📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাতিব ইব্‌ন আবী বালতা'আ (রা)

📄 হাতিব ইব্‌ন আবী বালতা'আ (রা)


হাতিব ইব্‌ন আবী বালতা'আ (রা): হিজরত-পূর্ব ৩৫ সালে লাখম ইবন 'আদীর বংশে জন্মগ্রহণকারী উক্ত সরলমনা সাহাবী একজন দক্ষ তীরন্দায এবং ব্যক্তিগত জীবনে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। জাহিলিয়াতের যুগেও তিনি তীরন্দাযী এবং কবি প্রতিভার জন্য বিখ্যাত ও সমাদৃত ছিলেন। তিনি কুরায়শদের চুক্তিবদ্ধ মিত্র ছিলেন। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে তাঁহার পরিবার-পরিজন মক্কায় কাফিরদের সহিত অবস্থানরত থাকায় তাহারা তাঁহার পরিবারের সাথে যাহাতে সদয় আচরণ করে এই আশায় তিনি কুরায়শদেরকে পত্র মারফত রাসূলুল্লাহ্-এর অভিযানের সংবাদ জানাইবার প্রয়াস পান। তাঁহার ধারণা ছিল, ইহাতে আল্লাহর নবীর কোনই ক্ষতি হইবে না, অথচ তাহার নিজ পরিবার বিরূপ পরিবেশে একটু সদয় আচরণ পাইবে। হযরত উমার (রা) এইজন্য এতই ক্ষিপ্ত হন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্-কে এই বলিয়া অনুরোধ জানান, তাহাকে এই মুনাফিকের গর্দান উড়াইয়া দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হউক। জবাবে রাসূলুল্লাহ্ বলেন, উমার! তুমি কি ভুলিয়া গিয়াছ, হাতিব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারিগণ আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমতাহানা নাযিলের মাধ্যমে তাঁহার ঈমানদার হওয়ার ঘোষণা দিলেন এইভাবে :
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ عَدُوِّى وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَآءَ.
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না" (৬০:১)।
বলা বাহুল্য, তিনি খাঁটি ঈমানদার না হইলে এইভাবে ঈমানদারগণকে লক্ষ্য করিয়া আয়াত নাযিল হইত না। যে ছয়জন সাহাবীকে রাসূলুল্লাহ্ ছয়জন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে একই দিনে দূতরূপে প্রেরণ করিয়াছিলেন হাতিব তাঁহাদের একজন। তিনি মিসর-রাজ মুকাওকিসের দরবারে পৌঁছিয়া সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন। ৩০ হিজরীতে ৬৫ বৎসর বয়ঃক্রমকালে মদীনায় তাঁহার মৃত্যু হয় (ই'লামুস-সাইলীন, পৃ. ৮১; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৪৩২; সীরাতুন্নবী, ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৬০৭, আরবী; ঐ বঙ্গানুবাদ, ইফা প্রকাশিত, ৪খ., পৃ. ৩৭-৩৮; তাবারী, ২খ., পৃ. ৬৪৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৮০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দিহয়া ইব্‌ন খালীফা আল-কালবী (রা)

📄 দিহয়া ইব্‌ন খালীফা আল-কালবী (রা)


দিয়া ইব্‌ন খালীফা আল-কালবী (রা): বিখ্যাত ছয় রাষ্ট্রপ্রধানের নামে পত্র প্রেরণের সময় রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে তদানীন্তন বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিধর রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে পত্রসহ প্রেরণ করিয়াছিলেন। পূর্বপরুষ কাল্‌ব ইব্‌ন ওবায়ার নামের সহিত সম্পৃক্ত করিয়া তাঁহাকে কালবী বলা হইত। বংশলতিকা এইরূপঃ দিহয়া ইব্‌ন খালীফা ইব্‌ন ফারওয়া ইব্‌ন ফুদালা ইব্‌ন যায়দ আল-কালবী। ইয়ামানী ভাষায় দিয়া অর্থ নেতা। প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। বদর ছাড়া অন্যান্য জিহাদে নবী কারীম -এর সঙ্গে থাকিয়া যুদ্ধ করেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। হযরত মু'আবিয়ার খিলাফতকাল পর্যন্ত সিরিয়ায় মিয্যা নামক স্থানে বসবাস করেন। আল্লামা শামসুদ্দীন সাখাবী তাঁহার বর্ণনা দিতে গিয়া বলেন:
كان جبريل ياتى رسول الله ﷺ على صورته فى بعض الاحيان وكان اجمل الناس وجها وكان اذا قدم المدينة من الشام لم تبق معصر الا خرجت نظر اليه. "জিব্রাঈল (আ) কোন কোন সময় তাঁহার বেশে নবী দরবারে হাযির হইতেন। তিনি ছিলেন সর্বাধিক সুন্দর পুরুষ। যখন সিরিয়া হইতে মদীনায় পদাপর্ণ করিলেন তখন তাঁহাকে একনজর দেখিবার জন্য বাহির হইতেন না, সমসাময়িক এমন একটি ব্যক্তিও ছিলেন না, (আত-তুহফাতু'ল-লাতীফ ফী তারীখিল মাদীনা, ১খ., পৃ. ৩৩১, সংখ্যা ১১৮৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামারী

📄 আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামারী


আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামারী: আমর ইবন উমায়্যা ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন আয়াস আবূ মুনিয়্যা আদ-দামারী। ইবন সা'দ বলেন, মুশরিক বাহিনী উহুদ ত্যাগ করার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত বীরপুরুষ ছিলেন। অনেক ব্যাপারে তিনি ছিলেন অগ্রণী। ৪র্থ হিজরীতে বি'রে মা'উনার হৃদয়বিদারক ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন এবং সত্তরজন মুসলিম কুরআন বিশেষজ্ঞের মধ্যে একমাত্র তিনিই জীবিত অবস্থায়' ফিরিয়া আসেন। হযরত খুবায়বকে যখন কাফিররা শূলে চড়াইয়া শহীদ করে তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার লাশ শূলির কাষ্ঠ হইতে গোপনে নামাইয়া আনার জন্য তাঁহাকেই প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইব্‌ন আবদিল বার তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করিতে গিয়া বলেন:
كان من رجال العرب نجدة وجرأة وكان رسول الله ﷺ يبعثه فى اموره. "তিনি আরবজাতির নির্ভরযোগ্য সাহসী ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার বিশেষ বিশেষ মিশনে তাঁহাকে প্রেরণ করিতেন” (আত-তুহফাতুল লাতীফ, ২খ., পৃ. ৩১৭, সংখ্যা ৩১৫৫)।
হিজরত পূর্ব আনুমানিক ২৫ সালে মদীনার নিকটবর্তী বদর এলাকায় দামরা গোত্রে জন্মগ্রহণকারী এই সাহাবী বৈবাহিক সূত্রে 'আবদে শামস গোত্রের মিত্রগোত্রের সাথে আবদ্ধ ছিলেন। ইথিওপীয় শাসক নাজাশীর সহিত 'আবদে শামস গোত্রের সুসম্পর্ক থাকায় 'আমর ইবন উমায়্যা প্রায়ই ইথিওপিয়ায় যাতায়াত করিতেন। এক সময় নাজাশী ঐ বনূ আবদে শামস গোত্রে
দাসরূপে জীবন যাপন করিয়াছিলেন এবং তখন তিনি আরবী ভাষাও শিক্ষা করিয়াছিলেন।
ইথিওপিয়ার তদানীন্তন বাদশাহ তাঁহাকে দাসরূপে জনৈক আরব বণিকের নিকট বিক্রি করিয়াছিলেন। নাজাশী তখন বনূ দামরা গোত্রে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজ্য ফিরিয়া পাইলে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে জর্জরিত আরব মুসলমান মুহাজিরদেরকে তিনিই আশ্রয় দিয়াছিলেন। বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয়ের পর পূর্ব-সদ্ভাবের উপর নির্ভর করিয়া আরব পৌত্তলিকরা মুসলমান মুহাজিরদেরকে ফিরাইয়া আনার জন্য তাঁহার দরবারে নিজেদের প্রতিনিধি দলকে উপঢৌকন সম্ভারাদিসহ প্রেরণ করিলে মুসলমানদের পক্ষে ওকালতি ও দৌত্যকাজের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) এই 'আমর ইবন উমায়্যাকেই পাঠাইয়াছিলেন, অথচ তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন নাই। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন হিজরী তৃতীয় সালে।
ইথিওপীয় দৌত্যকার্য সফলরূপে সম্পন্ন করার পর মদীনায় ফিরিয়া আসিয়া খারাতীম মহল্লায় বসবাস করিতে থাকেন। আবূ নু'আয়ম বলেন, ষাট হিজরীর পরে তিনি ইনতিকাল করেন (পূর্বোক্ত তুহফা; সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৫খ., পৃ. ৭৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমী (রা)

📄 আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমী (রা)


(৬) আবদুল্লাহ্ ইবন হু্যাফা আস্-সাহমী (রা): আবদুল্লাহ্ ইবন হুযাফা ইন্ন কায়স ইব্‌ন আদী ইবন সা'দ ইব্‌ন সাহম ইব্‌ন আমর ইবন হাসীস ইন্ন কা'ব ইব্‌ন লুয়াই ইব্‌ন গালিব, আবূ হুযাফা আল-কারানী আস-সাহমী। তিনি ছিলেন প্রথম যুগের মুহাজির। তাঁহার ভাই কায়সসহ ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। তদীয় মাতা কিতাবিয়্যা ইবনাতু হারছান ছিলেন বানুল হারিছ ইব্‌ন আবদ মানাতের মহিলা। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার মাধ্যমেই ঘোষণা করাইয়াছিলেন:
ان ايام منی ایام اكل وشرب وبعال. "মিনার দিনগুলি হইতেছে পানাহার ও দাম্পত্য জীবন যাপনের।"
হযরত উমার (রা)-এর আমলে একবার তিনি রোমকদের হাতে বন্দী হইয়া হত্যার সম্মুখীন হন। তাহারা তাঁহাকে বন্দী করিয়া ফুটন্ত তৈলপাত্রে নিক্ষেপের ভয় দেখাইয়া ইসলাম ত্যাগের জন্য চাপ দেয়। কিন্তু তিনি কোনমতেই ধর্মত্যাগে রাজী হন নাই। নিজের ঈমান রক্ষার জন্য তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করিতেও প্রস্তুত, এই অবস্থা লক্ষ্য করিয়া রোমক বাহিনীর লোকজন তাঁহাকে তাহাদের সম্রাটের দরবারে হাযির করে। তখন সম্রাট বলিলেন, তুমি আমার মস্তক চুম্বন কর, তাহা হইলে তোমাকে মুক্তি দেওয়া হইবে। তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন না। তারপর সম্রাট বলিলেন, তুমি যদি আমার মস্তক চুম্বন কর, তাহা হইলে তোমাকে তোমার সাথিগণসহ মুক্তি দেওয়া হইবে। সঙ্গী-সাথীদের কথা বিবেচনা করিয়া তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন। ফলে তাঁহার ৮০ জন বন্দী সাথীসহ তাঁহাকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইল। অতঃপর যখন তিনি তদীয় সঙ্গীগণসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন তখন খলীফা উমার (রা) বলিলেন, "আমি সহ প্রত্যেক মুসলিমের উচিত তোমার মস্তক চুম্বন করা।" এই কথা বলিয়া সত্যসত্যই তিনি দাঁড়াইয়া তাঁহার মস্তক চুম্বন করিলেন। হযরত উছমান (র)-এর খিলাফত আমলে ৩৩ হিজরীতে মিসরে তিনি ইন্তিকাল করেন (তুহফাতুল লাতীফী, ২খ., পৃ. ৩০; আল-মিসবাহুল মুদী, ১খ., পৃ. ২২০-২২১, সংখ্যা ২০০৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00