📄 মুহারিব গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
উহারা আরবের খুবই দুর্ধর্ষ জাতি ছিল। চারিত্রিক দিক দিয়াও তাহারা খুবই নিম্নমানের লোক ছিল। নবৃওয়াত লাভের সূচনাকালে যখন রাসূলুল্লাহ্ আরবের বিভিন্ন গোত্রে গিয়া ইসলামের দাওয়াত দিতেছিলেন তখন এই সম্প্রদায় তাঁহার সহিত খুবই রুঢ় আচরণ করিয়াছিল (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৪)।
দশম হিজরী সনে বিদায় হজ্জের প্রাক্কালে মুহারিব গোত্রের দশ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। এই দলের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন সাওয়া ইবনুল হারিছ এবং তদীয় পুত্র খুযায়মা ইন্ন সাওয়া। তাহারা মক্কায় আগমন করিয়া রামলা বিনতুল হারিছের গৃহে অবস্থান করিয়াছিল। তাহাদের নিকট সেখানে সকালে বিকালে খাদ্য পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বিলাল (রা)। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর তাঁহারা বলিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! অতীতের দিনগুলিতে আমাদের নিকট আপনার চেহারা হইতে ঘৃণিত অন্য কোন চেহারা ছিলনা। আর এই মুহূর্তে আমাদের নিকট আপনার চেহারা মুবারক হইতে অধিক প্রিয় অন্য কোন চেহারা নাই। এই প্রতিনিধি দলের এক লোককে রাসূলুল্লাহ্ চিনিয়া ফেলিয়াছিলেন। সে তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাকে এই পর্যন্ত জীবিত রাখিয়াছেন যাহার ফলে আপনাকে সত্য নবী বলিয়া স্বীকার করিয়াছি। তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সকল অন্তরই আল্লাহ্ তা'আলার হাতে। অতঃপর খুযায়মা ইব্ন সাওয়া (রা)-এর চেহারায় হাতে বুলাইয়া দিলেন। ফলে তাঁহার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল চকচকে হইয়া গেল (ইব্ন কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রগুক্ত ৫খ., পৃ.৭০)।
অপর এক সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ উহাদের একটি লোকের প্রতি গভীর মনোনিবেশের মাধ্যমে তাকাইতেছিলেন। তখন মুহারিব গোত্রের এই লোকটি নিবেদন করিয়া বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! সম্ভবত আমার সম্পর্কে আপনি কিছু একটি ভাবিতেছেন? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সম্ভবত আমি তোমাকে পূর্বেই দেখিয়াছি। সে তখন বলিল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আপনি আমাকে দেখিয়াছেন। আপনার সাথে কথা হইয়াছিল, তখন আপনার সহিত আমি কর্কশ ভাষায় কথা বলিয়াছিলাম। আপনার দা'ওয়াতকে বিদ্রূপ করিয়া প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। আর তাহা ঘটিয়াছিল উকায বাজারে। এই মুহূর্তে আপনি আমার নিকট দুনিয়ার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৫)।
📄 তুজায়ব গোত্রে ইসলামের আলো
তুজায়ব ইয়ামানের কিন্ন্দা এলাকার একটি উপগোত্রের নাম। কিনানা ইব্ন বুস্র আত-তুজায়বী যে তৃতীয় খলীফা উছমান ইব্ন আফফান (রা)-এর কুখ্যাত হত্যাকারী ছিল সে ছিল এই গোত্রীয় লোক। অপর দিকে তাজুব হিমইয়ার অঞ্চলের স্বতন্ত্র একটি গোত্রের নাম। হযরত আলী (রা)-এর হত্যাকারী ইব্ন মূলজিম ছিল এই তাজুব গোত্রের লোক। অনেকে এই দুইটি গোত্রকে এক মনে করিয়া বাস্তবতার বিপরীত চলিয়া যান (পাদটীকা, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত পৃ. ৪৩৪)। এই গোত্রের তের জন লোক নবম হিজরীতে প্রতিনিধি দল হিসাবে রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে আগমন করে (ইব্ন কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৭৩)। দরবারে নবৃওয়াতে আগমন কালে তাঁহারা নিজেদের গৃহপালিত প্রাণী এবং ফরয সাদাকার মাল লইয়া আসিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উহা পেশ করিয়া নিবেদন করিয়াছিলেন, আমাদের সম্পদের উপর আল্লাহ তা'আলার যেই হক রহিয়াছে উহা লইয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ উহাতে আনন্দিত হইলেও বলিয়াছিলেন, উহা ফিরাইয়া লইয়া যাও এবং তোমাদের এলাকার দরিদ্রগণের মধ্যে উহা বিতরণ করিয়া দাও। তাঁহারা তদুত্তরে বলিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেখানে বিতরণ করিবার পর যাহা রহিয়াছিল তাহা লইয়া আসিয়াছি। আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) মন্তব্য করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! তুজায়ব গোত্র যেই অভিনব পন্থায় আগমন করিল সেই মত আরবের অন্য কোন গোত্র আসে নাই। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হিদায়াত তো আল্লাহর হাতে। তিনি যাহার কল্যাণ চাহেন ঈমানের জন্য তাহার অন্তর খুলিয়া দেন। অতঃপর তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্ -এরি নিকট কিছু কথা নিবেদন করিলেন। তিনি তাহা লিখাইয়া দিয়া দিলেন। কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কিত আরও কিছু বিষয় তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট জানিতে চাহিলে উহাতে তাঁহার হৃদয়ে উহাদের প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পাইল। তিনি বিলাল (রা)-কে তাঁহাদিগকে উত্তমভাবে আপ্যায়ন করিতে নির্দেশ দিলেন। তাহারা শীঘ্র ফিরিয়া যাইতে চাহিলে রাসূলুল্লাহ্ উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, আমাদের কামনা হইল স্বগোত্রে ফিরিয়া গিয়া যথাশীঘ্র সম্ভব আপনার কথা পৌঁছাইয়া দেওয়া। সাধারণত প্রতিনিধিদল ফিরিয়া যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ যেই উপঢৌকন দিতেন উহা হইতে বেশী পরিমাণ তাহাদিগকে দান করিলেন। যাওয়ার সময় তিনি তাঁহাদের কেহ বাকী রহিয়াছে কিনা জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা বলিল, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এক যুবককে কাফেলার আসবাবপত্র ও যানবাহন দেখাশোনার জন্য পথিমধ্যে রাখিয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তিনি তাহাকে বানু আবযার লোক বলিয়া পরিচয় দিলে তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি অন্যান্য লোকদের প্রয়োজন মিটাইয়া দিয়াছেন। এখন আমার প্রয়োজন মিটাইয়া দেওয়ার পালা। আমার প্রয়োজন কিন্তু সম্পদ বিষয়ক নহে, তাহা অন্য রকম। আমার আগমন শুধু এই জন্য যে, আমার জন্য মাগফিরাতের কামনা করিবেন, আল্লাহ যেন আমার উপর করুণা করেন এবং আমার অন্তরকে পরমুখাপেক্ষী হইতে হিফাজত করেন- সেই দু'আ করিবেন। তাহার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ দু'আ করিলেন:
اللهم اغفر له وارحمه واجعل غناه في قلبه. "হে আল্লাহ্! তাহাকে ক্ষমা কর, করুণা কর, তাহার অন্তরকে অমুখাপেক্ষী করিয়া দাও"।
দু'আর সহিত অন্যান্য লোকদের জন্য যেই হাদিয়া তুহফা দেওয়া হইয়াছিল তাহাকেও সেইরূপ দান করিয়া বিদায় জানাইলেন। বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত বানূ আবযা গোত্রের কিছু লোকের সাক্ষাত হইলে তিনি ঐ যুবক ছেলেটি সম্পর্কে তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা তাহার অতুলনীয় অমুখাপেক্ষিতার কথা তুলিয়া ধরেন। রাসূলুল্লাহ্-এর ইনতিকালের পর ইয়ামনে মুরতাদ হইবার যেই হিড়িক পড়িয়াছিল তখন এই ছেলেটি তাহার গোত্রকে উহা হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। আবু বাকর (রা)-এর খিলাফত কালে খলীফা নিজেই তাঁহার খবরাখবর রাখিতেন। তাঁহার সহিত সদাচরণের নির্দেশ প্রদান করেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৩৪)।
📄 সুদা গোত্রে ইসলাম
ইয়ামানের একটি অঞ্চলের নাম ছিল সুদা'। ৮ম হিজরী সনে সেখান হইতে একটি প্রতিনিধিদল আগমন করিয়াছিল। ওয়াকিদীর বিবরণ মতে রাসূলুল্লাহ্ যখন জি'ইররানা হইতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযাত্রী দল পাঠাইতে লাগিলেন। এই সময় চার শত মুসলিম সদস্যের একটি বাহিনী কায়স ইবন সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর নেতৃত্বে "কুনাত” অভিমুখে প্রেরণ করেন। তাঁহাদের হাতে সাদা বর্ণের একটি পতাকা অর্পণ করিলেন। ছোট ছোট কাল কিছু ঝাণ্ডাও তাঁহাদিগের নিকট প্রদান করিয়া বলিলেন, ইয়ামান এলাকার সেইদিকে যাত্রা করিও যেখানে সুদা' গোত্র রহিয়াছে। সুদা' এলাকার এক লোক যখন অবহিত হইল যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার স্বাজাতির নিকট একটি দা'ওয়াতী কাফিলা প্রেরণ করিতেছেন, তখন সে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আমার কওমের পক্ষে হইতে আগমন করিয়াছি। আপনি এই কাফেলাটিকে ফিরাইয়া আনুন। আমি আমার গোত্রকে লইয়া আপনার দরবারে উপস্থিত হইব। তাঁহার কথায় রাসূলুল্লাহ্ (কায়স ইবন সা'দকে কুনাত হইতে প্রত্যাহার করিয়া লইলেন। অতঃপর সুদাঈ গোত্রীয় এই লোকটি স্বীয় গোত্রে ফিরিয়া গেলেন এবং পনের সদস্যের একটি দল লইয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা সকলেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন এবং স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। তাঁহারা নিজ বাসভূমিতে ফিরিয়া গিয়া ব্যাপক হারে ইসলামের দা'ওয়াত দিতে লাগিলেন, লোকজনও ইসলাম গ্রহণ করিতে লাগিল। ফলে বিদায় হজ্জের প্রাক্কালে এই গোত্রের একশতজন মুসলিম মক্কায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত হজ্জে শরীক হইয়াছিলেন (আসংহুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৫)।
যিনি রাসূলুল্লাহ্-কে কাফেলা প্রত্যাহার করিয়া লওয়ার আবেদন করিয়াছিলেন তাঁহার নাম ছিল যিয়াদ ইবনুল হারিছ আস-সুদা'ঈ (রা)। প্রতিনিধি দল লইয়া আসিবার পর রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, হে সুদা গোত্রের ভ্রাতা! তোমাকে তোমার গোত্রীয় লোকেরা বড়ই মূল্যায়ন করে। উত্তরে তিনি বলিলেন, উহা আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের অনুগ্রহের ফল। ইব্ন কাছীর বায়হাকীর উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, যিয়াদ ইবনুল হারিছ আস-সুদা'ঈ (রা) তাঁহার কওমের লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিবার পূর্বেই ব্যক্তিগতভাবে আসিয়া
ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অনুরোধে রাসূলল্লাহ্ প্রেরিত অভিযাত্রী কাফেলাকে অন্য লোক পাঠাইয়া ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট অবস্থানরত তাঁহার কওমের নিকট পত্র লিখিয়াছিলেন। পত্র পাইয়া রাসূলূল্লাহ্-এর নিকট একটি প্রতিনিধি দল চলিয়া আসে। স্বীয় কওমের তাৎক্ষণিক সাড়া দান প্রত্যক্ষ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ মন্তব্য করিয়াছিলেন, তুমিই স্বীয় কওমের যোগ্য অধিকর্তা। জওয়াবে তিনি বলিয়াছিলেন, উহা আমার যোগ্যতা নয় বরং আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে হিদায়াত দান করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ তখন আমাকে স্বীয় কওমের উপর আমীর নিয়োগ করিতে চাহিলে আমি উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিলাম। তিনি তখন আমাকে আমীর নিয়োগ মর্মে একটি আদেশ নামা লিখিলেন। আমি তখন আবেদন করিলাম, স্বীয় গোত্র হইতে সাদাকা সংগ্রহ করিয়া উহা হইতে কিছু অংশ আমাকে ব্যয় করিবার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ্ এই মর্মে অপর একটি ফরমান লিখিয়া দিলেন। হারিছ আস-সুদা'ঈ বলেন, আমার এই চাওয়া এবং রাসূলূল্লাহর কর্তৃক তাহা প্রদান করা কোন এক সফরের ঘটনা ছিল। রাসূলুল্লাহ্ এই সফরের প্রাক্কালে কোন এক রসত বাড়ীতে আশ্রয় লইলে সেখানকার লোকজন তাহাদের সাদাকা আদায়কারী আমীর সম্পর্কে অভিযোগ করিল। উপস্থিত লোকদের সম্মুখে রাসূলুল্লাহ্ এই মন্তব্য করিলেন:
لاخير في الامارة لرجل مؤمن "মু'মিন ব্যক্তির জন্য নেতৃত্ব গ্রহণে কোন কল্যাণ নাই"।
যিয়াদ আস-সুদা'ঈ বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর এই মন্তব্য আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করিল। অতঃপর আরও একটি লোক আসিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট কোন জিনিস চাহিল। তিনি উত্তরে বলিলেন:
من سأل الناس عن ظهر غنى فصداع في الرأس وداء في البطن. "ধনাঢ্য অবস্থায় মানুষের নিকট যাজ্ঞা করা মাথা ব্যথা ও পেটের অসুস্থতার পরিচায়ক"। যাজ্ঞাকারী লোকটি তখন বলিল, তাহা হইলে আমাকে সাদাকার সম্পদ হইতে দান করুন। জওয়াবে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা সাদাকা বণ্টনের ক্ষেত্রে নবী বা অন্য কাহারও মতামত গ্রহণ করেন নাই। তিনি স্বয়ং উহা আট ভাগে ভাগ করিয়া দিয়াছেন। যদি তুমি আট শ্রেণীর কোন এক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হও তাহা হইলে তোমাকে উহা হইতে আমি প্রদান করিব। রাসূলুল্লাহ্-এর এই অভিমতও আমার হৃদয়ে রেখাপাত করিল। অতঃপর রাত্রিকালে সকল লোক চলিয়া গেলে রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত আমি নিশি যাপন করিলাম। ফজরের সালাতের সময় হইলে তিনি বলিলেন, হে সুদা'ঈ ভাই, তোমার নিকট কোন পানি আছে কি? আমি উত্তর দিলাম, এত অল্প পরিমাণ পানি আছে যাহা আপনার জন্য যথেষ্ট নয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা পাত্রে ঢালিয়া আমার নিকট লইয়া আস। আমি তাহাই করিলাম, তিনি তাঁহার হাতের তালু পানিতে স্পর্শ করিলে দুই আঙ্গুলের মধ্যবর্তী স্থান দিয়া পানির ফোয়ারা বাহির হইতে দেখিলাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যাহাদের পানির প্রয়োজন রহিয়াছে তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া প্রয়োজন
অনুসারে পানি লইয়া যাওয়ার জন্য বল। প্রয়োজন অনুযায়ী সকলেই পানি লইয়া গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সালাতে দাঁড়াইতে চাহিলেন। বিলাল (রা) তখন ইকামত দানের জন্য দাঁড়াইলেন। যেহেতু আমি পূর্বে আযান দিয়াছিলাম সেজন্য রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে বলিলেন, তোমার সুদা'ঈ ভাই আযান দিয়াছে আর নিয়ম হইল যে আযান দিবে, ইকামত দেওয়া তাহারই অধিকার। সুতরাং আমি ইকামত দিলাম। রাসূলুল্লাহ্ যখন সালাত শেষ করিলেন, তখন আমাকে প্রদত্ত তাঁহার দুইটি আদেশনামা লইয়া উপস্থিত হইলাম। নিবেদন করিলাম, আমাকে উহা হইতে অব্যাহতি দান করুন হে আল্লাহ্র রাসূল! তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কী হইয়াছে তোমার? সুদা'ঈ বলিলেন, আমি আপনার ইরশাদ শুনিয়াছি, নেতৃত্বে গ্রহণের মধ্যে কোন মু'মিন ব্যক্তির কল্যাণ নাই। আমি তো আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের উপর ঈমানদার। আমি আপনার ইরশাদ আরও শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি স্বচ্ছল অবস্থায় মানুষের নিকট সওয়াল করবে তাহার মাথায় বেদনা দেখা দিবে এবং পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হইবে। অথচ আমি আপনার নিকট সওয়াল করিয়াছি স্বচ্ছলাবস্থায়। রাসূলুল্লাহ্ আবারও তাহা স্থির রাখিয়া বলিলেন, হ্যাঁ, বিষয় তাহাই হইবে, চাহিলে তুমি বজায় রাখ, না হয় তাহা অর্পণ করিয়া দাও। তিনি আরও বলিলেন, তাহা হইলে তুমি এমন একজন লোককে দেখাইয়া দাও যাহাকে আমীর নিয়োগ করা যায়। সুদা'ঈ একজন লোকের কথা বলিলে তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ এই গোত্রের আমীর নিয়োগ করিলেন। অতঃপর যিয়াদ ইবনুল হারিছ আস-সুদা'ঈ নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের এখানে একটি কুঁয়া রহিয়াছে। উহার পানি শীতকালে আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়, কিন্তু গ্রীষ্ম কালে উহা শুকাইয়া যায়। ফলে গোত্রের লোকজন গ্রীষ্মকালে এই দিক সেই দিকে গিয়া বাস করিতে থাকে। আমরা অল্প সংখ্যক মুসলমান, বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতে আমাদের জীবনের আশংকা রহিয়াছে। ফলে আমাদের এই কুয়াটির জন্য দু'আ করুন। রাসূলুল্লাহ্ সাতটি কংকর হাতে লইয়া তাহা মর্দন করিলেন এবং তাহার হাতে দিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র নাম লইয়া একটি একটি করিয়া কংকর কুয়াতে নিক্ষেপ করিবে। যিয়াদ সুদা'ঈ সেই মতই করিলেন, ফলে তাহার পানি আর কোন দিন শুকাইল না (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৬৫)।
📄 বানুল মুনতাফিক প্রতিনিধি দলের আগমন
লাকীত ইবন 'আমির এবং নুহায়ক ইব্ন 'আসিম ইবন মালিক ইবনুল মুনতাফিক দলীয় প্রতিনিধি হিসাবে রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে আগমন করিয়াছিল। লাকীত ইবন 'আমির বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে যখন উপনীত হইয়াছিলাম তখন তিনি ফজরের সালাত হইতে অবসর হইয়া বলিলেন, উপস্থিত জনতা! চারিদিন যাবত আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে কোন কথা বলি নাই, মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর। তোমাদের মধ্য হইতে কেহ এমন রহিয়াছে কি যাহাকে তাহার স্বীয় গোত্রের লোক আমার নিকট প্রতিনিধিস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছে? লাকীত বলেন, আমার এই কথা শুনিয়া লোকজন আমার প্রতি তাকাইতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ্ আবার বলিলেন, আপনারা দীন প্রচারের কাজ যথাযথভাবে পালন করিয়াছেন কি না, সেই সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে। আমি তখন দাঁড়াইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি গায়েব জানেন কি? তিনি তখন জওয়াব দিলেন,
গায়েবের চাবিকাঠি আল্লাহ্ হাতে। অতঃপর এই সম্পর্কিত আল-কুরআনের আয়াতটি পাঠ করিলেন। লাকীত বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আমাদের দেহ টুকরা টুকরা হইয়া যাইবে, বাতাস উহাকে উড়াইয়া কোথা হইতে কোথায় লইয়া যাইবে, না হয় পশু পাখি উহা সাবাড় করিবে ইহা সত্ত্বেও উহা কেমন করিয়া একত্রিত করা হইবে? রাসূলুল্লাহ্ উহা একটি যুক্তি দ্বারা বুঝাইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, ঘনবৃক্ষ লতা-পাতার ও সবুজে ঘেরা একটি উদ্যান ছিল। কিন্তু উহার অবস্থা এক সময় এমন হইয়া গেল যে, মানুষের ধারণা হইল যে, বাগানটি একেবারে শেষ হইয়া গেল। এমনি সময় আল্লাহ্ তা'আলা বৃষ্টি দান করিলেন, ফলে বাগানটি পুনরায় সজীব হইয়া গেল। বৃক্ষ ও চারা গাছ প্রাণ ফিরিয়া পাইল। যেই আল্লাহ্ বৃক্ষ ও চারার জীবন ফিরাইয়া দিতে সক্ষম, তিনিই ছড়ানো ছিটানো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ফিরাইয়া উহা একত্রিত করিতে সক্ষম। লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা তো সংখ্যায় এত বিপুল যে, গোটা জগৎব্যাপী মানুষ আর মানুষ। এক আল্লাহ্ এক সঙ্গে আমাদের সকলকে কিভাবে প্রত্যক্ষ করিবেন? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সারাজগৎ ব্যাপী সূর্য যেভাবে আলোক রশ্মি বিকীরিত করিতে পারে আল্লাহ্ তা'আলা সেই মত গোটা জগৎবাসীকে এক সঙ্গে অবলোকন করিতে সক্ষম হইবেন।
লাকীতের আবার জিজ্ঞাসা, আমরা যখন মহান আল্লাহ্র সম্মুখে উপস্থিত হইব তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সহিত কী আচরণ করিবেন? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ্ হাশরের মাঠের অবস্থা, মু'মিন ও কাফিরের পাওয়া ও চাওয়ার বিষয়ের বিবরণ দিলেন। লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, পাপ পুণ্যের বদলা কিভাবে লাভ করিব? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, একটি নেকীর বদলে দশটি পুরস্কার ও একটি পাপের বিপরীতে একটি শান্তিই ভোগ করিবে। আল্লাহ্ চাহিলে উহাও মার্জনা করিয়া দিতে পারেন।
লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম কি? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, জাহান্নামের সাতটি দ্বার রহিয়াছে। কোন দ্বারেই সত্তর বৎসরের পথের কম দূরত্ব নাই। জান্নাতের রহিয়াছে আটটি দ্বার। কোন দ্বারেই সত্তর বৎসরের পথের কম দূরত্ব নাই। লাকীত জিজ্ঞাসা করিলেন, জান্নাতে কি কি রহিয়াছে? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, খাঁটী মধুর নদী, এমন পানীয় বস্তুর নদী যাহা পান করিলে কোন ধরনের নেশা আসিবে না। দুধের নদী যাহার স্বাদ কোন সময় পরিবর্তন হইবে না। জান্নাতে আরও রহিয়াছে সব ধরনের ফলমূল, পূত পবিত্র স্ত্রীগণসহ সকল ধরনের সুখ-শান্তি, যাহার কোন উপমা পার্থিব কোন জিনিসের দ্বারা সম্ভব নয়।
লাকীত তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন বিষয়ের উপর আমরা আপনার নিকট বায়'আত গ্রহণ করিব? রাসূলুল্লাহ্ তখন হাত প্রসারিত করিয়া দিয়া বলিলেন, সালাত কায়েম, যাকাত আদায় এবং এই কথার উপর যে, আল্লাহ্র সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না।
এই হাদীছের বিষয়বস্তু আরও দীর্ঘ। এখানে কেবল অংশবিশেষ উল্লেখ করা হইল। এই রিওয়ায়াতের বিষয়বস্তুর উপর অনেকেই সমালোচনা করিয়াছেন। কিন্তু ইবনুল কায়্যিম উহার ভাষাকে নবুওয়াতের ভাষা বলিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৬৩)।