📄 আবদুল্লাহ ইব্ন ওয়াহ্ আল-আসলামী/আসাদী
(৩২) আবদুল্লাহ ইব্ন ওয়াহ্ব আল-আসলামী/আসাদী। (৩৩) হাবীব ইন্ন যায়দ আল-খাযরাজী
বালাযুরীর ধারণামতে মুসায়লামার নিকট প্রেরিত প্রথম পত্রের ডাকে সে সাড়া না দেওয়ায় তাহাকে ইসলামী রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধংদেহী আচরণ হইতে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ পুনরায় তাহার নিকট দূত প্রেরণ করেন। এই দুইজন সাহাবী ঐ দায়িত্বটি পালন করিয়াছিলেন (দ্র. ফুতূহুল বুলদান, পৃ. ১০২; রাসূল মুহাম্মদ-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ২১৫)।
📄 হাবীব ইব্ন যায়দ আল-খাযরাজী
চিঠিপত্র বা রাজকীয় ফরমানাদিতে সীল-মোহরের ব্যবহার আরবদেশে প্রচলিত ছিল না। ঐতিহাসিক বালাযুরী আফফান ইন্ন মুসলিম, শু'বা ও কাতাদা সূত্রে বর্ণনা করেন, আনাস ইবন মালিক (রা)-কে তিনি বলিতে শুনিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন রোমক সম্রাটের নিকট পত্র লিখিতে মনস্থ করিলেন তখন তাঁহাকে বলা হইল, সীলমোহরবিহীন পত্রাদি তাহারা পড়ে না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (স) একটি রৌপ্যের আংটি প্রস্তুত করাইলেন। তাহাতে অঙ্কিত ছিল محمد رسول الله। তাঁহার সেই আংটির শূদ্রতা যেন এখন আমার চক্ষের সম্মুখে ভাসিতেছে।
আনাস ইবন মালিক (রা)-এর আরেকটি বর্ণনা সূত্র হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্-এর আংটির রিং এবং নাগিনা সবটাই ছিল রৌপ্যের। যুত্রী ও কাতাদা সূত্রে বর্ণিত অপর এক হাদীছ হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্-এর আংটির নকশার অনুরূপ নকশাযুক্ত আংটি ব্যবহার অন্যদের জন্য তিনি নিষিদ্ধ করিয়াছেন। উক্ত বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, উহা কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারের আংটিই ছিল না, উহা ছিল তাঁহার রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের সীলমোহরও। পরবর্তীতে হযরত আবূ বকর, উমার ও উছমান (রা)-এর খিলাফত আমলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উহা রাষ্ট্রীয় সীলমোহররূপেই ব্যবহৃত হইয়াছে। তারপর একদিন যখন হযরত উছমান (রা) বি'রে আরীস নামক কূপের পাড়ে উপবিষ্ট ছিলেন তখন ঐ আংটিটি কূপে পড়িয়া যায়। তিন দিন পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুজি করিয়া, এমনকি উহার সম্পূর্ণ পানি সিঞ্চন করিয়া তন্নতন্ন করিয়া অনুসন্ধান চালাইয়াও তাহার কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। অগ্যতা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে তিনি অনুরূপ আরেকটি সীলমোহর প্রস্তুত করাইয়া কাজ চালাইয়া যাইতে থাকেন। আংটিটির খোদিত লিপি তিন লাইনে সাজানো ছিল যাহার সর্বনিম্নে মহাম্মদ, মধ্যে রাসূল এবং সর্বোচ্চে আল্লাহ শব্দ ছিল (ফুতূহুল বুলদান, বালাযুরী, পৃ. ৪৪৮; বৈরুত, ১৪০৩/১৯৮৩.; ড. হামীদুল্লাহ, মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৫০, ৫১ ও ৫৭)। লক্ষণীয়, ধারাবাহিকভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ অংকিত গোলাকার টোপ তৈরী করাইলে উহাতে যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামটি সর্বনিম্নে স্থান পাইত তাহা হইত একান্তই অশোভন- মহা প্রজ্ঞাবান মহানবী-এর সজাগ দৃষ্টি তাহা এড়াইয়া যাইতে পারে নাই।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রাবলীর সংরক্ষণ পদ্ধতি পর্যালোচনা
সুদীর্ঘ কাল পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ বিভিন্ন সম্রাট, গভর্নর, শাসক ও গোত্রপ্রধান বা সামন্ত রাজাদের নামে যে পত্রগুলি প্রেরণ করিয়াছিলেন ড. হামীদুল্লাহ সেগুলির সংখ্যা সোয়া দুই শত পর্যন্ত উল্লেখ করিয়াছিলেন (ড. হামীদুল্লাহর ফরাসী ভাষায় লিখিত” দুকিউমা সিভর লা ডিপ্লোমেসী
মুসলমান, ২খ., পৃ. ৯-১৭; প্যারিস ১৯৩৫, আহমাদ ফারীদূন, মুনশা'তু'স্-সালাতীন, ইস্তাম্বুল ১২৭৪ খৃ. পৃ. ৩০-৩৫)।
(১) স্পেনের খৃস্টান সম্রাটগণের নিকট সংরক্ষিত পত্রখানির চাক্ষুষ বিবরণী ৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত লেখকগণের পুস্তকাদিতে (ড. হামীদুল্লাহ্, দুকিউমা, ১খ., পৃ. ৪৫; কাত্তানী, কিতাবু'ত-তারাতীবিল ইদারিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৫৬-১৬৫, রাবাত মুদ্রণ ১০৪৬ হি.)।
(২) তামীম আদ-দারী (রা)-কে জায়গীর প্রদান সংক্রান্ত পত্রখানির কথা বর্ণনা করিয়াছেন ইমাম আবূ ইউসুফ তদীয় কিতাবুল খারাজে (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১৩২ ও ইব্ন ফাদলিল্লাহ্ আল-উমারী, কিতাবু মাসালিকিল আবসার, ১খ., পৃ. ১৭৪; ড. হামীদুল্লাহ, বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন, পৃ. ১৬৮-১৬৯, ১ম সং, ই. ফা. ১৯৮৫ খৃ.)।
(৩) মিসর-রাজ ও খৃস্টান পাদ্রী মুকাওকিসকে লিখিত রাসূলুল্লাহ্ -এর আসল পত্রখানি ১৮৫০ খৃস্টাব্দে মিসরের উঁচু এলাকায় অবস্থিত আখমীম নামক স্থানের এক খৃস্টীয় মঠ বা convent-এ পাওয়া যায় (কায়রোতে অবস্থানরত জনৈক প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ) মসিরো বার্তেলেমী তাহা উদ্ধার করিয়াছিলেন। কায়রো হইতে মোসিরো বেলিন, ১০ মার্চ, ১৮৫২ সালে উহা সংক্রান্ত দীর্ঘ একটি পত্র ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ মোসিও রেণাঁর কাছে প্যারিসে পাঠান। তিনি উহা উক্ত পত্রিকায় ১৫/২০ পৃষ্ঠা জুড়িয়া প্রকাশ করেন। তাঁহার উক্ত পত্রের কিছু অংশ নিম্নে উদ্ধৃত হইল:
"হস্তলিখিত একটি পত্র আমি সম্প্রতি দেখিয়াছি। উপরিউক্ত প্রাচ্য বিষয়ক সমিতিও এই পত্রের কথা অবগত হইয়াছে, তাহাদের ১৯৫১ সালের ১১ ডিসেম্বরের অধিবেশনে। পত্রটি সনাক্ত করেন মোসিয়োঁ এটি এন বার্তেলামী।
"মোসিয়োঁ বার্তেলমী কায়রোতে অবস্থানরত প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ একজন ফরাসী যুবক। আরবী ভাষায় বিরাট পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন বিনয়ী প্রকৃতির লোক। বেশ কিছুকাল হইতেই তিনি মিসরের প্রাচীন ভাষা অধ্যয়নরত। বিশেষত কিবতী ভাষায় লিখিত ঐ সমস্ত লিপির অনুসন্ধানে লিপ্ত যেগুলি মিসরের নির্জনতাপ্রিয় পাদ্রীগণের হিফাজতে রহিয়াছে এবং যেগুলি দ্বারা প্রাচীন কালের মূল্যবান তথ্যাদির সন্ধান পাওয়া যায়। গত বৎসর এক সফরে মোসিয়ো বার্তেলমী বিরাট অংকের অর্থ ব্যয় করিয়া দারুণ অর্থ সংকটে পতিত হন। অথচ ঐ সফরে অতি অল্প তথ্যই তাঁহার হস্তগত হয়। একদিন প্রবল জঠর জ্বালায় অস্থির হইয়া যখন তিনি আখমীমের নিকটবর্তী জনৈক খৃস্টান দরবেশের আস্তানায় উপনীত হন, তখন সেখানে আরবী ভাষায় লিখিত একখানা পুস্তক তাঁহার হস্তগত হয়- যাহা বাহ্য দৃষ্টিতে একান্তই মামুলী ধরনের ছিল। পুস্তকটির মলাট দৃষ্টে মনে হইতেছিল, উহা যেন বড় আকারের কোন পুস্তকের জন্যই তৈরী করা হইয়াছিল। মলাটের কিনারাগুলি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল এবং ইহার ভিতরের দিকে কিছু কিবতী অক্ষর দৃশ্যমান ছিল। আমাদের এই পর্যটক প্রথম পাতাটি আলাদা করার চেষ্টা করেন যাহা ভিতরের বেশ কিছু পাতাকে লেপটাইয়া রাখিয়াছিল। অত্যন্ত সতর্কতার সহিত যখন উহার প্রথম পাতাটি আলাদা করা হইল তখন ভিতর হইতে মোট দশটি পাতা বাহির হইয়া আসিল। উহাতে কিবতী ভাষার প্রাচীন লিপিতে ইঞ্জীল লিপিবদ্ধ ছিল। এই পাতাগুলি যাহাতে একটি শক্তিশালী বাণীর সংরক্ষণকারী হয়, সেই উদ্দেশ্যে এইভাবে সন্নিবেশিত করা হইয়াছিল।
"এই পত্রের বর্ণনামতে মোসিয়ো বার্তেলমী মলাটের ভিতরের কিবতী ভাষার পাতাগুলিকে একটার পর একটা করিয়া যখন আলাদা করিতেছিলেন এমন সময় তিনি দুই বাহুতে শক্তভাবে জড়ানো একটি চামড়ার টুকরা দেখিতে পান যাহার দুইটি স্থান কীটদষ্ট অবস্থায় ছিল। ঐ চামড়ার উপরে কৃষ্ণী লিপিতে কয়েকটি আরবী অক্ষরের উপর তাঁহার দৃষ্টি পতিত হয়। অনেক চেষ্টা সাধনার পর তাহাতে তিনি 'মুহাম্মাদ' শব্দটি পাঠ করিতে সমর্থ হন। ফলে বিষয়টি তাঁহার নিকট বেশ আকর্ষণীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়। সুতরাং যতটা সম্ভব সতর্কতার সহিত তিনি পৃষ্ঠাগুলিকে আলাদা করার প্রয়াস পান। হাজার চেষ্টার পরও উহাকে ভিজাইয়া নরম করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ফলে প্রথম হইতেই যে শব্দগুলি মিটিয়া যাইতেছিল তাহা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। মোসিয়ো বেলিন তদীয় উক্ত পত্রে আরও লিখেন, অতঃপর বিভিন্ন লোকের সাহায্যে উহার পাঠোদ্ধার এবং আরবী ইতিহাস হইতে উহার বচন উদ্ধার করা হয়।
"১৯০৪ খৃস্টাব্দে প্রখ্যাত মিসরীয় খৃস্টান পণ্ডিত জুর্জি যায়দান তদীয় আরবী মাসিক আল-হেলাল-এ প্রকাশ করেন, ইস্তাম্বুল হইতে সংগৃহীত উক্ত পত্রের নকলের একটি ফটোকপি। ইহারই নকল সম্ভবত ভারতবর্ষে আসিয়াছিল এবং ১৯১৭ খৃস্টাব্দে ইসলামিক রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। তবে উহাও আসল কপি ছিল না; বরং নকলের ফটোকপি ছিল।
"অধ্যাপক মারগোলিয়থ আল-হেলাল ১৯০৪ সালের নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত তদীয় প্রবন্ধে (পৃ. ১০৪) উক্ত পত্র উদ্ধারের ঘটনাটিকে অস্বীকার করার প্রয়াস পাইলেও উক্ত পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায়ই (ডিসেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৬০) উহার সত্যতা স্বীকার করিতে হয়" (বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন, ড. হামীদুল্লাহ, পৃ. ১৬০-১৬৫)।
ড. পি. বেজার (Dr. P. Bedger) মসিয়ো বেলিন এবং নলডিকে-এর মত বিশেষজ্ঞগণের পরীক্ষায় উক্ত আবিষ্কৃত পত্রখানা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আসল পত্র বলিয়াই প্রমাণিত হইয়াছে। ড. হামীদুল্লাহ-এর "মাজমূ'আতু'ল-ওয়াসাইকিস সিয়াসিয়্যা (নং ২১, পৃ. ৪৫), কলিকাতার মাসিক আল-এসলাম-এর জৈষ্ঠ ১৩২২ বাংলা সংখ্যার ১১৯ পৃষ্ঠায় এবং আলী হুসায়ন আলী তদীয় গ্রন্থ মাকাতীবুর রাসূল-এ (পৃ. ৯৬) উক্ত পত্রখানি নির্ভরযোগ্য বরাতে প্রকাশিত হইয়াছে।
মসিয়োঁ বার্থেলেমী পত্রখানা ৩০০ পাউণ্ডের বিনিময়ে তুরস্কের সুলতান আবদুল মাজীদের (১৮৩৯-১৮৬১ খৃ.) নিকট হস্তান্তর করেন। সুলতান উহা স্বর্ণের ফ্রেমে বাঁধাইয়া শাহী প্রাসাদের তোপকাপিতে যত্নের সহিত রাখিয়া দেন। পরবর্তী কালে উক্ত শাহী প্রাসাদটি তোপকাপি নামে অভিহিত হয় এবং যাদুঘরের রূপ পরিগ্রহ করে। উক্ত যাদুঘরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কথাটিতে আজও এই পবিত্র পত্রখানা নবী কারীম -এর অন্যান্য পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের সহিত সযত্নে সংরক্ষিত রহিয়াছে (মাকতুবাতে নববী, পৃ. ১৭১; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৬)।
(৪) ইথিওপীয় সম্রাট নাজাশীর নামে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রখানির ফটোকপি খৃস্টান লেখক জুর্জি যায়দানের 'তারীখ' গ্রন্থে মিসরের আরবী সাময়িকপত্র 'আল-হেলাল'-এর নভেম্বর ১৯০৪ সংখ্যায়, ড. হামীদুল্লাহর মাজমূ'আতু'ল-ওয়াছাইকি'স্-সিয়াসিয়্যাতে এবং তাঁহার বরাতে মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩০-এ দেখা যাইতে পারে। খৃ. ১৯৪০ সালে জি. আর. এস, লন্ডন কর্তৃক তাহা প্রকাশিত হয়। সহীফায়ে মুহাম্মাদ ইব্ন মুনাব্বির ১৯৪০ সালে ইংরেজ।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রাবলীতে সম্বোধনের ধরন ও উহার প্রভাব
প্রাচ্যবিদ অধ্যাপক ডানলপ রয়েল এসিয়াটিক সোসাইটির ম্যাগাজিনে তথ্য প্রকাশ করেন যে, জনৈক সিরীয় ব্যবসায়ীর মালিকানায় রক্ষিত চর্মগাত্রে ইথিওপীয় সম্রাট নাজাশীর নিকট লিখিত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্রখানা পাওয়া গিয়াছে। পত্রের সিরীয় মালিক জানান যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি তাহা দামিকে আগত জনৈক ইথিওপীয় খৃস্টান ধর্মযাজকের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন (আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, পৃ. ২৪৭-এর পাদটীকা; অধ্যাপক আকরম দিয়ার Madinah Society at the Time of the Prophet (sm), vol. 2, p. 132. দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুর দিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা হইতে প্রকাশিত মুসলিম পত্রিকা। বুরহানুল ইসলাম-এ সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, সম্রাট হইলে সেলাসী একটি মুসলিম প্রতিনিধি দলকে নবী কারীম (স)-এর পত্রখানা বাহির করিয়া দেন (রাসূলে আকরাম কী সিয়াসী জিন্দেগী, পৃ. ২৬৯-১৮২)।
(৫) রোমক সম্রাট কায়সারের (Heraclious) নিকট প্রেরিত রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রখানিও সুদীর্ঘ ৭ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল বলিয়া ড. হামীদুল্লাহ 'রাসূলে আকরাম কী সিয়াসী যিন্দেগী'-তে উল্লেখ করিয়াছেন। এই পত্রখানা হিজরী সপ্তম শতকে বিদ্যমান ছিল বলিয়া আল্লামা সুহায়লী বর্ণনা করিয়াছেন। বুখারী শরীফের ভাষ্যকার আল্লামা কাস্তাল্লানী (মৃ. ৮৫১/১৪৪৭ খৃ.) লিখেন যে, মালিক মানসূর কালাউন সালেহী (৬৭৮-৬৮৯হি.) ৬৮২/১২৮৩ সনে স্পেন সম্রাট আলফনসোর নিকট দূত প্রেরণ করিলে তিনি দূত সায়ফুদ্দীন কুলায়জকে স্বর্ণের কৌটাতে রক্ষিত উক্ত পত্রখানা দেখাইয়া বলেন, ইহা হইতেছে ইসলামের নবীর সেই পত্র যাহা তিনি আমাদের পূর্বপুরুষ হিরাক্লিয়াসের নামে লিখিয়াছিলেন (কাস্তাল্লানী, ১খ., পৃ. ৬৭; মাকতুবাতে নববী, পৃ. ১৩৫-১৩৬, পাদটীকায়)।
(৬) বাহরায়নের গভর্ণর ব্রনযির ইব্ন সাওয়া-এর নামে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রখানার ফটোকপি জার্মানের প্রাচ্যবিদদের পত্রিকা ZDMG-এর ১৭তম খণ্ডে ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয় ড. বুশ-এর মাধ্যমে। আল-ওয়াছাইকু'স-সিয়াসিয়্যায় উহা দলীল নং ৫৭-রূপে মুদ্রিত হয়। তবে এই পত্রখানার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হওয়া যায় নাই (Madinahs Society, at the Time of the Prophet (sm), vo. -2, p. 132; মাকতাবাতে নববী, পৃ. ১৭১)।
(৭) ইরান সম্রাট কিসরাকে লিখিত রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রখানা লেবাননের সাবেক উষীর মি. হেনরী ফিরাউনের ব্যক্তিগত পাঠাগারে পাওয়া গিয়াছে। উহা দৈর্ঘে ১৫ ইঞ্চি ও প্রন্থে ৮" ইঞ্চি। উহা একটি কাল বর্ণের চামড়ার উপর লিখিত। নীচে রাসূলুল্লাহ্ -এর সীলমোহরযুক্ত, মধ্যভাগ ফাড়া (হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস, পৃ. ৭০, মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, এমদাদীয়া লাইব্রেরী, চক বাজার, ঢাকা, ১৯৬৯ খৃ., ১ম সং.)।
রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রগুলির শুরুতে তাঁহার নিজের নাম আগে এবং প্রাপকের নাম পরে থাকিত। সেই যুগে রাজন্যবর্গ ও আমীর-উমারার নিকট পত্র লিখিবার সময় প্রাপকের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাহার নাম আগে এবং প্রেরকের নাম পরে লিখিবার প্রচলন ছিল। তিনি প্রাপকের নাম তো পরে দিতেনই, তদুপরি প্রাপকের নামের সাথে তেমন আড়ম্বরপূর্ণ পদবীও ব্যবহার
করিতেন না, একান্তই সাদামাটাভাবে তাহাদের নাম লিখাইয়া দিতেন। তাঁহার এইরূপ সম্বোধনই ছিল যুক্তিসংগত। কেননা তিনি যে ধর্মের দিকে তাহাদেরকে আহবান জানাইতেছিলেন সেই ধর্মের আলো সম্পর্কে রাজন্যবর্গ ছিলেন বিভ্রান্ত ও পথহারা। তাই আল্লাহর রাসূলের তুলনায় তাহাদের তেমন মর্যাদা ছিল-না যে, তিনি একান্তই ভক্তঅনুরক্ত প্রজাদের মত তাহাদেরকে আড়ম্বরপূর্ণ পদবী ব্যবহার করিয়া সম্বোধন করিবেন।
তদীয় এই অভূতপূর্ব সম্বোধন পদ্ধতি রাজা-বাদশাহদের দরবারসমূহে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সাধারণ্যে যখন এই ধরনের সম্বোধনের কথা প্রচারিত হইতে লাগিল, তখন সাধারণ মানুষও বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া পড়ে। কেননা তাহারা কোনদিন কল্পনাও করিতে পারিত না যে, প্রবল প্রতাপান্বিত রোমক সম্রাট কায়সার এবং পারস্য সম্রাট খসরু পারভেষের মত কোন ব্যক্তিকে কেহ এমন নির্ভীক সম্বোধন করিতে পারে। তাহার একটি সুফল ফলিল এই যে, ঐ রাজ-দরবারসমূহের মোসাহেবগণ এবং ইরানী ও রোমক আধিপত্যের অধীনে বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের লোকজন ভাবিতে শুরু করে, যে ব্যক্তি যুগের শ্রেষ্ঠ শাসককে এরূপ সম্বোধন করিতে পারে তাঁহার পশ্চাতে অবশ্যই কোন বিরাট শক্তি সক্রিয়। রাসূলুল্লাহ্-এর এইরূপ সম্বোধনে ইহাই ছিল ইসলামের প্রথম মনস্তাত্বিক বিজয়। ইরান সম্রাট খসরু পারভেয তো পত্রাবলীতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ দেখিয়াই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠেন। এইরূপ সম্বোধন তাহার দৃষ্টিতে ছিল সম্পূর্ণ অপমানজনক ও একটা অসহনীয় স্পর্ধা। তাই তৎক্ষণা সে রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়।
রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস নিজে ব্যাপারটিকে তেমন কোন গুরুত্ব না দিলেও তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট তাঁহার সহোদর ভাই, মতান্তরে ভ্রাতুষ্পুত্র এই পত্রখানা পাঠেরই উপযোগী নহে বলিয়া তাহার অভিমত ব্যক্ত করে। অনেকে আবার নবীর সত্যতা ও তদীয় আহবানের তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে সক্ষমও হন এবং পত্র প্রাপ্তির পর যথারীতি সেই দাওয়াতে সাড়া দিয়া ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সৌভাগ্যেরও অধিকারী হন। এই পত্রসমূহের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মহানবী-এর একজন সীরাত লেখক নিম্নলিখিভাবে মত প্রকাশ করিয়াছেন:
"একমাত্র পারস্য ও দামিশক ছাড়া অপর সমস্ত দেশের রাজা-বাদশাহগণই নবী করীম -এর সম্মানে নানা উপঢৌকনসহ তাঁর দূতদেরকে বিদায় দেন। এ ভাবে এশিয়া, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপেও নবী-এর বাণী ছড়াইয়া পড়ে। তাঁহার দা'ওয়াতে বিভিন্ন দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর খ্যাতনামা বীর, সম্রাট ও বাদশাহগণ যাহা করিতে পারেন নাই, মহানবী সুদূর মদীনায় অলক্ষ্যে থাকিয়া তাঁহার বাণী ও শিক্ষা দ্বারা পৃথিবীর মানুষের মন জয় করিয়া নেন" (ফজলুর রহমান প্রণীত, শান্তির নবী, পৃ. ১৩৪-১৩৬, ১ম সং, ১৯৯৪ খৃ.)।