📄 হাবীব ইব্ন যায়দ আল-খাযরাজী
চিঠিপত্র বা রাজকীয় ফরমানাদিতে সীল-মোহরের ব্যবহার আরবদেশে প্রচলিত ছিল না। ঐতিহাসিক বালাযুরী আফফান ইন্ন মুসলিম, শু'বা ও কাতাদা সূত্রে বর্ণনা করেন, আনাস ইবন মালিক (রা)-কে তিনি বলিতে শুনিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন রোমক সম্রাটের নিকট পত্র লিখিতে মনস্থ করিলেন তখন তাঁহাকে বলা হইল, সীলমোহরবিহীন পত্রাদি তাহারা পড়ে না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (স) একটি রৌপ্যের আংটি প্রস্তুত করাইলেন। তাহাতে অঙ্কিত ছিল محمد رسول الله। তাঁহার সেই আংটির শূদ্রতা যেন এখন আমার চক্ষের সম্মুখে ভাসিতেছে।
আনাস ইবন মালিক (রা)-এর আরেকটি বর্ণনা সূত্র হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্-এর আংটির রিং এবং নাগিনা সবটাই ছিল রৌপ্যের। যুত্রী ও কাতাদা সূত্রে বর্ণিত অপর এক হাদীছ হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্-এর আংটির নকশার অনুরূপ নকশাযুক্ত আংটি ব্যবহার অন্যদের জন্য তিনি নিষিদ্ধ করিয়াছেন। উক্ত বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, উহা কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারের আংটিই ছিল না, উহা ছিল তাঁহার রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের সীলমোহরও। পরবর্তীতে হযরত আবূ বকর, উমার ও উছমান (রা)-এর খিলাফত আমলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উহা রাষ্ট্রীয় সীলমোহররূপেই ব্যবহৃত হইয়াছে। তারপর একদিন যখন হযরত উছমান (রা) বি'রে আরীস নামক কূপের পাড়ে উপবিষ্ট ছিলেন তখন ঐ আংটিটি কূপে পড়িয়া যায়। তিন দিন পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুজি করিয়া, এমনকি উহার সম্পূর্ণ পানি সিঞ্চন করিয়া তন্নতন্ন করিয়া অনুসন্ধান চালাইয়াও তাহার কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। অগ্যতা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে তিনি অনুরূপ আরেকটি সীলমোহর প্রস্তুত করাইয়া কাজ চালাইয়া যাইতে থাকেন। আংটিটির খোদিত লিপি তিন লাইনে সাজানো ছিল যাহার সর্বনিম্নে মহাম্মদ, মধ্যে রাসূল এবং সর্বোচ্চে আল্লাহ শব্দ ছিল (ফুতূহুল বুলদান, বালাযুরী, পৃ. ৪৪৮; বৈরুত, ১৪০৩/১৯৮৩.; ড. হামীদুল্লাহ, মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৫০, ৫১ ও ৫৭)। লক্ষণীয়, ধারাবাহিকভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ অংকিত গোলাকার টোপ তৈরী করাইলে উহাতে যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামটি সর্বনিম্নে স্থান পাইত তাহা হইত একান্তই অশোভন- মহা প্রজ্ঞাবান মহানবী-এর সজাগ দৃষ্টি তাহা এড়াইয়া যাইতে পারে নাই।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রাবলীর সংরক্ষণ পদ্ধতি পর্যালোচনা
সুদীর্ঘ কাল পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ বিভিন্ন সম্রাট, গভর্নর, শাসক ও গোত্রপ্রধান বা সামন্ত রাজাদের নামে যে পত্রগুলি প্রেরণ করিয়াছিলেন ড. হামীদুল্লাহ সেগুলির সংখ্যা সোয়া দুই শত পর্যন্ত উল্লেখ করিয়াছিলেন (ড. হামীদুল্লাহর ফরাসী ভাষায় লিখিত” দুকিউমা সিভর লা ডিপ্লোমেসী
মুসলমান, ২খ., পৃ. ৯-১৭; প্যারিস ১৯৩৫, আহমাদ ফারীদূন, মুনশা'তু'স্-সালাতীন, ইস্তাম্বুল ১২৭৪ খৃ. পৃ. ৩০-৩৫)।
(১) স্পেনের খৃস্টান সম্রাটগণের নিকট সংরক্ষিত পত্রখানির চাক্ষুষ বিবরণী ৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত লেখকগণের পুস্তকাদিতে (ড. হামীদুল্লাহ্, দুকিউমা, ১খ., পৃ. ৪৫; কাত্তানী, কিতাবু'ত-তারাতীবিল ইদারিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৫৬-১৬৫, রাবাত মুদ্রণ ১০৪৬ হি.)।
(২) তামীম আদ-দারী (রা)-কে জায়গীর প্রদান সংক্রান্ত পত্রখানির কথা বর্ণনা করিয়াছেন ইমাম আবূ ইউসুফ তদীয় কিতাবুল খারাজে (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১৩২ ও ইব্ন ফাদলিল্লাহ্ আল-উমারী, কিতাবু মাসালিকিল আবসার, ১খ., পৃ. ১৭৪; ড. হামীদুল্লাহ, বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন, পৃ. ১৬৮-১৬৯, ১ম সং, ই. ফা. ১৯৮৫ খৃ.)।
(৩) মিসর-রাজ ও খৃস্টান পাদ্রী মুকাওকিসকে লিখিত রাসূলুল্লাহ্ -এর আসল পত্রখানি ১৮৫০ খৃস্টাব্দে মিসরের উঁচু এলাকায় অবস্থিত আখমীম নামক স্থানের এক খৃস্টীয় মঠ বা convent-এ পাওয়া যায় (কায়রোতে অবস্থানরত জনৈক প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ) মসিরো বার্তেলেমী তাহা উদ্ধার করিয়াছিলেন। কায়রো হইতে মোসিরো বেলিন, ১০ মার্চ, ১৮৫২ সালে উহা সংক্রান্ত দীর্ঘ একটি পত্র ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ মোসিও রেণাঁর কাছে প্যারিসে পাঠান। তিনি উহা উক্ত পত্রিকায় ১৫/২০ পৃষ্ঠা জুড়িয়া প্রকাশ করেন। তাঁহার উক্ত পত্রের কিছু অংশ নিম্নে উদ্ধৃত হইল:
"হস্তলিখিত একটি পত্র আমি সম্প্রতি দেখিয়াছি। উপরিউক্ত প্রাচ্য বিষয়ক সমিতিও এই পত্রের কথা অবগত হইয়াছে, তাহাদের ১৯৫১ সালের ১১ ডিসেম্বরের অধিবেশনে। পত্রটি সনাক্ত করেন মোসিয়োঁ এটি এন বার্তেলামী।
"মোসিয়োঁ বার্তেলমী কায়রোতে অবস্থানরত প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ একজন ফরাসী যুবক। আরবী ভাষায় বিরাট পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন বিনয়ী প্রকৃতির লোক। বেশ কিছুকাল হইতেই তিনি মিসরের প্রাচীন ভাষা অধ্যয়নরত। বিশেষত কিবতী ভাষায় লিখিত ঐ সমস্ত লিপির অনুসন্ধানে লিপ্ত যেগুলি মিসরের নির্জনতাপ্রিয় পাদ্রীগণের হিফাজতে রহিয়াছে এবং যেগুলি দ্বারা প্রাচীন কালের মূল্যবান তথ্যাদির সন্ধান পাওয়া যায়। গত বৎসর এক সফরে মোসিয়ো বার্তেলমী বিরাট অংকের অর্থ ব্যয় করিয়া দারুণ অর্থ সংকটে পতিত হন। অথচ ঐ সফরে অতি অল্প তথ্যই তাঁহার হস্তগত হয়। একদিন প্রবল জঠর জ্বালায় অস্থির হইয়া যখন তিনি আখমীমের নিকটবর্তী জনৈক খৃস্টান দরবেশের আস্তানায় উপনীত হন, তখন সেখানে আরবী ভাষায় লিখিত একখানা পুস্তক তাঁহার হস্তগত হয়- যাহা বাহ্য দৃষ্টিতে একান্তই মামুলী ধরনের ছিল। পুস্তকটির মলাট দৃষ্টে মনে হইতেছিল, উহা যেন বড় আকারের কোন পুস্তকের জন্যই তৈরী করা হইয়াছিল। মলাটের কিনারাগুলি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল এবং ইহার ভিতরের দিকে কিছু কিবতী অক্ষর দৃশ্যমান ছিল। আমাদের এই পর্যটক প্রথম পাতাটি আলাদা করার চেষ্টা করেন যাহা ভিতরের বেশ কিছু পাতাকে লেপটাইয়া রাখিয়াছিল। অত্যন্ত সতর্কতার সহিত যখন উহার প্রথম পাতাটি আলাদা করা হইল তখন ভিতর হইতে মোট দশটি পাতা বাহির হইয়া আসিল। উহাতে কিবতী ভাষার প্রাচীন লিপিতে ইঞ্জীল লিপিবদ্ধ ছিল। এই পাতাগুলি যাহাতে একটি শক্তিশালী বাণীর সংরক্ষণকারী হয়, সেই উদ্দেশ্যে এইভাবে সন্নিবেশিত করা হইয়াছিল।
"এই পত্রের বর্ণনামতে মোসিয়ো বার্তেলমী মলাটের ভিতরের কিবতী ভাষার পাতাগুলিকে একটার পর একটা করিয়া যখন আলাদা করিতেছিলেন এমন সময় তিনি দুই বাহুতে শক্তভাবে জড়ানো একটি চামড়ার টুকরা দেখিতে পান যাহার দুইটি স্থান কীটদষ্ট অবস্থায় ছিল। ঐ চামড়ার উপরে কৃষ্ণী লিপিতে কয়েকটি আরবী অক্ষরের উপর তাঁহার দৃষ্টি পতিত হয়। অনেক চেষ্টা সাধনার পর তাহাতে তিনি 'মুহাম্মাদ' শব্দটি পাঠ করিতে সমর্থ হন। ফলে বিষয়টি তাঁহার নিকট বেশ আকর্ষণীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়। সুতরাং যতটা সম্ভব সতর্কতার সহিত তিনি পৃষ্ঠাগুলিকে আলাদা করার প্রয়াস পান। হাজার চেষ্টার পরও উহাকে ভিজাইয়া নরম করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ফলে প্রথম হইতেই যে শব্দগুলি মিটিয়া যাইতেছিল তাহা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। মোসিয়ো বেলিন তদীয় উক্ত পত্রে আরও লিখেন, অতঃপর বিভিন্ন লোকের সাহায্যে উহার পাঠোদ্ধার এবং আরবী ইতিহাস হইতে উহার বচন উদ্ধার করা হয়।
"১৯০৪ খৃস্টাব্দে প্রখ্যাত মিসরীয় খৃস্টান পণ্ডিত জুর্জি যায়দান তদীয় আরবী মাসিক আল-হেলাল-এ প্রকাশ করেন, ইস্তাম্বুল হইতে সংগৃহীত উক্ত পত্রের নকলের একটি ফটোকপি। ইহারই নকল সম্ভবত ভারতবর্ষে আসিয়াছিল এবং ১৯১৭ খৃস্টাব্দে ইসলামিক রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। তবে উহাও আসল কপি ছিল না; বরং নকলের ফটোকপি ছিল।
"অধ্যাপক মারগোলিয়থ আল-হেলাল ১৯০৪ সালের নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত তদীয় প্রবন্ধে (পৃ. ১০৪) উক্ত পত্র উদ্ধারের ঘটনাটিকে অস্বীকার করার প্রয়াস পাইলেও উক্ত পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায়ই (ডিসেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৬০) উহার সত্যতা স্বীকার করিতে হয়" (বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন, ড. হামীদুল্লাহ, পৃ. ১৬০-১৬৫)।
ড. পি. বেজার (Dr. P. Bedger) মসিয়ো বেলিন এবং নলডিকে-এর মত বিশেষজ্ঞগণের পরীক্ষায় উক্ত আবিষ্কৃত পত্রখানা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আসল পত্র বলিয়াই প্রমাণিত হইয়াছে। ড. হামীদুল্লাহ-এর "মাজমূ'আতু'ল-ওয়াসাইকিস সিয়াসিয়্যা (নং ২১, পৃ. ৪৫), কলিকাতার মাসিক আল-এসলাম-এর জৈষ্ঠ ১৩২২ বাংলা সংখ্যার ১১৯ পৃষ্ঠায় এবং আলী হুসায়ন আলী তদীয় গ্রন্থ মাকাতীবুর রাসূল-এ (পৃ. ৯৬) উক্ত পত্রখানি নির্ভরযোগ্য বরাতে প্রকাশিত হইয়াছে।
মসিয়োঁ বার্থেলেমী পত্রখানা ৩০০ পাউণ্ডের বিনিময়ে তুরস্কের সুলতান আবদুল মাজীদের (১৮৩৯-১৮৬১ খৃ.) নিকট হস্তান্তর করেন। সুলতান উহা স্বর্ণের ফ্রেমে বাঁধাইয়া শাহী প্রাসাদের তোপকাপিতে যত্নের সহিত রাখিয়া দেন। পরবর্তী কালে উক্ত শাহী প্রাসাদটি তোপকাপি নামে অভিহিত হয় এবং যাদুঘরের রূপ পরিগ্রহ করে। উক্ত যাদুঘরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কথাটিতে আজও এই পবিত্র পত্রখানা নবী কারীম -এর অন্যান্য পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের সহিত সযত্নে সংরক্ষিত রহিয়াছে (মাকতুবাতে নববী, পৃ. ১৭১; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৬)।
(৪) ইথিওপীয় সম্রাট নাজাশীর নামে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রখানির ফটোকপি খৃস্টান লেখক জুর্জি যায়দানের 'তারীখ' গ্রন্থে মিসরের আরবী সাময়িকপত্র 'আল-হেলাল'-এর নভেম্বর ১৯০৪ সংখ্যায়, ড. হামীদুল্লাহর মাজমূ'আতু'ল-ওয়াছাইকি'স্-সিয়াসিয়্যাতে এবং তাঁহার বরাতে মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩০-এ দেখা যাইতে পারে। খৃ. ১৯৪০ সালে জি. আর. এস, লন্ডন কর্তৃক তাহা প্রকাশিত হয়। সহীফায়ে মুহাম্মাদ ইব্ন মুনাব্বির ১৯৪০ সালে ইংরেজ।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রাবলীতে সম্বোধনের ধরন ও উহার প্রভাব
প্রাচ্যবিদ অধ্যাপক ডানলপ রয়েল এসিয়াটিক সোসাইটির ম্যাগাজিনে তথ্য প্রকাশ করেন যে, জনৈক সিরীয় ব্যবসায়ীর মালিকানায় রক্ষিত চর্মগাত্রে ইথিওপীয় সম্রাট নাজাশীর নিকট লিখিত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্রখানা পাওয়া গিয়াছে। পত্রের সিরীয় মালিক জানান যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি তাহা দামিকে আগত জনৈক ইথিওপীয় খৃস্টান ধর্মযাজকের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন (আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, পৃ. ২৪৭-এর পাদটীকা; অধ্যাপক আকরম দিয়ার Madinah Society at the Time of the Prophet (sm), vol. 2, p. 132. দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুর দিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা হইতে প্রকাশিত মুসলিম পত্রিকা। বুরহানুল ইসলাম-এ সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, সম্রাট হইলে সেলাসী একটি মুসলিম প্রতিনিধি দলকে নবী কারীম (স)-এর পত্রখানা বাহির করিয়া দেন (রাসূলে আকরাম কী সিয়াসী জিন্দেগী, পৃ. ২৬৯-১৮২)।
(৫) রোমক সম্রাট কায়সারের (Heraclious) নিকট প্রেরিত রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রখানিও সুদীর্ঘ ৭ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল বলিয়া ড. হামীদুল্লাহ 'রাসূলে আকরাম কী সিয়াসী যিন্দেগী'-তে উল্লেখ করিয়াছেন। এই পত্রখানা হিজরী সপ্তম শতকে বিদ্যমান ছিল বলিয়া আল্লামা সুহায়লী বর্ণনা করিয়াছেন। বুখারী শরীফের ভাষ্যকার আল্লামা কাস্তাল্লানী (মৃ. ৮৫১/১৪৪৭ খৃ.) লিখেন যে, মালিক মানসূর কালাউন সালেহী (৬৭৮-৬৮৯হি.) ৬৮২/১২৮৩ সনে স্পেন সম্রাট আলফনসোর নিকট দূত প্রেরণ করিলে তিনি দূত সায়ফুদ্দীন কুলায়জকে স্বর্ণের কৌটাতে রক্ষিত উক্ত পত্রখানা দেখাইয়া বলেন, ইহা হইতেছে ইসলামের নবীর সেই পত্র যাহা তিনি আমাদের পূর্বপুরুষ হিরাক্লিয়াসের নামে লিখিয়াছিলেন (কাস্তাল্লানী, ১খ., পৃ. ৬৭; মাকতুবাতে নববী, পৃ. ১৩৫-১৩৬, পাদটীকায়)।
(৬) বাহরায়নের গভর্ণর ব্রনযির ইব্ন সাওয়া-এর নামে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রখানার ফটোকপি জার্মানের প্রাচ্যবিদদের পত্রিকা ZDMG-এর ১৭তম খণ্ডে ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয় ড. বুশ-এর মাধ্যমে। আল-ওয়াছাইকু'স-সিয়াসিয়্যায় উহা দলীল নং ৫৭-রূপে মুদ্রিত হয়। তবে এই পত্রখানার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হওয়া যায় নাই (Madinahs Society, at the Time of the Prophet (sm), vo. -2, p. 132; মাকতাবাতে নববী, পৃ. ১৭১)।
(৭) ইরান সম্রাট কিসরাকে লিখিত রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রখানা লেবাননের সাবেক উষীর মি. হেনরী ফিরাউনের ব্যক্তিগত পাঠাগারে পাওয়া গিয়াছে। উহা দৈর্ঘে ১৫ ইঞ্চি ও প্রন্থে ৮" ইঞ্চি। উহা একটি কাল বর্ণের চামড়ার উপর লিখিত। নীচে রাসূলুল্লাহ্ -এর সীলমোহরযুক্ত, মধ্যভাগ ফাড়া (হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস, পৃ. ৭০, মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, এমদাদীয়া লাইব্রেরী, চক বাজার, ঢাকা, ১৯৬৯ খৃ., ১ম সং.)।
রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রগুলির শুরুতে তাঁহার নিজের নাম আগে এবং প্রাপকের নাম পরে থাকিত। সেই যুগে রাজন্যবর্গ ও আমীর-উমারার নিকট পত্র লিখিবার সময় প্রাপকের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাহার নাম আগে এবং প্রেরকের নাম পরে লিখিবার প্রচলন ছিল। তিনি প্রাপকের নাম তো পরে দিতেনই, তদুপরি প্রাপকের নামের সাথে তেমন আড়ম্বরপূর্ণ পদবীও ব্যবহার
করিতেন না, একান্তই সাদামাটাভাবে তাহাদের নাম লিখাইয়া দিতেন। তাঁহার এইরূপ সম্বোধনই ছিল যুক্তিসংগত। কেননা তিনি যে ধর্মের দিকে তাহাদেরকে আহবান জানাইতেছিলেন সেই ধর্মের আলো সম্পর্কে রাজন্যবর্গ ছিলেন বিভ্রান্ত ও পথহারা। তাই আল্লাহর রাসূলের তুলনায় তাহাদের তেমন মর্যাদা ছিল-না যে, তিনি একান্তই ভক্তঅনুরক্ত প্রজাদের মত তাহাদেরকে আড়ম্বরপূর্ণ পদবী ব্যবহার করিয়া সম্বোধন করিবেন।
তদীয় এই অভূতপূর্ব সম্বোধন পদ্ধতি রাজা-বাদশাহদের দরবারসমূহে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সাধারণ্যে যখন এই ধরনের সম্বোধনের কথা প্রচারিত হইতে লাগিল, তখন সাধারণ মানুষও বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া পড়ে। কেননা তাহারা কোনদিন কল্পনাও করিতে পারিত না যে, প্রবল প্রতাপান্বিত রোমক সম্রাট কায়সার এবং পারস্য সম্রাট খসরু পারভেষের মত কোন ব্যক্তিকে কেহ এমন নির্ভীক সম্বোধন করিতে পারে। তাহার একটি সুফল ফলিল এই যে, ঐ রাজ-দরবারসমূহের মোসাহেবগণ এবং ইরানী ও রোমক আধিপত্যের অধীনে বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের লোকজন ভাবিতে শুরু করে, যে ব্যক্তি যুগের শ্রেষ্ঠ শাসককে এরূপ সম্বোধন করিতে পারে তাঁহার পশ্চাতে অবশ্যই কোন বিরাট শক্তি সক্রিয়। রাসূলুল্লাহ্-এর এইরূপ সম্বোধনে ইহাই ছিল ইসলামের প্রথম মনস্তাত্বিক বিজয়। ইরান সম্রাট খসরু পারভেয তো পত্রাবলীতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ দেখিয়াই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠেন। এইরূপ সম্বোধন তাহার দৃষ্টিতে ছিল সম্পূর্ণ অপমানজনক ও একটা অসহনীয় স্পর্ধা। তাই তৎক্ষণা সে রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়।
রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস নিজে ব্যাপারটিকে তেমন কোন গুরুত্ব না দিলেও তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট তাঁহার সহোদর ভাই, মতান্তরে ভ্রাতুষ্পুত্র এই পত্রখানা পাঠেরই উপযোগী নহে বলিয়া তাহার অভিমত ব্যক্ত করে। অনেকে আবার নবীর সত্যতা ও তদীয় আহবানের তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে সক্ষমও হন এবং পত্র প্রাপ্তির পর যথারীতি সেই দাওয়াতে সাড়া দিয়া ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সৌভাগ্যেরও অধিকারী হন। এই পত্রসমূহের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মহানবী-এর একজন সীরাত লেখক নিম্নলিখিভাবে মত প্রকাশ করিয়াছেন:
"একমাত্র পারস্য ও দামিশক ছাড়া অপর সমস্ত দেশের রাজা-বাদশাহগণই নবী করীম -এর সম্মানে নানা উপঢৌকনসহ তাঁর দূতদেরকে বিদায় দেন। এ ভাবে এশিয়া, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপেও নবী-এর বাণী ছড়াইয়া পড়ে। তাঁহার দা'ওয়াতে বিভিন্ন দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর খ্যাতনামা বীর, সম্রাট ও বাদশাহগণ যাহা করিতে পারেন নাই, মহানবী সুদূর মদীনায় অলক্ষ্যে থাকিয়া তাঁহার বাণী ও শিক্ষা দ্বারা পৃথিবীর মানুষের মন জয় করিয়া নেন" (ফজলুর রহমান প্রণীত, শান্তির নবী, পৃ. ১৩৪-১৩৬, ১ম সং, ১৯৯৪ খৃ.)।
📄 আবিসিনিয়ার নাজাশী আস্হামার নামে লিখিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
আবিসিনিয়ার নাজাশী আস্হামার নামে লিখিত রাসূলুল্লাহ্-এর পত্র
আবিসিনিয়া পৃথিবীর একটি অন্যতম প্রাচীন রাষ্ট্র। আরবের দক্ষিণে এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত এই পূর্ব আফ্রিকার রাষ্ট্রটি প্রাচীন কাল হইতেই আবিসিনিয়া (Abyssinis আরবীতে হাবাশী) নামে অভিহিত হইয়া আসিলেও বর্তমানে উহা ইথিওপিয়া নামেই পরিচিত। দেশটির বর্তমান আয়তন বার লক্ষ একুশ হাজার নয় শত বর্গ কিলোমিটার এবং বর্তমান
জনসংখ্যা প্রায় পাঁচকোটি (The Oxford School Atlas, 28th Ed. 1993)। আবিসিনীয় ভাষায় সম্রাটকে নেগাস (Negus) বলা হইয়া থাকে। নাজাশী উহারই আরবী রূপ।
৬ষ্ঠ হিজরীর যিলহজ্জ মাসে আমর ইবন উমায়্যা আদ-দাস্ত্রী (রা) রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রসহ মদীনা হইতে রওয়ানা হইয়া আবিসিনিয়ার রাজ-দরবারে গিয়া উপস্থিত হন। পত্রখানা বাদশাহর নিকট হস্তান্তরকালে তিনি একটি মর্মস্পর্শী ভাষণ দান করেন।
এখানে উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, এই নাজাশী আস্হামা এমনি একজন ন্যায়পরায়ণ ও সহৃদয় বাদশাহ ছিলেন, যিনি কুরায়শদের প্রেরিত বহুমূল্য উৎকোচ সম্ভার ফিরাইয়া দিয়া তাহাদের দূত আবদুল্লাহ ইব্ন আবী রাবী'আ ও 'আমর ইবনুল আসকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলিয়া দিয়াছিলেন, আল্লাহ যখন আমার হৃত রাজত্ব আমাকে ফিরাইয়া দেন তখন তিনি আমার নিকট হইতে কোন উৎকোচ গ্রহণ করেন নাই। কাজেই এই রাজ্যে আমার উৎকোচ গ্রহণের কোন প্রশ্নই উঠে না (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ১খ., পৃ. ৩৩৭-৩৪০; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ২৫-২৬, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ.)।
রাসূলুল্লাহ্ কর্তৃক ইসলামের দা'ওয়াত দানের ব্যাপারে এহেন রাষ্ট্রের প্রধানকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাঁহার পত্রবাহক দূত হযরত আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা) পত্রখানি হস্তান্তরের প্রাক্কালে প্রদত্ত ভূমিকামূলক ভাষণে বাদশাহকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন:
"জাঁহাপনা! আমার উপর সত্য পৌঁছাইয়া দেওয়ার এবং আপনার উপর উহা শ্রবণ ও গ্রহণ করার দায়িত্ব বর্তাইয়াছে। বিগত দিনসমূহে আপনি আমাদের প্রতি যে আনুকূল্য ও দয়া প্রদর্শন করিয়াছেন তাহাতে আমরা আপনাকে আমাদের একজন মনে করি। আপনার প্রতি আমাদের যে গভীর আস্থা রহিয়াছে তাহাতে আপনাকে আমাদের বাহিরের বলিয়া বিবেচনা করিতে পারি না। আমরা আমাদের ঈপ্সিত মঙ্গল আপনার নিকট হইতে লাভ করিয়াছি এবং আপনার পক্ষ হইতে যেসব অমঙ্গলের আশঙ্কা ছিল তাহা হইতে আপনি আমাদেরকে নিরাপদ রাখিয়াছেন।
"আমাদের পক্ষ হইতে আপনার উপর একটি নিশ্চিত দলীল হইতেছে হযরত আদমের সৃষ্টি। যে লীলাময় আল্লাহর কুদরতী হাত হযরত আদমকে পিতামাতা বিহনে মাটি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিই হযরত ঈসা আলায়হিস সালামকে পিতা বিহনে মাতৃগর্ভে জন্মদান করিয়াছেন"।
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ. "আল্লাহ্র নিকট নিশ্চয় ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। আদমকে তিনি মাটি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন, অতঃপর তিনি আদেশ করিয়াছেন হও, ফলে সে হইয়া গেল” (৩ঃ ৫৯)।
"আমাদের এবং আপনাদের মধ্যে ইনজীল (বাইবেল নূতন নিয়ম) হইতেছে এমন একটি সাক্ষী যাহার সাক্ষ্য কোনদিন প্রত্যাখ্যাত হইতে পারে না। আর ইহা হইতেছে এমন এক মীমাংসাকারী যাহার দ্বারা অবিচার হইতে পারে না। তাই নবী কারীম-এর আনুগত্য-অনুসরণে আল্লাহ্র রহমত নামিয়া আসিবে। তাহাতে মর্যাদা বৃদ্ধি পাইবে ও কল্যাণ সাধিত হইবে।
"হে রাজন! আপনি যদি মুহাম্মাদ -এর অনুসরণ না করেন তবে এই নিরক্ষর নবীকে প্রত্যাখ্যান করার দরুন আপনাকে ঠিক সেই দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে এবং সেই পাপের অধিকারী হইতে হইবে যেমনটি হযরত ঈসা (আ)-কে অস্বীকার করার দরুন ইয়াহুদীদের হইয়াছিল।
"আমারই মত আরও কয়েকজন বার্তাবাহক রাসূল আকরাম -এর পক্ষ হইতে অপর কয়েকজন বাদশাহর দরবারে ইসলামের দা'ওয়াত লইয়া রওয়ানা হইয়াছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ যে বিরাট আশা-আকাঙ্ক্ষা আপনার প্রতি পোষণ করেন অন্যদের বেলায় তিনি ততটুকু করেন না। আর তাহাদের সম্পর্কে তিনি যে আশঙ্কা পোষণ করেন আপনার ব্যাপারে তাঁহার মনে সেরূপ আশংকা নাই। আপনার আচরণে তিনি নিশ্চিত যে, আপনি আপনার প্রভুর অতীতে যেরূপ আনুগত্য প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা আপনি অব্যাহত রাখিবেন এবং ভবিষ্যতের বিরাট পুণ্য লাভে আপনি সচেষ্ট থাকিবেন।"
আবিসিনিয়া-রাজ আস্হামা গভীর মনোযোগ সহকারে দূতের এই বক্তব্য শ্রবণ করিলেন। অতঃপর জবাবস্বরূপ তিনি বলিলেন, "হে 'আমর! আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর সেই নির্বাচিত ও সম্মানিত রাসূল যাঁহার শুভাগমনের প্রতীক্ষায় কিতাবী সম্প্রদায়ের লোকজন দিন গুনিতেছে। নিঃসন্দেহে হযরত মূসা (আ) যেইভাবে গর্দভারোহী ঈসা নবীর শুভাগমনের সুসমাচার প্রচার করিয়াছিলেন, তেমনি ঈসা (আ)-ও উষ্ট্রারোহী মুহাম্মাদ -এর সুসমাচার প্রচার করিয়া গিয়াছেন। এতদুভয়ের মধ্যে চুল পরিমাণ পার্থক্য নাই। এই ব্যাপারে প্রত্যক্ষ দর্শন ও সুসমাচার আমার নিকট সমার্থক। কিন্তু আবিসিনিয়াবাসীদের মধ্যে আমার সমর্থক সংখ্যা নিতান্তই স্বল্প। আপনার নিকট আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, আমাকে একটু সময় দিন যাহাতে আমি আমার স্ব-সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার কিছু সমর্থক সৃষ্টি করিতে এবং তাহাদের মন প্রস্তুত করিতে তথা অনুকূল জনমত সৃষ্টি করিয়া লইতে সমর্থ হই" (সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৯; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১২৮)।
তারপর তিনি 'আমর ইবন উমায়্যার হস্ত হইতে সেই পত্রখানার প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে সশ্রদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হইলেন এবং পবিত্র পত্রখানা শ্রদ্ধাভরে চক্ষুদ্বয়ে লাগাইলেন। তারপর দোভাষীর মাধ্যমে পত্রখানা পড়াইয়া শুনিতে লাগিলেন। তাহার পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم
من محمد رسول الله الى النجاشي عظيم الحبشة سلم انت فاني احمد اليك الله الذي لا اله الا هو الملك القدوس السلام المؤمن المهيمن واشهد ان عيسى ابن مريم روح الله وكلمته القاها الى مريم البتول الطيبة الحصينة فحملت بعيسى فخلقه الله من روحه ونفخه كما خلق ادم بيده واني ادعوك الى الله وحده لا شريك له والموالاة على طاعته وان تتبعني وتوقن بالذي جاءني فاني رسول الله وانى
ادعوك وجنودك الى الله عز وجل وبلغت ونصحت فاقبلوا نصيحتي والسلام على من اتبع الهدى. الله رسول محمد
পরম দয়ালু ও পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে। আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে হাবশা অধিপতি নাজাশীর নামে— আপনি শান্তিতে থাকুন। সেই আল্লাহ্র প্রশংসা আপনার নিকট করিতেছি যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। তিনি রাজাধিরাজ, পবিত্র, শান্তির আধার, নিরাপত্তা বিধানকারী, উচ্চ মর্যাদা দানকারী। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, ‘ঈসা (আ) আল্লাহ্র রূহ ও কলেমা, যাহাকে সেই পূত-ললনা মরিয়মের গর্ভে তিনি নিক্ষেপ করিয়াছেন যিনি ছিলেন সতীসাধ্বী মহিলা, যদ্বারা তিনি গর্ভবতী হন এবং ‘ঈসা (আ)-কে প্রসব করেন। আল্লাহ্ তাঁহাকে তদীয় রূহ ও ফুৎকার হইতে সৃষ্টি করেন। তিনি ঠিক সেইভাবে সৃষ্টি করেন যেমনভাবে তিনি আদমকে আপন (কুদরতী) হাতে সৃষ্টি করিয়াছেন। আমি আপনাকে এবং আপনার বাহিনীকে সেই একক অদ্বিতীয় আল্লাহ্ দিকে দা’ওয়াত দিতেছি যাঁহার কোন শরীক নাই। তিনি মহিমান্বিত ও প্রবল প্রতাপান্বিত। আমি আল্লাহ্র পয়গাম অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে পৌঁছাইয়া দিয়াছি এবং পূর্ণ মঙ্গল কামনা করিয়াছি। সুতরাং আপনি আমার নসীহত কবুল করুন। সত্য পথের অনুসারিগণের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক” (তাবাকাত ইব্ন সা’দ, ৩খ., পৃ. ১৫; তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯৪; মাজমূ‘আতু ওয়াছাইকিস-সিয়াসিয়্যা, পৃ. ৪৫, দলীল নং, ২১; সুবহুল আ‘শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৯; যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৯৩; আসাহহুস-সিয়ার, মূল উর্দু, পৃ. ৩৯২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৮৩; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৬২; সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ৮৩; জামহারাতu রাসাইলিল আরাব, ১খ., পৃ. ৪১; ই‘লামুস সাইলীন (ইব্ন তুলুন), পৃ. ৫৪; ই‘লামুল ওয়ারা, পৃ. ৩০; যাদুল মা‘আদ, ৩খ., পৃ. ৬০)।
(সীলমোহর) আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ
আবিসিনিয়ার উক্ত নাজাশীর নাম ছিল আস্হামা ইব্ন আবজুর। তিনি ছিলেন রোমান ক্যাথলিকদের ত্রিত্ববাদের বিরোধী। ত্রিত্ববাদের বিপরীতে তিনি এক আত্মায় বিশ্বাসী ছিলেন। খৃস্টানদের অপর গ্রুপটি ছিল ত্রিত্ববাদের সমর্থক এবং রোমান গীর্জা ও রোমক সম্রাটের সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতার পুষ্ট। রোম-সম্রাটের দরবারে কিছু সংখ্যক মূর্তিপূজারীও থাকিত। একাত্মা ও ত্রি-আত্মার সমর্থকদের মধ্যে রোম সম্রাটের দরবারে ও সভা-সমাবেশে অহরহ বিতর্ক লাগিয়াই থাকিত। এই ধরনের বিতর্ক, বাদানুবাদ ও সাম্প্রদায়িক তিক্ততা সমগ্র খৃস্ট জগত জুড়িয়া বিরাজমান ছিল। নাজাশী নিজে যেহেতু একাত্মায় বিশ্বাসী ছিলেন, তাই ইসলামের একত্ববাদের দাওয়াত তাঁহাকে প্রভাবান্বিত করে। উপরন্তু তিনি বিগত এক যুগেরও বেশী সময় ধরিয়া
আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানগণের চরিত্র ও চালচলন দেখিয়া আসিতেছিলেন। তাঁহাদের সততা ও আল্লাহমুখী জীবন তাঁহার মনে বেশ দাগ কাটিয়াছিল। তাই তাঁহার নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মে যে, এহেন উন্নত চরিত্র ও জীবনদর্শনের অধিকারিগণ যে মহাপুরুষের অনুসারী তিনি নিশ্চয়ই আল্লাহর সত্য নবী।
যতদূর মনে হয়, উক্ত পত্রখানি বাদশাহর আম দরবারে তাঁহার নিকট হস্তান্তর করা হয় নাই। কেননা নাজাশী তদীয় ইসলাম গ্রহণের কথা তাঁহার দরবারী এবং প্রজাসাধারণের নিকট গোপন রাখিয়াছিলেন। আস্-সুহায়লী (মৃ. ৫৮১ হি.) বর্ণনা করেন যে, নাজাশীর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ রাজ্য জোড়া রাষ্ট্র হইয়া গেলে আবিসিনীয়গণ বিদ্রোহ করিতে উদ্যত হয়। তাহারা নাজাশীর বিরুদ্ধে শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করিতে থাকে। পরিস্থিতি লক্ষ্য করিয়া নাজাশী রাসূলুল্লাহ্ -এর পিতৃব্যপুত্র হযরত জা'ফার (রা)-কে ডাকিয়া পাঠাইয়া বলিলেন, আমি আপনাদের জন্য একটি নৌ-বহর তৈরি করিয়া রাখিয়াছি। আপনারা উহাতে আরোহণ করিয়া অপেক্ষা করিতে থাকুন। পরিস্থিতির অবনতি লক্ষ্য করিলে মুহাজিরগণকে লইয়া এই নৌ-বহরে করিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইবেন। আর আমি যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে সমর্থ হইয়াছি তবে আপনারা পূর্ববৎ নিয়াপদে আবিসিনিয়ায় বসবাস করিত থাকিবেন। এই আয়োজন সম্পন্ন করিয়া তিনি এক টুকরা কাগজে লিখিলেন:
اشهد ان لا اله الا الله واشهد ان محمدا عبده ورسوله واشهد ان عيسى بن مريم عبده وروحه وكلمته القاه الى مريم. "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল। আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, মারয়াম-তনয় 'ঈসা (আ) তদীয় বান্দা, তদীয় আত্মা এবং তদীয় কালেমা যাঁহাকে তিনি মারয়ামের প্রতি নিক্ষেপ করিয়াছেন।"
কাগজের উক্ত টুকরাটি তিনি জামার নীচে বুকের কাছে লুকাইয়া রাখিলেন। ইহার পর আম দরবার ডাকাইয়া আবিসিনীয় বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপতিগণকে একত্র করিলেন। তারপর তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কি? আমি কি তোমাদের শাসক হিসাবে যোগ্য ব্যক্তি নই? তাহারা সমস্বরে জবাব দিল, আমাদের শাসক হিসাবে আপনি যোগ্যতম ব্যক্তি। তবে আমরা শুনিতে পাইয়াছি যে, আপনি খৃস্টধর্ম বিসর্জন দিয়া 'ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র বান্দা বা দাস বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়াছেন!
আস্হামা জিজ্ঞাসা করিলেন, তাঁহার সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা? তাহারা জবাব দিল, তিনি তো আল্লাহ্ পুত্র। আস্হামা নিজের হাত বুকের উপর রখিয়া বলিলেন, "ঈসা (আ) ইহা হইতে (অর্থাৎ এই কাগজে লিপিবদ্ধ তাঁহার পরিচয়ের চাইতে) একটুও অতিরিক্ত কিছু শিক্ষা দেন নাই।" সমবেত বিক্ষুব্ধ আবিসিনীয়দের একজনও তাঁহার চাতুর্য সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আঁচ করিতে সমর্থ হইল না। তাহারা তাঁহার জবাব শুনিয়া শান্ত হইয়া গেল। বিদ্রোহের আশঙ্কা তিরোহিত হইয়া গেল। মুহাজিরগণ তখন নৌ-বহর হইতে অতবরণ করিয়া পূর্ববৎ নিরাপদে আবিসিনিয়ায় বসবাস করিতে থাকেন (রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ৯৭)।