📄 তাঈ গোত্রে ইসলাম প্রচার
জালহামা নামক এক ব্যক্তির উপাধিছিল তাঈ। এই গোত্র তাহার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া উহাদিগকে বানু তাঈ বা তাঈ গোত্র বলিয়া অভিহিত করা হয়। হিজরী নবম বা দশম সনে এই গোত্রের একদল লোক যায়দুল খায়ল নামক এক লোকের নেতৃত্বে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কাফেলার সদস্য সংখ্যা ছিল পনের জন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর গোত্রপতি "যায়দুল খায়ল" (অশ্বের যায়দ)-এর নাম পরিবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম যায়দুল খায়র বা মঙ্গলের যায়দ বলিয়া আখ্যায়িত করেন। অশ্ব চালনায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিলে তাঁহার এই উপাধি পড়িয়া গিয়াছিল।
রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম পরিবর্তন করিয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, আরবে যাহারই প্রশংসা আমি শুনিয়াছি বাস্তবে তাঁহাকে প্রশংসার তুলনায় কম পাইয়াছি, ব্যতিক্রম শুধু যায়দুল খায়ল। তাহার গুণগান যাহা আমি শুনিয়াছিলাম কার্যক্ষেত্রে আমি তাহাকে তদপেক্ষা বেশী পাইয়াছি (উসমান গণী, নায়রুল বারী, প্রাগুক্ত, ৮খ., ৪৭)।
আল্লামা শিবলী নু'মানীর মতে বানু তাঈ ইয়ামানেরই একটি প্রসিদ্ধ গেত্রের নাম। গোত্রপতি ছিলেন দুইজন - এক জন যায়দুল খায়ল এবং অপর জন আদী ইবন হাতিম তাঈ (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ১৩০)।
📄 বানূ আমের গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত দান
বানু 'আমির একটি উপগোত্রের নাম ছিল। উহারা ছিল মূলত কায়স আয়লানের অন্তর্ভুক্ত। এই গোত্রের নেতা ছিল তিন জন- আমির ইন্ন তুফায়ল, আরবাদ ইব্ন কায়স ও জাববার ইন সালমা। এই তিন জনের নেতৃত্বে এই গোত্রের তেরজন লোক হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়াছিল। 'আমির ও আরবাদ অসৎ উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। পক্ষান্তরে জাববার নিবেদিত প্রাণ লইয়া দরবারে নবুওয়াতে আসিয়াছিলেন।
'আমের মদীনায় উপনীত হইয়া সালুল পরিবারের জনৈক মহিলার গৃহে অতিথি হইয়াছিল। জাব্বার প্রসিদ্ধ সাহাবী কা'ব ইবন মালিক (রা)-এর পূর্ব পরিচিত ছিলেন। ফলে তের জন সঙ্গী সহ তিনি কা'ব (রা)-এর মেহমান হইয়াছিলেন। তাঁহার মাধ্যমেই উহারা রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপাস্থিত হইয়াছিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
আরবাদ ছিল বিখ্যাত কবি সাহাবী লাবীদ (রা)-এর ভাই। 'আমির তাহাকে বলিয়াছিল, আমরা মুহাম্মাদ-এর নিকট পৌঁছিবার পর আমি তাঁহাকে কথাবার্তা বলার মধ্যে ব্যস্ত রাখিব। উহার ফাঁকে তুমি তাঁহার কাম খতম করিয়া দিবে। তাহার গোত্রীয় লোক 'আমের ইসলাম গ্রহণ করিবার পরামর্শ দিলে সে বলিয়াছিল, আমি সেই পর্যন্ত ক্ষান্ত হইবনা যতদিন সমগ্র আরব আমার পদানত না হইবে। এই লক্ষ্যে অগ্রসর হইবার উদ্দেশ্যে আমি কুরায়শ যুবক মুহাম্মাদ-কে অনুসরণ করিব। সে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পৌঁছিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করুন। তিনি উত্তর দিলেন, যতক্ষণ তুমি এক আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস স্থাপন না করিবে সেই পর্যন্ত তোমার সহিত কোন বন্ধুত্ব স্থাপিত হইবে না। সে এই সকল কথা বলিতেছিল আর দৃষ্টি রাখিতেছিল আরবদের প্রতি যে, তাহাকে যেই বিষয়ের আদেশ করিয়াছিল তাহা সে পালন করিতে আগাইতেছে কি না? কিন্তু আরবাদ কিছুই করিবার হিম্মত পাইতেছিল না।
অপর একটি বর্ণনায় রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ আমের কে ইসলাম গ্রহণ করিবার দাওয়াত প্রদান করিলে সে বলিয়াছিল, আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করিতে পারি, আপনার বর্তমানে আমাকে আপনার স্থলবর্তী নিযুক্ত করিবেন। রাসূলুল্লাহ্ উত্তর দিলেন, এই কাজে তোমাকে এবং অন্য কাহাকেও নিযুক্ত করা যাইবে না। উহা সম্পূর্ণ আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন, তিনি যাহাকে ইচ্ছা এই দায়িত্ব অর্পণ করিবেন। অতঃপর বলিল, এই শর্তেও আমি ইসলাম গ্রহণ করিতে পারি যে, মরু অঞ্চল আপনার শাসনাধীন থাকিবে আর শহরাঞ্চল আমি শাসন করিব। রাসূলুল্লাহ্ এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করিলেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহা হইলে আমি কি প্রাপ্ত হইব? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, অন্যান্য মুসলমানগণ যাহা পাইবে তুমিও তাহা পাইবে। উত্তর শুনিয়া সে রাগে ক্ষোভে জ্বলিয়া উঠিল। হুমকী প্রদান করিল যে, আমি আপনার বিরুদ্ধে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী জড় করিব। আক্রমণের পর আক্রমণ করিয়া আপনাকে তটস্থ রাখিব। তিনি উত্তর দিলেন, তোমার অনিষ্ট হইতে আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে রক্ষা করিবেন (বুরহানুদ্দীন হালাবী, আস-সীরাতুল হালাবিয়্য, পৃ. ২১৮)।
উহাদের এই অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখিয়া উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) তাহাদের মাথায় আঘাত হানিতে লাগিলেন আর বলিতে লাগিলেন, হে বানরের দল! এই স্থান হইতে পলায়ন কর। আঘাত প্রাপ্ত হইয়া ইবনুত তুফায়ল জিজ্ঞাসা করিল, হে প্রহার কারী! আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি উসায়দ ইবন হুদায়র। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তোমার পিতা কি হুদায়র ইবন্ন সিমাক। তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। তখন সে বলিল, তোমার পিতা তো তোমা হইতে ভাল লোক ছিলেন। তিনি বলিলেন, তোমা হইতে ও আমার পিতা হইতে আমিই বরং উত্তম। কারণ তুমিও মুশরিক, আমার পিতাও মুশরিক ছিলেন। উহার পর রাসূলুল্লাহ্ অনেক দিন পর্যন্ত উহাদের উপর বদ
দু'আ করিলেন। 'আমির যাহাতে ধ্বংস হইয়া যায় সেই ধরনের রোগগ্রস্থ হইবার অভিশাপ করিলেন। বানু আমির উপগোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও আমিরের অনিষ্ট হইতে পরিত্রাণ রহিবারও দু'আ করিলেন (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪০৮)।
সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় আমির ইবনু'ত-তুফায়ল সম্পর্কে যাহা বর্ণিত হইয়াছে, উহার অংশবিশেষ হইল নিম্নরূপ:
وكان رئيس المشركين عمرو بن الطفيل خير بين ثلاث خصال فقال يكون لك اهل السهل ولى اهل المدر او اكون خليفتك او اغزوك باهل غطفان بالف والف فطعن عامر في بيت ام فلان فقال غدة كغدة البعير في بيت امرأة من ال فلان ائتوني بفرسي فمات على ظهر فرسه (رواه البخاری). "মুশরিক নেতা 'আমের ইবনু'ত-তুফায়ল রাসূলুল্লাহ্ -কে তিনটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণ করিবার এখতিয়ার প্রদান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, মরু অঞ্চল রহিবে আপনার অধীন আর শহর অঞ্চল আমার অধীন অথবা আমি আপনার স্থলাভিষিক্ত হইব। এই দুইটির বিপরীত হইলে আমি আপনার বিরুদ্ধে হাজার হাজার গাতফানী বাহিনী লইয়া চড়াও হইব। অতঃপর আমের প্লেগ রোগে আক্রান্ত হইল। সে তখন অমুক লোকের মায়ের গৃহে অবস্থান করিতেছিল। বর্ণনাকারী বলেন, অমুক পরিবারের মহিলার গৃহে অবস্থানরত অবস্থায় তাহার শরীরে উটের দেহে প্লেগের গোটা যেই ভাবে ফুটিয়া উঠে সেভাবেই ফুটিয়া উঠিয়াছিল। সে রোগে আক্রান্ত হইবার পর বলিল, আমার ঘোড়াটি লইয়া আস। ঘোড়ার উপর সওয়ার অবস্থাতেই সে মারা গেল” (বুখারী, সহীহ, ২খ, পৃ. ৫৮৬)।
হালাবী বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমের ইবনু'ত-তুফায়লের স্কন্ধে অথবা গলায় প্লেগ রোগের সঞ্চার করিলেন। সে তখন অকল্যাণের গুণে গুণান্বিত পরিবার বানু সালুল গোত্রের জনৈকা মহিলার গৃহে আশ্রিত ছিল (হালাবী, প্রাগুক্ত)।
📄 মুযায়না গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
আরবের বড় একটি গোত্রের নাম ছিল মুযায়না। রাসূলুল্লাহ্ -এর উর্ধতন পুরুষ মুদার পর্যন্ত পৌঁছিয়া এই গোত্রটি কুরায়শ বংশের সহিত মিলিত হইয়া যায়। মদীনায় দলবদ্ধ হইয়া সর্বপ্রথম যেই দলটি রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে আগমন করিয়াছিল তাহারা ছিল মুযায়না গোত্র। প্রসিদ্ধ সাহাবী নু'মান ইবন মুকাররিন (রা) ছিলেন এই গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি। মক্কা বিজয়ের সময় তিনিই ছিলেন এই গোত্রের পতাকা বহনকারী।
পরবর্তী কালে তাঁহারই নেতৃত্বে ইস্পাহান বিজয় হয় (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, মদীনা পাবলিকেশন্স, ২০০০ খৃ., পৃ. ৪১৯)।
ঐতিহাসিক আল-ওয়াকিদী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে সর্বপ্রথম আগত প্রতিনিধি দল ছিল মুদার গোত্রাধীন মুযায়না উপগোত্র। উহাদের সদস্য সংখ্যা ছিল চার শত। পঞ্চম হিজরী
সনের রজব মাসে তাহারা আগমন করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ তাহাদিগের হিজরত স্থল স্বীয় বাস ভূমিকেই ঘোষণা করেন। ইরশাদ করেন:
انتم مهاجرون حيث كنتم فارجعوا الى اموالكم "তোমাদের আবাসভূমিই তোমাদের হিজরত স্থল। তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদের নিকট ফিরিয়া যাও।"
নির্দেশ মত তাহারা স্বীয় শহরে প্রত্যাবর্তন করে। অতঃপর ইমাম ওয়াকিদী হিশাম ইবনুল- কালবী সূত্রে উল্লেখ করনে যে, মুযায়না গোত্রের সর্বপ্রথম যেই ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন খুযা'ঈ ইবন 'আবদ নাহম। তাঁহার সহিত ছিল দশ ব্যক্তির একটি দল। তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আসিয়া তাহার গোটা জাতির পক্ষ হইতে বায়'আত গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি যেই আস্থা লইয়া গোটা জাতির পক্ষ হইতে 'বায়'আত গ্রহণ করিয়াছিলেন প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহাদের মধ্যে সেই অবস্থা দেখিতে পাইলেন না। তাহারা পূর্বের অবস্থান হইতে ফিরিয়া গিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্এই সম্পর্কে অবহিত হইয়া হযরত হাসসান ইন্ন ছাবিত (রা)-কে খুযা'ঈর সহায়তায় অগ্রসর হইবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তিনি কতিপয় কবিতা রচনার মাধ্যমে উহাদের সমালোচনা করিলেন। খুযা'ঈ এই কবিতাগুলি স্বীয় গোত্র পৌঁছাইয়া দেন এবং উহা শুনাইয়া স্বীয় গোত্রের ভর্ৎসনা করেন। উহারা তাহা শুনিয়া আনুতপ্ত হয় এবং একত্রিত হইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করিয়া ইসলামে দীক্ষিত হয়। মক্কা বিজয়ের দিন মুযায়না গোত্রের সদস্য সংখ্যা ছিল এক হাজার। এই খুযা'ঈ (রা)-এর হাতেই রাসূলুল্লাহ্র বিজয়ের পতাকা দান করিয়াছিলেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ানা নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৩৩; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ২৮-২৯)।
সুনানে বায়হাকীতে হযরত নু'মান ইবন মুকাররিন (রা) হইতে তাহাদের প্রত্যাবর্তন কালীন একটি অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। তিনি বলেন, আমরা যখন প্রত্যাবর্তন করিবার সংকল্প করি তখন রাসূলুল্লাহ্ 'উমার (রা)-কে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন আমাদের বাড়ী ফিরিবার পাথেয় সংগ্রহ করিয়া দেন। উত্তরে উমার (রা) বলিলেন, আমার নিকট সামান্য খেজুর ব্যতীত অন্য কিছুই নাই। এই টুকু তাহাদের উপযোগী হইবে বলিয়া আমার মনে হয় না। রাসূলুল্লাহ্ পুনরায় তাঁহাকে একই নির্দেশ প্রদান করিলেন।
অতঃপর হযরত 'উমার (রা) সকলকে সঙ্গে লইয়া স্বীয় বাস ভূমিতে গেলেন। এমনকি তাঁহার শয্যা গৃহে লইয়া প্রবেশ করিলেন। আমরা গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম বিরাট উটের ন্যায় খেজুরের একটি স্তূপ পড়িয়া রহিয়াছে। কাফেলার প্রত্যেকেই নিজেদের চাহিদামত উহা হইতে খেজুর গ্রহণ করিলেন। খেজুর গ্রহণের পর আমিই সবার শেষে সে স্থান ত্যাগ করিয়াছি। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এত লোক খেজুর গ্রহণ করিবার পরও উহা যেমন ছিল তেমনই রহিয়া গেল, একটি খেজুরও হ্রাস পাইল না (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত,
📄 'আদী ইবন হাতিম তা'ঈর ইসলাম গ্রহণ
'আদী ইব্ন্ন হাতিম তাঈর ইসলাম গ্রহণ
আরব কিংবদন্তী দাতা হাতিম তা'ঈর পুত্র 'আদী ৭ম হিজরী সনে ইসলাম গ্রহণ করেন।
বংশীয় ধারাক্রমে তিনি ইতোপূর্বে খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি তাঁহার গোত্রীয় একজন নেতা ছিলেন। বানু তাঈ ছিল ইয়ামানের প্রসিদ্ধ একটি গোত্র। ইবন ইসহাক স্বয়ং আদীর বর্ণনা মতে তাঁহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি উল্লেখ করিয়াছেন। 'আদী ইবন হাতিম বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর ইসলামের দা'ওয়াত দান শুনিয়া আমি তাঁহার প্রতি খুবই বিক্ষুব্ধ ছিলাম। আমি আমার আরবীয় গোলামকে বলিয়া রাখিয়াছিলাম যে, মুহাম্মাদের অশ্বারোহী বাহিনী- আমাদের এলাকায় প্রবেশ করিয়াছে বলিয়া তুমি অবহিত হওয়া মাত্র আমাকে অবগত করিবে। আমি এলাকা ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইব। এই লক্ষ্যে তুমি উন্নত মানের উটগুলিকে সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রাখিবে। একদা আমার গোলামটি আসিয়া সংবাদ দিল যে, সে অনেক পতাকা উডডীয়মান দেখিয়া লোকদের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া অবহিত হইয়াছে যে, এইগুলি মুহাম্মাদ-এর বাহিনীর পতাকা। এই সংবাদ শুনিয়া আমি আমার পরিবার-পরিজন ও সন্তানদিগকে লইয়া সিরিয়ায় অবস্থিত খৃস্টধর্মের মূল কেন্দ্রের দিকে রওয়ানা হইলাম। কিন্তু আমার একজন ভগ্নি এখানে রহিয়া গিয়াছিল। মুসলিম বাহিনী তাহাকে বন্দী করিয়া বানু তাঈ গোত্রের অন্যান্য বন্দীদের সহিত রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উপস্থিত করিল। এই সময় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আমার পলায়নের সংবাদ পৌঁছিয়া গিয়াছিল। একদা তাঈ গোত্রের বন্দীদের পাশ দিয়া রাসূলুল্লাহ্ গমন করিতেছিলেন। তখন আমার ভগ্নি দাঁড়াইয়া আবেদন করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার পিতা ইনতিকাল করিয়াছেন। আমার অভিভাবকও আমার নিকট হইতে দূরে। আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ আপনাকে অনুগ্রহ করিবেন। রাসূলুল্লাহ আমার আবেদন শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার অভিভাবক কে? আমি বলিলাম, আদী ইবন হাতিম। শুনিয়া তিনি বলিলেন: আল্লাহ্ ও রাসূল হইতে পলায়নকারী। দ্বিতীয় দিনও আমি রাসূলুল্লাহ্-কে প্রথম দিনের ন্যায় বলিলাম। তিনি একই উত্তর দিলেন। তৃতীয় দিন রাসূলুল্লাহ্ আমার পাশ দিয়া গমন কালে আমি নিরাশ হইয়া তাঁহাকে কিছুই বলিতে চাহিলাম না। কিন্তু আলী (রা) আমাকে ইংগিত করিলে আমি দাঁড়াইয়া পূর্বের ন্যায় আবেদন করিলাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আমি তোমার বিষয় অবহিত হইয়াছি। তোমাকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইবে। তুমি তাড়াহুড়া করিওনা। এমন কোন বিশ্বস্ত লোক যদি পাও, যে তোমাকে তোমার স্বজনের নিকট পৌঁছাইয়া দিবে তখন আমাকে অবহিত করিও। বালী বা কুদা'আ গোত্রের কিছু লোককে পাইয়া আমি রাসূলুল্লাহ্-কে অবহিত করিলাম যে, ইহাদের সহিত আমি নিরাপদে আপনজনদের নিকট পৌঁছিতে পারিব। তিনি আমাকে কাপড় ও সফরের পাথেয় দান করিয়া বিদায় দিলেন। আমি সিরিয়ায় আমার ভাইয়ের নিকট পৌঁছিয়া গেলাম। তাহাকে দেখিয়া আমি আমার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের অভিযোগ করিলে তিনি আমাকে যুক্তিসংগত কারণ দেখাইয়া সান্ত্বনা দিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে রাসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে আমি বলিলাম, অচিরেই তাঁহার সহিত আপনার সাক্ষাত করা প্রয়োজন। তিনি নবী কি বাদশাহ উহা পার্থক্য করা আপনার কর্তব্য। হাতিম কন্যার পরামর্শে তিনি মদীনায় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পৌঁছিয়া গেলেন। 'আদী ইবন হাতিম বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উপনীত হইয়া তাঁহাকে সালাম দিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,
আপনি কে? আমি আমার পরিচয় পেশ করিলাম। আমাকে লইয়া তিনি তাঁহার গৃহের দিকে রওয়ানা করিলেন। এমতাবস্থায় জনৈকা বৃদ্ধা তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিল। সে কথা বলিতে আসিয়াছে বলিয়া জানাইল। তিনি দীর্ঘক্ষণ দণ্ডায়মান থাকিয়া তাহার কথা শুনিলেন। এই দৃশ্য দেখিয়াই আমার মনে হইল তিনি অবশ্যই কোন রাজা-বাদশাহ নহেন। অতঃপর গৃহে প্রবেশ করিয়া খেজুরের ছালা ভর্তি একটি গদির উপরে আমাকে বসিতে বলিয়া তিনি মাটির উপর বসিয়া গেলেন। অবস্থাদৃশ্যে আমি মনে মনে বলিলাম, নিশ্চিয়ই তিনি কোন রাজা-বাদশাহ নহেন। উহার পর আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে 'আদী! তুমি কি খৃস্টান ছিলে না? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। আরও বলিলেন, তুমি কি স্বজাতির লোকদের নিকট হইতে গণীমতের সম্পদ হইতে এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করিতে না? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। তিনি বলিলেন, উহাতো তোমাদের খৃস্টান ধর্মে বৈধ নয়। আমি উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, উহা বৈধ নয়। আমি তখনই বুঝিয়া ফেলিলাম যে, তিনি সত্যিই আল্লাহ্র রাসূল। অজানা কথাও তিনি জানেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হে 'আদী! হয়ত তুমি মুসলমানদের অস্বচ্ছলতা দেখিয়া ইসলাম গ্রহণ হইতে বিরত রহিয়াছ। আল্লাহ্র শপথ, অচিরেই উহারা এতই সম্পদের অধিকারী হইবে যে, উহাদের মধ্যে সাদাকা গ্রহণের জন্য কোন লোকই পাওয়া যাইবেনা। হয়ত একারণেও তুমি ইসলাম গ্রহণ হইতে বাধা প্রাপ্ত হইতেছ যে, মুসলমানদের শত্রু সংখ্যা বেশী এবং উহাদের জনবল কম। আল্লাহ্র শপথ! অচিরেই তুমি কোন মহিলার নিকট হইতে শুনিতে পাইবে যে, সে কাদিসিয়া হইতে স্বীয় উটের উপর সওয়ার হইয়া এই গৃহ পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে। পথে সে কাহাকেও ভয় পায় না। হয়ত ইসলামের পতাকাতলে প্রবেশ করিতে তুমি এই কারণে বাধাপ্রাপ্ত হইতেছে যে, মুসলমানদের প্রতিপক্ষ দলে রহিয়াছে রাজা-বাদশাহ শ্রেণীর লোক। অচিরেই তুমি দেখিতে পাইবে যে, বাবিল শহরের সুরম্য শ্বেত পাথরে নির্মিত অট্টালিকাগুলি মুসলিমদের পদানত হইয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্-এর এই বক্তব্য শুনিয়া ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
আদী ইব্ন হাতিম (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণের দুই বৎসর অতিক্রান্ত হইবার পর তৃতীয় বৎসরে আমি দেখিতে পাইলাম যে, বাবিল শহরের সুরম্য অট্টলিকাগুলি মুসলামানদের দখলে আসিয়া গিয়াছে। আরও দেখিলাম, কোন মহিলা একা একা কাদিসিয়া হইতে রওয়ানা করিয়া বায়তুল্লাহ্ শরীফে তাওয়াফ করিয়াছে। পথে সে কাহাকেও ভয় পায় নাই। রাসূলুল্লাহ্-এর এই দুইটি ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিফলিত হইবার ফলে আমি নিশ্চিত হইয়া গেলাম যে, তৃতীয় বৎসর মুলমানগণ এতই প্রাচুর্যের অধিকারী হইবেন যে, তখন তাহাদের মধ্যে কোন লোক সাদকা গ্রহণের প্রতি উৎসাহী পাওয়া যাইবে না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, বৈরূত ১৪১৫/১৯৯৪ ৫খ., পৃ. ৫০)।
'উমার ইবনুল খাত্তাব (র)-এর খিলাফত কালে আদী ইব্ন হাতিম একটি কাফেলাসহ তাহার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তখন তাহাদের মধ্যে যে কথোপকথন হইয়াছিল উহা সহীহ বুখারীর নিম্নোক্ত হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
عن عدي بن حاتم قال اتينا عمر في وفد فجعل يدعو رجلا رجلا ويسميهم فقلت اما تعرفنی با امير المؤمنين قال بلی اسلمت اذكفروا
واقبلت اذ ادبروا ووفيت اذ غدروا وعرفت اذ انكروا فقال عدى فلا ابالي اذا (رواه البخاري). "আদী ইব্ন হাতিম (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একটি প্রতিনিধিদল উমার (রা)-এর নিকট আগমন করিলাম। তিনি এক একজনকে নাম ধরিয়া ডাকিলেন। আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি আমাকে চিনেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। যখন লোকেরা কুফরী করিল তখন আপনি ইসলাম গ্রহণ করিলেন। যখন তাহারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল তখন আপনি অগ্রসর হইলেন। যখন তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা করিল তখন আপনি বিশ্বস্ততার পরিচয় দিলেন। যখন উহারা অস্বীকার করিল তখন আপনি স্বীকার করিলেন। আদী (রা) বলিলেন, যথেষ্ট হইয়াছে, এখন আমার কোন কিছু বলার নাই” (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬৩০)।
'আদী (রা) ছিলেন স্বীয় পিতা হাতিম তা'ঈর মতই দানবীর। কোন এক লোক তাঁহার নিকট একশত দিরহাম সাহায্য প্রার্থনা করিলে তিনি তাহার উপর এই কারণে চরম রাগ প্রকাশ করিয়াছিলেন যে, এত অল্প কিছুর জন্য তাহার নিকট প্রার্থনা করা হইল কেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن تميم بن طرفة قال سمعت عدى بن حاتم واتاه رجل يسأله مائة درهم فقال تسألني مائة درهم وانا ابن حاتم والله لا اعطيك ثم قال لولا اني سمعت رسول الله يقول من حلف على يمين ثم راى خيرا منها فليات الذي هو خير وفي رواية قال لك اربع مائة في عطائی (رواه مسلم). "তামীম ইব্ন তারফা হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি 'আদী ইবন হাতিম (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি যখন তাঁহার নিকট জনৈক লোক এক শত দিরহাম প্রার্থনা করিয়াছিল, আমি হাতিমের পুত্র। আর তুমি আমার নিকট এক শত দিরহাম প্রার্থনা করিতেছ! আল্লাহ্র শপথ! আমি তোমাকে উহা দিব না। অতঃপর বলিলেন, যদি আমি রাসূলুল্লাহ্ হইতে এই কথা না শুনিতাম যে, কোন ব্যক্তি কোন বিষয় সম্পর্কে কসম করিবার পর যদি উহা হইতে উত্তম কিছু দেখিতে পায় তাহা হইলে সে যেন কসম ভঙ্গ করিয়া সে যেন উত্তম কাজটি করে। অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, পরবর্তীতে হাতিম (রা) তাহাকে চারি শত দিরহাম দান করিলেন" (মুসলিম, দেওবন্দ, তা. বি., ২খ., পৃ. ৪৮)।