📄 'আদী ইবন হাতিম তা'ঈর ইসলাম গ্রহণ
'আদী ইব্ন্ন হাতিম তাঈর ইসলাম গ্রহণ
আরব কিংবদন্তী দাতা হাতিম তা'ঈর পুত্র 'আদী ৭ম হিজরী সনে ইসলাম গ্রহণ করেন।
বংশীয় ধারাক্রমে তিনি ইতোপূর্বে খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি তাঁহার গোত্রীয় একজন নেতা ছিলেন। বানু তাঈ ছিল ইয়ামানের প্রসিদ্ধ একটি গোত্র। ইবন ইসহাক স্বয়ং আদীর বর্ণনা মতে তাঁহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি উল্লেখ করিয়াছেন। 'আদী ইবন হাতিম বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর ইসলামের দা'ওয়াত দান শুনিয়া আমি তাঁহার প্রতি খুবই বিক্ষুব্ধ ছিলাম। আমি আমার আরবীয় গোলামকে বলিয়া রাখিয়াছিলাম যে, মুহাম্মাদের অশ্বারোহী বাহিনী- আমাদের এলাকায় প্রবেশ করিয়াছে বলিয়া তুমি অবহিত হওয়া মাত্র আমাকে অবগত করিবে। আমি এলাকা ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইব। এই লক্ষ্যে তুমি উন্নত মানের উটগুলিকে সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রাখিবে। একদা আমার গোলামটি আসিয়া সংবাদ দিল যে, সে অনেক পতাকা উডডীয়মান দেখিয়া লোকদের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া অবহিত হইয়াছে যে, এইগুলি মুহাম্মাদ-এর বাহিনীর পতাকা। এই সংবাদ শুনিয়া আমি আমার পরিবার-পরিজন ও সন্তানদিগকে লইয়া সিরিয়ায় অবস্থিত খৃস্টধর্মের মূল কেন্দ্রের দিকে রওয়ানা হইলাম। কিন্তু আমার একজন ভগ্নি এখানে রহিয়া গিয়াছিল। মুসলিম বাহিনী তাহাকে বন্দী করিয়া বানু তাঈ গোত্রের অন্যান্য বন্দীদের সহিত রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উপস্থিত করিল। এই সময় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আমার পলায়নের সংবাদ পৌঁছিয়া গিয়াছিল। একদা তাঈ গোত্রের বন্দীদের পাশ দিয়া রাসূলুল্লাহ্ গমন করিতেছিলেন। তখন আমার ভগ্নি দাঁড়াইয়া আবেদন করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার পিতা ইনতিকাল করিয়াছেন। আমার অভিভাবকও আমার নিকট হইতে দূরে। আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ আপনাকে অনুগ্রহ করিবেন। রাসূলুল্লাহ আমার আবেদন শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার অভিভাবক কে? আমি বলিলাম, আদী ইবন হাতিম। শুনিয়া তিনি বলিলেন: আল্লাহ্ ও রাসূল হইতে পলায়নকারী। দ্বিতীয় দিনও আমি রাসূলুল্লাহ্-কে প্রথম দিনের ন্যায় বলিলাম। তিনি একই উত্তর দিলেন। তৃতীয় দিন রাসূলুল্লাহ্ আমার পাশ দিয়া গমন কালে আমি নিরাশ হইয়া তাঁহাকে কিছুই বলিতে চাহিলাম না। কিন্তু আলী (রা) আমাকে ইংগিত করিলে আমি দাঁড়াইয়া পূর্বের ন্যায় আবেদন করিলাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আমি তোমার বিষয় অবহিত হইয়াছি। তোমাকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইবে। তুমি তাড়াহুড়া করিওনা। এমন কোন বিশ্বস্ত লোক যদি পাও, যে তোমাকে তোমার স্বজনের নিকট পৌঁছাইয়া দিবে তখন আমাকে অবহিত করিও। বালী বা কুদা'আ গোত্রের কিছু লোককে পাইয়া আমি রাসূলুল্লাহ্-কে অবহিত করিলাম যে, ইহাদের সহিত আমি নিরাপদে আপনজনদের নিকট পৌঁছিতে পারিব। তিনি আমাকে কাপড় ও সফরের পাথেয় দান করিয়া বিদায় দিলেন। আমি সিরিয়ায় আমার ভাইয়ের নিকট পৌঁছিয়া গেলাম। তাহাকে দেখিয়া আমি আমার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের অভিযোগ করিলে তিনি আমাকে যুক্তিসংগত কারণ দেখাইয়া সান্ত্বনা দিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে রাসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে আমি বলিলাম, অচিরেই তাঁহার সহিত আপনার সাক্ষাত করা প্রয়োজন। তিনি নবী কি বাদশাহ উহা পার্থক্য করা আপনার কর্তব্য। হাতিম কন্যার পরামর্শে তিনি মদীনায় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পৌঁছিয়া গেলেন। 'আদী ইবন হাতিম বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উপনীত হইয়া তাঁহাকে সালাম দিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,
আপনি কে? আমি আমার পরিচয় পেশ করিলাম। আমাকে লইয়া তিনি তাঁহার গৃহের দিকে রওয়ানা করিলেন। এমতাবস্থায় জনৈকা বৃদ্ধা তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিল। সে কথা বলিতে আসিয়াছে বলিয়া জানাইল। তিনি দীর্ঘক্ষণ দণ্ডায়মান থাকিয়া তাহার কথা শুনিলেন। এই দৃশ্য দেখিয়াই আমার মনে হইল তিনি অবশ্যই কোন রাজা-বাদশাহ নহেন। অতঃপর গৃহে প্রবেশ করিয়া খেজুরের ছালা ভর্তি একটি গদির উপরে আমাকে বসিতে বলিয়া তিনি মাটির উপর বসিয়া গেলেন। অবস্থাদৃশ্যে আমি মনে মনে বলিলাম, নিশ্চিয়ই তিনি কোন রাজা-বাদশাহ নহেন। উহার পর আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে 'আদী! তুমি কি খৃস্টান ছিলে না? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। আরও বলিলেন, তুমি কি স্বজাতির লোকদের নিকট হইতে গণীমতের সম্পদ হইতে এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করিতে না? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। তিনি বলিলেন, উহাতো তোমাদের খৃস্টান ধর্মে বৈধ নয়। আমি উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, উহা বৈধ নয়। আমি তখনই বুঝিয়া ফেলিলাম যে, তিনি সত্যিই আল্লাহ্র রাসূল। অজানা কথাও তিনি জানেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হে 'আদী! হয়ত তুমি মুসলমানদের অস্বচ্ছলতা দেখিয়া ইসলাম গ্রহণ হইতে বিরত রহিয়াছ। আল্লাহ্র শপথ, অচিরেই উহারা এতই সম্পদের অধিকারী হইবে যে, উহাদের মধ্যে সাদাকা গ্রহণের জন্য কোন লোকই পাওয়া যাইবেনা। হয়ত একারণেও তুমি ইসলাম গ্রহণ হইতে বাধা প্রাপ্ত হইতেছ যে, মুসলমানদের শত্রু সংখ্যা বেশী এবং উহাদের জনবল কম। আল্লাহ্র শপথ! অচিরেই তুমি কোন মহিলার নিকট হইতে শুনিতে পাইবে যে, সে কাদিসিয়া হইতে স্বীয় উটের উপর সওয়ার হইয়া এই গৃহ পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে। পথে সে কাহাকেও ভয় পায় না। হয়ত ইসলামের পতাকাতলে প্রবেশ করিতে তুমি এই কারণে বাধাপ্রাপ্ত হইতেছে যে, মুসলমানদের প্রতিপক্ষ দলে রহিয়াছে রাজা-বাদশাহ শ্রেণীর লোক। অচিরেই তুমি দেখিতে পাইবে যে, বাবিল শহরের সুরম্য শ্বেত পাথরে নির্মিত অট্টালিকাগুলি মুসলিমদের পদানত হইয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্-এর এই বক্তব্য শুনিয়া ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
আদী ইব্ন হাতিম (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণের দুই বৎসর অতিক্রান্ত হইবার পর তৃতীয় বৎসরে আমি দেখিতে পাইলাম যে, বাবিল শহরের সুরম্য অট্টলিকাগুলি মুসলামানদের দখলে আসিয়া গিয়াছে। আরও দেখিলাম, কোন মহিলা একা একা কাদিসিয়া হইতে রওয়ানা করিয়া বায়তুল্লাহ্ শরীফে তাওয়াফ করিয়াছে। পথে সে কাহাকেও ভয় পায় নাই। রাসূলুল্লাহ্-এর এই দুইটি ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিফলিত হইবার ফলে আমি নিশ্চিত হইয়া গেলাম যে, তৃতীয় বৎসর মুলমানগণ এতই প্রাচুর্যের অধিকারী হইবেন যে, তখন তাহাদের মধ্যে কোন লোক সাদকা গ্রহণের প্রতি উৎসাহী পাওয়া যাইবে না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, বৈরূত ১৪১৫/১৯৯৪ ৫খ., পৃ. ৫০)।
'উমার ইবনুল খাত্তাব (র)-এর খিলাফত কালে আদী ইব্ন হাতিম একটি কাফেলাসহ তাহার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তখন তাহাদের মধ্যে যে কথোপকথন হইয়াছিল উহা সহীহ বুখারীর নিম্নোক্ত হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
عن عدي بن حاتم قال اتينا عمر في وفد فجعل يدعو رجلا رجلا ويسميهم فقلت اما تعرفنی با امير المؤمنين قال بلی اسلمت اذكفروا
واقبلت اذ ادبروا ووفيت اذ غدروا وعرفت اذ انكروا فقال عدى فلا ابالي اذا (رواه البخاري). "আদী ইব্ন হাতিম (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একটি প্রতিনিধিদল উমার (রা)-এর নিকট আগমন করিলাম। তিনি এক একজনকে নাম ধরিয়া ডাকিলেন। আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি আমাকে চিনেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। যখন লোকেরা কুফরী করিল তখন আপনি ইসলাম গ্রহণ করিলেন। যখন তাহারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল তখন আপনি অগ্রসর হইলেন। যখন তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা করিল তখন আপনি বিশ্বস্ততার পরিচয় দিলেন। যখন উহারা অস্বীকার করিল তখন আপনি স্বীকার করিলেন। আদী (রা) বলিলেন, যথেষ্ট হইয়াছে, এখন আমার কোন কিছু বলার নাই” (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬৩০)।
'আদী (রা) ছিলেন স্বীয় পিতা হাতিম তা'ঈর মতই দানবীর। কোন এক লোক তাঁহার নিকট একশত দিরহাম সাহায্য প্রার্থনা করিলে তিনি তাহার উপর এই কারণে চরম রাগ প্রকাশ করিয়াছিলেন যে, এত অল্প কিছুর জন্য তাহার নিকট প্রার্থনা করা হইল কেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن تميم بن طرفة قال سمعت عدى بن حاتم واتاه رجل يسأله مائة درهم فقال تسألني مائة درهم وانا ابن حاتم والله لا اعطيك ثم قال لولا اني سمعت رسول الله يقول من حلف على يمين ثم راى خيرا منها فليات الذي هو خير وفي رواية قال لك اربع مائة في عطائی (رواه مسلم). "তামীম ইব্ন তারফা হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি 'আদী ইবন হাতিম (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি যখন তাঁহার নিকট জনৈক লোক এক শত দিরহাম প্রার্থনা করিয়াছিল, আমি হাতিমের পুত্র। আর তুমি আমার নিকট এক শত দিরহাম প্রার্থনা করিতেছ! আল্লাহ্র শপথ! আমি তোমাকে উহা দিব না। অতঃপর বলিলেন, যদি আমি রাসূলুল্লাহ্ হইতে এই কথা না শুনিতাম যে, কোন ব্যক্তি কোন বিষয় সম্পর্কে কসম করিবার পর যদি উহা হইতে উত্তম কিছু দেখিতে পায় তাহা হইলে সে যেন কসম ভঙ্গ করিয়া সে যেন উত্তম কাজটি করে। অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, পরবর্তীতে হাতিম (রা) তাহাকে চারি শত দিরহাম দান করিলেন" (মুসলিম, দেওবন্দ, তা. বি., ২খ., পৃ. ৪৮)।
📄 কিন্ন্দা গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
ইয়ামানের অন্তর্গত হাদারামাওতের একটি শহরের নাম ছিল কিন্ন্দা। এখানকার অধিবাসিগণকে কিনদী বলা হইত। আশ'আছ ইন্ন কায়স (রা) ছিলেন এ গোত্রের নেতা। দশম হিজরী সনে তাঁহার নেতৃত্বে ষাট কিংবা আশি জনের একটি অশ্বারোহী দল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে আগমন করে। তাহারা অত্যন্ত আড়ম্বরের সহিত আগমন করিয়াছিল। তাহাদের গায়ে ছিল
রেশমী চাদর। অস্ত্রে শস্ত্রে ছিল তাহারা খুবই সুসজ্জিত। তাঁহাদের জাকজমক অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ বললেন, তোমরা কি পূর্বে ইসলাম গ্রহণ কর নাই? তাহারা সম্মিলিতভাবে উত্তর প্রদান করিল, হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহাদিগকে বলিলেন, তাহা হইল তোমাদের কাঁধে রেশমী চাদর শোভা পাইতেছে কেন? তখন তাহারা সঙ্গে সঙ্গে রেশমী চাদর ছিঁড়িয়া শরীর হইতে ফেলিয়া দিল। উল্লেখ্য যে, উহারা রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করিবার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৮)।
আশ'আছ ইব্ন কায়স (রা) রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার সহিত বংশীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করিয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা আকিলুল মীরার (أكل الميرار) গোত্রীয় লোক এবং আপনিও সেই গোত্রভুক্ত। উল্লেখ্য যে, আকিলুল মীরার উপাধি ছিল হারিছ ইব্ন আমর, ইব্ন হাজার, ইব্ন মু'আবিয়া ও ইব্ন কিনদার। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এক ঊর্ধ্বতন দাদী অর্থাৎ কিলাব ইব্ন মুরার মাতা ছিলেন উক্ত বংশের সহিত সম্পৃক্ত। আশ'আছ (রা)-এর কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ মুচকি হাসিয়া বলিলেন, এই কথা 'আব্বাস ইব্ন আবদিল মুত্তালিব ও রাবী'আ ইব্দুল হারিছের সহিত প্রযোজ্য হয়। আমরা হইলাম নাদর ইব্ন কিনানা গোত্রের সহিত সম্পৃক্ত। প্রকাশ করা আবশ্যক যে, আব্বাস ও রাবী'আ (রা) ব্যবসার উদ্দেশ্যে ইয়ামানের ঐ এলাকায় গমন করিয়া তাহাদিগকে "আকিলুল মুরার" গোত্রীয় লোক বলিয়া পরিচয় দান করিলে সেখানকার লোক তাহাদিগকে খুবই সমাদর করিত (তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মূলুক, বৈরূত তা. বি., ৩খ., পৃ. ১৩৮)। হযরত আবূ বকর (রা) খলীফা নিযুক্ত হইবার পর এই আশ'আছ (রা)-এর সহিত তাহার বোন উম্মু ফারওয়াকে বিবাহ দেন। বিবাহ সম্পন্ন হইবার পর তিনি উটের বাজারে পৌঁছিয়া যেই উটটি তাহার সম্মুখে পড়িত তিনি উহার গর্দান উড়াইয়া দিতেন। বিশ-ত্রিশটি উট তিনি ধরাশায়ী করিলেন। তাহার এই কাণ্ড দেখিয়া লোকজন হতবাক হইয়া গেল। অতঃপর তিনি উটগুলির মূল্য পরিশোধ করিয়া বলিলেন, এইগুলি আপনাদের দাওয়াতের জন্য যবেহ করা হইয়াছে। আমি আপন শহরে থাকিলে উহা অপেক্ষা আরও বড় আয়োজন করিতাম (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ৩৬)।
📄 বানু তামীম গোত্রে ইসলামের দাওয়াত
সুকা (سقيا) নামক স্থানে বাস করিত বানু তামীম গোত্র। নবম হিজরী সনে রাসূলুল্লাহ্ উয়ায়না ইব্ন হিস্স (রা)-এর নেতৃত্বে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দলকে উহাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। রাত্রিকালে তাহারা উহাদের প্রতি দৃষ্টি দিলে বানু তামীম গোত্রের লোকেরা পলায়ন করে। তাঁহারা উক্ত গোত্রের এগারজন পুরুষ, একুশজন মহিলা ও ত্রিশজন বালককে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় লইয়া আসেন। উহার পর বানু তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করে। উহাতে এই গোত্রের কয়েকজন নেতাও ছিল। যেমন উতারিদ ইব্ন হাজিব, আকরা' ইব্ন হাবিস, যিবিরকান ইব্ন বাদ্র ও কায়স ইব্ন আসিম প্রমুখ। ইব্ন ইসহাকের বর্ণনামতে 'উয়ায়না ইব্ন হিস্স ও আকরা' ইব্ন হাবিস মক্কা।
বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ্ -এর সহিত ছিলেন। অতঃপর বানু তামীমের প্রতিনিধি দলের সহিত মদীনা আগমন করেন। এই গোত্রীয় লোকেরা ছিল যাযাবর শ্রেণীর লোক। আদব-কায়দা ও আচার-আচরণ সম্পর্কে অবহিত ছিলনা। রাসূলুল্লাহ্-এর গৃহের পিছনে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে এই বলিয়া আহ্বান করিল اخرج الينا يا محمد "হে মুহাম্মাদ! আমাদের নিকট বাহির হউন" (মুহাম্মদ 'উসমান, নাসরুল বারী, ঢাকা, তা. বি., ৮খ., পৃ. ৪২৯)।
রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগের নিকট আগমন করিলেন উহারা বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমরা আপনার নিকট আসিয়াছিলাম বংশীয় আভিজাত্য প্রকাশ করিতে। সুতরাং আমাদিগকে অনুমতি প্রদান করুন। তিনি তাহাদিগকে অনুমতি প্রদান করিলে 'উতারিদ ইন্ন হাজিব দাঁড়াইয়া স্বীয় বংশ গৌরব সম্পর্কে ভাষণ প্রদান করিল। তাহার ভাষণের ধরন ছিল এই রূপ:
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদিগকে মর্যাদাশীল করিয়াছেন, রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছেন, অগণিত ধন-ভাণ্ডারের মালিক এবং প্রাচ্যের জাতিসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করিয়াছেন। বর্তমান কালে কেহই আমাদিগের সমকক্ষতার দাবী করিতে পারে না। কেহ আমাদিগের সমমর্যাদার দাবী করিলে সে দাঁড়াইয়া এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য ও গুণের কথা উল্লেখ করুক, যাহা আমরা উল্লেখ করিলাম।
'উতারিদ ভাষণ সমাপনান্তে বসিয়া পড়িল। রাসূলুল্লাহ্ তখন ছাবিত ইব্ন কায়স (রা)-কে তাহার উত্তর প্রদানের আহ্বান জানাইলেন। তাঁহার ভাষণের সারকথা ছিল এইরূপ :
"সকল প্রসংসার অধিকারী সেই আল্লাহ্ যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করিয়াছেন, এতদুভয়ে তাঁহার নির্দেশ বাস্তবায়ন করিয়াছেন। তাঁহার নির্দেশ ব্যতীত কিছুই হয় না। তাঁহার সানুগ্রহে আমাদিগকে রাজত্ব দান করিয়াছেন। সর্বোত্তম সৃষ্টি হইতে রাসূল মনোনীত করিয়াছেন, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সম্ভ্রান্ত বংশের সদস্য, সর্বাধিক সত্যবাদী, সবচেয়ে অধিক চরিত্রবান। তাঁহার উপর কিতাব নাযিল করিয়াছেন। সৃষ্টি জগতের নিকট উহা আমানত রাখিয়াছেন। অতঃপর তিনি ঈমান আনয়নের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। তাঁহার কওমের মধ্যে যাহারা মুহাজির ও দয়াবান তাহারা ঈমান গ্রহণ করিয়াছে। বংশের দিক দিয়া তাঁহারা সবচেয়ে অভিজাত, কর্মের দিক দিয়া সর্বোত্তম। সৃষ্টি কূলের মধ্যে তাঁহারাই সর্ব প্রথম ঈমানের আহ্বানে সাড়া দিয়াছে। আর আমরা আল্লাহ্র পথে সাহায্যকারী তাঁহার রাসূলের পারিষদ। আমরা সর্বদা কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করি, উহাদিগের সহিত জিহাদে অবতীর্ণ হওয়াকে খুবই সহজ মনে করি।"
বক্তৃতা শেষে কবিতা পাঠের পালা শুরু হইল। বানু তামীমের প্রসিদ্ধ কবি যাবারকান ইব্ন বা দাঁড়াইয়া অনেকগুলি কবিতা আবৃত্তি করিল। তাহার কবিতার প্রথম চরণটি ছিল এই রূপ:
نحن الكرام فلا حى تعادلنا - منا الملوك وفينا ينصب البيع.
"আমরাই সম্ভ্রান্ত, কোন গোত্রই আমাদের সমকক্ষ নয়। আমাদের মধ্যেই রহিয়াছে রাজা-বাদশাহ, গির্জার প্রতিষ্ঠাতা আমরাই।"
তাঁহার কবিতা পাঠ শেষে রাসূলুল্লাহ্ হাসান ইব্ন ছাবিত (রা)-এর প্রতি ঈঙ্গিত করিলেন। তিনি দাঁড়াইয়া যেই কবিতা পাঠ করিলেন তাহার প্রথমাংশ ছিল এইরূপ:
📄 আবদুল কায়স গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
ان الذوائب من فهر واخواتهم - قد بينوا سنة للناس يتبعوا. "ফির গোত্রের সম্ভ্রান্ত লোকেরা এবং তাহাদের ভ্রাতৃবর্গ মানবজাতিকে অনুসরণীয় পথ বলিয়া দিয়াছে।"
অতঃপর বানু তামীম নেতা হাসসান (রা)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করিল। তাঁহার মধ্যে আল্লাহ্ প্রদত্ত শক্তি রহিয়াছে বলিয়া স্বীকার করিয়া আগত সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল (তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়া'ল-মুলুক, বৈরূত তা. বি., ৩খ., ১১৫)।
কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার নিকট প্রিয় নবীকে এই ধরনের আহ্বান করা পছন্দনীয় ছিল না। ইরশাদ হইয়াছে:
انَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ. "যাহারা ঘরের বাহির হইতে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে তাহাদের অধিকাংশ নির্বোধ" (৪৯:৪)।
وَلَوْا أَنَّهُمْ صَبَرُوا حَتَّى تَخْرُجَ إِلَيْهِمْ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "তুমি বাহির হইয়া উহাদের নিকট আসা পর্যন্ত যদি উহারা ধৈর্য ধারণ করিত তবে তাহাই উহাদের জন্য উত্তম হইত। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৪৯:৫)।
আয়াতে তাহাদেরকে নির্বোধ বলিয়া অভিহিত করা এবং পরবর্তীতে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও দয়ালু বলিয়া ঘোষণা প্রদান করিবার মধ্যে এই ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, তাহারা তাওবা করিলে উহা মার্জনা করা হইবে। বানু তামীমের সাদাসিধা হইবার আরও কিছু ঘটনা হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে।
عن عمران بن حصين قال اتى نضر من بني تميم النبي الله فقال اقبلوا البشري يا بنى تميم قالوا يا رسول الله قد بشرتنا فاعطنا فرائ ذلك في وجهه فجاء نفر من اليمن فقال اقبلوا البشرى اذ لم يقبلها بنو تميم قالوا قد قبلنا يا رسول الله. "ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানু তামীমের একদল লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিল। তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, হে বানু তামীম! সুসংবাদ গ্রহণ কর। তাহারা বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি তো আমাদেরকে শুধু সুসংবাদ শুনাইলেন, কিছু মালও প্রদান করুন। তাহাদের এই কথায় রাসূলুল্লাহ্-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ পাইল। ইত্যবসরে ইয়ামান হইতে একটি প্রতিনিধি দল আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আপনারা সুসংবাদ গ্রহণ করুন যে সুসংবাদ বানু তামীম গ্রহণ করে নাই। তাহারা বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা গ্রহণ করিলাম" (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৬২৬)।
বানু তামীম যে ইসলাম গ্রহণ করিয়া প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল সেই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ হইতে আভাষ পাওয়া যায়। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن الزبير انه قدم ركب من بني تميم على النبي ﷺ فقال ابو بكر امر القعقاع بن معبد بن زرارة قال عمر بل امر الاقرع بن حابس قال
আবু বকর মা আরদত ইল্লা খিলাফী ক্বালা উমার মা আরদত খিলাফাকা ফাতামারিয়া হাত্তা ইরতাফাত আসওয়াতুহুমা ফানাযালা ফী যালিকা ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ'মিনু লা তুক্বাদ্দিমু বাইনা ইয়াদাই আল্লাহু ওয়া রাসুলিহী হাত্তা ইনক্বাদাত। "আবদুল্লাহ্ ইবনুয যুবায়র (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানু তামীম গোত্রের একদল লোক রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিল। আবূ বাক্স (রা) বলিলেন, কা'কা' ইব্ন মা'বাদ ইব্ন যুরারা (রা)-কে আমীর নিয়োগ করুন। 'উমার (রা) বলিলেন বরং আকরা' ইব্ন হাবিস (রা)-কে আমীর নিয়োগ করুন। আবূ বাক্স (রা) বলিলেন, তুমি আমার বিরুদ্ধে কথা বলিতে চাও। উমার (রা) বলিলেন, আমি আপনার বিরোধিতা করিতে চাহি নাই। উভয়ের বাদানুবাদে উচ্চ ধ্বনি ধ্বনিত হইল। উহার পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়ঃ "হে মু'মিনগণ! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হইও না এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মু'মিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজদিগের কণ্ঠস্বর উঁচু করিও না এবং নিজদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাঁহার সহিত সেইরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না। কারণ ইহাতে তোমাদের কর্ম নিস্ফল হইয়া যাইবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে" (৪৯: ১-২; বুখারী আস-সাহীহ, প্রাগুক্ত)।
বানু তামীমের প্রশংসায় আরও বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابى هريرة قال لا أزال احب بني تميم بعد ثلث سمعته من رسول الله ﷺ يقولها فيهم هم اشد امتى على الدجال وكانت فيهم سبية عند عائشة فقال اعتقيها فانها من ولد اسماعيل وجاءت صدقاتهم فقال هذه صدقات قوم او قومي. "আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর তিনটি কথা শ্রবণ করিবার পর বানু তামীমকে ভালবাসিতেছি, কথাগুলি তিনি তাহাদের সম্পর্কে বলিয়াছিলেন। উহারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে কঠোর একটি জাতি। হযরত আইশা (রা)-এর নিকট এই গোত্রের একজন বন্দিনী ছিল। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে বলিলেন, উহাকে আযাদ করিয়া দাও। কারণ সে ইসমাঈল (আ)-এর বংশীয়। তাহাদের নিকট হইতে সাদাকার মাল আসিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা আমার গোত্রের সাদাকা” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
বাহরায়নে বসবাসকারী একটি গোত্রের নাম ছিল আবদুল কায়স গোত্র। আবদুল কায়স ছিল ঊর্ধ্বতন গোত্রপতির নাম। গোত্রপতির নামেই পরবর্তী কালে এই গোত্রের নাম আবদুল কায়স হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই গোত্রটি মোট দুইবার রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে আগমন করিয়াছিল। প্রথমবার ৫ম হিজরী বা উহারও পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার হিজরী ৮ম সনে কিংবা ৯ম সনে, মতান্তরে দশম সনে (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস-সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৪)। উহাদিগকে স্বাগত জানাইতে রাসূলুল্লাহ্ বলিয়াছিলেন: