📄 আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামারী
আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামারী: আমর ইবন উমায়্যা ইব্ন খুওয়ায়লিদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন আয়াস আবূ মুনিয়্যা আদ-দামারী। ইবন সা'দ বলেন, মুশরিক বাহিনী উহুদ ত্যাগ করার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত বীরপুরুষ ছিলেন। অনেক ব্যাপারে তিনি ছিলেন অগ্রণী। ৪র্থ হিজরীতে বি'রে মা'উনার হৃদয়বিদারক ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন এবং সত্তরজন মুসলিম কুরআন বিশেষজ্ঞের মধ্যে একমাত্র তিনিই জীবিত অবস্থায়' ফিরিয়া আসেন। হযরত খুবায়বকে যখন কাফিররা শূলে চড়াইয়া শহীদ করে তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার লাশ শূলির কাষ্ঠ হইতে গোপনে নামাইয়া আনার জন্য তাঁহাকেই প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইব্ন আবদিল বার তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করিতে গিয়া বলেন:
كان من رجال العرب نجدة وجرأة وكان رسول الله ﷺ يبعثه فى اموره. "তিনি আরবজাতির নির্ভরযোগ্য সাহসী ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার বিশেষ বিশেষ মিশনে তাঁহাকে প্রেরণ করিতেন” (আত-তুহফাতুল লাতীফ, ২খ., পৃ. ৩১৭, সংখ্যা ৩১৫৫)।
হিজরত পূর্ব আনুমানিক ২৫ সালে মদীনার নিকটবর্তী বদর এলাকায় দামরা গোত্রে জন্মগ্রহণকারী এই সাহাবী বৈবাহিক সূত্রে 'আবদে শামস গোত্রের মিত্রগোত্রের সাথে আবদ্ধ ছিলেন। ইথিওপীয় শাসক নাজাশীর সহিত 'আবদে শামস গোত্রের সুসম্পর্ক থাকায় 'আমর ইবন উমায়্যা প্রায়ই ইথিওপিয়ায় যাতায়াত করিতেন। এক সময় নাজাশী ঐ বনূ আবদে শামস গোত্রে
দাসরূপে জীবন যাপন করিয়াছিলেন এবং তখন তিনি আরবী ভাষাও শিক্ষা করিয়াছিলেন।
ইথিওপিয়ার তদানীন্তন বাদশাহ তাঁহাকে দাসরূপে জনৈক আরব বণিকের নিকট বিক্রি করিয়াছিলেন। নাজাশী তখন বনূ দামরা গোত্রে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজ্য ফিরিয়া পাইলে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে জর্জরিত আরব মুসলমান মুহাজিরদেরকে তিনিই আশ্রয় দিয়াছিলেন। বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয়ের পর পূর্ব-সদ্ভাবের উপর নির্ভর করিয়া আরব পৌত্তলিকরা মুসলমান মুহাজিরদেরকে ফিরাইয়া আনার জন্য তাঁহার দরবারে নিজেদের প্রতিনিধি দলকে উপঢৌকন সম্ভারাদিসহ প্রেরণ করিলে মুসলমানদের পক্ষে ওকালতি ও দৌত্যকাজের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) এই 'আমর ইবন উমায়্যাকেই পাঠাইয়াছিলেন, অথচ তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন নাই। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন হিজরী তৃতীয় সালে।
ইথিওপীয় দৌত্যকার্য সফলরূপে সম্পন্ন করার পর মদীনায় ফিরিয়া আসিয়া খারাতীম মহল্লায় বসবাস করিতে থাকেন। আবূ নু'আয়ম বলেন, ষাট হিজরীর পরে তিনি ইনতিকাল করেন (পূর্বোক্ত তুহফা; সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৫খ., পৃ. ৭৩)।
📄 আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমী (রা)
(৬) আবদুল্লাহ্ ইবন হু্যাফা আস্-সাহমী (রা): আবদুল্লাহ্ ইবন হুযাফা ইন্ন কায়স ইব্ন আদী ইবন সা'দ ইব্ন সাহম ইব্ন আমর ইবন হাসীস ইন্ন কা'ব ইব্ন লুয়াই ইব্ন গালিব, আবূ হুযাফা আল-কারানী আস-সাহমী। তিনি ছিলেন প্রথম যুগের মুহাজির। তাঁহার ভাই কায়সসহ ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। তদীয় মাতা কিতাবিয়্যা ইবনাতু হারছান ছিলেন বানুল হারিছ ইব্ন আবদ মানাতের মহিলা। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার মাধ্যমেই ঘোষণা করাইয়াছিলেন:
ان ايام منی ایام اكل وشرب وبعال. "মিনার দিনগুলি হইতেছে পানাহার ও দাম্পত্য জীবন যাপনের।"
হযরত উমার (রা)-এর আমলে একবার তিনি রোমকদের হাতে বন্দী হইয়া হত্যার সম্মুখীন হন। তাহারা তাঁহাকে বন্দী করিয়া ফুটন্ত তৈলপাত্রে নিক্ষেপের ভয় দেখাইয়া ইসলাম ত্যাগের জন্য চাপ দেয়। কিন্তু তিনি কোনমতেই ধর্মত্যাগে রাজী হন নাই। নিজের ঈমান রক্ষার জন্য তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করিতেও প্রস্তুত, এই অবস্থা লক্ষ্য করিয়া রোমক বাহিনীর লোকজন তাঁহাকে তাহাদের সম্রাটের দরবারে হাযির করে। তখন সম্রাট বলিলেন, তুমি আমার মস্তক চুম্বন কর, তাহা হইলে তোমাকে মুক্তি দেওয়া হইবে। তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন না। তারপর সম্রাট বলিলেন, তুমি যদি আমার মস্তক চুম্বন কর, তাহা হইলে তোমাকে তোমার সাথিগণসহ মুক্তি দেওয়া হইবে। সঙ্গী-সাথীদের কথা বিবেচনা করিয়া তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন। ফলে তাঁহার ৮০ জন বন্দী সাথীসহ তাঁহাকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইল। অতঃপর যখন তিনি তদীয় সঙ্গীগণসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন তখন খলীফা উমার (রা) বলিলেন, "আমি সহ প্রত্যেক মুসলিমের উচিত তোমার মস্তক চুম্বন করা।" এই কথা বলিয়া সত্যসত্যই তিনি দাঁড়াইয়া তাঁহার মস্তক চুম্বন করিলেন। হযরত উছমান (র)-এর খিলাফত আমলে ৩৩ হিজরীতে মিসরে তিনি ইন্তিকাল করেন (তুহফাতুল লাতীফী, ২খ., পৃ. ৩০; আল-মিসবাহুল মুদী, ১খ., পৃ. ২২০-২২১, সংখ্যা ২০০৮)।
📄 শুজা' ইব্ন ওয়াহব (রা)
(৭) শুজা' ইব্ন ওয়াহব (রা): শুজা' ইব্ন ওয়াহব ইবন রাবী'আ ইব্ন আসাদ আল-আযদী। তিনি বানু 'আবদে শাম্স-এর মিত্র ছিলেন। প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের ভাই 'উকবা ইব্ন আবী ওয়াহ্হ্বসহ বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধসহ ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুগের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। ইথিওপিয়ার দ্বিতীয় হিজরতে তিনি শামিল ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ দামি অধিপতি হারিছ ইব্ন আধী শুমার আল-গাসসানী এবং জাবালা ইব্ন আয়হামের নিকট তাঁহাকে পত্রসহ দূতরূপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইয়ামামার যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। ৮ম হিজরী/৬২৯ খৃ. তাঁহাকে সেনাপতি করিয়া একটি বাহিনী প্রেরিত হইয়াছিল (ইব্ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৬০৭; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬১; তাবারী, ২খ., পৃ. ৬৪৪; ইন্ন খালদুন, পৃ. ৭৮৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৮০; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৩৮৬; জামহারাতu আনসাবিল আরব, পৃ. ১৮১)।
কোন কোন ঐতিহাসিক বলিয়াছেন, দিয়া কালবীর সাথে তিনি রোমেও প্রেরিত হইয়াছিলেন (আসাহহুস-সিয়ার, বাংলা ভাষ্য, পৃ. ৪২৫)।
📄 আমর ইবন হাম্ (রা)
(১০) আমর ইবন হাযম্ (রা): খন্দক যুদ্ধের মাত্র ১৫ বৎসর পর্বে মদীনায় খাযরাজ গোত্রে জন্মগ্রহণকারী এই সাহাবীর উপনাম বা ডাকনাম ছিল আবুদ দুহা ও আবূ মুহাম্মাদ। তাঁহার পিতামহ ও প্রপিতামহের নাম যথাক্রমে যায়দ ও লাওযান। মাত্র পনের বৎসর বয়সে খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নাজরানের বানুল হারিছ গোত্র হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদের আহবানে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণ করার পর সেখানকার লোকজনকে দীন সম্পর্কে জ্ঞান দান, কুরআন শিক্ষা দান এবং যাকাত আদায় করার উদ্দেশ্যে তাঁহাকে সেই দেশে প্রেরণ করেন। ঐ সময় তাঁহার বয়স ছিল মাত্র সতের বৎসর। সেখানে তাঁহাকে প্রেরণকালে ইসলামের বিস্তারিত বিধিবিধান সম্বলিত একখানা লিপিও রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে প্রদান করেন। নবী কারীম তাহাকে ইয়ামানের শাসনকর্তা নিয়োগকালেও এরূপ একখানা লিপি তাঁহাকে দিয়াছিলেন। ৫১ হিজরীতে, মতন্তরে ৫৩ অথবা ৫৪ হিজরীতে হযরত উমার (রা)-এর খিলাফত আমলে মদীনায় তিনি ইন্তিকাল করেন। এই বর্ণনা আবূ নু'আয়ম ও আবুত-তাহযীব গ্রন্থের (তুহফাতুল লাতীফ ফী তারীখিল মাদীনা, ২খ., পৃ. ৩১৯, সংখ্যা ৩১৬৬)।