📄 বালিয়্যি প্রতিনিধি দলের ইসলাম গ্রহণ
সাহাবী রুয়াইফা' ইব্ন ছাবিত আল-বালয়াবী (রা)-এর গোত্র বালিয়্যি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট নবম হিজরী সনের রবী'উল আউয়াল মাসে আগমন করিয়াছিল। গোত্রীয় আত্মীয়তার কারণে তাহারা আসিয়া তাঁহারই মেহমান হয়। অতঃপর তাঁহাকেই সঙ্গে লইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হয়। রুয়াইফা' (রা) তাহাদিগকে পরিচয় করাইতে গিয়া বলিয়াছিলেন, উহারা আমারই গোত্রীয় লোক। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে ও তাহার গোত্রকে মারহাবা বলিয়া স্বাগত জানাইলেন। তাহারা সকলেই তখন ইসলাম গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন:
الحمد لله الذي هداكم للاسلام فكل من مات على غير الاسلام فهو في النار. "সকল প্রশংসা আল্লাহ্র যিনি তোমাদেরকে ইসলামের জন্য হিদায়াত করিয়াছেন। ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত কেহ মারা গেলে জাহান্নামে যাইবে।"
আবুদ-দাবীব নামে প্রতিনিধি দলে একজন বৃদ্ধ ছিল। সে জিজ্ঞাসা করিল, মেহমানদারী করা তাহার বড়ই সখ। উহাতে সে কি ছওয়াব লাভ করিবে? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যত ভাল কাজ তোমরা করিবে উহা ধনী ও নির্ধন যে কাহারও জন্য করা হউক তাহা তো সাদাকা হিসাবে গণ্য হইবে। সে আবারও জিজ্ঞাসা করিল, মেহমানদারী কত দিন পর্যন্ত করিতে হয়? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তিনদিন। উহার পর মেহমানদারী করা সাদাকার সমপর্যায়ের। মেহমানের জন্যও উচিৎ হইবে না যে, তিন দিন পরও সে অতিথি থাকিবে। অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, মাঠে ঘাটে পাওয়া ভেড়া ও বকরী, যেইগুলি মালিকের নিকট হইতে হারাইয়া গিয়াছে, তাহার হুকুম কি? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হয়ত উহা তোমার হইবে, বা তোমার ভাইয়ের (মালিকের)। আর যদি উহা ধরিয়া না রাখ তাহা হইলে উহা নেকড়ে বাঘ সাবাড় করিয়া ফেলিবে। হারাইয়া যাওয়া উট সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি উত্তর দিলেন, উহা ধরিয়া রাখা তোমার জন্য উচিত নয়। সে-ই তাহার মালিককে তালাশ করিয়া বাহির করিবে। রুয়াইকা' (রা) বলেন, অতঃপর তাহারা আমার গৃহে ফিরিয়া আসিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগের জন্য খেজুর লইয়া আসিয়া তাহাদিগকে দান করিলেন। তিন দিন এখানে অবস্থান করিবার পর তাহারা রওয়ানা করিলে রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে সাদর বিদায়ী সম্ভাষণ জানাইলেন (দানাপুরী, প্রাগুক্ত, ৪৪১)।
📄 'আযরা গোত্রে ইসলাম
'আযরা সিরিয়ার একটি বিখ্যাত এলাকার নাম। বানু 'আযরা সেখানে বসবাস করিত বলিয়া এখানকার নাম 'আযরা হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। নবম হিজরীর সফর মাসে সেখানকার বার জন লোক রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করে। তাহাদের প্রখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন হামযা ইবনুন নু'মান (রা)। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমরা কোন গোত্রের লোক? তাহারা উত্তর দিল, আমরা বানু 'আযরার লোক,
মাতৃপক্ষ হইতে যাহারা কুসায়্যির ভাই। সুতরাং আমরা আপনারই আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ্ তখন আহলান সাহলান বলিয়া তাহাদিগকে স্বাগত জানাইলেন। তখন তাহারা সকলেই ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে সিরিয়া বিজয়ের সুসংবাদ দান করিয়াছিলেন এবং হিরাক্লিয়াসের পলায়নের অগ্রিম বার্তা জানাইয়া দিয়া দিলেন। উহাদিগকে গণকের নিকট না যাওয়ার এবং কুরবানী ব্যতীত অন্যান্য সকল ধরনের যবেহ করা হইতে নিষেধ করিয়া দিলেন। তাহারা কয়েক দিন রামলায় অবস্থান করিয়া ফিরিয়া গেল। প্রত্যাবর্তনের সময় যথারীতি রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে তাহাদের উপঢৌকন দিয়াছিলেন (দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪০)।
📄 নাখ'আ প্রতিনিধি দলের আগমন
নাখ'আ ইয়ামানের একটি প্রতিনিধি দলের নাম। উহারা প্রতিনিধিদল হিসাবে আগমনকারী সর্বশেষ দল ছিল। একাদশ হিজরীর মুহাররামের মাঝামাঝি সময়ে তাহারা আগমন করে। এই প্রতিনিধি দলে দুই শত লোক আসিয়াছিলেন। তাঁহারা পূর্বেই মু'আয ইবন জাবাল (রা)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আসিয়া তাঁহারা কেবল উহার অনুমোদন লাভ করিয়াছিলেন।
যুরারাহ ইব্দ 'আমর (রা) এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট নিবেদন করিলেন যে, সফরে তিনি বিস্ময়কর কিছু স্বপ্ন দেখিয়াছেন। উহার একটি স্বপ্নছিল এই যে, 'একটি গাধী লাল কাল একটি বাছুর প্রসব করিয়াছে।' রাসূলুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি বাসস্থানে কোন গর্ভবতী দাসী রাখিয়া আসিয়াছেন কি? তিনি হ্যাঁ সূচক জওয়াব দিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সে একটি সন্তান প্রসব করিয়াছে, সন্তানটি আপনারই ঔরস জাত। বাছুরটির রঙ এমন কেন সেই সম্পর্কে অবহিত হইতে চাহিলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে পাশে ডাকিয়া আনিয়া চুপে চুপে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার শরীরের কোন স্থানে শ্বেত রোগ আছে কি যাহা তুমি গোপন করিয়া রাখিয়াছ?
তিনি বিস্ময়াভিভূত হইয়া স্বীকার করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেহই এই সম্পর্কে অবহিত ছিল না। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, স্বপ্নে সেই রঙই দেখানো হইয়াছে। যুরারা (রা) বলিলেন, আমি স্বপ্নে আরও দেখিয়াছি যে, নু'মান ইবনুল মুনযির মোতি ও মণিমুক্তা দ্বারা সজ্জিত। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা আরবের বাস্তব রূপ, যাহা উন্নত মানের আকার-আকৃতি ধারণ করিবে। যুরারা (রা) আরও বলিলেন, আমি দেখিলাম, এক বৃদ্ধা মহিলা দীর্ঘ কেশধারী ভূ-পৃষ্ঠ হইতে উত্থিত হইতেছে। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা আরব এলাকা ব্যতীত অন্য দেশের অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন।
যুরারা সর্বশেষ যেই স্বপ্নের কথা বলিলেন তাহা হইল, তিনি ভূ-পৃষ্ট হইতে আগুন উত্থিত হইতে দেখিলেন, আর উহা তাহার ও তাহার পুত্র 'আমরের মাঝে আড়াল হইয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ্ উহার তা'বীর করিলেন, উহা হইল ফিতনা যাহা পরবর্তী কালে প্রকাশিত হইবে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ফিতনার ধরন কিরূপ হইবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, জনগণ তাহাদের ইমামকে হত্যা করিবে, মুসলমানগণ পরস্পর খুনাখুনিতে লিপ্ত হইবে, এক মুসলমান
অপর মুসলমানকে হত্যা করাকে পানি পান করা হইতেও অধিকতর প্রিয় মনে হইবে। যদি তোমার পূর্বে তোমার পুত্র ইনতিকাল করে তাহা হইলে তুমি এই ফিতনা দেখিয়া যাইবে আর যদি তুমি তাহার পূর্বে ইনতিকাল কর তাহা হইলে সে নিজেই সেই ফিতনা দেখিতে পাইবে। যুরারা বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! দু'আ করুন আল্লাহ্ তা'আলা যেন আমাকে সেই ফিতনার সম্মুখীন না করেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাঁহার জন্য দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! তাঁহাকে এই ফিতনার সম্মুখীন করিও না। ফলে কিছু দিন পরই তাঁহার ইনতিকাল হইয়া গেল। কিন্তু তাঁহার পুত্র আমীরুল মুমিনীন উছমান ইব্ন আফফান (রা)-এর বিরুদ্ধাচরণকারীগণের দলভুক্ত ছিল (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) আল-কুরআনুল করীম, ৪৮: ১, ১১০: ১-৩, ৩৪ ৫৯-৬১, ৪৯: ১৭, ৪৯: ৫; (২) মুহাম্মাদ ইব্ন ইসমাঈল আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., ৬২২, ২খ., ৬২৯, ২খ., ৬৩০, ২খ., ৬২৬; (৩) মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশায়রী, আস-সহীহ, দেওবন্দ তা. বি., ২খ., পৃ. ৪৮, ২খ., পৃ. ৩০৪; (৪) আবূ দাউদ আস-সিজিস্তানী, সুনান, দেওবন্দ সংস্করণ, তা. বি., ১খ., ৭৯; (৬) আল-খাতীব তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, দেওবন্দ সংস্করণ, তা. বি., পৃ. ৩২৪; (৭) তাবারী, আত-তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, তা. বি., ২খ., পৃ. ১২৬, ৩খ., পৃ. ১৩০; (৮) ইব্ন খালদুন, কিতাবুল ইবার ওয়াদ-দীওয়ান (তারীখে ইব্ন খালদুন), বৈরূত ১৩৯১/১৯৭১, ২খ., পৃ. ৫৭; (৯) ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, বৈরূত ১৪১৫/১৯৯৪, ৫খ., পৃ. ৪২, ৫০, ৬৮, ৭৮; (১০) আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, বৈরূত তা. বি., ৭খ., পৃ. ৪১৬, ৪২৮; (১১) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, বৈরূত তা. বি., ১খ., পৃ. ৩২; (১২) ইন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (তাফসীরে ইবন কাছীর, উর্দু), আশরাফী বুক ডিপো, তা. বি., ১খ., ৩য় পারা, পৃ. ৭৫; (১৩) আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, দেওবন্দ সংস্করণ, তা. বি., ৩৮৭, ৪২২, ৪২৩, ৪২৪, ৪৩০, ৪৪৮; (১৪) মুহাম্মদ ইব্ন উছমান, নাসরুল বারী, চক বাজার, ঢাকা তা. বি., ৮খ., পৃ. ৪২০, ৪২৯; (১৫) শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মদীনা পাবলিকেশন্স, ১৪২১/২০০০ খৃ., পৃ. ৪০৭; (১৬) আকবর খান নজীব আবাদী, তারীখে ইসলাম, দেওবন্দ তা. বি., ১খ., ৯২; (১৭) ইবন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, আল-মাকতাবাতুল আশরাফিয়্যা, দেওবন্দ, তা. বি., ৮খ., পৃ. ৭১; (১৮) আহমদ আলী সাহারানপুরী, পাদাটীকা সাহীহ বুখারী, দেওবন্দ সংস্করণ, তা. বি., ২খ., পৃ. ৬৩০; (১৯) বুরহানুদ্দীন আল-হালাবী, আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, বৈরুত, তা. বি., ৩খ., পৃ. ২১৮।
ফয়সল আহমদ জালালী