📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওস গোত্রে ইসলাম প্রচার

📄 দাওস গোত্রে ইসলাম প্রচার


দাওস আরবের একটি প্রসিদ্ধ গোত্রের নাম। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ও আবূ হুরায়রা (রা) এই গোত্রেরই লোক ছিলেন। গোত্রপতি তুফায়ল ইবন 'আমর আদ-দাওসী ছিলেন এক প্রসিদ্ধ কবি। রাসূলুল্লাহ্-এর হিজরতের পূর্বেই তিনি মক্কায় উপনীত হইয়াছিলেন। কিন্তু মক্কার কাফিরগণ তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিতে বারণ করিয়াছিল। দৈবাৎ তিনি হারাম শরীফে গেলে সেখানে রাসূলুল্লাহ্ -কে সালাত আদায়রত দেখিতে পাইলেন। পাশে দাঁড়াইয়া তাঁহার কিরা'আত শুনিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে বিপ্লব সংঘটিত হইল। আরয করিলেন, আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে খুলিয়া বলুন। তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের স্বরূপ খুলিয়া বলিলেন এবং আল-কুরআনের তিলাওয়াত শুনাইলেন। সংগে সংগে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হইয়া গেলেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া তুফায়ল (রা) গোত্রীয় অন্যান্য লোককেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। দাওস গোত্রে ছিল যিনার বাজার খুবই গরম। তাহারা মনে করিল ইসলাম গ্রহণ করিবার পর এই স্বাধীনতা থাকিবে কিনা। এই কারণে তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে সংকোচ বোধ করিল।
তুফায়ল (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হইয়া উহাদের অবস্থা শুনাইলেন। তিনি তাহাদের দু'আ করিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, ১৪২১ হি.)। দাওস নেতা তুফায়ল হিজরতের একাদশ বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি মক্কায় সেই সময় উপস্থিত হইলে মক্কার কাফিররা তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ্ হইতে দূরে থাকিবার জন্য খুবই ভয় দেখাইয়াছিল, যাহার ফলে তিনি স্বীয় কানে তুলা ঢুকাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন যাহাতে মুহাম্মাদ-এর কথা তাহার কর্ণ কুহরে প্রবেশ না করে। কিন্তু দৈবাৎ কোন এক ফজরের সালাতে তিনি রাসূলুল্লাহ-এর কিরা'আত শুনিয়া ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া গিয়াছিলেন।
অতঃপর তিনি তাহার গোত্র যাহাতে ইসলাম গ্রহণ করে সেইজন্য রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট দু'আ চাহিয়াছিলেন। তাহার মধ্যে এমন একটি লক্ষণও সৃষ্টি করিয়া দিরার জন্য আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করিবার কথা বলিয়া দিলেন যাহার ফলে স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচার সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহার জন্য দু'আ করিলেন:
اللهم اجعل له اية. "হে আল্লাহ! তাহার মধ্যে একটি লক্ষণ সৃষ্টি করিয়া দাও।"
তুফায়ল (রা) বলেন, আমি যখন স্বীয় আবাসভূমির নিকটবর্তী হইয়া গোলাম তখন আমার দুই চক্ষুর মধ্যবর্তী স্থলে আলোকবর্তিকার ন্যায় একটি 'নূর' সৃষ্টি হইয়া গেল। আমি তখন আল্লাহ তা'আলার দরবারে আলোটি অন্য কোন স্থানে স্থানান্তরিত হইবার জন্য প্রার্থনা করিলাম যাহাতে স্বজাতি লোকেরা দেশ ত্যাগের ফলে আমার দৈহিক কোন পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে বলিয়া মনে না করে। অতঃপর এই আলোটি আমার হাতের লাঠিতে স্থানান্তরিত হইয়া গেল। আর লাঠিটি একটি হারিকেনের আকৃতি ধারণ করিল। অতঃপর আমি ইসলাম প্রচার করা আরম্ভ করিলাম। আমার আহ্বানে সাড়া দিয়া আমার পিতা, আমার সহধর্মীনি ও আবূ হুরায়রা (রা) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কিন্তু অন্যান্য লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইল। ফলে পুনরায় আমি মক্কা মুকাররামায় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া এখানকার অবস্থা শুনাইলাম। তিনি তখন দু'আ করিলেন (উসমান গণী, নায়রুল বারী, দেওবন্দ, ১৪১৭ হি., ৮খ., পৃ. ৪৬৮)
এই সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছে:
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال جاء الطفيل بن عمرو الى النبي ﷺ فقال ان دوسا قد هلكت عصت وابت فادع الله عليهم فقال اللهم اهد دوسا وأت بهم (رواه البخاري). "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুফায়ল ইন্ন 'আমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, দাওস গোত্র ধ্বংস হইয়া গিয়াছে, অবাধ্যতা অবলম্বন করিয়াছে ও ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাইয়াছে। আপনি উহাদের বদদু'আ করুন। তিনি দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান কর এবং তাহাদেরকে আমার নিকট লইয়া আস” (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬৩০)।
রাসূলুল্লাহ্-এর এই দু'আর পর তুফায়ল ইবন আমর (রা) স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া ইসলাম প্রচার করিতে লাগিলেন। লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ যখন খায়বারে অবস্থান গ্রহণ করিতেছিলেন তখন ৭০ কিংবা ৮০ জনের একটি মুসলিম কাফিলা লইয়া তিনি তাঁহার নিকট আগমন করিলেন (আল-কাসতাল্লানী, ইরশাদুস সারী, বরাত পাদটীকা সহীহ বুখারী, কৃত আহমদ আলী সাহারান পুরী, ২খ., ৬৩০)।
দাওস গোত্রীয় আবূ হুরায়রা (রা) যখন সপ্তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করিতে আসিতেছিলেন তখন তাঁহার এক অভিব্যক্তি স্বয়ং তিনিই প্রকাশ করেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن ابي هريرة قال لما قدمت على النبي الله قلت في الطريق يا ليلة من طولها وعنائها على انها من دارة الكفر نجت وابق غلام لى فى الطريق فلما قدمت على
النبي ﷺ فبايعته فبينا انا عنده اذ طلع الغلام فقال لى النبي ﷺ يا أبا هريرة هذا غلامك فقال هو لوجه الله فاعتقته. "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিতেছিলাম, তখন পথিমধ্যে (কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে) বলিলাম, হে রাত্রি! তোমার দীর্ঘতা ও যাতনা দান সত্ত্বেও আমাকে কুফরীর স্থান হইতে মুক্তি দাও। অতঃপর তিনি বলেন, পথিমধ্যে আমার গোলাম পালাইয়া গিয়াছিল। আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার নিকট বায়'আত গ্রহণ করিলাম। ইতোমধ্যে আমার গোলামটি আসিল। তিনি আমাকে বলিলেন, আবূ হুরায়রা! এইতো তোমার গোলাম। তখন আল্লাহর ওয়াস্তে তিনি তাহাকে আযাদ করিয়া দিলেন” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাঈ গোত্রে ইসলাম প্রচার

📄 তাঈ গোত্রে ইসলাম প্রচার


জালহামা নামক এক ব্যক্তির উপাধিছিল তাঈ। এই গোত্র তাহার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া উহাদিগকে বানু তাঈ বা তাঈ গোত্র বলিয়া অভিহিত করা হয়। হিজরী নবম বা দশম সনে এই গোত্রের একদল লোক যায়দুল খায়ল নামক এক লোকের নেতৃত্বে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কাফেলার সদস্য সংখ্যা ছিল পনের জন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর গোত্রপতি "যায়দুল খায়ল" (অশ্বের যায়দ)-এর নাম পরিবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম যায়দুল খায়র বা মঙ্গলের যায়দ বলিয়া আখ্যায়িত করেন। অশ্ব চালনায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিলে তাঁহার এই উপাধি পড়িয়া গিয়াছিল।
রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম পরিবর্তন করিয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, আরবে যাহারই প্রশংসা আমি শুনিয়াছি বাস্তবে তাঁহাকে প্রশংসার তুলনায় কম পাইয়াছি, ব্যতিক্রম শুধু যায়দুল খায়ল। তাহার গুণগান যাহা আমি শুনিয়াছিলাম কার্যক্ষেত্রে আমি তাহাকে তদপেক্ষা বেশী পাইয়াছি (উসমান গণী, নায়রুল বারী, প্রাগুক্ত, ৮খ., ৪৭)।
আল্লামা শিবলী নু'মানীর মতে বানু তাঈ ইয়ামানেরই একটি প্রসিদ্ধ গেত্রের নাম। গোত্রপতি ছিলেন দুইজন - এক জন যায়দুল খায়ল এবং অপর জন আদী ইবন হাতিম তাঈ (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ১৩০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানূ আমের গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত দান

📄 বানূ আমের গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত দান


বানু 'আমির একটি উপগোত্রের নাম ছিল। উহারা ছিল মূলত কায়স আয়লানের অন্তর্ভুক্ত। এই গোত্রের নেতা ছিল তিন জন- আমির ইন্ন তুফায়ল, আরবাদ ইব্‌ন কায়স ও জাববার ইন সালমা। এই তিন জনের নেতৃত্বে এই গোত্রের তেরজন লোক হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়াছিল। 'আমির ও আরবাদ অসৎ উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। পক্ষান্তরে জাববার নিবেদিত প্রাণ লইয়া দরবারে নবুওয়াতে আসিয়াছিলেন।
'আমের মদীনায় উপনীত হইয়া সালুল পরিবারের জনৈক মহিলার গৃহে অতিথি হইয়াছিল। জাব্বার প্রসিদ্ধ সাহাবী কা'ব ইবন মালিক (রা)-এর পূর্ব পরিচিত ছিলেন। ফলে তের জন সঙ্গী সহ তিনি কা'ব (রা)-এর মেহমান হইয়াছিলেন। তাঁহার মাধ্যমেই উহারা রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপাস্থিত হইয়াছিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
আরবাদ ছিল বিখ্যাত কবি সাহাবী লাবীদ (রা)-এর ভাই। 'আমির তাহাকে বলিয়াছিল, আমরা মুহাম্মাদ-এর নিকট পৌঁছিবার পর আমি তাঁহাকে কথাবার্তা বলার মধ্যে ব্যস্ত রাখিব। উহার ফাঁকে তুমি তাঁহার কাম খতম করিয়া দিবে। তাহার গোত্রীয় লোক 'আমের ইসলাম গ্রহণ করিবার পরামর্শ দিলে সে বলিয়াছিল, আমি সেই পর্যন্ত ক্ষান্ত হইবনা যতদিন সমগ্র আরব আমার পদানত না হইবে। এই লক্ষ্যে অগ্রসর হইবার উদ্দেশ্যে আমি কুরায়শ যুবক মুহাম্মাদ-কে অনুসরণ করিব। সে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পৌঁছিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করুন। তিনি উত্তর দিলেন, যতক্ষণ তুমি এক আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস স্থাপন না করিবে সেই পর্যন্ত তোমার সহিত কোন বন্ধুত্ব স্থাপিত হইবে না। সে এই সকল কথা বলিতেছিল আর দৃষ্টি রাখিতেছিল আরবদের প্রতি যে, তাহাকে যেই বিষয়ের আদেশ করিয়াছিল তাহা সে পালন করিতে আগাইতেছে কি না? কিন্তু আরবাদ কিছুই করিবার হিম্মত পাইতেছিল না।
অপর একটি বর্ণনায় রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ আমের কে ইসলাম গ্রহণ করিবার দাওয়াত প্রদান করিলে সে বলিয়াছিল, আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করিতে পারি, আপনার বর্তমানে আমাকে আপনার স্থলবর্তী নিযুক্ত করিবেন। রাসূলুল্লাহ্ উত্তর দিলেন, এই কাজে তোমাকে এবং অন্য কাহাকেও নিযুক্ত করা যাইবে না। উহা সম্পূর্ণ আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন, তিনি যাহাকে ইচ্ছা এই দায়িত্ব অর্পণ করিবেন। অতঃপর বলিল, এই শর্তেও আমি ইসলাম গ্রহণ করিতে পারি যে, মরু অঞ্চল আপনার শাসনাধীন থাকিবে আর শহরাঞ্চল আমি শাসন করিব। রাসূলুল্লাহ্ এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করিলেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহা হইলে আমি কি প্রাপ্ত হইব? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, অন্যান্য মুসলমানগণ যাহা পাইবে তুমিও তাহা পাইবে। উত্তর শুনিয়া সে রাগে ক্ষোভে জ্বলিয়া উঠিল। হুমকী প্রদান করিল যে, আমি আপনার বিরুদ্ধে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী জড় করিব। আক্রমণের পর আক্রমণ করিয়া আপনাকে তটস্থ রাখিব। তিনি উত্তর দিলেন, তোমার অনিষ্ট হইতে আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে রক্ষা করিবেন (বুরহানুদ্দীন হালাবী, আস-সীরাতুল হালাবিয়্য, পৃ. ২১৮)।
উহাদের এই অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখিয়া উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) তাহাদের মাথায় আঘাত হানিতে লাগিলেন আর বলিতে লাগিলেন, হে বানরের দল! এই স্থান হইতে পলায়ন কর। আঘাত প্রাপ্ত হইয়া ইবনুত তুফায়ল জিজ্ঞাসা করিল, হে প্রহার কারী! আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি উসায়দ ইবন হুদায়র। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তোমার পিতা কি হুদায়র ইবন্ন সিমাক। তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। তখন সে বলিল, তোমার পিতা তো তোমা হইতে ভাল লোক ছিলেন। তিনি বলিলেন, তোমা হইতে ও আমার পিতা হইতে আমিই বরং উত্তম। কারণ তুমিও মুশরিক, আমার পিতাও মুশরিক ছিলেন। উহার পর রাসূলুল্লাহ্ অনেক দিন পর্যন্ত উহাদের উপর বদ
দু'আ করিলেন। 'আমির যাহাতে ধ্বংস হইয়া যায় সেই ধরনের রোগগ্রস্থ হইবার অভিশাপ করিলেন। বানু আমির উপগোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও আমিরের অনিষ্ট হইতে পরিত্রাণ রহিবারও দু'আ করিলেন (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪০৮)।
সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় আমির ইবনু'ত-তুফায়ল সম্পর্কে যাহা বর্ণিত হইয়াছে, উহার অংশবিশেষ হইল নিম্নরূপ:
وكان رئيس المشركين عمرو بن الطفيل خير بين ثلاث خصال فقال يكون لك اهل السهل ولى اهل المدر او اكون خليفتك او اغزوك باهل غطفان بالف والف فطعن عامر في بيت ام فلان فقال غدة كغدة البعير في بيت امرأة من ال فلان ائتوني بفرسي فمات على ظهر فرسه (رواه البخاری). "মুশরিক নেতা 'আমের ইবনু'ত-তুফায়ল রাসূলুল্লাহ্ -কে তিনটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণ করিবার এখতিয়ার প্রদান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, মরু অঞ্চল রহিবে আপনার অধীন আর শহর অঞ্চল আমার অধীন অথবা আমি আপনার স্থলাভিষিক্ত হইব। এই দুইটির বিপরীত হইলে আমি আপনার বিরুদ্ধে হাজার হাজার গাতফানী বাহিনী লইয়া চড়াও হইব। অতঃপর আমের প্লেগ রোগে আক্রান্ত হইল। সে তখন অমুক লোকের মায়ের গৃহে অবস্থান করিতেছিল। বর্ণনাকারী বলেন, অমুক পরিবারের মহিলার গৃহে অবস্থানরত অবস্থায় তাহার শরীরে উটের দেহে প্লেগের গোটা যেই ভাবে ফুটিয়া উঠে সেভাবেই ফুটিয়া উঠিয়াছিল। সে রোগে আক্রান্ত হইবার পর বলিল, আমার ঘোড়াটি লইয়া আস। ঘোড়ার উপর সওয়ার অবস্থাতেই সে মারা গেল” (বুখারী, সহীহ, ২খ, পৃ. ৫৮৬)।
হালাবী বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমের ইবনু'ত-তুফায়লের স্কন্ধে অথবা গলায় প্লেগ রোগের সঞ্চার করিলেন। সে তখন অকল্যাণের গুণে গুণান্বিত পরিবার বানু সালুল গোত্রের জনৈকা মহিলার গৃহে আশ্রিত ছিল (হালাবী, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুযায়না গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 মুযায়না গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


আরবের বড় একটি গোত্রের নাম ছিল মুযায়না। রাসূলুল্লাহ্ -এর উর্ধতন পুরুষ মুদার পর্যন্ত পৌঁছিয়া এই গোত্রটি কুরায়শ বংশের সহিত মিলিত হইয়া যায়। মদীনায় দলবদ্ধ হইয়া সর্বপ্রথম যেই দলটি রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে আগমন করিয়াছিল তাহারা ছিল মুযায়না গোত্র। প্রসিদ্ধ সাহাবী নু'মান ইবন মুকাররিন (রা) ছিলেন এই গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি। মক্কা বিজয়ের সময় তিনিই ছিলেন এই গোত্রের পতাকা বহনকারী।
পরবর্তী কালে তাঁহারই নেতৃত্বে ইস্পাহান বিজয় হয় (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, মদীনা পাবলিকেশন্স, ২০০০ খৃ., পৃ. ৪১৯)।
ঐতিহাসিক আল-ওয়াকিদী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে সর্বপ্রথম আগত প্রতিনিধি দল ছিল মুদার গোত্রাধীন মুযায়না উপগোত্র। উহাদের সদস্য সংখ্যা ছিল চার শত। পঞ্চম হিজরী
সনের রজব মাসে তাহারা আগমন করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ তাহাদিগের হিজরত স্থল স্বীয় বাস ভূমিকেই ঘোষণা করেন। ইরশাদ করেন:
انتم مهاجرون حيث كنتم فارجعوا الى اموالكم "তোমাদের আবাসভূমিই তোমাদের হিজরত স্থল। তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদের নিকট ফিরিয়া যাও।"
নির্দেশ মত তাহারা স্বীয় শহরে প্রত্যাবর্তন করে। অতঃপর ইমাম ওয়াকিদী হিশাম ইবনুল- কালবী সূত্রে উল্লেখ করনে যে, মুযায়না গোত্রের সর্বপ্রথম যেই ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন খুযা'ঈ ইবন 'আবদ নাহম। তাঁহার সহিত ছিল দশ ব্যক্তির একটি দল। তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আসিয়া তাহার গোটা জাতির পক্ষ হইতে বায়'আত গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি যেই আস্থা লইয়া গোটা জাতির পক্ষ হইতে 'বায়'আত গ্রহণ করিয়াছিলেন প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহাদের মধ্যে সেই অবস্থা দেখিতে পাইলেন না। তাহারা পূর্বের অবস্থান হইতে ফিরিয়া গিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্এই সম্পর্কে অবহিত হইয়া হযরত হাসসান ইন্ন ছাবিত (রা)-কে খুযা'ঈর সহায়তায় অগ্রসর হইবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তিনি কতিপয় কবিতা রচনার মাধ্যমে উহাদের সমালোচনা করিলেন। খুযা'ঈ এই কবিতাগুলি স্বীয় গোত্র পৌঁছাইয়া দেন এবং উহা শুনাইয়া স্বীয় গোত্রের ভর্ৎসনা করেন। উহারা তাহা শুনিয়া আনুতপ্ত হয় এবং একত্রিত হইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করিয়া ইসলামে দীক্ষিত হয়। মক্কা বিজয়ের দিন মুযায়না গোত্রের সদস্য সংখ্যা ছিল এক হাজার। এই খুযা'ঈ (রা)-এর হাতেই রাসূলুল্লাহ্র বিজয়ের পতাকা দান করিয়াছিলেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ানা নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৩৩; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ২৮-২৯)।
সুনানে বায়হাকীতে হযরত নু'মান ইবন মুকাররিন (রা) হইতে তাহাদের প্রত্যাবর্তন কালীন একটি অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। তিনি বলেন, আমরা যখন প্রত্যাবর্তন করিবার সংকল্প করি তখন রাসূলুল্লাহ্ 'উমার (রা)-কে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন আমাদের বাড়ী ফিরিবার পাথেয় সংগ্রহ করিয়া দেন। উত্তরে উমার (রা) বলিলেন, আমার নিকট সামান্য খেজুর ব্যতীত অন্য কিছুই নাই। এই টুকু তাহাদের উপযোগী হইবে বলিয়া আমার মনে হয় না। রাসূলুল্লাহ্ পুনরায় তাঁহাকে একই নির্দেশ প্রদান করিলেন।
অতঃপর হযরত 'উমার (রা) সকলকে সঙ্গে লইয়া স্বীয় বাস ভূমিতে গেলেন। এমনকি তাঁহার শয্যা গৃহে লইয়া প্রবেশ করিলেন। আমরা গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম বিরাট উটের ন্যায় খেজুরের একটি স্তূপ পড়িয়া রহিয়াছে। কাফেলার প্রত্যেকেই নিজেদের চাহিদামত উহা হইতে খেজুর গ্রহণ করিলেন। খেজুর গ্রহণের পর আমিই সবার শেষে সে স্থান ত্যাগ করিয়াছি। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এত লোক খেজুর গ্রহণ করিবার পরও উহা যেমন ছিল তেমনই রহিয়া গেল, একটি খেজুরও হ্রাস পাইল না (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত,

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00