عبد الله ورسوله الى هرقل عظيم الروم سلام على من اتبع الهدى اما بعد فاني ادعوك بدعاية الاسلام اسلم تسلم يؤتك الله اجرك مرتين فان توليت فعليك اثم الاريسيين و يا اهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ان لا نعبد الا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون "পরম দয়ালু ও পরম দয়াময় আল্লাহ্র নামে। আবদুল্লাহ্র পুত্র ও আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে রোমের প্রধান হিরাক্লিয়াসের প্রতি। সালাম (শান্তি) বর্ষিত হউক যে হিদায়াতের অনুসারী। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেছি। ইসলাম গ্রহণ করিয়া লউন, নিরাপত্তা লাভ করিবেন এবং আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দান করিবেন। আর আপনি যদি পরাঙ্মুখ হন তাহা হইলে (প্রজা) কৃষককুলের পাপের বোঝা আপনার উপর বর্তাইবে। হে কিতাবী সম্প্রদায়! আইস সে কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ্ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করে।' যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, "তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম (আল্লাহতে আত্ম সর্ম্পণকারী") (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪-৫; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৭-৯৮ কিতাবুল জিহাদ ওয়াস্-সিয়ার; জামহারাতু রাসাইলিল আরব, ১খ., পৃ. ৩৮-৩৯; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮১; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬০; ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৩৫; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৩; আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ২৭৫; আল-আগানী, ৬খ., পৃ. ৯৩; কিতাবুল আমওয়াল, পৃ.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কায়সারের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ

📄 কায়সারের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ


২৭; তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯১; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া (কাসতাল্লানী), ৩খ., পৃ. ৩৮৪; তাহাবী, মুশকিলুল আছার, ২খ., পৃ. ৩৯৭; দুরুল মাসদুর, ২খ., পৃ. ৪০; দালাইলুন নবুওয়া, পৃ. ২৯০; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৭৪; ইয়া'কুবী, ২খ., পৃ. ৬২; কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ২৭৫; মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২৬৩; মাজমুআতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮১; মাকাতিবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১০৫)।
কায়সার পত্রখানা পাঠ করিয়া চুপ হইয়া গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি মুখ খুলিলেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের দরবারে পত্রখানা পেশ করিতে বলিয়া দিলেন। চতুর্দিক হইতে যখন কায়সারের দরবারে অসংখ্য অভিনন্দন আসিয়া পৌঁছিতেছিল এমন সময় এই পত্রখানা যেন কেমন একটা ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। ইহার সম্বোধনের ধরন-ধারণ মোটেও সম্রাটের উপযোগী বা তাঁহার মানমর্যাদার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। হিরাক্লিয়াসের তো পত্রের বক্তব্যে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠার কথা, কিন্তু তিনি তাহা না করিয়া সহিষ্ণুতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিলেন। ইহা রীতিমত একটা অর্থবহ ব্যাপার ছিল।
আসল ব্যাপার ছিল এই যে, প্রায় এক দশক পূর্বে যখন ইরানীরা হিরাক্লিয়াসকে পরাজিত করিয়া রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌঁছাইয়া গিয়াছিল তখন ইয়াহুদীরা ও আরব গোত্রসমূহ রোমকদের বিরুদ্ধে ইরানীদেরকে সমর্থন করিয়াছিল। ইরানীরা যেহেতু পৌত্তলিক ছিল, তাই আরবের পৌত্তলিক গোত্রসমূহের সহানুভূতি সাধারণত রোমকদের বিরুদ্ধে তাহাদেরই পক্ষে থাকিত। রোমকদের জন্য এই ব্যাপারটা কম তাৎপর্যবহ ছিল না যে, এহেন পৌত্তলিক আরব কবীলাগুলির মধ্যেই এমন একটি শক্তির উদ্ভব হইতেছে যাহারা পৌত্তলিক ইরানীদের বিরুদ্ধে কিতাবীদের সমর্থক এবং তাহাদের নবী ঈসা (আ)-কে তাহারা আল্লাহ্ নবী বলিয়াও স্বীকার করে। তাই পৌত্তলিক ইরানীদের বিরুদ্ধে এই নূতন ধর্মাবলম্বিগণকে উৎসাহিত করাই ছিল বিজ্ঞজনোচিত পদক্ষেপ। আর এইজন্যই রাসূলুল্লাহ -এর পত্রের বক্তব্যে হিরাক্লিয়াসের মনে যাহা একটু তিক্ততার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা তিনি হজম করিয়া ফেলেন এবং আদেশ দেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছিয়া আরবের এই নবী এবং তাঁহার নবুওয়াতের দাবি সম্পর্কে অনুসন্ধান করিয়া জানিতে হইবে।
রোমক সম্রাটের দরবারে মহানবী -এর দূত দিহয়া কালবী (রা) মহানবী -এর দূত দিহয়া আল-কালবী (রা) প্রথমে বুসরার প্রশাসক গাস্সান-রাজ হারিছ ইব্‌ন আবী শুমারা আল-গাসসানীর নিকট রাসূলুল্লাহ -এর পত্রসহ উপস্থিত হন এবং উহা কায়সারের নিকট হস্তান্তরের আবেদন জানান। গাসসানরাজ 'আদী ইবন হাতিম তাঈ (রা)-কে তাহার সঙ্গে দিয়া সম্রাটের দরবারে তাঁহাকে প্রেরণ করেন (রাসাইলুন নাবী, পৃ. ২৬; জামহারাতু রাসাইলিল আরাب, ১খ., পৃ. ৩৭)।
তিনি যখন সম্রাটের দরবারে পৌছিলেন তখন পারিষদবর্গ তাঁহাকে বলিল, বাদশাহ জাহাপনাকে দেখামাত্র তাঁহাকে সিজদা করিবে। তারপর তিনি অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত মস্তক উত্তোলন করিবেন না। সাথে সাথে দিহয়া (রা) বলিলেন, ইহা আমি কস্মিনকালেও করিতে পারিব না। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাহাকেও আমি সিজদা করিব না। তাহারা বলিল, তাহা হইলে তো তোমার
পত্র তিনি গ্রহণই করিবেন না। তাহাদের মধ্যকার জনৈক বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলিল, আমি তোমাকে এমন এক বুদ্ধি শিখাইয়া দিতেছি যাহাতে তিনি তোমার পত্রখানা গ্রহণ করিবেন, অথচ তাঁহাকে তোমার সিজদা করার প্রয়োজনও হইবে না। দিহয়া (রা) বলিলেন, কী সেই বুদ্ধি?
সেই ব্যক্তি বলিল, তিনি যখন মিম্বরের উপর উপবিষ্ট থাকিবেন তখন তুমি তাঁহার মিম্বরের উপর পত্রখানা রাখিয়া দিবে। সেখানে অন্য কেহ হাত দিতে সাহস পাইবে না। কায়সার তাহা নিজ হাতে তুলিয়া লইবেন এবং তাঁহার কোন পারিষদকে ডাকিবেন। দূত দিহয়া কালবী (রা) তাহাই করিলেন। কায়সার নিজ হাতে পত্রখানা উঠাইয়া লইয়া পত্রের শিরোনামে 'বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম' দেখিতে পাইয়া বলিলেন, সুলায়মান আলায়হিস সালামের পর আর কাহাকেও এরূপ পত্র লিখিতে দেখি নাই। তারপর দোভাষী ডাকিয়া তিনি পত্রখানা পাঠ করাইয়া শুনিলেন এবং বলিলেন, তাঁহার সম্প্রদায়ের এমন এক ব্যক্তিকে ডাকিয়া আন যাহাকে আমি পত্রলেখক সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করিব [আস-সীরাতুল হালাবিয়‍্যা, ৩খ., পৃ, ২৭৫; সীরাতু যায়নী দালান (হালাবিয়্যার পাদটীকায়), ৩খ., পৃ. ৫৮; কানযুল উম্মাল, ৫খ., পৃ. ২৪৬; মাকাতিবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১০৮-১০৯]।
কায়সারের পত্র পাঠের পূর্বেই মহানবী -এর দূত দিহয়া আল-কালবী (রা) তাঁহার উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাহাতে তিনি বলেন:
“হে রোম সম্রাট! আমাকে যিনি আপনার দরবারে দূতরূপে প্রেরণ করিয়াছেন তিনি আপনার চেয়ে অনেক গুণ উত্তম এবং তাঁহাকে যিনি নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছেন সেই পবিত্র সত্তা হইতেছেন সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমি যাহা নিবেদন করিব তাহা বিনীতভাবে শ্রবণপূর্বক আন্তরিকতার সহিত আপনি তাহার উত্তর প্রদান করিবেন। বিনীত বিনম্র অন্তরে শ্রবণ ব্যতিরেকে আপনি উহার মর্ম উপলব্ধি করিতে পারিবেন না। আর উত্তর প্রদানে আন্তরিক ও সনিষ্ঠ না হইলে সেই উত্তর কোনক্রমেই ন্যায্য ও যথার্থ হইবে না।"
কায়সার বলিলেন, আপনি বলুন! দিহয়া কালবী (রা) তখন বলিলেন, আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন যে, মসীহ ইব্‌ন মারয়াম (আ) প্রার্থনা করিতেন। জবাবে কায়সার বলিলেন, হাঁ, তিনি অবশ্যই প্রার্থনা করিতেন।
দিহয়া কালবী (রা) বলিয়াই চলিলেন, আমি আপনাকে সেই পবিত্র সত্তার দিকে আহ্বান জানাইতেছি যাঁহার উদ্দেশ্যে মসীহ (আ) প্রার্থনা করিতেন, যাঁহার সম্মুখে তিনি সিজদায় লুটাইয়া পড়িতেন, যিনি তাঁহাকে পিতা বিহনে মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি আসমান-যমীন সবকিছু সৃষ্টি করিয়াছেন। তারপর আমি সেই উম্মী নবীর দিকে আপনাকে আহবান জানাইতেছি— যাঁহার সুসমাচার হযরত মূসা ও হযরত 'ঈসা (আ) প্রদান করিয়াছেন। আপনি তো তাহা সম্যক অবগত রহিয়াছেন। আপনি যদি এই দাওয়াতে সাড়া দান করেন তাহা হইলে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় মঙ্গলই আপনার জন্য সুনিশ্চিত। আর যদি দুর্ভাগ্যক্রমে উহাতে আপনি ব্যর্থ হন, তাহা হইলে পারলৌকিক মঙ্গল আপনার হাতছাড়া হইয়া যাইবে, যদিও ইহলৌকিক মঙ্গলে অন্যরাও আপনার সহিত শামিল থাকিবে। আপনি নিশ্চিতরূপে জানিয়া রাখুন, আপনার একজন প্রতিপালক

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিশপ-পাদ্রীর ইসলাম গ্রহণ ও শাহাদত বরণ

📄 বিশপ-পাদ্রীর ইসলাম গ্রহণ ও শাহাদত বরণ


রহিয়াছেন- যিনি তাঁহার অগ্রাহ্যকারীদেরকে ধ্বংস করিয়াছেন এবং তাঁহার নিয়ামতসমূহ পালাক্রমে হাতবদল করিয়া দেন।"
কায়সার রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা দিয়া (রা)-এর হাত হইতে গ্রহণ করিয়া নিজ মস্তকে ধারণ করিলেন এবং নিজের চক্ষে ও মুখমণ্ডলে লাগাইলেন। তারপর তাহা খুলিয়া পাঠ করিলেন। দিয়া কালবী (রা) বলেন, তারপর তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, চিন্তা-ভাবনা করিয়া আগামী কাল আমি উহার জবাব দিব (রাওদুল উনুফ, ১৯৭৮ সং., ৪খ., পৃ. ২৪৯; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৭০-৭১)।
রাসূলুল্লাহ -এর ঐ পত্রখানা সত্যসত্যই হিরাক্লিয়াসকে অত্যন্ত চিন্তিত করিয়া তোলে। কেননা তিনি নিজে তাহার স্বধর্মে বিশেষজ্ঞ এবং আখেরী যামানায় একজন নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে 'ঈসা (আ) প্রদত্ত সুসমাচার সম্পর্কে ওয়াকেফহাল ছিলেন। তাই পত্রখানা তাহাকে অধিক কৌতূহলী করিয়া তোলে। ব্যাপারটি অনুসন্ধান করিয়া দেখিবার জন্য তিনি পত্রপ্রেরক নবীর স্বদেশীয় ও স্ব-সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট হইতে প্রকৃত তথ্য জানিতে আগ্রহী হইয়া উঠেন।
ঘটনাচক্রে কুরায়শ নেতা আবু সুফয়ান একটি বাণিজ্য কাফেলাসহ তখন বায়তুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত ছিলেন। শাহী কর্মকর্তাগণ তাহাকে এই কথা বলিয়া সম্রাটের দরবারে উপস্থিত করে যে, শাহানশাহের কিছু প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হইবে।
কায়সার নিজে পত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং পত্রবাহককে সমীহ করিলেও তাহার পার্শ্বে উপবিষ্ট তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র, মতান্তরে ভ্রাতা প্রচণ্ড বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। দিয়া কালবীর বর্ণনানুসারে ঐ ব্যক্তিটির দেহ ছিল গৌরবর্ণ, চক্ষু নীলবর্ণ এবং মস্তক মুণ্ডিত। পত্রের শিরোনাম "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে রোমক প্রধান হিরাকলের প্রতি" শ্রবণ করিয়াই সে গর্জিয়া উঠিল, "এই পত্র আর কোনক্রমেই এই দরবারে পাঠ করা চলে না।" কায়সার বলিলেন, কেন কী হইয়াছে? সে বলিল, পত্রপ্রেরক প্রথমে তাঁহার নিজের নাম লিখিয়াছে। দ্বিতীয়ত, রোমক সম্রাট না লিখিয়া সে রোমের 'প্রধান হিরাকল' লিখিয়া সম্বোধন করিয়াছে। এমন তুচ্ছ পত্র কী করিয়া সম্রাটের দরবারে পঠিত হইতে পারে? জবাবে হিরাক্লিয়াস যাহা বলিলেন স্বয়ং দিয়া কালবীর ভাষ্য অনুসারে তাহা ছিল এইরূপ:
والله انك لضعيف الراى اترى ارمى بكتاب رجل يأتيه الناموس الأكبر وهو احق ان يبدئ بنفسه ولقد صدق انا صاحب الروم والله مالكي ومالكه "আল্লাহ্র কসম! তুমি নিশ্চিতভাবেই অপরিপক্ক মত পোষণকারী। তুমি কি লক্ষ করিয়াছ, এমন এক মহান ব্যক্তির পত্র আমার প্রতি নিক্ষিপ্ত হইয়াছে, যাঁহার নিকট নামূসে আকবার (পবিত্রাত্মা জিবরাঈল) আগমন করিয়া থাকেন। তিনি নিশ্চয়ই তাঁহার নাম পূর্বে লিখার অধিকতর হকদার। আর তিনি যথার্থই লিখিয়াছেন, আমি রোমের প্রধান, সম্রাট নই, আল্লাহই আমার এবং রোমের প্রকৃত রাজাধিরাজ।"
দিয়া কালবী (রা) বলেন, ইহার পর হিরাক্লিয়াসের নির্দেশে পত্রখানা রাজদরবারে পঠিত হইল। দরবার ভঙ্গের পর লোকজন যখন স্ব স্বগৃহে চলিয়া গেল তখন সম্রাট আমাকে এবং
দরবারের বিশিষ্ট পাদ্রীকে তাহার অন্দর মহলে ডাকিয়া পাঠাইলেন। সম্রাট আদ্যোপান্ত বিবরণ পাদ্রীকে শুনাইয়া রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা তাহাকেও পড়িয়া শুনাইলেন। সবকিছু অবগত হইয়া পাদ্রী বলিলেন, ইনিই তো সেই বহু প্রতীক্ষিত নবী যাঁহার অপেক্ষায় আমরা কালাতিপাত করিতেছি এবং যাঁহার সুসমাচার ঈসা (আ) আমাদেরকে শুনাইয়া গিয়াছেন। সম্রাট পাদ্রীকে লক্ষ করিয়া বলিলেন, এবার আমার ব্যাপারে আপনার কী পরামর্শ, বলুন।
জবাবে পাদ্রী বলিলেন, আর যে যাহাই বলুক না কেন, আমি তো তাঁহার সত্যতার অনুমোদনই করিব এবং তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়া লইব। কায়সার বলিলেন, আমি যদি তাহা করি তাহা হইলে আমাকে রাজত্বের মোহ ত্যাগ করিতে হইবে। তারপর তিনি দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
انى لاعلم ان صاحبك نبي مرسل والذي كنا ننتظره وتجده في كتابنا ولكني اخاف الروم على نفسى ولولا ذلك لا تبعته. "আমি নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত আছি, আপনার মনিব আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল যাঁহার জন্য আমরা প্রতীক্ষা করিয়া আসিতেছি এবং যাঁহার কথা আমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থে পাইয়াছি। কিন্তু আমি আশঙ্কা করি রোমকগণ আমাকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তাহা না হইলে আমি অবশ্যই তাঁহার আনুগত্য করিতাম” (উসদুল-গাবা, ৩খ., পৃ. ৪১; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ.২১৬; তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯২-৯৩; আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮)।
ইহার পর তিনি দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ওহে! তুমি বিশপ দুগাতিরের কাছে গিয়া তোমাদের মনীবের কথা বল। কেননা রোমবাসীদের দৃষ্টিতে তিনি আমার চেয়েও অধিকতর বরেণ্য। তাহাকে তুমি আমার কথা বলিবে। দেখ, এই ব্যাপারে তিনি কি বলেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১১২)।
বার্তাবাহক দিয়া কালবী (রা) আরো বলেন, যে বিশপ পাদ্রীকে কায়সার রোমবাসীদের নিকট তাহার নিজের চেয়ে অধিকতর বরেণ্য বলিয়া তাহার মতামত জানিবার জন্য আমাকে প্রেরণ করিলেন, প্রতি রবিবার তাহার নিকট বিপুল জনসমাবেশ ঘটিত। তিনি তাহাদেরকে ধর্মোপদেশ দান করিতেন। কিন্তু আমার তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া রাসূলুল্লাহ-এর পত্রের ব্যাপারে অবগত করার পরবর্তী রবিবার তিনি আর তাহার হুজরা হইতে বাহির হইলেন না। আমি তাহার নিকট যাতায়াত করিতাম এবং আমার সহিত তাহার কথাবার্তা হইত। ইহার পর দ্বিতীয় রবিবারও তাহার নিকট প্রচুর জনসমাগম হইল। লোকজন দীর্ঘক্ষণ তাহার প্রতীক্ষা করিল, কিন্তু তিনি কোনক্রমেই হুজরা হইতে বাহির হইলেন না। অসুস্থতার ভান করিয়া তিনি হুজরায় অবস্থান করিলেন। ক্রমে কয়েক রবিবার এইরূপ করার পর লোকজন তাহার প্রতি সন্দিহান হইয়া উঠিল। তাহারা তাহাকে বলিয়া পাঠাইল, তুমি আমাদের নিকট উপস্থিত হও আর নাই হও আমরা তোমার হুজরায় ঢুকিয়া তোমাকে বধ করিব। আমরা তো সেই আরবটির আগমনের দিন হইতেই তোমার মধ্যে কেমন একটি অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়া আসিতেছি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রোমক সম্রাটের দরবারে কুরায়শ কাফেলা

📄 রোমক সম্রাটের দরবারে কুরায়শ কাফেলা


বিশপ পাদ্রী তখন আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তুমি আমার এই পত্রখানা গ্রহণ কর, ইহা তুমি তোমার মনিবকে দিবে। তাঁহাকে আমার সালাম জানাইবে এবং তাঁহাকে অবশ্যই বলিবে যে, আমি সাক্ষ্য দিতেছি, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই এবং নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আমি তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছি এবং সর্বান্তকরণে তাঁহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি। আমি তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিতেছি। আমার এই ইসলাম গ্রহণে উহারা ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছে যাহা তুমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিতেছ। তুমি তাঁহাকে এই সংবাদ জানাইবে। অতঃপর তিনি হুজরা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। আর যায় কোথায়! বিক্ষুব্ধ খৃস্টান জনতা মুহূর্তে চতুর্দিক হইতে তাহার উপর ঝাপাইয়া পড়িল এবং তাহাকে শহীদ করিয়া ফেলিল (হায়াতুস-সাহাবা, ২খ., পৃ. ২১৬)।
দিয়া কালবী (রা) কায়সারের নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া যখন তহাকে এই বৃত্তান্ত শুনাইলেন, তখন কায়সার তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমার তো আশংকা হয়, লোকে আমার সহিতও এইরূপ আচরণই করিবে। আমি তোমাকে পূর্বেই বলিয়াছিলাম, বিশপ দুগাতির তাহাদের কাছে আমার চেয়েও বেশী বরেণ্য ছিলেন (তাবারী, ৩খ., পৃ. ৮৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬২-২৬৮; আল-জাওয়াবুস সাহীহ্ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ (ইব্‌ তায়মিয়্যা), ১খ., পৃ. ৯৪; ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৪০)।
রোমক সম্রাট কায়সার হযরত দিয়াকে বলেন, আমি সম্যক জ্ঞাত আছি যে, সত্যিই তিনি নবী— যেমনটি বিশপ দুগাতির বলিয়াছেন। কিন্তু আমি যদি তাহা প্রকাশ করিতে চাই তাহা হইলে আমার রাজত্ব হাতছাড়া হইয়া যাইবে এবং রোমকগণ আমাকে বধ করিবে। আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) এই ঘটনা বিবৃত করিয়া মন্তব্য করেন, মহানবী যে বলিয়াছেন "তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর তাহা হইলে সার্বিক নিরাপত্তা লাভ করিবে”, উহা সে বিস্মৃত হইল (সীরাতুল মুস্তাফা, ২ খ., পৃ. ৭৭)।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) পূর্ণ সনদসহ আবু সুফয়ানের যবানী বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, "আমরা ছিলাম ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। যুদ্ধ আমাদের দ্বারপ্রান্তে ছিল এবং আমাদের সম্পদরাশি প্রায় নিঃশেষ হইয়া আসিয়াছিল। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ ও আমাদের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হইল তখন আমাদের অবস্থা এই ছিল যে, আমরা কাহারও নিকট হইতে নিরাপত্তা প্রাপ্ত হইলেও আমরা নিজেরা কাহাকেও নিরাপত্তা দিতাম না। সন্ধির পর কয়েকজন কুরায়শ ব্যবসায়ীসহ ব্যবসা ব্যাপদেশে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া পড়িলাম। আমার জানামতে কুরায়শের সকল নারী বা পুরুষের ব্যবসা সামগ্রী ঐ কাফেলায় আমাদের সহিত ছিল। ফিলিস্তীনের গাযা এলাকা ছিল আমাদের বাণিজ্যকেন্দ্র। আমরা সেখানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। ঐ সময় রোমক সম্রাট পারস্যবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছেন। তিনি তাহাদেরকে তাহাদের দখলকৃত এলাকা হইতে বহিষ্কার করিয়া দিয়াছেন। তাহারাও রোমক এলাকা হইতে ছিনাইয়া নেওয়া ক্রুশটি সম্রাটকে ফেরত দিয়াছে। ক্রুশ ফেরত পাওয়ার পর সম্রাট হিমসের তাঁহার আবাসস্থল হইতে প্রার্থনার উদ্দেশ্যে পদব্রজে বায়তুল মুকাদ্দাসের
উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। তাঁহাকে সেখানে স্বাগত জানান হয় এবং তাঁহার চলার পথে পুষ্প বর্ষণ করা হয়। তিনি জলিয়ায় (বায়তুল মাকদিস) পৌছিলেন এবং সেখানে সালাত আদায় ও রাত্রিযাপন করিলেন।
পরদিন ভোরে অত্যন্ত বিষন্ন মুখে তিনি নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইলেন। তাঁহার বিষন্নতা দর্শনে উৎসুক পাদ্রিগণ তাঁহার এই বিষন্ন ভাবের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। জবাবে তিনি বলিলেন, গতরাত্রে তারকারাজি পর্যবেক্ষণ করিয়া আমি দেখিতে পাইলাম যে, খতনাকারীদের বাদশাহ্ আবির্ভাব ঘটিয়াছে। উপস্থিত সভাসদগণ বলিলেন, ইহাতে জাহাঁপনার আশঙ্কার কোন কারণ নাই। আমাদের জানা মতে, ইয়াহুদীরাই কেবল খতনা করিয়া থাকে। তাহারা তেমন কোন শক্তিশালী জাতি নহে। উহারা আপনার অধীনস্থ প্রজামাত্র। ইহার পরও যদি জাহাঁপনা তাহাদের পক্ষ হইতে কোনরূপ অনিষ্টের আশঙ্কা করেন, তাহা হইলে সারা দেশে লোক প্রেরণ পূর্বক ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করিয়া তাহাদের নিকট হইতে স্বস্তি লাভ করিতে পারেন।
তাহারা যখন এইরূপ সলাপরামর্শ করিতেছিল তখনই বসরার শাসনকর্তার একজন দূত আরবের এক ব্যক্তিসহ সম্রাটের দরবারে আসিয়া উপস্থিত হয়। দূত বলিল, জাহাঁপনা! এই লোকটি আরব হইতে আসিয়াছে। তাহারা ভেড়া-বকরী ও উট প্রভৃতির মালিক। তাহাদের দেশে এক অভিনব ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। জাহাপনা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে তাহার বর্ণনা দিবে।
লোকটি যখন সম্রাটের নিকট আগমন করিয়া এইরূপ নিবেদন করিল তখন সম্রাট দোভাষীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তাহাকে জিজ্ঞাসা কর তাহাদের দেশে কী অভিনব ব্যাপার ঘটিয়াছে? তাহাকে প্রশ্ন করা হইলে জবাবে সে জানাইল, আরবদেশের কুরায়শ বংশের এক ব্যক্তি নবৃওয়াতের দাবি করিয়াছেন, কিছু সংখ্যক লোক তাঁহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিলেও আমরা তাঁহার ঘোর বিরোধী। অনেক স্থানে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হইয়াছে। আমি তাহাদেরকে এই অবস্থায় রাখিয়াই আপনার সদনে উপস্থিত হইয়াছি।
এইরূপ সংবাদ শ্রবণ করিয়া রোমক সম্রাট তাহাকে বিবস্ত্র করার নির্দেশ দিলেন। দেখা গেল তাহার খতনা করা হইয়াছে। সম্রাট বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি ইহাই স্বপ্নে দেখিয়াছি। ইতোপূর্বে তোমরা যাহা বলিয়াছ তাহা যথার্থ নহে। তাহাকে তাহার বস্ত্র ফেরত দাও। অতঃপর আগন্তুককে লক্ষ্য করিয়া সম্রাট বলিলেন, হে আগন্তুক! তুমি তোমার পথে চলিয়া যাও। তারপর তিনি তাহার পুলিশ প্রধানকে ডাকাইয়া বলিলেন, গোটা সিরিয়া প্রদেশে খোঁজাখুঁজি করিয়া এমন একটি লোক আন যে ঐ কথিত নবীর স্বগোত্রীয় এবং তাঁহার সম্পর্কে আমাদেরকে সঠিক তথ্য দিতে সক্ষম হইবে। পুলিশের লোকেরা আমাদের কাফেলার সকল লোককে সম্রাটের দরবারে নিয়া উপস্থিত করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৪৫৪-৫) ৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00