📄 নাজাশীর নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বিতীয় পত্র
আস্হামা নবী কারীম-এর পবিত্র পত্রখানা হাতির দাঁতের কৌটায় আবদ্ধ করিয়া সংরক্ষিত করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬০)। তিনি প্রায়ই বলিতেন, যতদিন এই বরকতময় তোহফা আবিসিনিয়ায় সংরক্ষিত থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত এই দেশের বিরুদ্ধে শত্রুর হস্ত উত্তোলিত হইতে পারিবে না। তাবারী প্রমুখ ঐতিহাসিকের বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্-এর উক্ত পত্রের পাঠে অধিভুক্ত নিম্নলিখিত বাক্যগুলিও পাওয়া যায়:
قد بعثت اليك ابن عمى جعفرا ونفرا من المسلمين فاذا جاءوك فاثرهم ودع التبجر. "আমি আমার পিতৃব্য পুত্র জা'ফারকে এবং তাঁহার সাথে একদল মুসলমানক আপনার নিকট প্রেরণ করিতেছি। যখন তাঁহারা আপনার নিকট পৌঁছিবে তখন তাঁহাদেরকে আতিথ্য দান করিবেন এবং উদ্ধত আচরণ হইতে বিরত থাকিবেন।"
অবশ্য হালাবী, আল-কাস্তাল্লানী, আল-কালকাশান্দী প্রমুখের বর্ণনায় এই বর্ধিত অংশের উল্লেখ নাই। ড. হামীদুল্লাহ বলেন, এ রকম বাক্য হিজরী ৬ষ্ঠ সালে কীভাবে লিখা যাইতে পারে? ঐ সময় তো মুসলমানদের হাবশায় হিজরতের প্রায় পনের বৎসর অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। পত্রের বিষয়বস্তু হইতে অনুমিত হয়, উহা ছিল জা'ফার (রা)-এর পরিচিতিমূলক। জীবনীকারগণ এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব হইলেও পত্রের উক্ত বাক্যগুলি হইতে ধারণা করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ নবুওয়াত লাভের প্রাক্কালে আবিসিনিয়াও সফর করিয়াছিলেন এবং অন্যান্য বণিকদের মত নাজাশীর সহিত তাঁহারও ব্যক্তিগত পরিচয় ঘটিয়া থাকিবে। মুহাজিরগণকে বিদায় দানকালে তাই তিনি বলিয়াছিলেন, আবিসিনিয়ায় এমন এক সম্রাট রহিয়াছেন যাহার রাজত্বে কাহারও প্রতি অবিচার করা হয় না।
ড. হামীদুল্লাহ বলেন, ১৯৩৯ সালে "মদীনার পত্রাবলী” শীর্ষক ভাষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে আমি যখন অক্সফোর্ডে গিয়াছিলাম, তখন অধ্যাপক মারগোলিয়থ স্কটল্যান্ডের জনৈক প্রাচ্যাবিদের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যিনি সম্প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উক্ত পত্রটি পাইয়াছিলেন। উক্ত প্রাচ্যবিদের উদ্দেশ্যে লিখিত আমার পত্রটি অধ্যাপক মারগোলিয়থ তাহার কাছে পৌঁছাইয়া দেন। স্কটল্যান্ডের ব্রাইডকর্ক নামক স্থানে বসবাসকারী প্রাচ্যবিদ ডি. এম. ডানলপ আমার চিঠির জবাবে ১৯৩৯ সালে ২ জুন সিরিয়া হইতে যে পত্রটি লিখেন, তাহা হায়দরাবাদে (দাক্ষিণাত্য) আমার হস্তগত হয়। উক্ত পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন: "বিশেষ এক পরিস্থিতিতে নাজাশীর প্রতি লিখিত এই পত্রখানা সম্প্রতি ফিলিস্তীনের জনৈক পাদ্রীর নিকট হইতে ক্রয় করা হইয়াছে এবং অচিরেই লন্ডনের জি. আর. এ. এম. পত্রিকায় প্রবন্ধাকারে তাহা প্রকাশিত হইবে।"
ইহা ছাড়া তিনি অনুগ্রহ করিয়া উপরিউক্ত পত্রের একটি হস্তলিখিত অনুলিপিও প্রেরণ করেন। দেশে ফিরিয়া ইহার একটি ফটোকপি প্রেরণের প্রতিশ্রুতিও তিনি আমাকে দিয়াছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হইয়া যাওয়ায় তাহার সহিত আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হইয়া যায় (বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন, পৃ. ১৩২-৩৩)।
সুতরাং উক্ত বাক্যগুলি যে রাসূলুল্লাহ্-এরই তাহার সম্ভাবনা একবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না; বরং তাহাদেরকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে হয় যে, মুসলমানদের আবিসিনিয়ায়
হিজরতকালেও রাসূলুল্লাহ্ সম্রাটের নামে একখানি পত্র দিয়া থাকিনে, যাহাতে উক্ত কথাগুলিও ছিল। তবে সেই চিঠির পূর্ণ বিবরণ অদ্যাবধি জানা যায় নাই। কালের বিবর্তনে হয়ত কোনদিন তহা আবিষ্কৃতও হইতে পারে। ৭ম হিজরীতে সম্রাটের দরবারে রাসূলুল্লাহ্-এর যে পত্রখানা পৌঁছিয়াছিল তাহার সহিত এই বাক্যগুলি জুড়িয়া দেওয়া তাবারী প্রমুখ ঐতিহাসিকগণের ভ্রমপ্রমাদ মাত্র। কারণ তখনও দাওয়াতী পত্র প্রেরণের পরিবেশ তৈরী হয় নাই। আলী ইব্ন হুসায়ন আলী আল-আহমাদী বলেন:
فالمناسب أن يكتب في السنة التي خرج فيها عمرو بن العاصي الحبشة سفيرا من قبل معاندى مكة لا يذاء جعفر واصحابه. "সুতরাং ইহাই যুক্তিসঙ্গত মনে হয় যে, যে বৎসর 'আমর ইবনুল 'আস জা'ফার এবং তদীয় সাথীবর্গকে কষ্ট দেওয়ার জন্য মক্কায় ইসলাম বিদ্বেষীদের পক্ষ হইতে দৌত্যকর্মের জন্য ইথিওপিয়ায় গিয়াছিলেন, ঐ পত্রখানা ঐ সময়ই রাসূলুল্লাহ্ -এর পক্ষ হইতে প্রেরিত হইয়াছিল” (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১২৫)।
আর হিজরী ৬ষ্ঠ সালের শেষ মুহূর্তে বা সপ্তম হিজরীর শুরুতে প্রেরিত পত্রে রাসূলুল্লাহ্ তদীয় পিতৃব্য পুত্র জা'ফার তায়্যার (রা)-এর পরিচিতি লিখিবেন, তাহা গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ ইহার এক যুগেরও অধিক কাল পূর্বেই তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করিয়া এবং রাজদরবারে ওজস্বিনী ভাষায় ইসলাম ও ইসলামের নবীর পরিচয় তুলিয়া ধরিয়া সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন।
যাহাই হউক, হযরতের পবিত্র রাজদরবারে পঠিত হওয়া এবং পূর্বোক্ত প্রতিক্রিয়া ও ঘটনাসমূহ সংঘটিত হওয়ার পর যখন আবিসিনীয়দের উত্তেজনা ও বিদ্রোহ-বিক্ষোভ প্রশমিত হইল তখন নাজাশী রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রের জবাব লিখিলেন। পত্রখানি তিনি জা'ফার ইব্ন আবী তালিব (রা)-এর হাতেই লিখান (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৫৯)। আবিসিনিয়া অধিপতি নাজাশীর জবাবী পত্র:
بسم الله الرحمن الرحيم الى محمد رسول الله من النجاشي الاصحم بن ابجر سلام عليك يا نبي الله ورحمة الله وبركاته احمد الله الذى لا اله الا هو الذي هداني للاسلام. اما بعد فقد بلغنى كتابك يا رسول الله فما ذكرت من أمر عيسى فورب السماء والارض ان عيسى ما يزيد على ما ذكرت تغرافا انه كما قلت وقد عرفنا ما بعثت به الينا وقد قرينا ابن عماك واصحابه فاشهد انك رسول الله صادقا مصدقا وقد بايعتك بايعت ابن عمك واسلمت على يديه لله رب العالمين وقد بعثت اليك با بنى ارها ابن الاصحم بن ابجر فانى لا املك الا نفسى وان شئت ان اتيتك فعلت يا رسول الله فاني اشهد ان ما تقول حق والسلام عليك يارسول الله.
পাঠকগণের মনে এই প্রসঙ্গে একটি কৌতূহল জাগিতে পারে যে, সুদূর ইথিওপিয়ায় প্রবাসী একজন মুহাজির মহিলার সহিত রাসূলুল্লাহ্-এর বিবাহ অনুষ্ঠানের বা মুসলমানগণকে মদীনায় পাঠাইয়া দিবার নির্দেশ দানেরই বা কী প্রয়োজন পড়িয়াছিল, আর মুহাজিরগণ যখন যথাসম্ভব শীঘ্র মদীনায় ফিরিয়াই আসিবেন, তাহা হইলে ঐ বিবাহ আয়োজনের ব্যাপারটি বিদেশ বিভুঁইয়ে করারই কী দরকার ছিল?
প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, উম্মু হাবীবা রামালা বিন্ত আবী সুফিয়ান তাঁহার স্বামী উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন জাহ্শ আল-আসাদীর সঙ্গেই ইথিওপিয়ায় হিজরত করিয়াছিলেন। হতভাগ্য উবায়দুল্লাহ্ ইথিওপিয়ার খৃস্টান পরিবেশে কিছুদিন বসবাস করিয়া অজ্ঞাত কারণে খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হইয়া পড়িলে ইহা হযরত উম্মু হাবীবা (রা)-এর ভীষণ মনোকষ্টের কারণ হওয়াটাই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেননা যে নবীকে ও তাঁহার ধর্মকে বরণ করিতে গিয়া তিনি তদীয় পিতা কুরায়শ নেতা আবূ সুফ্যানকে পরিত্যাগ করিয়া আসিতে দ্বিধাবোধ করেন নাই, তাঁহার হতভাগ্য স্বামী সেই প্রাণপ্রিয় নবী ও তাঁহার সত্য ধর্মকেই বিসর্জন দিয়া কুফরী জীবন অবলম্বন করিয়াছে। আল্লাহ্র রাসূল ইথিওপিয়ার রাজদরবারে সেই দেশের সম্রাটের ওকালতিতে স্বয়ং তাঁহার সহিত বিবাহের আয়োজন করাইয়া তাঁহার ভগ্নহৃদয়ে আশার সঞ্চার করিয়াছিলেন। তিনি বুঝাইয়া দিলেন, তাঁহার হতভাগ্য স্বামীটি তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া কুফরী জীবনে চলিয়া গেলেও আল্লাহ্ নবীর নিকট তাঁহার মূল্য একটুও কমে নাই, বরং তাঁহার কদর দুনিয়া ও আখিরাতে হাজার গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। সুতরাং তাঁহার আক্ষেপের কিছুই নাই। সত্য সত্যই হতভাগ্য উবায়দুল্লাহ্ প্রিয়নবীর রক্তের আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হইল, আর উম্মু হাবীবা (রা) আল্লাহ্, রাসূল ও তদীয় সত্য ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ শত্রুদের একজনের ঘরে জন্মগ্রহণ করিয়াও ইতিহাসে অমর ও উম্মুল মু'মীনীনরূপে চিরভাস্বর হইয়া রহিলেন। উম্মু হাবীবা (রা)-এর মনোকষ্ট দীর্ঘায়িত হউক উহা দরদী রাসূলুল্লাহ-এর মনোপূত ছিল না। তাই দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাবে বলা যায়, মদীনার নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভ এবং অবশেষে হুদায়বিয়ার সন্ধির কারণে অনেকটা সুসংহত ও নিরাপদ হইয়া যাওয়ায় অপরদিকে ইথিওপিীয় সম্রাট নিজে ইসলাম গ্রহণ করিলেও সেখানে মুসলমানগণ যেহেতু একান্তই সংখ্যালঘু এবং খৃস্টানদের অনেকেই তাঁহাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিল, তাই মুসলমানদের নিজেদের নিরাপদ রাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তনই ছিল যুক্তিযুক্ত। তাই রাসূলুল্লাহ্ -এর প্রথম পত্রের দূত আমর ইবন উমায়্যা দামরীকেই ঐ মর্মের পত্রসহ মুসলমানদেরকে ফিরাইয়া লইয়া আসিবার দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছিল। উল্লেখ্য, এই 'আমর ইবন উমায়্যাকে রাসূলুল্লাহ্ঐ সময়ও ইথিওপিয়ায় মুসলমানদের পক্ষে ওকালতি ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে পাঠাইয়াছিলেন যখন বদরের যুদ্ধে পরাজিত হইয়া ক্ষুব্ধ মক্কাবাসী 'আমর ইবনুল আসকে স্বজাতি ও স্বধর্ম বিরোধী পলাতক কুরায়শ সন্তানদেরকে সেই দেশ হইতে ফিরাইয়া আনিবার জন্য উপঢৌকনাদিসহ প্রেরণ করিয়াছিল, অথচ 'আমর ইবন উমায়্যা তখনও মুশরিকই ছিলেন। বদর ও উহুদ যুদ্ধে তাহাকে কুরায়শদের পক্ষে যুদ্ধও করিতে দেখা গিয়াছিল (ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ১৮২-৮৩; ইসলামী বিশ্বকোষ,
ইথিওপিীয় সম্রাট রাসূলুল্লাহ্ -এর নির্দেশানুযায়ী প্রিয়নবী -এর সহিত উম্মু হাবীba (রা)-এর 'আকদ' অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। তিনি চারি শত দীনার মহরস্বরূপ রাসূলুল্লাহ্ -এর পক্ষ হইতে নিজেই পরিশোধ করেন এবং বিবাহ উপলক্ষে যথারীতি প্রীতিভোজেরও ব্যবস্থা করেন (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১৪৫; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৫৯; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৩-৩৭)।
তারপর বহুমূল্য উপহার-সামগ্রীসহ অন্যান্য মুহাজিরগণের সহিত তাঁকেও মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিয়া দেন। নাজাশী ঐ প্রতিনিধি দলের সহিত রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে ঐ বিবরণসহ নিম্নরূপ পত্র দেন:
بسم الله الرحمن الرحيم الى محمد ﷺ من النجاشي اصحمة سلام عليك يا رسول الله ورحمة الله وبركاته اما بعد فاني قد زوجتك امرأة من قومك وعلى دينك وهى السيرة ام حبيبة بنت ابي سفيان واهديتك هدية جامعة قميصا وسراويل وعطافا وخفين ساذجتين والسلام عليك ورحمة الله وبركاته. "পরম দয়ালু ও পরম দয়াময় আল্লাহর নামে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি নাজাশী আসহামার পক্ষ হইতে আপনার প্রতি আল্লাহ্ শান্তি, রহমত ও বরকতসমূহ বর্ষণ করুন। ইয়া রাসূলাল্লাহ্! পর সমাচার, আমি আপনার সম্প্রদায়ের ও আপনার ধর্মের অনুসারিণী এক মহিলাকে আপনার সহিত বিবাহ পড়াইয়া দিয়াছি। আর তিনি হইতেছেন মহীয়সী উম্মু হাবীবা বিন্ত আবী সুফয়ান। আপনার জন্য আমি উপঢৌকন পাঠাইতেছি— যাহাতে জামা, পায়জামা, চাদর ও চর্মের একজোড়া মোজা রহিয়াছে। আসসালামু আলায়কা ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকুতূহ" (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১২৯; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৪৮; রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, ৪র্থ সং (ই. ফা. সং), পৃ. ৩৭)।
নাজাশীর আরও একখানা পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়- যাহাতে তিনি তাঁহার পুত্র উরায়হাসহ ইথিওপিয়া প্রবাসী মুহাজিরগণ এবং ষাটজন ইথিওপিীয় মুসলমানকে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করাইয়া দেওয়ার বিবরণ রহিয়াছে। পত্রখানার পাঠ এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم الى محمد ﷺ من النجاشي اصحمة سلام عليك يا رسول الله من الله ورحمة الله وبركاته لا اله الا الذي هداني للاسلام اما بعد فقد ارسلت اليك يارسول الله من كان عندى من اصحابك المهاجرين من مكة الى بلادى وها انا ارسلت اليك ابني اريحا في ستين رجلا من اهل الحبشة وان شئت أن اتيتك بنفسي فعلت یا رسول الله فانی اشهد أن ما تقول حق والسلام عليك يا رسول الله ورحمة الله وبركاته. "পরম দয়ালু ও পরম দয়াময় আল্লাহ্র নামে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রতি নাজাশী আসহামার পক্ষ হইতে। আল্লাহ্ পক্ষ হইতে শান্তি, রহমত ও বরকতরাশি বর্ষিত হউক ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ঐ সত্তা ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই যিনি আমাকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করিয়াছেন। অতঃপর সমাচার-ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার নিকট আপনার মক্কার যে মুহাজির সাহাবীগণ অবস্থান করিতেছিলেন আমি তাহাদেরকে আপনার নিকট রওয়ানা করাইয়া দিলাম। আর এখন আমার পুত্র উরায়হাকে ষাটজন ইথিওপিীয় সঙ্গী সমভিব্যাহারে আপনার দরবারে পাঠাইয়া দিলাম। আর আপনি যদি চাহেন তাহা হইলে আমি নিজেও আপনার দরবারে আসিয়া হাযিরা দিব। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি যাহা বলেন উহা সত্য। ওয়াসসালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ ওয়া রাহমাতুল্লাহ ও বারাকাতুহু' (মাজমূআতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৭৯; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১২৯, পাদটীকায় আত-তারীখুল মানকূশ ও সাওয়াতিউল আনওয়ার-এর বরাতে)।
নাজাশীর এই সর্বশেষে উল্লিখিত পত্রখানা সম্পর্কে দুই রকম রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে যে, আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী হযরত জা'ফার (রা), উম্মুল মুমিনীন উম্মু হাবীবা এবং হাবশায় হিজরতকারী মুহাজিরগণের কাফেলার সাথেই নাজাশী তদীয় পুত্র উরায়হাকে ষাটজন আবিসিনীয় সমভিব্যাহারে রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে প্রেরণ করেন। এই সময় উরায়হা আবিসিনিয় সাথিগণসহ ভিন্ন জাহাজে আরোহিত ছিলেন। অপর দুইখানা জাহাজে মুহাজিরগণ আরোহণ করেন। সমুদ্রে ঝড় উঠিলে মুহাজিরগণের জাহাজ দুইটি রক্ষা পায় আর নাজাশী-তনয় উরায়হা তদীয় সঙ্গী-সাথিগণসহ সমুদ্র বক্ষে নিমজ্জিত হন। তাঁহাদের মধ্যকার কাহারও জীবন রক্ষা পায় নাই।
অপর রিওয়ায়াত অনুসারে উরায়হা আবিসিনীয় সঙ্গিগণসহ নিরাপদেই মদীনায় আগমন করেন। তাহাদের সকলেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পবিত্র হস্তে বায়'আত হওয়ার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাহারা নাজাশীর পত্রখানা যথারীতি রাসূলুল্লাহ্-এর কাছে হস্তান্তর করেন। নাজাশীর ইনতিকালের পর ইথিওপিয়ার একটি প্রতিনিধি দল উরায়হাকে স্বদেশে লইয়া যাওয়ার জন্য মদীনায় আসে। কিন্তু উরায়হা প্রিয় নবীর সান্নিধ্য ত্যাগ করিয়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে সম্মত হন নাই। তিনি মদীনায় থাকিয়া যান। মদীনায় অবস্থানকারী ইথিওপিীয়গণ কোন কোন যুদ্ধে অপর মুসলমান সৈন্যগণের সহিত কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া যুদ্ধও করিয়াছেন।
প্রথম বর্ণনা সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে, উরায়হা এবং তদীয় সঙ্গী-সাথিগণ যদি জলমগ্ন হইয়া মৃত্যুবরণই করিয়া থাকেন, তাহা হইলে ঐ পত্রখানা আবার কী করিয়া রক্ষা পাইল? এই প্রশ্ন হইতে বাঁচিবার জন্য বলা হইয়া থাকে, ঐ পত্রখানা 'আমর ইবন উমায়্যার নিকট ছিল। ইহা কোন বোধগম্য কথা নহে যে, যে পত্রখানা পৌছাইবার জন্য স্বয়ং নাজাশী আপন পুত্র উরায়হাকে প্রেরণ করিলেন, সেই পত্রখানা আবার তিনি 'আমর ইবন উমায়্যার হাতে কেন অর্পণ করিলেন? ইহা কূটনৈতিক নীতিরও পরিপন্থী বলিয়া মনে হয়। তারপর উরায়হার হাতে অর্পিত পত্রের পাঠ লক্ষ করুন। নাজাশী লিখিতেছেন: আমি আপনার নির্দেশ পালন করিয়াছি এবং মুহাজিরগণকে রওয়ানা করিয়া দিয়াছি। আর এখন আমার পুত্র উরায়হাকে পাঠাইতেছি।
এই লিপি হইতে পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে যে, উরায়হাকে মুহাজিরগণের সহিত রওয়ানা করা হয় নাই, বরং পরবর্তীতে প্রেরণ করা হইয়াছে। আর তিনি পত্রসহ নিরাপদেই মদীনায় পৌছিয়াছেন। এইজন্য দ্বিতীয় বিবরণই যথার্থ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। 'আমর ইবন উমায়্যা (রা) যেই পত্রখনা বহন করিয়া লইয়া যান তাহাতেও উরায়হার উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু যতদূর মনে হয় তিনি ঐ সময়ই রওয়ানা হইতে পারেন নাই, বরং পরে রওয়ানা হইয়াছিলেন।
ড. হামীদুল্লাহ্ তদীয় 'মাজমু'আতু'ল-ওয়াছাইক' গ্রন্থে ইথিওপিীয় সম্রাটের নামে লিখিত আরও একখানি পত্র উদ্ধৃত করিয়াছেন। উহার পাঠ নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب محمد النبى الى النجاشي الاصحم عظيم الحبشة سلام على من اتبع الهدى وامن بالله ورسوله واشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له لم يتخذ صاحبة ولا ولدا وان محمدا عبده ورسوله. وادعوك بدعاية الله فانى انا رسوله فاسلم تسلم و يا اهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم الا الا الله ولا نشرك به شيئا ولم يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون فان ابيت فعليك اثم النصارى من قومك. "দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। এই পত্রখানা আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে ইথিওপিীয় সম্রাট নাজাশীর প্রতি। সালাম তাহার প্রতি যে সত্যপথের অনুসারী, আল্লাহ্ ও রাসূলে বিশ্বাসী এবং যে এই মর্মে সাক্ষ্য দেয় যে, এক একক লা-শারীক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই, যিনি কোন স্ত্রী বা পুত্র গ্রহণ করেন নাই এবং মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। আমি আপনাকে ইসলামের দা'ওয়াত দিতেছি। কেননা আমি তাঁহারই বার্তাবাহক রাসূল। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, তাহা হইলে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। "হে কিতাবী সম্প্রদায়! আইস, এমন একটি ব্যাপারে আমরা ঐক্যবদ্ধ হইয়া যাই, যে ব্যাপারটিতে আমরা ও তোমরা সমান। তাহা হইল, আল্লাহ্ ছাড়া আমরা আর কাহারও ইবাদত করিব না, তাঁহার সহিত অন্য কাহাকেও শরীক সাব্যস্ত করিব না এবং আমরা আল্লাহকে বাদ দিয়া একে অপরকে প্রভুরূপে গ্রহণ করিব না। যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয়, তবে তুমি বলিয়া দাও, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম, আল্লাহতে আত্মসমর্পণকারী” (৩ : ৬৪)। আপনি যদি (সত্য গ্রহণে) পরান্মুখ হন, তাহা হইলে খৃস্টান জাতির পাপের বোঝা আপনার উপরই বর্তাইবে।"
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
📄 রোমক সম্রাটের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূত দিহয়া কালবী (রা)
(মাজমু'আতু'ল-ওয়াছাইক, পৃ. ৭৯; যুরকানী, আল-মাওয়াহিবু'ল-লাদুন্নিয়া, ৩খ., পৃ. ৩৪৩-৩৪)।
ইতিহাস গ্রন্থসমূহ ঘাটিলে অনুমিত হয়, এই পত্রখানাও যেন আসহামা নাজাশীর নামে লিখিত হইয়াছিল। পত্রশীর্ষে আসহামা নামটিও উৎকীর্ণ ছিল। কিন্তু পত্রের পাঠে এই বিবরণ লিপিবদ্ধ নাই যে, কখন কাহার মাধ্যমে তাহা প্রেরিত হইয়াছিল। কেননা, আসহামার নামে লিখিত প্রথম পত্রখানা হইতেছে যাহা নবৃওয়াতের পঞ্চম বর্ষে জা'ফার তায়্যার (রা) আবিসিনিয়ায় হিজরতকালে সঙ্গে লইয়া গিয়াছিলেন অথবা উহার স্বল্পকাল পরে তাঁহাদের ব্যাপারে লিখিত হইয়াছিল। দ্বিতীয় পত্রখানি হইতেছে যাহা 'আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা) হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সপ্তম হিজরীতে বহন করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন। তৃতীয় পত্রখানাও উক্ত আমর (রা)-এর মাধ্যমেই প্রেরিত হইয়াছিল- যাহাতে উম্মে হাবীবা (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ-এর পরিণয় এবং মুহাজিরগণের ইথিওপিয়া হইতে রওয়ানা হওয়ার উল্লেখ রহিয়াছে। মুহাজিরগণের প্রত্যাবর্তনকাল পর্যন্ত এই পূর্ণ মেয়াদের মধ্যে এই শেষোক্ত পত্রের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। হাদীছে অবশ্য উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ এক বা একাধিক নাজাশীর উদ্দেশ্যে পত্র প্রেরণ করিয়াছেন। হযরত আনাস (রা)-এর বরাতে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীছে আছে:
عن انس ان النبي ﷺ كتب الى كسرى والى قيصر والى النجاشي والى كل جبار يدعوهم الى الله عز وجل وليس بالنجاشي الذي صلى عليه النبي ﷺ -
"রাসূলুল্লাহ (স) কিসরা, কায়সার, নাজাশী এবং প্রতাপশালী রাজন্যবর্গের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইয়া পত্র প্রেরণ করেন, তবে ঐ নাজাশী নহে, রাসূলুল্লাহ যাঁহার জানাযার নামায পড়িয়াছিলেন" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৯)।
কিন্তু ঐ নাজাশীর নাম, পত্র প্রেরণের তারিখ বা পত্রবাহক কে ছিলেন তাহার কোন হদিস পাওয়া যায় না। পত্রখানার মর্ম হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যদি উহা নাজাশী আসহামের নামেই লিখিত হইয়া থাকে, তবে তাহা নিশ্চয়ই সপ্তম হিজরীতে হইয়া থাকিবে, যখন রাসূলুল্লাহ বিশ্বের অন্যান্য রাজা-বাদশাহর নামে পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। কিন্তু ঐ পত্রখানা যে প্রথমোক্ত পত্র ছিল এই ব্যাপারে সীরাতবেত্তা ও ঐতিহাসিকগণের কোন দ্বিমত নাই। সুতরাং আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হইতে হয় যে, এই শেষোক্ত পত্রখানা দ্বিতীয় নাজাশীর উদ্দেশ্যে লিখিত হইয়াছিল-যিনি আসহামা নাজাশীর ইন্তিকালের পর তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন। বাক্যটিও- যাহা সাধারণত বিধর্মীদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতেন- এই সত্যকে জোরদার করে। প্রমাণবশত ইহাতে নাজাশী আসহামের নাম লিখিত হইয়াছে (যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৪৬; সীরাতুল মুস্তাফা, কান্ধলভী, ২খ., পৃ. ৩৯৭-৯৮)।
হিজরী ৫ম/৬২৩ খৃ. সালে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস নিনেভার যুদ্ধে ইরানীদেরকে পরাস্ত করিয়া টাইগ্রীস নদীর অপর পাড়ে ঠেলিয়া দেন। শেষ পর্যন্ত খসরু পারভেযকে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে রাজস্ব প্রদানে সম্মত হইতে হয় এবং পবিত্র ক্রুশও তাঁহাকে ফেরত দিতে হয়। এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয় উপলক্ষে খৃস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাসে একটি উৎসবের আয়োজন করে। বিধ্বস্ত
কিয়ামাতা দুর্গ পুনর্নির্মিত হয়। স্বয়ং সম্রাট হিরাক্লিয়াস পবিত্র ক্রুশ সেখানে পৌছাইয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে এন্টিয়ক হইতে অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে বাহির হইলেন। পবিত্র ক্রুশের এই মিছিল এবং বিজয় উৎসবে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে উত্তর আফ্রিকা, মিসর, ইরাক ও আরবের রোমক শাসিত এলাকাসমূহ এবং রোমান সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যসমূহের রাষ্ট্রদূতগণ রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে অভিনন্দন জানাইবার উদ্দেশ্যে সেখানে আসিয়া পৌঁছেন। তাহাদের কাফেলাসমূহ এই মিছিলে অংশগ্রহণ করিয়া তাহার জৌলুস বর্ধিত করে।
রাসূলুল্লাহ-এর দূত দিহ্ইয়া আল-কালবীর স্বয়ং সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হইয়া পত্র হস্তান্তর যেহেতু রীতিমত এক অসম্ভব ব্যাপার ছিল তাই তিনি এই উদ্দেশ্যে গাস্সানীদের প্রাচীন রাজধানী বুসরার শাসক হারিছের সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁহার দৌত্যকার্যের কথা তাঁহাকে অবহিত করেন।
লক্ষ ভক্ত অনুরক্ত পরিবেষ্টিত অবস্থায় কায়সার যখন পবিত্র ক্রুশসহ হিমসে উপনীত হইলেন, তখন দিহ্ইয়া আল-কালবী (রা) বুসরার শাসনকর্তার মাধ্যমে কায়সারের দরবারে উপনীত হইলেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা তাঁহার নিকট পেশ করিলেন। সেই পত্রখানার পাঠ ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد عبد الله ورسوله الى هرقل عظيم الروم سلام على من اتبع الهدى اما بعد فاني ادعوك بدعاية الاسلام اسلم تسلم يؤتك الله اجرك مرتين فان توليت فعليك اثم الاريسيين و يا اهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ان لا نعبد الا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون "পরম দয়ালু ও পরম দয়াময় আল্লাহ্র নামে। আবদুল্লাহ্র পুত্র ও আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে রোমের প্রধান হিরাক্লিয়াসের প্রতি। সালাম (শান্তি) বর্ষিত হউক যে হিদায়াতের অনুসারী। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেছি। ইসলাম গ্রহণ করিয়া লউন, নিরাপত্তা লাভ করিবেন এবং আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দান করিবেন। আর আপনি যদি পরাঙ্মুখ হন তাহা হইলে (প্রজা) কৃষককুলের পাপের বোঝা আপনার উপর বর্তাইবে। হে কিতাবী সম্প্রদায়! আইস সে কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ্ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করে।' যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, "তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম (আল্লাহতে আত্ম সর্ম্পণকারী") (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪-৫; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৭-৯৮ কিতাবুল জিহাদ ওয়াস্-সিয়ার; জামহারাতু রাসাইলিল আরব, ১খ., পৃ. ৩৮-৩৯; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮১; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬০; ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৩৫; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৩; আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ২৭৫; আল-আগানী, ৬খ., পৃ. ৯৩; কিতাবুল আমওয়াল, পৃ.
📄 কায়সারের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ
২৭; তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯১; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া (কাসতাল্লানী), ৩খ., পৃ. ৩৮৪; তাহাবী, মুশকিলুল আছার, ২খ., পৃ. ৩৯৭; দুরুল মাসদুর, ২খ., পৃ. ৪০; দালাইলুন নবুওয়া, পৃ. ২৯০; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৭৪; ইয়া'কুবী, ২খ., পৃ. ৬২; কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ২৭৫; মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২৬৩; মাজমুআতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৮১; মাকাতিবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১০৫)।
কায়সার পত্রখানা পাঠ করিয়া চুপ হইয়া গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি মুখ খুলিলেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের দরবারে পত্রখানা পেশ করিতে বলিয়া দিলেন। চতুর্দিক হইতে যখন কায়সারের দরবারে অসংখ্য অভিনন্দন আসিয়া পৌঁছিতেছিল এমন সময় এই পত্রখানা যেন কেমন একটা ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। ইহার সম্বোধনের ধরন-ধারণ মোটেও সম্রাটের উপযোগী বা তাঁহার মানমর্যাদার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। হিরাক্লিয়াসের তো পত্রের বক্তব্যে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠার কথা, কিন্তু তিনি তাহা না করিয়া সহিষ্ণুতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিলেন। ইহা রীতিমত একটা অর্থবহ ব্যাপার ছিল।
আসল ব্যাপার ছিল এই যে, প্রায় এক দশক পূর্বে যখন ইরানীরা হিরাক্লিয়াসকে পরাজিত করিয়া রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌঁছাইয়া গিয়াছিল তখন ইয়াহুদীরা ও আরব গোত্রসমূহ রোমকদের বিরুদ্ধে ইরানীদেরকে সমর্থন করিয়াছিল। ইরানীরা যেহেতু পৌত্তলিক ছিল, তাই আরবের পৌত্তলিক গোত্রসমূহের সহানুভূতি সাধারণত রোমকদের বিরুদ্ধে তাহাদেরই পক্ষে থাকিত। রোমকদের জন্য এই ব্যাপারটা কম তাৎপর্যবহ ছিল না যে, এহেন পৌত্তলিক আরব কবীলাগুলির মধ্যেই এমন একটি শক্তির উদ্ভব হইতেছে যাহারা পৌত্তলিক ইরানীদের বিরুদ্ধে কিতাবীদের সমর্থক এবং তাহাদের নবী ঈসা (আ)-কে তাহারা আল্লাহ্ নবী বলিয়াও স্বীকার করে। তাই পৌত্তলিক ইরানীদের বিরুদ্ধে এই নূতন ধর্মাবলম্বিগণকে উৎসাহিত করাই ছিল বিজ্ঞজনোচিত পদক্ষেপ। আর এইজন্যই রাসূলুল্লাহ -এর পত্রের বক্তব্যে হিরাক্লিয়াসের মনে যাহা একটু তিক্ততার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা তিনি হজম করিয়া ফেলেন এবং আদেশ দেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছিয়া আরবের এই নবী এবং তাঁহার নবুওয়াতের দাবি সম্পর্কে অনুসন্ধান করিয়া জানিতে হইবে।
রোমক সম্রাটের দরবারে মহানবী -এর দূত দিহয়া কালবী (রা) মহানবী -এর দূত দিহয়া আল-কালবী (রা) প্রথমে বুসরার প্রশাসক গাস্সান-রাজ হারিছ ইব্ন আবী শুমারা আল-গাসসানীর নিকট রাসূলুল্লাহ -এর পত্রসহ উপস্থিত হন এবং উহা কায়সারের নিকট হস্তান্তরের আবেদন জানান। গাসসানরাজ 'আদী ইবন হাতিম তাঈ (রা)-কে তাহার সঙ্গে দিয়া সম্রাটের দরবারে তাঁহাকে প্রেরণ করেন (রাসাইলুন নাবী, পৃ. ২৬; জামহারাতু রাসাইলিল আরাب, ১খ., পৃ. ৩৭)।
তিনি যখন সম্রাটের দরবারে পৌছিলেন তখন পারিষদবর্গ তাঁহাকে বলিল, বাদশাহ জাহাপনাকে দেখামাত্র তাঁহাকে সিজদা করিবে। তারপর তিনি অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত মস্তক উত্তোলন করিবেন না। সাথে সাথে দিহয়া (রা) বলিলেন, ইহা আমি কস্মিনকালেও করিতে পারিব না। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাহাকেও আমি সিজদা করিব না। তাহারা বলিল, তাহা হইলে তো তোমার
পত্র তিনি গ্রহণই করিবেন না। তাহাদের মধ্যকার জনৈক বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলিল, আমি তোমাকে এমন এক বুদ্ধি শিখাইয়া দিতেছি যাহাতে তিনি তোমার পত্রখানা গ্রহণ করিবেন, অথচ তাঁহাকে তোমার সিজদা করার প্রয়োজনও হইবে না। দিহয়া (রা) বলিলেন, কী সেই বুদ্ধি?
সেই ব্যক্তি বলিল, তিনি যখন মিম্বরের উপর উপবিষ্ট থাকিবেন তখন তুমি তাঁহার মিম্বরের উপর পত্রখানা রাখিয়া দিবে। সেখানে অন্য কেহ হাত দিতে সাহস পাইবে না। কায়সার তাহা নিজ হাতে তুলিয়া লইবেন এবং তাঁহার কোন পারিষদকে ডাকিবেন। দূত দিহয়া কালবী (রা) তাহাই করিলেন। কায়সার নিজ হাতে পত্রখানা উঠাইয়া লইয়া পত্রের শিরোনামে 'বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম' দেখিতে পাইয়া বলিলেন, সুলায়মান আলায়হিস সালামের পর আর কাহাকেও এরূপ পত্র লিখিতে দেখি নাই। তারপর দোভাষী ডাকিয়া তিনি পত্রখানা পাঠ করাইয়া শুনিলেন এবং বলিলেন, তাঁহার সম্প্রদায়ের এমন এক ব্যক্তিকে ডাকিয়া আন যাহাকে আমি পত্রলেখক সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করিব [আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ, ২৭৫; সীরাতু যায়নী দালান (হালাবিয়্যার পাদটীকায়), ৩খ., পৃ. ৫৮; কানযুল উম্মাল, ৫খ., পৃ. ২৪৬; মাকাতিবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১০৮-১০৯]।
কায়সারের পত্র পাঠের পূর্বেই মহানবী -এর দূত দিহয়া আল-কালবী (রা) তাঁহার উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাহাতে তিনি বলেন:
“হে রোম সম্রাট! আমাকে যিনি আপনার দরবারে দূতরূপে প্রেরণ করিয়াছেন তিনি আপনার চেয়ে অনেক গুণ উত্তম এবং তাঁহাকে যিনি নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছেন সেই পবিত্র সত্তা হইতেছেন সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমি যাহা নিবেদন করিব তাহা বিনীতভাবে শ্রবণপূর্বক আন্তরিকতার সহিত আপনি তাহার উত্তর প্রদান করিবেন। বিনীত বিনম্র অন্তরে শ্রবণ ব্যতিরেকে আপনি উহার মর্ম উপলব্ধি করিতে পারিবেন না। আর উত্তর প্রদানে আন্তরিক ও সনিষ্ঠ না হইলে সেই উত্তর কোনক্রমেই ন্যায্য ও যথার্থ হইবে না।"
কায়সার বলিলেন, আপনি বলুন! দিহয়া কালবী (রা) তখন বলিলেন, আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন যে, মসীহ ইব্ন মারয়াম (আ) প্রার্থনা করিতেন। জবাবে কায়সার বলিলেন, হাঁ, তিনি অবশ্যই প্রার্থনা করিতেন।
দিহয়া কালবী (রা) বলিয়াই চলিলেন, আমি আপনাকে সেই পবিত্র সত্তার দিকে আহ্বান জানাইতেছি যাঁহার উদ্দেশ্যে মসীহ (আ) প্রার্থনা করিতেন, যাঁহার সম্মুখে তিনি সিজদায় লুটাইয়া পড়িতেন, যিনি তাঁহাকে পিতা বিহনে মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি আসমান-যমীন সবকিছু সৃষ্টি করিয়াছেন। তারপর আমি সেই উম্মী নবীর দিকে আপনাকে আহবান জানাইতেছি— যাঁহার সুসমাচার হযরত মূসা ও হযরত 'ঈসা (আ) প্রদান করিয়াছেন। আপনি তো তাহা সম্যক অবগত রহিয়াছেন। আপনি যদি এই দাওয়াতে সাড়া দান করেন তাহা হইলে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় মঙ্গলই আপনার জন্য সুনিশ্চিত। আর যদি দুর্ভাগ্যক্রমে উহাতে আপনি ব্যর্থ হন, তাহা হইলে পারলৌকিক মঙ্গল আপনার হাতছাড়া হইয়া যাইবে, যদিও ইহলৌকিক মঙ্গলে অন্যরাও আপনার সহিত শামিল থাকিবে। আপনি নিশ্চিতরূপে জানিয়া রাখুন, আপনার একজন প্রতিপালক
📄 বিশপ-পাদ্রীর ইসলাম গ্রহণ ও শাহাদত বরণ
রহিয়াছেন- যিনি তাঁহার অগ্রাহ্যকারীদেরকে ধ্বংস করিয়াছেন এবং তাঁহার নিয়ামতসমূহ পালাক্রমে হাতবদল করিয়া দেন।"
কায়সার রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা দিয়া (রা)-এর হাত হইতে গ্রহণ করিয়া নিজ মস্তকে ধারণ করিলেন এবং নিজের চক্ষে ও মুখমণ্ডলে লাগাইলেন। তারপর তাহা খুলিয়া পাঠ করিলেন। দিয়া কালবী (রা) বলেন, তারপর তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, চিন্তা-ভাবনা করিয়া আগামী কাল আমি উহার জবাব দিব (রাওদুল উনুফ, ১৯৭৮ সং., ৪খ., পৃ. ২৪৯; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৭০-৭১)।
রাসূলুল্লাহ -এর ঐ পত্রখানা সত্যসত্যই হিরাক্লিয়াসকে অত্যন্ত চিন্তিত করিয়া তোলে। কেননা তিনি নিজে তাহার স্বধর্মে বিশেষজ্ঞ এবং আখেরী যামানায় একজন নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে 'ঈসা (আ) প্রদত্ত সুসমাচার সম্পর্কে ওয়াকেফহাল ছিলেন। তাই পত্রখানা তাহাকে অধিক কৌতূহলী করিয়া তোলে। ব্যাপারটি অনুসন্ধান করিয়া দেখিবার জন্য তিনি পত্রপ্রেরক নবীর স্বদেশীয় ও স্ব-সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট হইতে প্রকৃত তথ্য জানিতে আগ্রহী হইয়া উঠেন।
ঘটনাচক্রে কুরায়শ নেতা আবু সুফয়ান একটি বাণিজ্য কাফেলাসহ তখন বায়তুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত ছিলেন। শাহী কর্মকর্তাগণ তাহাকে এই কথা বলিয়া সম্রাটের দরবারে উপস্থিত করে যে, শাহানশাহের কিছু প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হইবে।
কায়সার নিজে পত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং পত্রবাহককে সমীহ করিলেও তাহার পার্শ্বে উপবিষ্ট তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র, মতান্তরে ভ্রাতা প্রচণ্ড বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। দিয়া কালবীর বর্ণনানুসারে ঐ ব্যক্তিটির দেহ ছিল গৌরবর্ণ, চক্ষু নীলবর্ণ এবং মস্তক মুণ্ডিত। পত্রের শিরোনাম "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে রোমক প্রধান হিরাকলের প্রতি" শ্রবণ করিয়াই সে গর্জিয়া উঠিল, "এই পত্র আর কোনক্রমেই এই দরবারে পাঠ করা চলে না।" কায়সার বলিলেন, কেন কী হইয়াছে? সে বলিল, পত্রপ্রেরক প্রথমে তাঁহার নিজের নাম লিখিয়াছে। দ্বিতীয়ত, রোমক সম্রাট না লিখিয়া সে রোমের 'প্রধান হিরাকল' লিখিয়া সম্বোধন করিয়াছে। এমন তুচ্ছ পত্র কী করিয়া সম্রাটের দরবারে পঠিত হইতে পারে? জবাবে হিরাক্লিয়াস যাহা বলিলেন স্বয়ং দিয়া কালবীর ভাষ্য অনুসারে তাহা ছিল এইরূপ:
والله انك لضعيف الراى اترى ارمى بكتاب رجل يأتيه الناموس الأكبر وهو احق ان يبدئ بنفسه ولقد صدق انا صاحب الروم والله مالكي ومالكه "আল্লাহ্র কসম! তুমি নিশ্চিতভাবেই অপরিপক্ক মত পোষণকারী। তুমি কি লক্ষ করিয়াছ, এমন এক মহান ব্যক্তির পত্র আমার প্রতি নিক্ষিপ্ত হইয়াছে, যাঁহার নিকট নামূসে আকবার (পবিত্রাত্মা জিবরাঈল) আগমন করিয়া থাকেন। তিনি নিশ্চয়ই তাঁহার নাম পূর্বে লিখার অধিকতর হকদার। আর তিনি যথার্থই লিখিয়াছেন, আমি রোমের প্রধান, সম্রাট নই, আল্লাহই আমার এবং রোমের প্রকৃত রাজাধিরাজ।"
দিয়া কালবী (রা) বলেন, ইহার পর হিরাক্লিয়াসের নির্দেশে পত্রখানা রাজদরবারে পঠিত হইল। দরবার ভঙ্গের পর লোকজন যখন স্ব স্বগৃহে চলিয়া গেল তখন সম্রাট আমাকে এবং
দরবারের বিশিষ্ট পাদ্রীকে তাহার অন্দর মহলে ডাকিয়া পাঠাইলেন। সম্রাট আদ্যোপান্ত বিবরণ পাদ্রীকে শুনাইয়া রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা তাহাকেও পড়িয়া শুনাইলেন। সবকিছু অবগত হইয়া পাদ্রী বলিলেন, ইনিই তো সেই বহু প্রতীক্ষিত নবী যাঁহার অপেক্ষায় আমরা কালাতিপাত করিতেছি এবং যাঁহার সুসমাচার ঈসা (আ) আমাদেরকে শুনাইয়া গিয়াছেন। সম্রাট পাদ্রীকে লক্ষ করিয়া বলিলেন, এবার আমার ব্যাপারে আপনার কী পরামর্শ, বলুন।
জবাবে পাদ্রী বলিলেন, আর যে যাহাই বলুক না কেন, আমি তো তাঁহার সত্যতার অনুমোদনই করিব এবং তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়া লইব। কায়সার বলিলেন, আমি যদি তাহা করি তাহা হইলে আমাকে রাজত্বের মোহ ত্যাগ করিতে হইবে। তারপর তিনি দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
انى لاعلم ان صاحبك نبي مرسل والذي كنا ننتظره وتجده في كتابنا ولكني اخاف الروم على نفسى ولولا ذلك لا تبعته. "আমি নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত আছি, আপনার মনিব আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল যাঁহার জন্য আমরা প্রতীক্ষা করিয়া আসিতেছি এবং যাঁহার কথা আমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থে পাইয়াছি। কিন্তু আমি আশঙ্কা করি রোমকগণ আমাকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তাহা না হইলে আমি অবশ্যই তাঁহার আনুগত্য করিতাম” (উসদুল-গাবা, ৩খ., পৃ. ৪১; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ.২১৬; তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯২-৯৩; আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮)।
ইহার পর তিনি দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ওহে! তুমি বিশপ দুগাতিরের কাছে গিয়া তোমাদের মনীবের কথা বল। কেননা রোমবাসীদের দৃষ্টিতে তিনি আমার চেয়েও অধিকতর বরেণ্য। তাহাকে তুমি আমার কথা বলিবে। দেখ, এই ব্যাপারে তিনি কি বলেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১১২)।
বার্তাবাহক দিয়া কালবী (রা) আরো বলেন, যে বিশপ পাদ্রীকে কায়সার রোমবাসীদের নিকট তাহার নিজের চেয়ে অধিকতর বরেণ্য বলিয়া তাহার মতামত জানিবার জন্য আমাকে প্রেরণ করিলেন, প্রতি রবিবার তাহার নিকট বিপুল জনসমাবেশ ঘটিত। তিনি তাহাদেরকে ধর্মোপদেশ দান করিতেন। কিন্তু আমার তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া রাসূলুল্লাহ-এর পত্রের ব্যাপারে অবগত করার পরবর্তী রবিবার তিনি আর তাহার হুজরা হইতে বাহির হইলেন না। আমি তাহার নিকট যাতায়াত করিতাম এবং আমার সহিত তাহার কথাবার্তা হইত। ইহার পর দ্বিতীয় রবিবারও তাহার নিকট প্রচুর জনসমাগম হইল। লোকজন দীর্ঘক্ষণ তাহার প্রতীক্ষা করিল, কিন্তু তিনি কোনক্রমেই হুজরা হইতে বাহির হইলেন না। অসুস্থতার ভান করিয়া তিনি হুজরায় অবস্থান করিলেন। ক্রমে কয়েক রবিবার এইরূপ করার পর লোকজন তাহার প্রতি সন্দিহান হইয়া উঠিল। তাহারা তাহাকে বলিয়া পাঠাইল, তুমি আমাদের নিকট উপস্থিত হও আর নাই হও আমরা তোমার হুজরায় ঢুকিয়া তোমাকে বধ করিব। আমরা তো সেই আরবটির আগমনের দিন হইতেই তোমার মধ্যে কেমন একটি অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়া আসিতেছি।