📄 বানু তামীম গোত্রে ইসলামের দাওয়াত
সুকা (سقيا) নামক স্থানে বাস করিত বানু তামীম গোত্র। নবম হিজরী সনে রাসূলুল্লাহ্ উয়ায়না ইব্ন হিস্স (রা)-এর নেতৃত্বে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দলকে উহাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। রাত্রিকালে তাহারা উহাদের প্রতি দৃষ্টি দিলে বানু তামীম গোত্রের লোকেরা পলায়ন করে। তাঁহারা উক্ত গোত্রের এগারজন পুরুষ, একুশজন মহিলা ও ত্রিশজন বালককে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় লইয়া আসেন। উহার পর বানু তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করে। উহাতে এই গোত্রের কয়েকজন নেতাও ছিল। যেমন উতারিদ ইব্ন হাজিব, আকরা' ইব্ন হাবিস, যিবিরকান ইব্ন বাদ্র ও কায়স ইব্ন আসিম প্রমুখ। ইব্ন ইসহাকের বর্ণনামতে 'উয়ায়না ইব্ন হিস্স ও আকরা' ইব্ন হাবিস মক্কা।
বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ্ -এর সহিত ছিলেন। অতঃপর বানু তামীমের প্রতিনিধি দলের সহিত মদীনা আগমন করেন। এই গোত্রীয় লোকেরা ছিল যাযাবর শ্রেণীর লোক। আদব-কায়দা ও আচার-আচরণ সম্পর্কে অবহিত ছিলনা। রাসূলুল্লাহ্-এর গৃহের পিছনে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে এই বলিয়া আহ্বান করিল اخرج الينا يا محمد "হে মুহাম্মাদ! আমাদের নিকট বাহির হউন" (মুহাম্মদ 'উসমান, নাসরুল বারী, ঢাকা, তা. বি., ৮খ., পৃ. ৪২৯)।
রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগের নিকট আগমন করিলেন উহারা বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমরা আপনার নিকট আসিয়াছিলাম বংশীয় আভিজাত্য প্রকাশ করিতে। সুতরাং আমাদিগকে অনুমতি প্রদান করুন। তিনি তাহাদিগকে অনুমতি প্রদান করিলে 'উতারিদ ইন্ন হাজিব দাঁড়াইয়া স্বীয় বংশ গৌরব সম্পর্কে ভাষণ প্রদান করিল। তাহার ভাষণের ধরন ছিল এই রূপ:
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদিগকে মর্যাদাশীল করিয়াছেন, রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছেন, অগণিত ধন-ভাণ্ডারের মালিক এবং প্রাচ্যের জাতিসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করিয়াছেন। বর্তমান কালে কেহই আমাদিগের সমকক্ষতার দাবী করিতে পারে না। কেহ আমাদিগের সমমর্যাদার দাবী করিলে সে দাঁড়াইয়া এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য ও গুণের কথা উল্লেখ করুক, যাহা আমরা উল্লেখ করিলাম।
'উতারিদ ভাষণ সমাপনান্তে বসিয়া পড়িল। রাসূলুল্লাহ্ তখন ছাবিত ইব্ন কায়স (রা)-কে তাহার উত্তর প্রদানের আহ্বান জানাইলেন। তাঁহার ভাষণের সারকথা ছিল এইরূপ :
"সকল প্রসংসার অধিকারী সেই আল্লাহ্ যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করিয়াছেন, এতদুভয়ে তাঁহার নির্দেশ বাস্তবায়ন করিয়াছেন। তাঁহার নির্দেশ ব্যতীত কিছুই হয় না। তাঁহার সানুগ্রহে আমাদিগকে রাজত্ব দান করিয়াছেন। সর্বোত্তম সৃষ্টি হইতে রাসূল মনোনীত করিয়াছেন, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সম্ভ্রান্ত বংশের সদস্য, সর্বাধিক সত্যবাদী, সবচেয়ে অধিক চরিত্রবান। তাঁহার উপর কিতাব নাযিল করিয়াছেন। সৃষ্টি জগতের নিকট উহা আমানত রাখিয়াছেন। অতঃপর তিনি ঈমান আনয়নের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। তাঁহার কওমের মধ্যে যাহারা মুহাজির ও দয়াবান তাহারা ঈমান গ্রহণ করিয়াছে। বংশের দিক দিয়া তাঁহারা সবচেয়ে অভিজাত, কর্মের দিক দিয়া সর্বোত্তম। সৃষ্টি কূলের মধ্যে তাঁহারাই সর্ব প্রথম ঈমানের আহ্বানে সাড়া দিয়াছে। আর আমরা আল্লাহ্র পথে সাহায্যকারী তাঁহার রাসূলের পারিষদ। আমরা সর্বদা কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করি, উহাদিগের সহিত জিহাদে অবতীর্ণ হওয়াকে খুবই সহজ মনে করি।"
বক্তৃতা শেষে কবিতা পাঠের পালা শুরু হইল। বানু তামীমের প্রসিদ্ধ কবি যাবারকান ইব্ন বা দাঁড়াইয়া অনেকগুলি কবিতা আবৃত্তি করিল। তাহার কবিতার প্রথম চরণটি ছিল এই রূপ:
نحن الكرام فلا حى تعادلنا - منا الملوك وفينا ينصب البيع.
"আমরাই সম্ভ্রান্ত, কোন গোত্রই আমাদের সমকক্ষ নয়। আমাদের মধ্যেই রহিয়াছে রাজা-বাদশাহ, গির্জার প্রতিষ্ঠাতা আমরাই।"
তাঁহার কবিতা পাঠ শেষে রাসূলুল্লাহ্ হাসান ইব্ন ছাবিত (রা)-এর প্রতি ঈঙ্গিত করিলেন। তিনি দাঁড়াইয়া যেই কবিতা পাঠ করিলেন তাহার প্রথমাংশ ছিল এইরূপ:
📄 আবদুল কায়স গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
ان الذوائب من فهر واخواتهم - قد بينوا سنة للناس يتبعوا. "ফির গোত্রের সম্ভ্রান্ত লোকেরা এবং তাহাদের ভ্রাতৃবর্গ মানবজাতিকে অনুসরণীয় পথ বলিয়া দিয়াছে।"
অতঃপর বানু তামীম নেতা হাসসান (রা)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করিল। তাঁহার মধ্যে আল্লাহ্ প্রদত্ত শক্তি রহিয়াছে বলিয়া স্বীকার করিয়া আগত সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল (তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়া'ল-মুলুক, বৈরূত তা. বি., ৩খ., ১১৫)।
কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার নিকট প্রিয় নবীকে এই ধরনের আহ্বান করা পছন্দনীয় ছিল না। ইরশাদ হইয়াছে:
انَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ. "যাহারা ঘরের বাহির হইতে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে তাহাদের অধিকাংশ নির্বোধ" (৪৯:৪)।
وَلَوْا أَنَّهُمْ صَبَرُوا حَتَّى تَخْرُجَ إِلَيْهِمْ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "তুমি বাহির হইয়া উহাদের নিকট আসা পর্যন্ত যদি উহারা ধৈর্য ধারণ করিত তবে তাহাই উহাদের জন্য উত্তম হইত। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৪৯:৫)।
আয়াতে তাহাদেরকে নির্বোধ বলিয়া অভিহিত করা এবং পরবর্তীতে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও দয়ালু বলিয়া ঘোষণা প্রদান করিবার মধ্যে এই ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, তাহারা তাওবা করিলে উহা মার্জনা করা হইবে। বানু তামীমের সাদাসিধা হইবার আরও কিছু ঘটনা হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে।
عن عمران بن حصين قال اتى نضر من بني تميم النبي الله فقال اقبلوا البشري يا بنى تميم قالوا يا رسول الله قد بشرتنا فاعطنا فرائ ذلك في وجهه فجاء نفر من اليمن فقال اقبلوا البشرى اذ لم يقبلها بنو تميم قالوا قد قبلنا يا رسول الله. "ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানু তামীমের একদল লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিল। তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, হে বানু তামীম! সুসংবাদ গ্রহণ কর। তাহারা বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি তো আমাদেরকে শুধু সুসংবাদ শুনাইলেন, কিছু মালও প্রদান করুন। তাহাদের এই কথায় রাসূলুল্লাহ্-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ পাইল। ইত্যবসরে ইয়ামান হইতে একটি প্রতিনিধি দল আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আপনারা সুসংবাদ গ্রহণ করুন যে সুসংবাদ বানু তামীম গ্রহণ করে নাই। তাহারা বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা গ্রহণ করিলাম" (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৬২৬)।
বানু তামীম যে ইসলাম গ্রহণ করিয়া প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল সেই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ হইতে আভাষ পাওয়া যায়। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن الزبير انه قدم ركب من بني تميم على النبي ﷺ فقال ابو بكر امر القعقاع بن معبد بن زرارة قال عمر بل امر الاقرع بن حابس قال
আবু বকর মা আরদত ইল্লা খিলাফী ক্বালা উমার মা আরদত খিলাফাকা ফাতামারিয়া হাত্তা ইরতাফাত আসওয়াতুহুমা ফানাযালা ফী যালিকা ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ'মিনু লা তুক্বাদ্দিমু বাইনা ইয়াদাই আল্লাহু ওয়া রাসুলিহী হাত্তা ইনক্বাদাত। "আবদুল্লাহ্ ইবনুয যুবায়র (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানু তামীম গোত্রের একদল লোক রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিল। আবূ বাক্স (রা) বলিলেন, কা'কা' ইব্ন মা'বাদ ইব্ন যুরারা (রা)-কে আমীর নিয়োগ করুন। 'উমার (রা) বলিলেন বরং আকরা' ইব্ন হাবিস (রা)-কে আমীর নিয়োগ করুন। আবূ বাক্স (রা) বলিলেন, তুমি আমার বিরুদ্ধে কথা বলিতে চাও। উমার (রা) বলিলেন, আমি আপনার বিরোধিতা করিতে চাহি নাই। উভয়ের বাদানুবাদে উচ্চ ধ্বনি ধ্বনিত হইল। উহার পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়ঃ "হে মু'মিনগণ! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হইও না এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মু'মিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজদিগের কণ্ঠস্বর উঁচু করিও না এবং নিজদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাঁহার সহিত সেইরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না। কারণ ইহাতে তোমাদের কর্ম নিস্ফল হইয়া যাইবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে" (৪৯: ১-২; বুখারী আস-সাহীহ, প্রাগুক্ত)।
বানু তামীমের প্রশংসায় আরও বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابى هريرة قال لا أزال احب بني تميم بعد ثلث سمعته من رسول الله ﷺ يقولها فيهم هم اشد امتى على الدجال وكانت فيهم سبية عند عائشة فقال اعتقيها فانها من ولد اسماعيل وجاءت صدقاتهم فقال هذه صدقات قوم او قومي. "আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর তিনটি কথা শ্রবণ করিবার পর বানু তামীমকে ভালবাসিতেছি, কথাগুলি তিনি তাহাদের সম্পর্কে বলিয়াছিলেন। উহারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে কঠোর একটি জাতি। হযরত আইশা (রা)-এর নিকট এই গোত্রের একজন বন্দিনী ছিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে বলিলেন, উহাকে আযাদ করিয়া দাও। কারণ সে ইসমাঈল (আ)-এর বংশীয়। তাহাদের নিকট হইতে সাদাকার মাল আসিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা আমার গোত্রের সাদাকা” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
বাহরায়নে বসবাসকারী একটি গোত্রের নাম ছিল আবদুল কায়স গোত্র। আবদুল কায়স ছিল ঊর্ধ্বতন গোত্রপতির নাম। গোত্রপতির নামেই পরবর্তী কালে এই গোত্রের নাম আবদুল কায়স হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই গোত্রটি মোট দুইবার রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে আগমন করিয়াছিল। প্রথমবার ৫ম হিজরী বা উহারও পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার হিজরী ৮ম সনে কিংবা ৯ম সনে, মতান্তরে দশম সনে (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস-সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৪)। উহাদিগকে স্বাগত জানাইতে রাসূলুল্লাহ্ বলিয়াছিলেন:
📄 আশ'আরী গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
مرحبا با الو وفد غير خزايا ولا ندامی “কোনরূপ অপমান ও অনুশোচনা ব্যতিরেকে এই দলকে আমি সুস্বাগত জানাইতেছি।”
এই প্রতিনিধি দলের মধ্যে এক লোকের পরিচিতি ছিল আশজ্জ আবুদল কায়স হিসাবে যাহার মূল নাম ছিল মুনযির ইন্ন আইয (রা)। তাহার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ বলিয়াছিলেন:
ان فيك خلتين يحبهما الله ورسوله الحلم والااناة. "তোমার মধ্যে এমন দুইটি বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে যেইগুলি আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল ভালবাসেন। উহা হইল ধৈর্য ধারণ ও ধীরে সুস্থে কর্ম সম্পাদন” (আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪২৮)।
সহীহ বুখারীতে উহাদের আগমন ও প্রস্থানের বিষয়টি সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত হইয়াছে।
عن ابن عباس قال قدم وفد عبد القيس على رسول الله ﷺ فقال مرحبا بالقوم غير خزايا ولا ندامى فقالوا يا رسول الله ان بيننا وبينك المشركين من مضر وانا لا نصل اليك الا فى اشهر الحرم حدثنا بجمل من الامر أن عملنا به دخلنا الجنة وندعو به من وراءنا قال امركم باربع وانهاكم عن اربع الايمان بالله وهل تدرون ما ایمان بالله شهادة ان لا اله الا الله واقام الصلوة وايتاء الزكوة وصوم رمضان وان تعطوا من المغانم الخمس وانهاكم عن اربع ما انتبذ في الدباء والنقير والحنتم والمزفت.
“আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাইয়া বলিলেন, কোন ধরনের অপমান ও অনুতাপ ছাড়াই আপনাদেরকে স্বাগত জানাইতেছি। তাহারা বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের ও আপনার মধ্যবর্তী স্থানে মুশরিক মুদার গোত্র বাস করে। নিষিদ্ধ মাসগুলি ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট পৌঁছিতে সক্ষম নহি। আমাদেরকে কতিপয় বাক্যে কিছু নির্দেশ করুন যাহা আমরা পালন করিলে জান্নাতে প্রবেশ করিব। আর উহা আমরা আমাদের পিছনের লোকদের নিকট পৌঁছাইয়া দিব। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আমি তোমাদেরকে চারি জিনিসের আদেশ করিব এবং চারি জিনিস হইতে বারণ করিব। প্রথম হইল, আল্লাহ্র উপর ঈমান আনয়ন। তোমরা কি জান, আল্লাহ্র উপর ঈমান আনয়ন করা কি? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সাক্ষ্য দান করা, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের সাওম পালন করা, গানীমাতের মাল হইতে এক-পঞ্চমাংশ দান করা। আমি তোমাদেরকে নিষেধ করিতেছি এমন চারটি জিনিস হইতে যেইগুলিতে নাবীয বানানো হয়, উহা হইল শুকনা লাউয়ের খোলস, বৃক্ষের মূল খোদাই করিয়া যে পাত্র বানানো হয়, সবুজ কলসি ও কালাই করা কোন পাত্র” (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬২৭)।
উল্লেখ্য যে, এই সকল পাত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা আসল উদ্দেশ্য ছিল না। তখনকার যুগে এই সকল পাত্রের সাহায্যে মাদক জাতীয় জিনিস তৈরি, হইত। মদ পানে মানুষ এতই আসক্ত ছিল যে, মদ ব্যতীত তাহাদের স্বাভাবিক জীবনের কল্পনাই করা যাইত না। এই আসক্তিকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করার নিমিত্তে তাহাদেরকে মদ তৈরীর উক্ত সরঞ্জাম হইতে নিষেধ করা হইয়াছিল। পরবর্তীকালে নিষেধাজ্ঞা রহিত হইয়া যায়।
বাহরায়নের আবদুল কায়স জনপদেই মসজিদে নববীর পর প্রথম জুমু'আর সালাত আদায় করা হইয়াছিল। এই সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابن عباس قال اول جمعة جمعت بعد جمعة جمعت في مسجد رسول الله ﷺ في مسجد عبد القيس بجواثي من البحرين "আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর মসজিদে জুমু'আর সালাত আদায় করিবার পর সর্বপ্রথম আবদুল কায়স গোত্রের মসজিদ, যাহা বাহরায়নের জাওয়াছা নামক স্থানে ছিল, যেখানে জুমুআর সালাত অনুষ্ঠিত হয়" (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২৭)।
এই আবদুল কায়স গোত্রের ইসলাম গ্রহণের কাজে ব্যস্ত থাকায় রাসূলুল্লাহ্ যোহরের ফরয পরবর্তী দুই রাকাআত সুন্নাত আদায় করিতে না পারিয়া তাহা আসরের ফরয আদায় করিবার পর কাযা করিয়াছিলেন। উহা দেখিয়া অনেকের ধারণা হইয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ আসরের পরও দুই রাকাআত সুন্নাতের বিধান প্রবর্তন করিয়াছেন। কিন্তু তিনি এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হইলে ইরশাদ করিয়াছিলেন:
انه اتاني اناس من عبد القيس بالاسلام من قومهم فشغلوني عن الركعتين اللتين بعد الظهر فهما هاتان "আমার নিকট আবদুল কায়স গোত্রের কতিপয় লোক ইসলাম গ্রহণ করিবার নিমিত্তে আগমন করিয়াছিল। তাহাদের সহিত ব্যস্ত থাকায় যুহরের ফরয পরবর্তী দুই রাক্'আত সুন্নাত আমি আদায় করিতে পারি নাই। আসর সালাতের পরে যেই দুই রাকাআত সুন্নাত আদায় করিতে তোমরা আমাকে দেখিয়াছিলে উহা হইল সেই দুই রাকাআত” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইয়ামানের একটি সম্ভ্রান্ত গোত্র ছিল আশ'আরী গোত্র। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ছিলেন এই গোত্রীয় একজন সাহাবী। রাসূলুল্লাহ্ -এর নবুওয়াতের দা'ওয়াত তাহাদের নিকট পৌঁছিলে সেইখান হইতে ৫৩ ব্যক্তি মদীনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-ও সেই কাফেলায় ছিলেন। তাঁহারা একটি জাহাজে আরোহণ করিয়া রওয়ানা করিয়াছিলেন। কিন্তু সামুদ্রিক বায়ু অনুকূল না হওয়ায় জাহাজটি হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) গিয়া পৌঁছে। সেইখানে হযরত জা'ফার (রা) পূর্ব হইতেই অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি উহাদিগকে লইয়া আরব অভিমুখে রওয়ানা করিলেন। সেই সময় খায়বার
📄 বানূ হানীফা গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
বিজিত হইয়া গিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ সেইখানে তখনও রহিয়া গিয়াছিলেন। ফলে আশ'আরী গোত্রটি খায়বারেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট উপস্থিত হয় এবং তাঁহার নিকট ইসলামের বায়'আত গ্রহণ করে। এই সম্পর্কে সহীহ মুসলিমের বর্ণনাটি নিম্নরূপ:
عن ابي موسى قال بلغنا مخرج رسول الله ﷺ ونحن باليمن فخرجنا مهاجرين اليه انا واخوان لى انا اصغرهما احدهما ابو بردة والآخر ابو رهم اما قال بضعا واما قال ثلاثة وخمسين او اثنين وخمسين رجلا من قومي قال فركبنا سفينة فالقتنا سفينتنا الى النجاشي بالحبشة فوافقنا جعفر بن ابي طالب واصحابه عنده فقال جعفر ان رسول الله ﷺ بعثنا ههنا وامرنا بالاقامة فاقيموا معنا قال فاقمنا معه حتى قدمنا جميعا قال فوافقنا رسول الله ﷺ حين افتتح خیبر..... الى اخره. "আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের নিকট রাসূলুল্লাহ্-এর হিজরতের কথা পৌঁছিল। আমরা তখন ইয়ামানে ছিলাম। আমি ও আমার বড় দুই ভাই যথাক্রমে আবু বুরদা ও আবূ রুহম হিজরতের উদ্দেশ্যে বাহির হইলাম। আমাদের সহিত ৫৩ সদস্যের বা ৫২ জনের একটি কাফেলা ছিল। আমরা নৌযানে আরোহণ করিয়া রওয়ানা করিলাম। কিন্তু আমাদেরকে নৌযান লইয়া গেল নাজ্জাশীর হাবশায়। সেইখানে আমরা জা'ফার ইবন আবী তালিব (রা) ও তাঁহার সঙ্গীগণের সাক্ষাত লাভ করিলাম। জা'ফার (রা) আমাদিগকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে এখানে প্রেরণ করিয়াছেন এবং এখানে অবস্থান করিবার নির্দেশ দিয়াছেন। সুতরাং আপনারাও আমাদের সহিত এখানে অবস্থান করুন। আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বলেন, তাহার কথায় আমরা সেইখানে অবস্থান করিলাম। অতঃপর সম্মিলিতভাবে সকলেই রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইলাম। তখন তিনি সবেমাত্র খায়বার বিজয় সম্পন্ন করিয়াছিলেন” (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩০৪)।
দশম হিজরী সনে বানু হানীফা গোত্র রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। ইবন ইসহাক বলেন, বানু হানীফা গোত্রের এই প্রতিনিধি দলের সহিত মুসায়লামাতুল কায্যাবও শরীক ছিল। তাহারা মদীনায় আসিয়া আল-হারিছের কন্যা আনসার গোত্রীয় এক মহিলার গৃহে মেহমান হইয়াছিল। বর্ণিত আছে যে, বানু হানীফার এই প্রতিনিধিদল যখন রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করে তখন মুসায়লামাতুল কায্যাবকে তাহারা কাপড়ের আচ্ছাদনে ঢাকিয়া রাখিয়াছিল। পরিচয় গোপন রাখিয়া যখন সে দরবারে নবৃওয়াতের নিকটবর্তী হয় তখন রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত কথা বলে। তিনি তখন সাহাবায়ে কিরামের এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁহার হাতে ছিল খেজুরের একটি ডাল। সে তাঁহার নিকট কিছু চাহিলে তিনি তাহাকে বলিলেন, তোমাকে এই ডালের ছালও দেওয়া যাইবে না। ইন্ন ইসহাক আরও বলেন, আমার নিকট বানু হানীফা গোত্রের এক শায়খ মুসায়লামার এই দলে
শরীক হওয়া সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন বানু হানীফা গোত্র যখন রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল তখন তাহাদের সহিত মুসায়লামাতুল কায্যাব ছিল না; বরং সে ছিল প্রতিনিধি দলের জন্য নির্মিত শিবির ও বাহনের দেখা-শোনার কাজে নিয়োজিত। বানু হানীফা গোত্র ইসলাম গ্রহণ করিবার পর তাহারা বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের এক সহযাত্রী আমাদের শিবির ও সওয়ার-দেখা শোনার কাজে নিয়োজিত থাকায় আপনার সমীপে উপস্থিত হইতে পারে নাই। রাসূলুল্লাহ্ তখন বলিলেন, তোমাদিগকে যাহা কিছুর আদেশ দেওয়া হইয়াছে উহা তাহার জন্যও প্রযোজ্য হইবে। অতঃপর কাফেলা যখন ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তন করিল তখন মুসায়লামা মুরতাদ হইয়া গেল এবং মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করিয়া বসিল।
অতঃপর সে বানু হানীফা হইতে সালাতের বিধান রহিত করিয়া দেয়, মদ পান ও যেনা বৈধ বলিয়া ঘোষণা দেয়। তবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ যে নবী উহা অস্বীকার করে নাই বরং উহার পক্ষে সাক্ষী প্রদান করে (তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলuk, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ১৩৭)।