📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সালীত ইবনুল 'আমর (রা)

📄 সালীত ইবনুল 'আমর (রা)


(১৩) সালীত ইবনুল 'আমর (রা): সালীত ইবন 'আমর ইবন 'আবদ শামস ইব্‌ন 'আবদ উদ্দ ইব্‌ন 'নাসর ইবন মালিক ইবন হিসল ইবন 'আমের ইব্‌ন লুওয়াঈ আল-'আমিরী। সুকরান ইবন 'আমর (সাহল ইব্‌ন আমর ও খতীবে কুবায়শ লকবে বিখ্যাত) সুহায়ল ইন্ন 'আমর নামক সাহাবী-ত্রয় তাঁহারই ভাই ছিলেন (আত-তুহফাতুল লতীফ, ১খ., পৃ. ৪১০; সংখ্যা ১৫৮০; ঐ, পৃ. ৪৩২, সংখ্যা ১৬৮৬; ৪৩৪, সংখ্যা ১৭০২)। সালীত ও সুকরান উভয়ে আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরতকালে ঐ প্রথম মুহাজির কাফেলায় ছিলেন (সীরাতু-নবী, ইবন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৫৪)।
পরবর্তীতে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। বদরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর একজন মুজাহিদরূপে অংশগ্রহণ করেন। হযরত আবূ বকরের খিলাফত আমলে ইয়ামামার রিদ্দার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তাবারীর বর্ণনামতে, ১২ হিজরীতে তিনি সেখানে ঐ যুদ্ধে শহীদ হন। ইয়ামামায় যাতায়াতের অভিজ্ঞতা পূর্ব হইতেই তাঁহার ছিল বিধায় সেইখানকার শাসক হাওযা ইবন আলী ও ছুমামা ইব্‌ন আদালের নিকট ইসলামের দা'ওয়াতপত্রসহ প্রেরণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে মনোনীত করিয়াছিলেন (ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ১৩৯; উসদুল গাবা, ২খ., পৃ. ৩৪৪; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৮, বৈরূত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাইর ইবনুল আওয়াম (রা)

📄 সাইর ইবনুল আওয়াম (রা)


(১৪) সাইব ইবনুল আওয়াম (রা): হযরত যুবায়র ইবনুল 'আওয়ামের সহোদর ছিলেন এই সাইব (রা)। তাঁহাদের উভয়েরই মা ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর ফুফু সাফিয়্যা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব। তাঁহার বংশ লতিকা এইরূপ: সা'ইব ইবন 'আওয়াম ইবন খুওয়ায়লিদ ইব্‌ন আসাদ ইবন আবদিল উয্যা ইন্ন কুসায়্যি ইন্ন কিলাব (আত্-তুহফাতুল লাতীফ, ১খ., পৃ. ৩৫৬, সংখ্যা ১৩০৯, যুবায়র ইব্‌ন আওয়াম শিরোনামে)। রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত উলুদ ও খন্দকসহ পরবর্তী যুদ্ধসমূহে শরীক ছিলেন। ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। ভণ্ডনবী মুসায়লামা কাযযাবের নিকট রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্র লইয়া যান (আল-মিসবাহুল মুদী, ১খ., পৃ. ২১৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা)

📄 আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা)


(১৫) আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা): আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কায়স ইবন সালীম ইব্‌ন হিদার ইব্‌ন হারব ইবন 'আমের ইবন উমায়র। আবূ মূসা উপনামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁহার মাতার নাম ছিল তায়ি‍্যবা। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করিয়া মদীনায় হিজরত করেন এবং সেইখানেই ইন্তিকাল করে।
আবূ মূসা (রা) তাঁহার কয়েক ভাইসহ তাঁহার স্বগোত্রের কতিপয় লোকজনকে লইয়া মক্কা আসেন এবং সাঈদ ইবনুল 'আসের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন। ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে নির্যাতনের শিকার হওয়া ছিল অপরিহার্য ভাগ্যলিপি। ফলে হাবশায় হিজরত করেন এবং খায়বার জয়ের পর প্রত্যাবর্তন করেন। কোন কোন ঐতিহাসিক খায়বার অভিযানকালে তাঁহার ইসলাম গ্রহণের কথা বলিয়াছেন। আসলে ব্যাপারটি ছিল এই যে, ইয়ামানের দাওস ও আশ'আরী কবীলার বহু ঈমানদার রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সাক্ষাতের আশায় সমুদ্রপথে মদীনায় রওয়ানা হন। কিন্তু সামুদ্রিক ঝড় তাঁহাদের কিশতীকে আবিসিনিয়ায় নিয়া ভিড়ায়। সেখানে তাহারা জা'ফার ইব্‌ন আবূ তালিবসহ অন্যান্য মুসলমানের সহিত সানন্দে একত্রে বসবাস করেন এবং খায়বার বিজয়কালে হযরত জা'ফারের সহিতই এখানে আসিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সাক্ষাত করেন (প্রফেসর আবদুল খালেক, সাইয়েদুল মুরসালীন, ইফা. (প্রকাশিত) ৩য় সং, ১৯৮৬, ২খ., পৃ. ৮১৯)।
রাসূলুল্লাহ্ দশম হিজরী/৬৩১-৩২ খ্রি. সনে হযরত মু'আয ইবন জাবালের সহিত ইয়ামানের গভর্ণর নিয়োগ করেন। হযরত উমার (রা)-এর খিলাফত আমলে তিনি বসরায় ১৭ হিজরীতে কুফায় বদলী করেন। ২২ হিজরীতে তাঁহাকে কৃফার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। এক বৎসর যাইতে না যাইতে পুনরায় তাঁহাকে বসরার গভর্নর পদে ফিরাইয়া নেওয়া হয়। হযরত উছমানের শাহাদতের কয়েক বৎসর পূর্বেই তাঁহাকে তথা হইতে প্রত্যাহার করা হয়। তিনি তখন কৃষ্ণাতে বসবাস করিতে থাকেন। ৩৪/৬৫৪-৫৫ সনে হযরত উছমান তাঁহাকে পুনরায় কৃফার গভর্নর নিযুক্ত করেন। খলীফার শাহাদতের পর কৃফাবাসীরা হযরত আলীর পক্ষ অবলম্বন করিলে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তিনি পদচ্যুত হন। সিফফীনের যুদ্ধের পর হযরত 'আলী ও মু'আবিয়ার বিরোধ মীমাংসায় হযরত আলীর পক্ষের সালিশ কিন্তু তাঁহাকেই মনোনীত করা হয়। এই পর্যায়ে মু'আবিয়া পক্ষের সালিশ 'আমর ইবনুল আস-এর কূটবুদ্ধির কাছে পরাস্ত ও ক্ষুদ্ধ আবূ মুসা আল-আশ'আরী (রা) প্রথমে মক্কায় ও পরে কুফায় বসবাস করেন।
তাঁহার সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে দাউদ, বংশের বাদ্যযন্ত্র (মিযমার) উপাধি দেন। তিনি একজন দক্ষ সেনাপতি হিসাবেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে ইয়ামানের যুবায়দ ও তৎসন্নিহিত নিম্নাঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তিনি ৪২ মতান্তরে ৫২ হিজরীতে কৃষ্ণায় ইন্তিকাল করেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ হুরায়রা 'আবদুর রাহমান আদ-দাওসী (রা)

📄 আবূ হুরায়রা 'আবদুর রাহমান আদ-দাওসী (রা)


(১৬) আবূ হুরায়রা 'আবদুর রহমান আদ-দাওসী (রা): নামের চেয়ে উপনামেই তিনি অধিকতর মশহুর ছিলেন। তাঁহার আসল নাম সম্পর্কে মতভেদ আছে। তবে অধিকতর নির্ভরযোগ্য বর্ণনানুসারে তাঁহার আসল নাম ছিল আবদুর রহমান ইবন সাখর। তাঁহার মাতার নাম ছিল উমায়মা। একদা নবী করীম তাঁহার আস্তিনের মধ্যে একটি বিড়াল ছানা দেখিতে পাইয়া তাঁহা এই বিড়ালপ্রীতির জন্য তাঁহাকে আবূ হুরায়রা বা বিড়াল ছানার পিতা
বলিয়া আখ্যায়িত করেন (উসদুল গাবা, ৬খ., পৃ. ৩৩৭)। এই মর্মের একখানা হাদীছ তিরমিযীতেও পাওয়া যায়। তবে সেখানে রাসূলুল্লাহ্ -এর উল্লেখ না করিয়া আবূ হুরায়রা (রা) বলেন:
فكانت لى هريرة العب بها فكنوني بها. "আমার একটি বিড়ালছানা ছিল যাহার সহিত আমি খেলা করিতাম। এজন্য লোকজন আমাকে আবূ হুরায়রা উপনামে অভিহিত করে” (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩৮৪০)।
দক্ষিণ আরবের আযদ গোত্রের সুলায়ম ইব্‌ন ফাহম গোত্রে তাঁহার জন্ম। হুদায়বিয়ার সন্ধি ও খায়বার যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে নবী দরবারে আগমন করিয়া তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তিনি ত্রিশ বৎসরের যুবক। প্রিয়নবীর সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কাবাসিগণের অন্তর্ভুক্ত হন এবং সর্বদা ছায়ার মত তাঁহাকে অনুসরণ করিতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ্-এর উযূ-ইস্তিনজার পানিও তিনি আগাইয়া দিতেন এবং বিভিন্ন অভিযানে তাঁহার সঙ্গীরূপে থাকিতেন। রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট যেসব খাদ্যদ্রব্য আসিত, তাঁহারই নির্দেশে ঐসব খাদ্যদ্রব্য তিনি সুফফাবাসিগণের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিতেন এবং অনেক সময় নিজে অভুক্ত অর্ধভুক্ত অবস্থায় থাকিতেন, কিন্তু প্রাণান্তকর ক্ষুধা সত্ত্বেও কোনদিন কাহারও নিকট যাঞ্চা করিতেন না। এই সম্পর্কে তিনি নিজে বলেন, অনেক সময় আমি ক্ষুধার জ্বালায় মসজিদের আঙিনায় লুটাইয়া পড়িতাম এবং লোকজন আমাকে মৃগীরোগী ভাবিয়া আমার ঘাড়ে পা রাখিয়া চাপ দিতেন-যাহাতে আমি আরোগ্য হই। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি মৃগীরোগী ছিলাম না, ক্ষুধার জ্বালায় আমি এরূপ লুটাইয়া পড়িতাম। পরবর্তী কালে একদিন রেশমী রূমালে নাক মুছিতে মুছিতে অশ্রুসজল কণ্ঠে তিনি তাঁহার প্রথম জীবনের এই স্মৃতিচারণ করিতেছিলেন (শায়খুল হাদীছ মুহাম্মদ যাকারিয়া, Stories of Sahabah, p. 64, Millat Book Cantre, New Dehli)।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি তাঁহার সেই দারিদ্র্য পীড়িত জীবনের উল্লেখ করেন এইভাবে: আমি পিতৃহীন অবস্থায় বড় হই, নিঃস্ব অবস্থায় হিজরত করি, বাররা বিন্ত গাযওয়ানের বাড়ীতে পেটেভাতে শ্রমিকরূপে খাটি, অবশেষে আল্লাহ তাঁহাকেই আমার স্ত্রী করিয়া দেন। সুতরাং সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি দীনকে শক্তির মাধ্যম (কাওয়ামা) করিয়াছেন এবং আবূ হুরায়রাকে ইমাম বানাইয়াছেন (রিজাল ও নিসা হাওলার রাসূল পৃ. ৩০৪-৩০৫; কায়রো, সিফাতুস সাফওয়া, ১খ., পৃ. ৩৫০-৩৫১)।
বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছ হইতে প্রতিপন্ন হয় যে, আবূ হুরায়রা (রা) অত্যন্ত জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কিয়ামতের দিন আপনার শাফাআতধন্য সর্বপ্রথম ব্যক্তিটি কে হইবে? তখন রাসুলুল্লাহ্ বলিলেন:
لقد ظننت يا أبا هريرة ان لا يسألني عن هذا الحديث احد اول منك لما رأيت من حرصك على الحديث. "আমি পূর্বেই ধারণা করিয়াছিলাম হে আবূ হুরায়রা! তোমার পূর্বে আর কোন ব্যক্তিই এই প্রশ্নটি আমাকে করিবে না। কেননা, আমি তোমার মধ্যে হাদীছের লিপ্সা প্রত্যক্ষ করিয়াছি" (বুখারী, হাদীছ নং ৯৯, কিতাবুল ইলম)।
নবী কারীম (স) 'আলা ইবনুল হাদরামীর সহিত তাঁহাকে 'হাজার'-এর অধিবাসীদের নিকট পত্রসহ প্রেরণ করিয়াছিলেন। হযরত উমার (রা) তাঁহাকে বাহরায়নের গভর্নর নিয়োগ করিয়াছিলেন। পরবর্তীতে অর্থ সঞ্চয়ের অভিযোগে তিনি তাঁহাকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু পরে তদন্তক্রমে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হইলে উমার (রা) পুনরায় তাঁহাকে ঐ পদে বহাল করিবার জন্য ডাকিয়া পাঠান, কিন্তু তিনি তাহা পুনরায় গ্রহণে অসম্মত হন (বুখারী, আস-সিয়ার, ২খ., পৃ. ৬১২; রিজাল ও নিসা হাওলার রাসূল, পৃ. ৩০৪-৩০৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিতেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট হইতে দুইটি দু'আ সংরক্ষণ করিয়াছি। তাহার একটি আমি লোকসমাজে প্রচার করিয়াছি এবং অপরটি এমন যাহা প্রচার করিলে আমার এই কণ্ঠনালী কর্তন করা হইবে।
আল-হাফিয হাদীছটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি যে দু'আ লোকসমক্ষে প্রকাশ করেন নাই, বিশেষজ্ঞগণ তাহার অর্থ করিয়াছেন ঐ সমস্ত হাদীছ যেগুলিতে অসৎ লোক, তাহাদের নামধাম ও সময়কালের বর্ণনা রহিয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) ইশারা-ইঙ্গিতে তাহাদের কাহারও কাহারও কথা বলিতেন। কেননা তিনি তাহাদের পক্ষ হইতে প্রাণের আশঙ্কা করিতেন। যেমন তিনি দু'আতে অনেক সময় বলিতেন:
أعوذ بالله من رأس الستين وإمارة الصبيان. "হে আল্লাহ! আমি ষাট হিজরীর প্রান্তভাগ ও বালকদের শাসন হইতে তোমার শরণ প্রার্থনা করি।"
ইহা দ্বারা তিনি মু'আবিয়া ইব্‌ন য়াযীদের রাজত্বের দিকে ইঙ্গিত করিতেন। কেননা ষাট হিজরীতে তাহার শাসন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করেন। তাহার এক বৎসর পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ৫৭ হিজরীতে হযরত মুআবিয়া (রা) শাসনামলের শেষদিকে, মতান্তরে ৫৯ হিজরীতে মদীনায়, মতান্তরে আল-আকীক নামক স্থানে ৭৮ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন (সিফাতুস্ সাওয়া, ১খ., পৃ. ৩৫২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00