📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও 'আলী (রা)-কে পর্যায়ক্রমে ইয়ামানে প্রেরণ
মু'আয ইব্ন জাবাল (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ করিবার সময় বিচারকার্য পরিচালনা কিভাবে করিবেন সেই সম্পর্কে তাঁহার নিকট জানিতে চাহিলে তিনি বলিয়াছিলেন। বর্ণিত আছে : عن معاذ بن جبل ان رسول الله ﷺ لما بعثه الى اليمن قال كيف تقضى اذا عرض لك قضاء قال اقضى بكتاب الله قال فان لم تجد في كتاب الله قال فبسنة رسول الله قال فان لم تجد في سنة رسول الله ﷺ قال اجتهد رائي ولا الوا قال فضرب رسول الله ﷺ على صدره وقال الحمد لله الذي وفق رسول رسول الله لما يرضى به رسول الله (رواه الترمذي و ابو داود ) . "মু'আয ইবন জাবাল (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে ইয়ামানে প্রেরণকালে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নিকট বিচারকার্য পেশ হইলে তুমি কিভাবে সিদ্ধান্ত দিবে? তিনি বলিলেন, আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমি সিদ্ধান্ত দান করিব। রাসূলুল্লাহ্ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি তুমি আল্লাহ্ কিতাবে না পাও? তিনি বলিলেন, তাহা হইলে আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দান করিব। রাসূলুল্লাহ্ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি তুমি হাদীছেও না পাও? তিনি উত্তর দিলেন, আমি স্বীয় অভিমত অনুযায়ী গবেষণা করিব। গবেষণা করিয়া সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে আমি ত্রুটি করিব না। তিনি বলেন, (আমার উত্তর শুনিয়া) রাসূলুল্লাহ্ আমার বুকে চপেটাঘাত করিয়া বলিলেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ্ যিনি তাঁহার রাসূলের প্রতিনিধিকে তিনি যেইভাবে সিদ্ধান্ত প্রদান পসন্দ করেন উহার তাওফীক দান করিয়াছেন” (তিরমিযী, আবূ দাউদ, বরাত মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৩২৪)।
মু'আয ইবন জাবাল (রা) সেখানে পৌঁছিবার পর জনৈক মহিলা তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিয়াছিল, হে রাসূলুল্লাহ্-এর প্রতিনিধি! স্ত্রীর উপর স্বামীর কি অধিকার রহিয়াছে? তিনি তাহাকে উত্তরে বলিয়াছিলেন, স্ত্রীর জন্য সম্ভব নয় স্বামীর হক আদায় করা। যতটুকু সম্ভব তুমি স্বামীর হক আদায় করিতে চেষ্টা করিতে থাক। মহিলাটি উহা শুনিয়া বলিল, যদি আপনি রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই আপনি অবহিত থাকিবেন স্বামীর হক স্ত্রীর উপর কতটুকু? প্রত্যুত্তরে মু'আয (রা) বলিলেন, যদি তুমি তোমার স্বামীকে এমতাবস্থায় পাও যে তাহার নাকমুখ হইতে রক্ত পুঁজ গড়াইয়া পড়িতেছে আর তুমি তোমার জিহ্বা দ্বারা উহা চাটিয়া তোল তবুও তুমি তোমর স্বামীর হক আদায় করিতে সক্ষম হইবে না (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪১৬)।
তা'ইফ হইতে প্রত্যাবর্তন এবং জি'ইররানা নামক স্থানে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভাগ করিয়া দিবার পর বিদায় হজ্জের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও আলী (রা)-কে পর্যায়ক্রমে ইয়ামান প্রেরণ করিয়াছিলেন। আলী (রা)-কে প্রেরণ করিবার পর খালিদ (রা)-কে মদীনায় চলিয়া আসার আদেশ করিয়াছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে :
عن البراء قال بعثنا رسول الله ﷺ مع خالد بن الوليد الى اليمن قال ثم بعث عليا بعد ذلك مكانه فقال مر اصحاب خالد من شاء منهم أن يعقب معك فليعقب ومن شاء فليقبل فكنت فيمن عقب معه قال فغنمت اواق ذوات عدد (رواه البخاري). "আল-বারাআ ইব্ন 'আযিব (রা)-হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-এর সহিত ইয়ামানে প্রেরণ করেন, অতঃপর তাঁহার স্থলে পরবর্তীতে আলী (রা)-কে সেখানে প্রেরণ করেন। তিনি আলী (রা)-কে বলিয়া দেন যে, খালিদ-এর সঙ্গীগণের মধ্যে এই নির্দেশ পৌঁছাইয়া দিও যে, যাহার ইচ্ছা তোমার সঙ্গে থাকিয়া যাওয়ার সে যেন তথায় থাকিয়া যায় এবং যাহার ইচ্ছা মদীনায় চলিয়া আসার সে যেন ফিরিয়া আসে। আল-বারাআ (রা) বলেন, আলী (রা)-এর সহিত যাহারা গিয়াছিলেন আমি ছিলাম তাহাদের একজন। অতঃপর আমি বহু রৌপ্যমুদ্রা লাভ করিয়াছিলাম" (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২৩)।
আলী (রা)-কে এই মুহূর্তে ইয়ামানে প্রেরনের উদ্দেশ্য ছিল গানীমাতের মাল হইতে আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ্-এর নির্ধারিত অংশ পঞ্চমাংশ গ্রহণের নিমিত্ত। ইরশাদ হইয়াছে:
عن بريدة قال بعث النبى الله عليا الى خالد ليقبض الخمس وكنت ابغض عليا وقد اغتسل فقلت لخالد الا ترى الى هذا فلما قدمنا على النبي ﷺ ذكرت ذلك له فقال يا يريدة اتبغض عليا فقلت نعم قال لا تبغضه فان له في الخمس اكثر من ذلك (رواه البخاري). "বুরায়দা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-কে খালিদ (রা)-এর নিকট হইতে গানীমাতের এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণ করিবার জন্য প্রেরণ করেন। আমি ছিলাম আলী (রা)-এর প্রতি বিতৃষ্ণ। ভোরবেলা 'আলী (রা) গোসল করিলেন। আমি খালিদ (রা)-কে বলিলাম, তুমি কি তাহাকে দেখিতেছ না? অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া বিষয়টি তাহাকে জানাইলাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হে বুরায়দা! তুমি কি আলীর প্রতি ক্ষুব্ধ? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আলীর প্রতি বিতৃষ্ণ; কারণ এক-পঞ্চমাংশে তাহার পাওনা আরও অধিক” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইয়ামান হইতে আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর বিদায় হজ্জের সময় মক্কায় সরাসরি উপনীত হইয়াছিলেন এবং তাঁহার সহিত হজ্জও করিয়াছিলেন।
عن انس ان النبي ﷺ اهل بحج وعمرة ..... فقدم علينا على بن ابي طالب من اليمن حاجا فقال النبى ﷺ بما اهللت فان معنا اهلك قال اهللت بما اهل به النبي ﷺ قال فامسك فان معنا هديا . "আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ হজ্জ ও 'উমরার একই সাথে ইহরাম করিয়াছিলেন। ...... ইত্যবসরে আমাদের নিকট আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) ইয়ামান হইতে হজ্জ করার উদ্দেশ্যে আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কিভাবে ইহরাম করিয়াছ? কারণ আমাদের সহিত রহিয়াছে তোমার স্ত্রী। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ যেইভাবে ইহরাম করিয়াছেন আমিও সেইভাবে ইহরাম করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা হইলে তুমি তাহা অব্যাহত রাখ। কারণ আমাদের সহিত কুরবানীর পশু রহিয়াছে” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বালের রিওয়ায়াতে রহিয়াছে যে, আলী (রা)-কে যখন রাসূলুল্লাহ্ ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তিনি বলিয়াছিলেন, আমি অল্প বয়স্ক যুবক। বিচার কার্য সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতা নাই, অথচ আমাকে প্রবীণ একটি জাতির প্রতি প্রেরণ করিতেছেন। তাঁহার এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার বুকে হাত রাখিয়া দু'আ করিয়াছিলেন :
اللهم ثبت لسانه واهد قلبه. "হে আল্লাহ! তাহার জিহবাকে অবিচল রাখিও এবং তাহার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করিও"।
অতঃপর তিনি তাঁহাকে অসিয়্যত করেন যে, হে আলী! যখন তোমার সম্মুখে বাদী বিবাদী নালিশ লইয়া আসে তখন প্রথম ব্যক্তি যেই অভিযোগ করে তাহা শুনিয়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিও না যেই পর্যন্ত এই বিষয়টি দ্বিতীয় ব্যক্তি হইতে না শুনিবে। উহাতে বিষয়টি তোমার নিকট স্পষ্ট হইয়া যাইবে। আলী (রা) বলেন, উহার পর সমাধান দানে আমি কোন সমস্যায় পড়ি নাই। মুসনাদে আহমাদে আরও বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ্ ইয়ামানে প্রেরণ করিবার পর আমি এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছিলাম যাহারা সিংহ নিধনের জন্য একটি গর্ত খনন করিয়াছিল। সেখানে একটি সিংহ ধরা পড়িবার পর লোকজন ধাক্কা ধাক্কি করিতে লাগিল। ইত্যবসরে গর্তে একটি লোক পড়িয়া যাওয়ার উপক্রম হইলে সে আরও একজনকে টানিয়া ধরিল এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি অন্য একজনকে জড়াইয়া ধরিল। এইভাবে গর্তে চারজন পড়িয়া গেল। সিংহ তখন তাহাদিগের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া সকলকে আহত করিল। অতঃপর এক লোক তীর নিক্ষেপ করিয়া সিংহটিকে খতম করিয়া দিল। অপর দিকে সিংহের আক্রমণের ফলে আহত চার জন লোক মারা গেল। নিহত প্রথম লোকটির আত্মীয়-স্বজনরা দ্বিতীয় লোকটির আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে চাহিল। আলী (রা) তখন তাহাদিগের মধ্যে দাঁড়াইয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ জীবিত থাকা অবস্থায় তোমরা পরস্পর কিতালে অবতীর্ণ হইবে? তাহা হইতে পারেনা। আমি তোমাদের মধ্যে বিচার-নিষ্পত্তি করিয়া দিব যদি তোমার উভয় পক্ষ উহাতে সম্মত হও। অন্যথায় আমি তোমাদিগকে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পাঠাইয়া দিব। তিনি তোমাদের এই বিবাদের সমাধান করিবেন। এতদসত্ত্বেও যাহারা অন্যায় করিবে তাহারা অধিকার হইতে বঞ্চিত হইবে। উহার পর তিনি সমাধান দিলেন যে, গর্তের নিকট যে সকল গোত্র উপস্থিত ছিল সবাই মিলিয়া দিয়াতের এক-চতুর্থাংশ, তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও পূর্ণ অংশ একত্রিত
কর। প্রথম যেই লোকটি গর্ভে পড়িয়াছিল তাহার আত্মীয়-স্বজনরা পাইবেন এক চতুর্থাংশ, দ্বিতীয় লোকটি পাইবে এক-তৃতীয়াংশ, তৃতীয় লোকটি পাইবে অর্ধাংশ এবং চতুর্থ লোকটি পাইবে পূর্ণ অংশ।
আলী (রা)-এর এই সমাধান মানিয়া লইতে তাহারা অস্বীকার করিল। ফলে তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিল। তিনি তখন মাকামে ইবরাহীমে অবস্থান রত ছিলেন। তাঁহারা তাঁহার নিকট বিষয়টির বিবরণ দিলেন। ইতোমধ্যে এক লোক বলিয়া উঠিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আলী (রা) এই ব্যাপারে আমাদেরকে একটি সমাধান দান করিয়াছেন। অতঃপর বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট ব্যক্ত করা হইল। রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-এর সমাধানকে স্থির রাখিলেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৮৪)।
📄 দাওস গোত্রে ইসলাম প্রচার
দাওস আরবের একটি প্রসিদ্ধ গোত্রের নাম। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ও আবূ হুরায়রা (রা) এই গোত্রেরই লোক ছিলেন। গোত্রপতি তুফায়ল ইবন 'আমর আদ-দাওসী ছিলেন এক প্রসিদ্ধ কবি। রাসূলুল্লাহ্-এর হিজরতের পূর্বেই তিনি মক্কায় উপনীত হইয়াছিলেন। কিন্তু মক্কার কাফিরগণ তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিতে বারণ করিয়াছিল। দৈবাৎ তিনি হারাম শরীফে গেলে সেখানে রাসূলুল্লাহ্ -কে সালাত আদায়রত দেখিতে পাইলেন। পাশে দাঁড়াইয়া তাঁহার কিরা'আত শুনিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে বিপ্লব সংঘটিত হইল। আরয করিলেন, আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে খুলিয়া বলুন। তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের স্বরূপ খুলিয়া বলিলেন এবং আল-কুরআনের তিলাওয়াত শুনাইলেন। সংগে সংগে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হইয়া গেলেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া তুফায়ল (রা) গোত্রীয় অন্যান্য লোককেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। দাওস গোত্রে ছিল যিনার বাজার খুবই গরম। তাহারা মনে করিল ইসলাম গ্রহণ করিবার পর এই স্বাধীনতা থাকিবে কিনা। এই কারণে তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে সংকোচ বোধ করিল।
তুফায়ল (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হইয়া উহাদের অবস্থা শুনাইলেন। তিনি তাহাদের দু'আ করিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, ১৪২১ হি.)। দাওস নেতা তুফায়ল হিজরতের একাদশ বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি মক্কায় সেই সময় উপস্থিত হইলে মক্কার কাফিররা তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ্ হইতে দূরে থাকিবার জন্য খুবই ভয় দেখাইয়াছিল, যাহার ফলে তিনি স্বীয় কানে তুলা ঢুকাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন যাহাতে মুহাম্মাদ-এর কথা তাহার কর্ণ কুহরে প্রবেশ না করে। কিন্তু দৈবাৎ কোন এক ফজরের সালাতে তিনি রাসূলুল্লাহ-এর কিরা'আত শুনিয়া ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া গিয়াছিলেন।
অতঃপর তিনি তাহার গোত্র যাহাতে ইসলাম গ্রহণ করে সেইজন্য রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট দু'আ চাহিয়াছিলেন। তাহার মধ্যে এমন একটি লক্ষণও সৃষ্টি করিয়া দিরার জন্য আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করিবার কথা বলিয়া দিলেন যাহার ফলে স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচার সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহার জন্য দু'আ করিলেন:
اللهم اجعل له اية. "হে আল্লাহ! তাহার মধ্যে একটি লক্ষণ সৃষ্টি করিয়া দাও।"
তুফায়ল (রা) বলেন, আমি যখন স্বীয় আবাসভূমির নিকটবর্তী হইয়া গোলাম তখন আমার দুই চক্ষুর মধ্যবর্তী স্থলে আলোকবর্তিকার ন্যায় একটি 'নূর' সৃষ্টি হইয়া গেল। আমি তখন আল্লাহ তা'আলার দরবারে আলোটি অন্য কোন স্থানে স্থানান্তরিত হইবার জন্য প্রার্থনা করিলাম যাহাতে স্বজাতি লোকেরা দেশ ত্যাগের ফলে আমার দৈহিক কোন পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে বলিয়া মনে না করে। অতঃপর এই আলোটি আমার হাতের লাঠিতে স্থানান্তরিত হইয়া গেল। আর লাঠিটি একটি হারিকেনের আকৃতি ধারণ করিল। অতঃপর আমি ইসলাম প্রচার করা আরম্ভ করিলাম। আমার আহ্বানে সাড়া দিয়া আমার পিতা, আমার সহধর্মীনি ও আবূ হুরায়রা (রা) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কিন্তু অন্যান্য লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইল। ফলে পুনরায় আমি মক্কা মুকাররামায় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া এখানকার অবস্থা শুনাইলাম। তিনি তখন দু'আ করিলেন (উসমান গণী, নায়রুল বারী, দেওবন্দ, ১৪১৭ হি., ৮খ., পৃ. ৪৬৮)
এই সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছে:
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال جاء الطفيل بن عمرو الى النبي ﷺ فقال ان دوسا قد هلكت عصت وابت فادع الله عليهم فقال اللهم اهد دوسا وأت بهم (رواه البخاري). "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুফায়ল ইন্ন 'আমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, দাওস গোত্র ধ্বংস হইয়া গিয়াছে, অবাধ্যতা অবলম্বন করিয়াছে ও ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাইয়াছে। আপনি উহাদের বদদু'আ করুন। তিনি দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান কর এবং তাহাদেরকে আমার নিকট লইয়া আস” (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬৩০)।
রাসূলুল্লাহ্-এর এই দু'আর পর তুফায়ল ইবন আমর (রা) স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া ইসলাম প্রচার করিতে লাগিলেন। লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ যখন খায়বারে অবস্থান গ্রহণ করিতেছিলেন তখন ৭০ কিংবা ৮০ জনের একটি মুসলিম কাফিলা লইয়া তিনি তাঁহার নিকট আগমন করিলেন (আল-কাসতাল্লানী, ইরশাদুস সারী, বরাত পাদটীকা সহীহ বুখারী, কৃত আহমদ আলী সাহারান পুরী, ২খ., ৬৩০)।
দাওস গোত্রীয় আবূ হুরায়রা (রা) যখন সপ্তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করিতে আসিতেছিলেন তখন তাঁহার এক অভিব্যক্তি স্বয়ং তিনিই প্রকাশ করেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن ابي هريرة قال لما قدمت على النبي الله قلت في الطريق يا ليلة من طولها وعنائها على انها من دارة الكفر نجت وابق غلام لى فى الطريق فلما قدمت على
النبي ﷺ فبايعته فبينا انا عنده اذ طلع الغلام فقال لى النبي ﷺ يا أبا هريرة هذا غلامك فقال هو لوجه الله فاعتقته. "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিতেছিলাম, তখন পথিমধ্যে (কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে) বলিলাম, হে রাত্রি! তোমার দীর্ঘতা ও যাতনা দান সত্ত্বেও আমাকে কুফরীর স্থান হইতে মুক্তি দাও। অতঃপর তিনি বলেন, পথিমধ্যে আমার গোলাম পালাইয়া গিয়াছিল। আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার নিকট বায়'আত গ্রহণ করিলাম। ইতোমধ্যে আমার গোলামটি আসিল। তিনি আমাকে বলিলেন, আবূ হুরায়রা! এইতো তোমার গোলাম। তখন আল্লাহর ওয়াস্তে তিনি তাহাকে আযাদ করিয়া দিলেন” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
📄 তাঈ গোত্রে ইসলাম প্রচার
জালহামা নামক এক ব্যক্তির উপাধিছিল তাঈ। এই গোত্র তাহার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া উহাদিগকে বানু তাঈ বা তাঈ গোত্র বলিয়া অভিহিত করা হয়। হিজরী নবম বা দশম সনে এই গোত্রের একদল লোক যায়দুল খায়ল নামক এক লোকের নেতৃত্বে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কাফেলার সদস্য সংখ্যা ছিল পনের জন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর গোত্রপতি "যায়দুল খায়ল" (অশ্বের যায়দ)-এর নাম পরিবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম যায়দুল খায়র বা মঙ্গলের যায়দ বলিয়া আখ্যায়িত করেন। অশ্ব চালনায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিলে তাঁহার এই উপাধি পড়িয়া গিয়াছিল।
রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম পরিবর্তন করিয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, আরবে যাহারই প্রশংসা আমি শুনিয়াছি বাস্তবে তাঁহাকে প্রশংসার তুলনায় কম পাইয়াছি, ব্যতিক্রম শুধু যায়দুল খায়ল। তাহার গুণগান যাহা আমি শুনিয়াছিলাম কার্যক্ষেত্রে আমি তাহাকে তদপেক্ষা বেশী পাইয়াছি (উসমান গণী, নায়রুল বারী, প্রাগুক্ত, ৮খ., ৪৭)।
আল্লামা শিবলী নু'মানীর মতে বানু তাঈ ইয়ামানেরই একটি প্রসিদ্ধ গেত্রের নাম। গোত্রপতি ছিলেন দুইজন - এক জন যায়দুল খায়ল এবং অপর জন আদী ইবন হাতিম তাঈ (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ১৩০)।
📄 বানূ আমের গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত দান
বানু 'আমির একটি উপগোত্রের নাম ছিল। উহারা ছিল মূলত কায়স আয়লানের অন্তর্ভুক্ত। এই গোত্রের নেতা ছিল তিন জন- আমির ইন্ন তুফায়ল, আরবাদ ইব্ন কায়স ও জাববার ইন সালমা। এই তিন জনের নেতৃত্বে এই গোত্রের তেরজন লোক হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়াছিল। 'আমির ও আরবাদ অসৎ উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। পক্ষান্তরে জাববার নিবেদিত প্রাণ লইয়া দরবারে নবুওয়াতে আসিয়াছিলেন।
'আমের মদীনায় উপনীত হইয়া সালুল পরিবারের জনৈক মহিলার গৃহে অতিথি হইয়াছিল। জাব্বার প্রসিদ্ধ সাহাবী কা'ব ইবন মালিক (রা)-এর পূর্ব পরিচিত ছিলেন। ফলে তের জন সঙ্গী সহ তিনি কা'ব (রা)-এর মেহমান হইয়াছিলেন। তাঁহার মাধ্যমেই উহারা রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপাস্থিত হইয়াছিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
আরবাদ ছিল বিখ্যাত কবি সাহাবী লাবীদ (রা)-এর ভাই। 'আমির তাহাকে বলিয়াছিল, আমরা মুহাম্মাদ-এর নিকট পৌঁছিবার পর আমি তাঁহাকে কথাবার্তা বলার মধ্যে ব্যস্ত রাখিব। উহার ফাঁকে তুমি তাঁহার কাম খতম করিয়া দিবে। তাহার গোত্রীয় লোক 'আমের ইসলাম গ্রহণ করিবার পরামর্শ দিলে সে বলিয়াছিল, আমি সেই পর্যন্ত ক্ষান্ত হইবনা যতদিন সমগ্র আরব আমার পদানত না হইবে। এই লক্ষ্যে অগ্রসর হইবার উদ্দেশ্যে আমি কুরায়শ যুবক মুহাম্মাদ-কে অনুসরণ করিব। সে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পৌঁছিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করুন। তিনি উত্তর দিলেন, যতক্ষণ তুমি এক আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস স্থাপন না করিবে সেই পর্যন্ত তোমার সহিত কোন বন্ধুত্ব স্থাপিত হইবে না। সে এই সকল কথা বলিতেছিল আর দৃষ্টি রাখিতেছিল আরবদের প্রতি যে, তাহাকে যেই বিষয়ের আদেশ করিয়াছিল তাহা সে পালন করিতে আগাইতেছে কি না? কিন্তু আরবাদ কিছুই করিবার হিম্মত পাইতেছিল না।
অপর একটি বর্ণনায় রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ আমের কে ইসলাম গ্রহণ করিবার দাওয়াত প্রদান করিলে সে বলিয়াছিল, আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করিতে পারি, আপনার বর্তমানে আমাকে আপনার স্থলবর্তী নিযুক্ত করিবেন। রাসূলুল্লাহ্ উত্তর দিলেন, এই কাজে তোমাকে এবং অন্য কাহাকেও নিযুক্ত করা যাইবে না। উহা সম্পূর্ণ আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন, তিনি যাহাকে ইচ্ছা এই দায়িত্ব অর্পণ করিবেন। অতঃপর বলিল, এই শর্তেও আমি ইসলাম গ্রহণ করিতে পারি যে, মরু অঞ্চল আপনার শাসনাধীন থাকিবে আর শহরাঞ্চল আমি শাসন করিব। রাসূলুল্লাহ্ এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করিলেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহা হইলে আমি কি প্রাপ্ত হইব? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, অন্যান্য মুসলমানগণ যাহা পাইবে তুমিও তাহা পাইবে। উত্তর শুনিয়া সে রাগে ক্ষোভে জ্বলিয়া উঠিল। হুমকী প্রদান করিল যে, আমি আপনার বিরুদ্ধে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী জড় করিব। আক্রমণের পর আক্রমণ করিয়া আপনাকে তটস্থ রাখিব। তিনি উত্তর দিলেন, তোমার অনিষ্ট হইতে আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে রক্ষা করিবেন (বুরহানুদ্দীন হালাবী, আস-সীরাতুল হালাবিয়্য, পৃ. ২১৮)।
উহাদের এই অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখিয়া উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) তাহাদের মাথায় আঘাত হানিতে লাগিলেন আর বলিতে লাগিলেন, হে বানরের দল! এই স্থান হইতে পলায়ন কর। আঘাত প্রাপ্ত হইয়া ইবনুত তুফায়ল জিজ্ঞাসা করিল, হে প্রহার কারী! আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি উসায়দ ইবন হুদায়র। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তোমার পিতা কি হুদায়র ইবন্ন সিমাক। তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। তখন সে বলিল, তোমার পিতা তো তোমা হইতে ভাল লোক ছিলেন। তিনি বলিলেন, তোমা হইতে ও আমার পিতা হইতে আমিই বরং উত্তম। কারণ তুমিও মুশরিক, আমার পিতাও মুশরিক ছিলেন। উহার পর রাসূলুল্লাহ্ অনেক দিন পর্যন্ত উহাদের উপর বদ
দু'আ করিলেন। 'আমির যাহাতে ধ্বংস হইয়া যায় সেই ধরনের রোগগ্রস্থ হইবার অভিশাপ করিলেন। বানু আমির উপগোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও আমিরের অনিষ্ট হইতে পরিত্রাণ রহিবারও দু'আ করিলেন (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪০৮)।
সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় আমির ইবনু'ত-তুফায়ল সম্পর্কে যাহা বর্ণিত হইয়াছে, উহার অংশবিশেষ হইল নিম্নরূপ:
وكان رئيس المشركين عمرو بن الطفيل خير بين ثلاث خصال فقال يكون لك اهل السهل ولى اهل المدر او اكون خليفتك او اغزوك باهل غطفان بالف والف فطعن عامر في بيت ام فلان فقال غدة كغدة البعير في بيت امرأة من ال فلان ائتوني بفرسي فمات على ظهر فرسه (رواه البخاری). "মুশরিক নেতা 'আমের ইবনু'ত-তুফায়ল রাসূলুল্লাহ্ -কে তিনটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণ করিবার এখতিয়ার প্রদান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, মরু অঞ্চল রহিবে আপনার অধীন আর শহর অঞ্চল আমার অধীন অথবা আমি আপনার স্থলাভিষিক্ত হইব। এই দুইটির বিপরীত হইলে আমি আপনার বিরুদ্ধে হাজার হাজার গাতফানী বাহিনী লইয়া চড়াও হইব। অতঃপর আমের প্লেগ রোগে আক্রান্ত হইল। সে তখন অমুক লোকের মায়ের গৃহে অবস্থান করিতেছিল। বর্ণনাকারী বলেন, অমুক পরিবারের মহিলার গৃহে অবস্থানরত অবস্থায় তাহার শরীরে উটের দেহে প্লেগের গোটা যেই ভাবে ফুটিয়া উঠে সেভাবেই ফুটিয়া উঠিয়াছিল। সে রোগে আক্রান্ত হইবার পর বলিল, আমার ঘোড়াটি লইয়া আস। ঘোড়ার উপর সওয়ার অবস্থাতেই সে মারা গেল” (বুখারী, সহীহ, ২খ, পৃ. ৫৮৬)।
হালাবী বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমের ইবনু'ত-তুফায়লের স্কন্ধে অথবা গলায় প্লেগ রোগের সঞ্চার করিলেন। সে তখন অকল্যাণের গুণে গুণান্বিত পরিবার বানু সালুল গোত্রের জনৈকা মহিলার গৃহে আশ্রিত ছিল (হালাবী, প্রাগুক্ত)।