📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাসসান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 গাসসান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


আরব খৃস্টানদের একটি গোত্রের নাম ছিল গাস্সান। রোম সম্রাট কায়সারের পক্ষ হইতে উহারা আরবের একটি অঞ্চল শাসন করিত। ১০ম হিজরীর রামাযান মাসে গাসসান গোত্রাধীন তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিল। তাঁহারা তাৎক্ষণিকভাবে অবশ্য মন্তব্য করিয়াছিলেন যে, আমাদের গোত্রের অন্যান্যরা ইসলাম গ্রহণ করে কিনা তাহা আল্লাহ্ তা'আলাই ভাল জানেন। উহারা তো বড়ই ক্ষমতা প্রিয় এবং রোম সম্রাট কায়সারের একনিষ্ঠ ভক্ত। সে যাহাই হউক রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের প্রতি সাধারণ প্রতিনিধি দলের ন্যায় আচরণ করিয়াছিলেন এবং প্রত্যাবর্তন কালে অন্যান্যদলের মত উপঢৌকন দান করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাদের গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে নাই। তবে তাহারা মনে প্রাণে গোপনে মুসলিম ছিল। দুই জন ঈমান অবস্থাতেই ইনতিকাল করেন। তৃতীয় ব্যক্তি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর শাসন কালীন সময়ে ইয়ারমুকের যুদ্ধে হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-এর সহিত সাক্ষাত করিয়া নিজের ইসলাম গ্রহণ করিবার কথা তাহাকে অবহিত করিলে তিনি তাঁহাকে খুবই সমাদর করেন (দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সালমান গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত

📄 সালমান গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত


রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট সালামান প্রতিনিধি দল আগমন করিল। তাহারা সাতজন ছিলেন। তাঁহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিলেন। হাবীব ইবন উমার (রা) এই দলের এক সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -কে তখন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, সময় মত সালাত আদায় করা। এই প্রতিনিধিদল সেই দিন রাসূলূল্লাহ্ -এর সহিত জু'হর ও 'আসর এই দুই ওয়াক্তের সালাত আদায় করিয়াছিলেন। এই দুই সালাতের ব্যাপারে হাবীব (রা)-এর অভিমত ছিল যে, তুলনামূলকভাবে জু'হর হইতে আসরের সালাত সংক্ষিপ্ত ছিল। তাঁহারা স্বীয় এলাকায় অনাবৃষ্টির অভিযোগ করিলে রাসূলুল্লাহ্
তাহাদের দেশে বৃষ্টি হওয়ার জন্য দু'আ করিলেন। অতঃপর আমরা সেখানে তিন দিন অবস্থান করিলাম। তিন দিনই আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর মেহমান ছিলাম। ফিরিবার সময় বিলাল (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ আমাদের প্রত্যেককে পাঁচ ওকিয়া (পাঁচ আউন্স) রৌপ্য প্রদানের নির্দেশ দিলেন। তাহার নিকট অন্য কোন সম্পদ না থাকায় ক্ষমা চাহিলেন। আমরা ভাবিলাম যাহা পাইয়াছি তাহা হইতে উত্তম পাওনা আর কি হইতে পারে। ফিরিয়া দেখিলাম বৃষ্টির জন্য যেই দিন রাসূলুল্লাহ্ দু'আ করিয়াছিলেন, সেই দিনই বৃষ্টি হইয়াছিল। উহারা দশম হিজরীর শাওয়াল মাসে আগমন করিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুহারিব গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 মুহারিব গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


উহারা আরবের খুবই দুর্ধর্ষ জাতি ছিল। চারিত্রিক দিক দিয়াও তাহারা খুবই নিম্নমানের লোক ছিল। নবৃওয়াত লাভের সূচনাকালে যখন রাসূলুল্লাহ্ আরবের বিভিন্ন গোত্রে গিয়া ইসলামের দাওয়াত দিতেছিলেন তখন এই সম্প্রদায় তাঁহার সহিত খুবই রুঢ় আচরণ করিয়াছিল (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৪)।
দশম হিজরী সনে বিদায় হজ্জের প্রাক্কালে মুহারিব গোত্রের দশ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। এই দলের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন সাওয়া ইবনুল হারিছ এবং তদীয় পুত্র খুযায়মা ইন্ন সাওয়া। তাহারা মক্কায় আগমন করিয়া রামলা বিনতুল হারিছের গৃহে অবস্থান করিয়াছিল। তাহাদের নিকট সেখানে সকালে বিকালে খাদ্য পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বিলাল (রা)। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর তাঁহারা বলিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! অতীতের দিনগুলিতে আমাদের নিকট আপনার চেহারা হইতে ঘৃণিত অন্য কোন চেহারা ছিলনা। আর এই মুহূর্তে আমাদের নিকট আপনার চেহারা মুবারক হইতে অধিক প্রিয় অন্য কোন চেহারা নাই। এই প্রতিনিধি দলের এক লোককে রাসূলুল্লাহ্ চিনিয়া ফেলিয়াছিলেন। সে তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাকে এই পর্যন্ত জীবিত রাখিয়াছেন যাহার ফলে আপনাকে সত্য নবী বলিয়া স্বীকার করিয়াছি। তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সকল অন্তরই আল্লাহ্ তা'আলার হাতে। অতঃপর খুযায়মা ইব্‌ন সাওয়া (রা)-এর চেহারায় হাতে বুলাইয়া দিলেন। ফলে তাঁহার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল চকচকে হইয়া গেল (ইব্‌ন কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রগুক্ত ৫খ., পৃ.৭০)।
অপর এক সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ উহাদের একটি লোকের প্রতি গভীর মনোনিবেশের মাধ্যমে তাকাইতেছিলেন। তখন মুহারিব গোত্রের এই লোকটি নিবেদন করিয়া বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! সম্ভবত আমার সম্পর্কে আপনি কিছু একটি ভাবিতেছেন? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সম্ভবত আমি তোমাকে পূর্বেই দেখিয়াছি। সে তখন বলিল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আপনি আমাকে দেখিয়াছেন। আপনার সাথে কথা হইয়াছিল, তখন আপনার সহিত আমি কর্কশ ভাষায় কথা বলিয়াছিলাম। আপনার দা'ওয়াতকে বিদ্রূপ করিয়া প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। আর তাহা ঘটিয়াছিল উকায বাজারে। এই মুহূর্তে আপনি আমার নিকট দুনিয়ার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৪৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তুজায়ব গোত্রে ইসলামের আলো

📄 তুজায়ব গোত্রে ইসলামের আলো


তুজায়ব ইয়ামানের কিন্ন্দা এলাকার একটি উপগোত্রের নাম। কিনানা ইব্‌ন বুস্র আত-তুজায়বী যে তৃতীয় খলীফা উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-এর কুখ্যাত হত্যাকারী ছিল সে ছিল এই গোত্রীয় লোক। অপর দিকে তাজুব হিমইয়ার অঞ্চলের স্বতন্ত্র একটি গোত্রের নাম। হযরত আলী (রা)-এর হত্যাকারী ইব্‌ন মূলজিম ছিল এই তাজুব গোত্রের লোক। অনেকে এই দুইটি গোত্রকে এক মনে করিয়া বাস্তবতার বিপরীত চলিয়া যান (পাদটীকা, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত পৃ. ৪৩৪)। এই গোত্রের তের জন লোক নবম হিজরীতে প্রতিনিধি দল হিসাবে রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে আগমন করে (ইব্‌ন কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৭৩)। দরবারে নবৃওয়াতে আগমন কালে তাঁহারা নিজেদের গৃহপালিত প্রাণী এবং ফরয সাদাকার মাল লইয়া আসিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উহা পেশ করিয়া নিবেদন করিয়াছিলেন, আমাদের সম্পদের উপর আল্লাহ তা'আলার যেই হক রহিয়াছে উহা লইয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ উহাতে আনন্দিত হইলেও বলিয়াছিলেন, উহা ফিরাইয়া লইয়া যাও এবং তোমাদের এলাকার দরিদ্রগণের মধ্যে উহা বিতরণ করিয়া দাও। তাঁহারা তদুত্তরে বলিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেখানে বিতরণ করিবার পর যাহা রহিয়াছিল তাহা লইয়া আসিয়াছি। আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) মন্তব্য করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! তুজায়ব গোত্র যেই অভিনব পন্থায় আগমন করিল সেই মত আরবের অন্য কোন গোত্র আসে নাই। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হিদায়াত তো আল্লাহর হাতে। তিনি যাহার কল্যাণ চাহেন ঈমানের জন্য তাহার অন্তর খুলিয়া দেন। অতঃপর তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্ -এরি নিকট কিছু কথা নিবেদন করিলেন। তিনি তাহা লিখাইয়া দিয়া দিলেন। কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কিত আরও কিছু বিষয় তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট জানিতে চাহিলে উহাতে তাঁহার হৃদয়ে উহাদের প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পাইল। তিনি বিলাল (রা)-কে তাঁহাদিগকে উত্তমভাবে আপ্যায়ন করিতে নির্দেশ দিলেন। তাহারা শীঘ্র ফিরিয়া যাইতে চাহিলে রাসূলুল্লাহ্ উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, আমাদের কামনা হইল স্বগোত্রে ফিরিয়া গিয়া যথাশীঘ্র সম্ভব আপনার কথা পৌঁছাইয়া দেওয়া। সাধারণত প্রতিনিধিদল ফিরিয়া যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ যেই উপঢৌকন দিতেন উহা হইতে বেশী পরিমাণ তাহাদিগকে দান করিলেন। যাওয়ার সময় তিনি তাঁহাদের কেহ বাকী রহিয়াছে কিনা জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা বলিল, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এক যুবককে কাফেলার আসবাবপত্র ও যানবাহন দেখাশোনার জন্য পথিমধ্যে রাখিয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তিনি তাহাকে বানু আবযার লোক বলিয়া পরিচয় দিলে তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি অন্যান্য লোকদের প্রয়োজন মিটাইয়া দিয়াছেন। এখন আমার প্রয়োজন মিটাইয়া দেওয়ার পালা। আমার প্রয়োজন কিন্তু সম্পদ বিষয়ক নহে, তাহা অন্য রকম। আমার আগমন শুধু এই জন্য যে, আমার জন্য মাগফিরাতের কামনা করিবেন, আল্লাহ যেন আমার উপর করুণা করেন এবং আমার অন্তরকে পরমুখাপেক্ষী হইতে হিফাজত করেন- সেই দু'আ করিবেন। তাহার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ দু'আ করিলেন:
اللهم اغفر له وارحمه واجعل غناه في قلبه. "হে আল্লাহ্! তাহাকে ক্ষমা কর, করুণা কর, তাহার অন্তরকে অমুখাপেক্ষী করিয়া দাও"।
দু'আর সহিত অন্যান্য লোকদের জন্য যেই হাদিয়া তুহফা দেওয়া হইয়াছিল তাহাকেও সেইরূপ দান করিয়া বিদায় জানাইলেন। বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত বানূ আবযা গোত্রের কিছু লোকের সাক্ষাত হইলে তিনি ঐ যুবক ছেলেটি সম্পর্কে তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা তাহার অতুলনীয় অমুখাপেক্ষিতার কথা তুলিয়া ধরেন। রাসূলুল্লাহ্-এর ইনতিকালের পর ইয়ামনে মুরতাদ হইবার যেই হিড়িক পড়িয়াছিল তখন এই ছেলেটি তাহার গোত্রকে উহা হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। আবু বাকর (রা)-এর খিলাফত কালে খলীফা নিজেই তাঁহার খবরাখবর রাখিতেন। তাঁহার সহিত সদাচরণের নির্দেশ প্রদান করেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৩৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00