📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুদা গোত্রে ইসলাম

📄 সুদা গোত্রে ইসলাম


ইয়ামানের একটি অঞ্চলের নাম ছিল সুদা'। ৮ম হিজরী সনে সেখান হইতে একটি প্রতিনিধিদল আগমন করিয়াছিল। ওয়াকিদীর বিবরণ মতে রাসূলুল্লাহ্ যখন জি'ইররানা হইতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযাত্রী দল পাঠাইতে লাগিলেন। এই সময় চার শত মুসলিম সদস্যের একটি বাহিনী কায়স ইবন সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর নেতৃত্বে "কুনাত” অভিমুখে প্রেরণ করেন। তাঁহাদের হাতে সাদা বর্ণের একটি পতাকা অর্পণ করিলেন। ছোট ছোট কাল কিছু ঝাণ্ডাও তাঁহাদিগের নিকট প্রদান করিয়া বলিলেন, ইয়ামান এলাকার সেইদিকে যাত্রা করিও যেখানে সুদা' গোত্র রহিয়াছে। সুদা' এলাকার এক লোক যখন অবহিত হইল যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার স্বাজাতির নিকট একটি দা'ওয়াতী কাফিলা প্রেরণ করিতেছেন, তখন সে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আমার কওমের পক্ষে হইতে আগমন করিয়াছি। আপনি এই কাফেলাটিকে ফিরাইয়া আনুন। আমি আমার গোত্রকে লইয়া আপনার দরবারে উপস্থিত হইব। তাঁহার কথায় রাসূলুল্লাহ্ (কায়স ইবন সা'দকে কুনাত হইতে প্রত্যাহার করিয়া লইলেন। অতঃপর সুদাঈ গোত্রীয় এই লোকটি স্বীয় গোত্রে ফিরিয়া গেলেন এবং পনের সদস্যের একটি দল লইয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা সকলেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন এবং স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। তাঁহারা নিজ বাসভূমিতে ফিরিয়া গিয়া ব্যাপক হারে ইসলামের দা'ওয়াত দিতে লাগিলেন, লোকজনও ইসলাম গ্রহণ করিতে লাগিল। ফলে বিদায় হজ্জের প্রাক্কালে এই গোত্রের একশতজন মুসলিম মক্কায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত হজ্জে শরীক হইয়াছিলেন (আসংহুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৫)।
যিনি রাসূলুল্লাহ্-কে কাফেলা প্রত্যাহার করিয়া লওয়ার আবেদন করিয়াছিলেন তাঁহার নাম ছিল যিয়াদ ইবনুল হারিছ আস-সুদা'ঈ (রা)। প্রতিনিধি দল লইয়া আসিবার পর রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, হে সুদা গোত্রের ভ্রাতা! তোমাকে তোমার গোত্রীয় লোকেরা বড়ই মূল্যায়ন করে। উত্তরে তিনি বলিলেন, উহা আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের অনুগ্রহের ফল। ইব্ন কাছীর বায়হাকীর উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, যিয়াদ ইবনুল হারিছ আস-সুদা'ঈ (রা) তাঁহার কওমের লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিবার পূর্বেই ব্যক্তিগতভাবে আসিয়া
ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অনুরোধে রাসূলল্লাহ্ প্রেরিত অভিযাত্রী কাফেলাকে অন্য লোক পাঠাইয়া ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট অবস্থানরত তাঁহার কওমের নিকট পত্র লিখিয়াছিলেন। পত্র পাইয়া রাসূলূল্লাহ্-এর নিকট একটি প্রতিনিধি দল চলিয়া আসে। স্বীয় কওমের তাৎক্ষণিক সাড়া দান প্রত্যক্ষ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ মন্তব্য করিয়াছিলেন, তুমিই স্বীয় কওমের যোগ্য অধিকর্তা। জওয়াবে তিনি বলিয়াছিলেন, উহা আমার যোগ্যতা নয় বরং আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে হিদায়াত দান করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ তখন আমাকে স্বীয় কওমের উপর আমীর নিয়োগ করিতে চাহিলে আমি উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিলাম। তিনি তখন আমাকে আমীর নিয়োগ মর্মে একটি আদেশ নামা লিখিলেন। আমি তখন আবেদন করিলাম, স্বীয় গোত্র হইতে সাদাকা সংগ্রহ করিয়া উহা হইতে কিছু অংশ আমাকে ব্যয় করিবার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ্ এই মর্মে অপর একটি ফরমান লিখিয়া দিলেন। হারিছ আস-সুদা'ঈ বলেন, আমার এই চাওয়া এবং রাসূলূল্লাহর কর্তৃক তাহা প্রদান করা কোন এক সফরের ঘটনা ছিল। রাসূলুল্লাহ্ এই সফরের প্রাক্কালে কোন এক রসত বাড়ীতে আশ্রয় লইলে সেখানকার লোকজন তাহাদের সাদাকা আদায়কারী আমীর সম্পর্কে অভিযোগ করিল। উপস্থিত লোকদের সম্মুখে রাসূলুল্লাহ্ এই মন্তব্য করিলেন:
لاخير في الامارة لرجل مؤمن "মু'মিন ব্যক্তির জন্য নেতৃত্ব গ্রহণে কোন কল্যাণ নাই"।
যিয়াদ আস-সুদা'ঈ বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর এই মন্তব্য আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করিল। অতঃপর আরও একটি লোক আসিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট কোন জিনিস চাহিল। তিনি উত্তরে বলিলেন:
من سأل الناس عن ظهر غنى فصداع في الرأس وداء في البطن. "ধনাঢ্য অবস্থায় মানুষের নিকট যাজ্ঞা করা মাথা ব্যথা ও পেটের অসুস্থতার পরিচায়ক"। যাজ্ঞাকারী লোকটি তখন বলিল, তাহা হইলে আমাকে সাদাকার সম্পদ হইতে দান করুন। জওয়াবে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা সাদাকা বণ্টনের ক্ষেত্রে নবী বা অন্য কাহারও মতামত গ্রহণ করেন নাই। তিনি স্বয়ং উহা আট ভাগে ভাগ করিয়া দিয়াছেন। যদি তুমি আট শ্রেণীর কোন এক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হও তাহা হইলে তোমাকে উহা হইতে আমি প্রদান করিব। রাসূলুল্লাহ্-এর এই অভিমতও আমার হৃদয়ে রেখাপাত করিল। অতঃপর রাত্রিকালে সকল লোক চলিয়া গেলে রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত আমি নিশি যাপন করিলাম। ফজরের সালাতের সময় হইলে তিনি বলিলেন, হে সুদা'ঈ ভাই, তোমার নিকট কোন পানি আছে কি? আমি উত্তর দিলাম, এত অল্প পরিমাণ পানি আছে যাহা আপনার জন্য যথেষ্ট নয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা পাত্রে ঢালিয়া আমার নিকট লইয়া আস। আমি তাহাই করিলাম, তিনি তাঁহার হাতের তালু পানিতে স্পর্শ করিলে দুই আঙ্গুলের মধ্যবর্তী স্থান দিয়া পানির ফোয়ারা বাহির হইতে দেখিলাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যাহাদের পানির প্রয়োজন রহিয়াছে তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া প্রয়োজন
অনুসারে পানি লইয়া যাওয়ার জন্য বল। প্রয়োজন অনুযায়ী সকলেই পানি লইয়া গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সালাতে দাঁড়াইতে চাহিলেন। বিলাল (রা) তখন ইকামত দানের জন্য দাঁড়াইলেন। যেহেতু আমি পূর্বে আযান দিয়াছিলাম সেজন্য রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে বলিলেন, তোমার সুদা'ঈ ভাই আযান দিয়াছে আর নিয়ম হইল যে আযান দিবে, ইকামত দেওয়া তাহারই অধিকার। সুতরাং আমি ইকামত দিলাম। রাসূলুল্লাহ্ যখন সালাত শেষ করিলেন, তখন আমাকে প্রদত্ত তাঁহার দুইটি আদেশনামা লইয়া উপস্থিত হইলাম। নিবেদন করিলাম, আমাকে উহা হইতে অব্যাহতি দান করুন হে আল্লাহ্র রাসূল! তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কী হইয়াছে তোমার? সুদা'ঈ বলিলেন, আমি আপনার ইরশাদ শুনিয়াছি, নেতৃত্বে গ্রহণের মধ্যে কোন মু'মিন ব্যক্তির কল্যাণ নাই। আমি তো আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের উপর ঈমানদার। আমি আপনার ইরশাদ আরও শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি স্বচ্ছল অবস্থায় মানুষের নিকট সওয়াল করবে তাহার মাথায় বেদনা দেখা দিবে এবং পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হইবে। অথচ আমি আপনার নিকট সওয়াল করিয়াছি স্বচ্ছলাবস্থায়। রাসূলুল্লাহ্ আবারও তাহা স্থির রাখিয়া বলিলেন, হ্যাঁ, বিষয় তাহাই হইবে, চাহিলে তুমি বজায় রাখ, না হয় তাহা অর্পণ করিয়া দাও। তিনি আরও বলিলেন, তাহা হইলে তুমি এমন একজন লোককে দেখাইয়া দাও যাহাকে আমীর নিয়োগ করা যায়। সুদা'ঈ একজন লোকের কথা বলিলে তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ এই গোত্রের আমীর নিয়োগ করিলেন। অতঃপর যিয়াদ ইবনুল হারিছ আস-সুদা'ঈ নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের এখানে একটি কুঁয়া রহিয়াছে। উহার পানি শীতকালে আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়, কিন্তু গ্রীষ্ম কালে উহা শুকাইয়া যায়। ফলে গোত্রের লোকজন গ্রীষ্মকালে এই দিক সেই দিকে গিয়া বাস করিতে থাকে। আমরা অল্প সংখ্যক মুসলমান, বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতে আমাদের জীবনের আশংকা রহিয়াছে। ফলে আমাদের এই কুয়াটির জন্য দু'আ করুন। রাসূলুল্লাহ্ সাতটি কংকর হাতে লইয়া তাহা মর্দন করিলেন এবং তাহার হাতে দিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র নাম লইয়া একটি একটি করিয়া কংকর কুয়াতে নিক্ষেপ করিবে। যিয়াদ সুদা'ঈ সেই মতই করিলেন, ফলে তাহার পানি আর কোন দিন শুকাইল না (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৬৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানুল মুনতাফিক প্রতিনিধি দলের আগমন

📄 বানুল মুনতাফিক প্রতিনিধি দলের আগমন


লাকীত ইবন 'আমির এবং নুহায়ক ইব্‌ন 'আসিম ইবন মালিক ইবনুল মুনতাফিক দলীয় প্রতিনিধি হিসাবে রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে আগমন করিয়াছিল। লাকীত ইবন 'আমির বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে যখন উপনীত হইয়াছিলাম তখন তিনি ফজরের সালাত হইতে অবসর হইয়া বলিলেন, উপস্থিত জনতা! চারিদিন যাবত আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে কোন কথা বলি নাই, মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর। তোমাদের মধ্য হইতে কেহ এমন রহিয়াছে কি যাহাকে তাহার স্বীয় গোত্রের লোক আমার নিকট প্রতিনিধিস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছে? লাকীত বলেন, আমার এই কথা শুনিয়া লোকজন আমার প্রতি তাকাইতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ্ আবার বলিলেন, আপনারা দীন প্রচারের কাজ যথাযথভাবে পালন করিয়াছেন কি না, সেই সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে। আমি তখন দাঁড়াইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি গায়েব জানেন কি? তিনি তখন জওয়াব দিলেন,
গায়েবের চাবিকাঠি আল্লাহ্ হাতে। অতঃপর এই সম্পর্কিত আল-কুরআনের আয়াতটি পাঠ করিলেন। লাকীত বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আমাদের দেহ টুকরা টুকরা হইয়া যাইবে, বাতাস উহাকে উড়াইয়া কোথা হইতে কোথায় লইয়া যাইবে, না হয় পশু পাখি উহা সাবাড় করিবে ইহা সত্ত্বেও উহা কেমন করিয়া একত্রিত করা হইবে? রাসূলুল্লাহ্ উহা একটি যুক্তি দ্বারা বুঝাইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, ঘনবৃক্ষ লতা-পাতার ও সবুজে ঘেরা একটি উদ্যান ছিল। কিন্তু উহার অবস্থা এক সময় এমন হইয়া গেল যে, মানুষের ধারণা হইল যে, বাগানটি একেবারে শেষ হইয়া গেল। এমনি সময় আল্লাহ্ তা'আলা বৃষ্টি দান করিলেন, ফলে বাগানটি পুনরায় সজীব হইয়া গেল। বৃক্ষ ও চারা গাছ প্রাণ ফিরিয়া পাইল। যেই আল্লাহ্ বৃক্ষ ও চারার জীবন ফিরাইয়া দিতে সক্ষম, তিনিই ছড়ানো ছিটানো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ফিরাইয়া উহা একত্রিত করিতে সক্ষম। লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা তো সংখ্যায় এত বিপুল যে, গোটা জগৎব্যাপী মানুষ আর মানুষ। এক আল্লাহ্ এক সঙ্গে আমাদের সকলকে কিভাবে প্রত্যক্ষ করিবেন? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সারাজগৎ ব্যাপী সূর্য যেভাবে আলোক রশ্মি বিকীরিত করিতে পারে আল্লাহ্ তা'আলা সেই মত গোটা জগৎবাসীকে এক সঙ্গে অবলোকন করিতে সক্ষম হইবেন।
লাকীতের আবার জিজ্ঞাসা, আমরা যখন মহান আল্লাহ্র সম্মুখে উপস্থিত হইব তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সহিত কী আচরণ করিবেন? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ্ হাশরের মাঠের অবস্থা, মু'মিন ও কাফিরের পাওয়া ও চাওয়ার বিষয়ের বিবরণ দিলেন। লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, পাপ পুণ্যের বদলা কিভাবে লাভ করিব? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, একটি নেকীর বদলে দশটি পুরস্কার ও একটি পাপের বিপরীতে একটি শান্তিই ভোগ করিবে। আল্লাহ্ চাহিলে উহাও মার্জনা করিয়া দিতে পারেন।
লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম কি? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, জাহান্নামের সাতটি দ্বার রহিয়াছে। কোন দ্বারেই সত্তর বৎসরের পথের কম দূরত্ব নাই। জান্নাতের রহিয়াছে আটটি দ্বার। কোন দ্বারেই সত্তর বৎসরের পথের কম দূরত্ব নাই। লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, জান্নাতে কি কি রহিয়াছে? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, খাঁটী মধুর নদী, এমন পানীয় বস্তুর নদী যাহা পান করিলে কোন ধরনের নেশা আসিবে না। দুধের নদী যাহার স্বাদ কোন সময় পরিবর্তন হইবে না। জান্নাতে আরও রহিয়াছে সব ধরনের ফলমূল, পূত পবিত্র স্ত্রীগণসহ সকল ধরনের সুখ-শান্তি, যাহার কোন উপমা পার্থিব কোন জিনিসের দ্বারা সম্ভব নয়।
লাকীত তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন বিষয়ের উপর আমরা আপনার নিকট বায়'আত গ্রহণ করিব? রাসূলুল্লাহ্ তখন হাত প্রসারিত করিয়া দিয়া বলিলেন, সালাত কায়েম, যাকাত আদায় এবং এই কথার উপর যে, আল্লাহ্র সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না।
এই হাদীছের বিষয়বস্তু আরও দীর্ঘ। এখানে কেবল অংশবিশেষ উল্লেখ করা হইল। এই রিওয়ায়াতের বিষয়বস্তুর উপর অনেকেই সমালোচনা করিয়াছেন। কিন্তু ইবনুল কায়্যিম উহার ভাষাকে নবুওয়াতের ভাষা বলিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৬৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বালিয়্যি প্রতিনিধি দলের ইসলাম গ্রহণ

📄 বালিয়্যি প্রতিনিধি দলের ইসলাম গ্রহণ


সাহাবী রুয়াইফা' ইব্‌ন ছাবিত আল-বালয়াবী (রা)-এর গোত্র বালিয়্যি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট নবম হিজরী সনের রবী'উল আউয়াল মাসে আগমন করিয়াছিল। গোত্রীয় আত্মীয়তার কারণে তাহারা আসিয়া তাঁহারই মেহমান হয়। অতঃপর তাঁহাকেই সঙ্গে লইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হয়। রুয়াইফা' (রা) তাহাদিগকে পরিচয় করাইতে গিয়া বলিয়াছিলেন, উহারা আমারই গোত্রীয় লোক। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে ও তাহার গোত্রকে মারহাবা বলিয়া স্বাগত জানাইলেন। তাহারা সকলেই তখন ইসলাম গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন:
الحمد لله الذي هداكم للاسلام فكل من مات على غير الاسلام فهو في النار. "সকল প্রশংসা আল্লাহ্র যিনি তোমাদেরকে ইসলামের জন্য হিদায়াত করিয়াছেন। ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত কেহ মারা গেলে জাহান্নামে যাইবে।"
আবুদ-দাবীব নামে প্রতিনিধি দলে একজন বৃদ্ধ ছিল। সে জিজ্ঞাসা করিল, মেহমানদারী করা তাহার বড়ই সখ। উহাতে সে কি ছওয়াব লাভ করিবে? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যত ভাল কাজ তোমরা করিবে উহা ধনী ও নির্ধন যে কাহারও জন্য করা হউক তাহা তো সাদাকা হিসাবে গণ্য হইবে। সে আবারও জিজ্ঞাসা করিল, মেহমানদারী কত দিন পর্যন্ত করিতে হয়? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তিনদিন। উহার পর মেহমানদারী করা সাদাকার সমপর্যায়ের। মেহমানের জন্যও উচিৎ হইবে না যে, তিন দিন পরও সে অতিথি থাকিবে। অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, মাঠে ঘাটে পাওয়া ভেড়া ও বকরী, যেইগুলি মালিকের নিকট হইতে হারাইয়া গিয়াছে, তাহার হুকুম কি? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হয়ত উহা তোমার হইবে, বা তোমার ভাইয়ের (মালিকের)। আর যদি উহা ধরিয়া না রাখ তাহা হইলে উহা নেকড়ে বাঘ সাবাড় করিয়া ফেলিবে। হারাইয়া যাওয়া উট সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি উত্তর দিলেন, উহা ধরিয়া রাখা তোমার জন্য উচিত নয়। সে-ই তাহার মালিককে তালাশ করিয়া বাহির করিবে। রুয়াইকা' (রা) বলেন, অতঃপর তাহারা আমার গৃহে ফিরিয়া আসিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগের জন্য খেজুর লইয়া আসিয়া তাহাদিগকে দান করিলেন। তিন দিন এখানে অবস্থান করিবার পর তাহারা রওয়ানা করিলে রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে সাদর বিদায়ী সম্ভাষণ জানাইলেন (দানাপুরী, প্রাগুক্ত, ৪৪১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 'আযরা গোত্রে ইসলাম

📄 'আযরা গোত্রে ইসলাম


'আযরা সিরিয়ার একটি বিখ্যাত এলাকার নাম। বানু 'আযরা সেখানে বসবাস করিত বলিয়া এখানকার নাম 'আযরা হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। নবম হিজরীর সফর মাসে সেখানকার বার জন লোক রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করে। তাহাদের প্রখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন হামযা ইবনুন নু'মান (রা)। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমরা কোন গোত্রের লোক? তাহারা উত্তর দিল, আমরা বানু 'আযরার লোক,
মাতৃপক্ষ হইতে যাহারা কুসায়্যির ভাই। সুতরাং আমরা আপনারই আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ্ তখন আহলান সাহলান বলিয়া তাহাদিগকে স্বাগত জানাইলেন। তখন তাহারা সকলেই ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে সিরিয়া বিজয়ের সুসংবাদ দান করিয়াছিলেন এবং হিরাক্লিয়াসের পলায়নের অগ্রিম বার্তা জানাইয়া দিয়া দিলেন। উহাদিগকে গণকের নিকট না যাওয়ার এবং কুরবানী ব্যতীত অন্যান্য সকল ধরনের যবেহ করা হইতে নিষেধ করিয়া দিলেন। তাহারা কয়েক দিন রামলায় অবস্থান করিয়া ফিরিয়া গেল। প্রত্যাবর্তনের সময় যথারীতি রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে তাহাদের উপঢৌকন দিয়াছিলেন (দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00