📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ মূসা ও মু'আয (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ

📄 আবূ মূসা ও মু'আয (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ


আরব রাজ্যসমূহের মধ্যে ইয়ামন ছিল সর্বাধিক স্বাচ্ছন্দ্যশীল এলাকা। প্রাচীন কাল হইতেই উহা উন্নতমানের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছিল। সাবা ও হিময়ারীদের বিশাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এখানেই। রাসূলুল্লাহ্-এর ইহলোকে আগমনের প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে ৫২৫ খৃষ্টাব্দে আবিসিনিয়ার খৃস্টানগণ ইয়ামন দখল করিয়া লয়। তাঁহার জন্মের কয়েক বৎসর পর পারসিকগণ উহা জবরদখল করিয়া ফেলে। পারসিক গভর্নর কর্তৃকই উহা শাসিত হইতেছিল। ইয়ামনবাসীরা ছিল জাতিগত দিক দিয়া কাহতাল বংশোদ্ভূত। এই দিকে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন ইসমাঈল (আ)-এর রক্তধারার অন্তর্গত আরব। এই জাতিগত পার্থক্যের ফলে সেখানে ইসলাম প্রচারের কিছু সমস্যা অনুভূত হইত। ইয়ামনীরা নিজেদের সংস্কৃতি ও রাজ্য শাসন লইয়া অপরদের উপর গর্ববোধ করিত। সমগ্র আরব জাতি তাহাদিগের উন্নত মর্যাদাকে একবাক্যে স্বীকার করিত। আরবে ইয়ামনীগণই শাসক হিসাবে বিবেচিত হইত। উহার প্রমাণ মিলে যখন ইয়ামন বংশোদ্ভূত কিনদা গোত্রভুক্ত প্রতিনিধি দল মক্কায়
রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিত তখন গোত্রপতি বলিয়া উঠে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ও আমরা কি একই বংশোদ্ভূত নই! রাসূলুল্লাহ্ জওয়াবে বলিতেন, না, আমরা নাঘ্র ইবন কিনানা বংশের লোক। আমরা আপন মাতার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করিতে পারি না। স্বীয় পিতাকেও অস্বীকার করি না (ইবনুল কায়ি‍্যম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩২)।
সাধারণভাবে ইয়ামনে ইসলাম প্রচারের জন্য রাসূলুল্লাহ্ মু'আয ইবন জাবাল এবং আবূ মুসা আল-আশআরী (রা)-কে প্রেরণ করেন। তাঁহারা স্বতন্ত্র দুইটি অঞ্চলের দায়িত্ব লইয়া সেখানে প্রেরিত হইয়াছিলেন। বিদায় হজ্জ্বের পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাদেরকে প্রেরণ করেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
عن أبي بردة قال بعث رسول الله الله ابا موسى ومعاذ بن جبل قال بعث كل واحد منهما على مخلاف قال واليمن مخلافان ثم قال يسرا ولا تعسرا وبشرا ولا تنفرا فانطلق كل واحد منهما الى عمله قال وكان كل واحد منهما اذا سار في ارضه كان قريبا من صاحبه احدث به عهدا فسلم عليه فسار معاذ في ارضه قريبا من صاحبه ابي موسى فجاء يسير على بغلته حتى انتهى واذا هو جالس وقد اجتمع اليه الناس واذا رجل عنده قد جمعت يداه الى عنقه فقال له معاذ يا عبد الله بن قيس ايم هذا قال رجل كفر بعد اسلامه قال لا انزل حتى يقتل قال انما جئ به لذلك فانزل قال ما انزل حتى يقتل فامر به فقتل ثم نزل فقال يا عبد الله كيف تقرأ القرآن قال اتفوقه لفوقا قال فكيف تقرأ انت يا معاذ قالا انام أول الليل فاقوم وقد قضيت جزئى من النوم فاقرأ ما كتب الله لى فاحتسب نومتي كما احتسب قومتي (رواه البخاري). "আবূ বুরদা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আবূ মূসা ও মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে ইয়ামান অভিমুখে প্রেরণ করেন। তিনি (আবূ বুরদা) বলেন, তিনি দুইজনকে দুইটি অঞ্চলে প্রেরণ করেন। সেদিনকার ইয়ামান দুইটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। রওয়ানা হইবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা মানুষের সহিত কোমল আচরণ করিবে, রুঢ় আচরণ করিবে না। সুসংবাদ প্রদান করিবে, কাহারও মনে ঘৃণার উদ্রেক করিবে না। অতঃপর তাঁহারা আপন আপন কাজে রওয়ানা হইয়া গেলেন। তাহাদের মধ্যে একজন স্বীয় এলাকা পরিদর্শন করিবার সময় অপরজনের নিকটবর্তী হইলে নূতনভাবে পরস্পর সাক্ষাত করিতেন, সালাম বিনিময় করিতেন। একদা মু'আয (রা) একটি গাধায় সওয়ার হইয়া স্বীয় এলাকা পরিদর্শন করিতে গিয়া আবূ মুসা (রা)-এর সহিত সাক্ষাত করিলেন। আবূ মুসা (রা) তখন উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁহার আশেপাশে লোকজন ভিড় জমাইয়াছিল। সেখানে একটি লোককে দেখা গেল তাহার দুই হাত ঘাড়ের সহিত বাঁধা। মু'আয (রা) বলিলেন, হে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কায়স! এই লোকটি কে?
আবূ মূসা (রা) বলিলেন, সে ইসলাম গ্রহণ করিবার পর কাফির হইয়া গিয়াছে। মু'আয (রা) বলিলেন, আমি গাধার উপর হইতে অবতরণ করিব না যেই পর্যন্ত তাহাকে হত্যা করা না হইবে। তিনি বলিলেন, আপনি অবতরণ করুন, তাহাকে হত্যা করিবার জন্যই এখানে উপস্থিত করা হইয়াছে। তিনি বলিলেন, উহাকে যেই পর্যন্ত হত্যা করা হইবে না আমি অবতরণ করিব না। অতঃপর তিনি হত্যা করিবার নির্দেশ দিলে তাহাকে হত্যা করা হয়। মু'আয (রা) অবতরণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবদুল্লাহ! আপনি কিভাবে আল-কুরআন তিলাওয়াত করেন? তিনি বলিলেন, আমি অল্প অল্প করিয়া সব সময় তিলাওয়াত করি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মু'আয! আপনি কিভাবে তিলাওয়াত করেন? তিনি বলিলেন, আমি রাত্রের শুরুতে ঘুমাইয়া পড়ি, অতঃপর আমার ঘুমের অংশ শেষ করিয়া জাগ্রত হই এবং আল্লাহ্ কর্তৃক আমার জন্য নির্ধারিত অংশ পাঠ করি। আমি ছওয়াবের নিয়তে ঘুমাই যেভাবে ছওয়াবের নিয়তে জাগ্রত হই” (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২২)।
عن ابن عباس قال قال رسول الله الله لمعاذ بن جبل حين بعثه الى اليمن انك ستأتى قوما اهل كتاب فاذا جئتهم فadعوهم الى ان يشهدوا ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله فان هم اطاعوالك بذلك فاخبرهم ان الله فرض عليهم خمس صلوات كل يوم وليلة فانهم اطاعوا لك بذالك فاخبرهم ان الله فرض عليهم صدقة تؤخذ من اغنيائهم فترد على فقرائهم فانهم اطاعوالك بذلك فاياك وكرائم اموالهم واتق دعوة المظلوم فانه ليس بينه وبين الله حجاب (رواه البخاري). "ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন মু'আয ইবন জাবাল (রা)-কে ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের নিকট যাইতেছ। সেখানে যাওয়ার পর তুমি তাহাদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ এই দুইটি কথার সাক্ষী দেওয়ার দাওয়াত দিও। যদি উহারা তাহা মানিয়া লয় তাহা হইলে তাহাদেরকে অবহিত করিও, নিশ্চয় আল্লাহ্ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করিয়াছেন। যদি উহা তাহারা গ্রহণ করে তখন তাহাদিগকে জানাইয়া দিও, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের উপর সাদাকা (যাকাত) ফরয করিয়াছেন। উহা সচ্ছলদের নিকট হইতে আদায় করিয়া অসচ্ছলদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে। যদি উহারা তাহা মান্য করে তাহা হইলে উহাদের উত্তম মালগুলি গ্রহণ করা হইতে দূরে থাকিও। নির্যাতিত ব্যক্তির বদদু'আ হইতে বাঁচিয়া থাকিও। কারণ তাহার মধ্যে ও আল্লাহ্ মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নাই" (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইমাম আহমাদ তদীয় সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, মু'আয ইবন জাবাল (রা)-কে যখন রাসূলুল্লাহ্ ইয়ামনের দিকে প্রেরণ করেন তখন তাহাকে বিদায় দানের সময় তাহার সহিত হাঁটিতে হাঁটিতে বলিয়াছিলেন, হে মু'আয! সম্ভবত এই বৎসরের পর তুমি আমার সহিত সাক্ষাত করিতে পারিবেনা। আমার অনুপস্থিতিতে আমার এই মসজিদ ও কবর পরিদর্শন করিবে। মু'আয (রা) উহা
শ্রবণ করিয়া বিরহ হইয়া যাওয়ার ব্যথায় খুক্ক্রন্দন করিলেন। অঃপর কিছুদূর অগ্রসর হইয়া মদীনার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, আমার নিকট মুত্তাকীরাই সর্বোত্তম মানুষ, তাহারা যে কোন গোত্রের এবং যে কোন স্থানের হউক না কেন। অপর একটি রিওয়ায়েত রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ মু'আয (রা)-কে ক্রন্দন করিতে নিষেধ করিয়া বলিয়াছিলেন, ان البكاء من الشيطان "নিশ্চয় ক্রন্দন শয়তানের তরফ হইতে"। অপর একটি বর্ণনায় রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ মু'আয (রা)-কে বিদায় সম্ভাষণ জ্ঞাপন কালে বলিয়াছিলেন, আমি তোমাকে এমন একটি জাতির প্রতি প্রেরণ করিতেছি যাহাদের হৃদয় অত্যন্ত কোমল। উহারা সত্যের জন্য মরিয়া হইয়া লড়াই করিবে। উহাদের মধ্যে যাহারা তোমার অনুসরণ করিবে তাহাদেরকে সঙ্গে লইয়া অবাধ্যদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিবে। তখন দেখিবে তাহারা ইসলামের দিকে ধাবিত হইতেছে। এমনকি স্ত্রী তাহার স্বামীর পূর্বে, সন্তান পিতার পূর্বে, এক ভাই অপর ভাইয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করিবার জন্য প্রতিযোগিতা করিবে।
উপরিউক্ত হাদীছ হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হয় যে, মু'আয (রা) ইয়ামন হইতে ফিরিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত মিলিত হইতে পারিবেন না। বাস্তবে হইয়াছিল তাহাই। কারণ তাঁহার ইয়ামনে অবস্থান কালেই বিদায় হজ্জ অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। উহার একাশি দিন পর রাসূলুল্লাহ্ -এর ইনতিকাল হয়।
কোন কোন রিওয়ায়াতের বর্ণনামতে মু'আয ইবন জাবাল (রা) ইয়ামন হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট তাহাকে তা'যীমী সিজদার জন্য প্রার্থনা জানাইয়াছিলেন। কারণ তিনি ইয়ামনে দেখিয়াছেন যে ছোটরা বড়দেরকে সম্মানার্থে সিজদা করেন। রাসুলুল্লাহ্ তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছিলেন যে, যদি আমি মানুষকে মানুষের জন্য সিজদা করিবার অনুমতি প্রদান করিতাম তাহা হইলে স্ত্রীকে তাহার স্বামীর উদ্দেশ্যে সিজদা করিবার অনুমতি প্রদান করিতাম।
এই ধরনের রিওয়ায়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ্র -এর জীবদ্দশায় মু'আয ইবন জাবাল (রা)-এর ইয়ামন হইতে প্রত্যাবর্তনের পক্ষে দলীল উপস্থাপন করা যায় না। কারণ পূর্বোক্ত রিওয়ায়াত শক্তি-শালী ভিত্তির উপর উপস্থাপিত। বিশেষ করিয়া যেখানে কোন কোন রিওয়ায়াতে বর্ণিত রহিয়াছে যে, মু'আয (রা) শাম হইতে ফিরিয়া সিজদা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭৮)।
মু'আয ইবন জাবাল (রা)-কে ইয়ামনের দিকে প্রেরণ করিবার সময় রাসূলুল্লাহ্ আরও কিছু অসিয়্যত করিয়াছিলেন, বর্ণিত আছে: عن معاذ بن جبل ان رسول الله الله لما بعثه الى اليمن قال اياك والتنعم فان عباد الله ليسوا بالمتنعمين. "মু'আয ইবন জাবাল (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন তাঁহাকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন বলিলেন, তুমি বিলাসবহুল জীবন যাপন পরিহার করিবে। কারণ আল্লাহ্র বান্দাগণ বিলাসী হয় না" (ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হামবাল, আল-মুসনাদ, বরাত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও 'আলী (রা)-কে পর্যায়ক্রমে ইয়ামানে প্রেরণ

📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও 'আলী (রা)-কে পর্যায়ক্রমে ইয়ামানে প্রেরণ


মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ করিবার সময় বিচারকার্য পরিচালনা কিভাবে করিবেন সেই সম্পর্কে তাঁহার নিকট জানিতে চাহিলে তিনি বলিয়াছিলেন। বর্ণিত আছে : عن معاذ بن جبل ان رسول الله ﷺ لما بعثه الى اليمن قال كيف تقضى اذا عرض لك قضاء قال اقضى بكتاب الله قال فان لم تجد في كتاب الله قال فبسنة رسول الله قال فان لم تجد في سنة رسول الله ﷺ قال اجتهد رائي ولا الوا قال فضرب رسول الله ﷺ على صدره وقال الحمد لله الذي وفق رسول رسول الله لما يرضى به رسول الله (رواه الترمذي و ابو داود ) . "মু'আয ইবন জাবাল (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে ইয়ামানে প্রেরণকালে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নিকট বিচারকার্য পেশ হইলে তুমি কিভাবে সিদ্ধান্ত দিবে? তিনি বলিলেন, আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমি সিদ্ধান্ত দান করিব। রাসূলুল্লাহ্ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি তুমি আল্লাহ্ কিতাবে না পাও? তিনি বলিলেন, তাহা হইলে আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দান করিব। রাসূলুল্লাহ্ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি তুমি হাদীছেও না পাও? তিনি উত্তর দিলেন, আমি স্বীয় অভিমত অনুযায়ী গবেষণা করিব। গবেষণা করিয়া সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে আমি ত্রুটি করিব না। তিনি বলেন, (আমার উত্তর শুনিয়া) রাসূলুল্লাহ্ আমার বুকে চপেটাঘাত করিয়া বলিলেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ্ যিনি তাঁহার রাসূলের প্রতিনিধিকে তিনি যেইভাবে সিদ্ধান্ত প্রদান পসন্দ করেন উহার তাওফীক দান করিয়াছেন” (তিরমিযী, আবূ দাউদ, বরাত মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৩২৪)।
মু'আয ইবন জাবাল (রা) সেখানে পৌঁছিবার পর জনৈক মহিলা তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিয়াছিল, হে রাসূলুল্লাহ্-এর প্রতিনিধি! স্ত্রীর উপর স্বামীর কি অধিকার রহিয়াছে? তিনি তাহাকে উত্তরে বলিয়াছিলেন, স্ত্রীর জন্য সম্ভব নয় স্বামীর হক আদায় করা। যতটুকু সম্ভব তুমি স্বামীর হক আদায় করিতে চেষ্টা করিতে থাক। মহিলাটি উহা শুনিয়া বলিল, যদি আপনি রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই আপনি অবহিত থাকিবেন স্বামীর হক স্ত্রীর উপর কতটুকু? প্রত্যুত্তরে মু'আয (রা) বলিলেন, যদি তুমি তোমার স্বামীকে এমতাবস্থায় পাও যে তাহার নাকমুখ হইতে রক্ত পুঁজ গড়াইয়া পড়িতেছে আর তুমি তোমার জিহ্বা দ্বারা উহা চাটিয়া তোল তবুও তুমি তোমর স্বামীর হক আদায় করিতে সক্ষম হইবে না (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪১৬)।
তা'ইফ হইতে প্রত্যাবর্তন এবং জি'ইররানা নামক স্থানে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভাগ করিয়া দিবার পর বিদায় হজ্জের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও আলী (রা)-কে পর্যায়ক্রমে ইয়ামান প্রেরণ করিয়াছিলেন। আলী (রা)-কে প্রেরণ করিবার পর খালিদ (রা)-কে মদীনায় চলিয়া আসার আদেশ করিয়াছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে :
عن البراء قال بعثنا رسول الله ﷺ مع خالد بن الوليد الى اليمن قال ثم بعث عليا بعد ذلك مكانه فقال مر اصحاب خالد من شاء منهم أن يعقب معك فليعقب ومن شاء فليقبل فكنت فيمن عقب معه قال فغنمت اواق ذوات عدد (رواه البخاري). "আল-বারাআ ইব্‌ন 'আযিব (রা)-হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-এর সহিত ইয়ামানে প্রেরণ করেন, অতঃপর তাঁহার স্থলে পরবর্তীতে আলী (রা)-কে সেখানে প্রেরণ করেন। তিনি আলী (রা)-কে বলিয়া দেন যে, খালিদ-এর সঙ্গীগণের মধ্যে এই নির্দেশ পৌঁছাইয়া দিও যে, যাহার ইচ্ছা তোমার সঙ্গে থাকিয়া যাওয়ার সে যেন তথায় থাকিয়া যায় এবং যাহার ইচ্ছা মদীনায় চলিয়া আসার সে যেন ফিরিয়া আসে। আল-বারাআ (রা) বলেন, আলী (রা)-এর সহিত যাহারা গিয়াছিলেন আমি ছিলাম তাহাদের একজন। অতঃপর আমি বহু রৌপ্যমুদ্রা লাভ করিয়াছিলাম" (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২৩)।
আলী (রা)-কে এই মুহূর্তে ইয়ামানে প্রেরনের উদ্দেশ্য ছিল গানীমাতের মাল হইতে আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ্-এর নির্ধারিত অংশ পঞ্চমাংশ গ্রহণের নিমিত্ত। ইরশাদ হইয়াছে:
عن بريدة قال بعث النبى الله عليا الى خالد ليقبض الخمس وكنت ابغض عليا وقد اغتسل فقلت لخالد الا ترى الى هذا فلما قدمنا على النبي ﷺ ذكرت ذلك له فقال يا يريدة اتبغض عليا فقلت نعم قال لا تبغضه فان له في الخمس اكثر من ذلك (رواه البخاري). "বুরায়দা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-কে খালিদ (রা)-এর নিকট হইতে গানীমাতের এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণ করিবার জন্য প্রেরণ করেন। আমি ছিলাম আলী (রা)-এর প্রতি বিতৃষ্ণ। ভোরবেলা 'আলী (রা) গোসল করিলেন। আমি খালিদ (রা)-কে বলিলাম, তুমি কি তাহাকে দেখিতেছ না? অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া বিষয়টি তাহাকে জানাইলাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হে বুরায়দা! তুমি কি আলীর প্রতি ক্ষুব্ধ? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আলীর প্রতি বিতৃষ্ণ; কারণ এক-পঞ্চমাংশে তাহার পাওনা আরও অধিক” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইয়ামান হইতে আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর বিদায় হজ্জের সময় মক্কায় সরাসরি উপনীত হইয়াছিলেন এবং তাঁহার সহিত হজ্জও করিয়াছিলেন।
عن انس ان النبي ﷺ اهل بحج وعمرة ..... فقدم علينا على بن ابي طالب من اليمن حاجا فقال النبى ﷺ بما اهللت فان معنا اهلك قال اهللت بما اهل به النبي ﷺ قال فامسك فان معنا هديا . "আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ হজ্জ ও 'উমরার একই সাথে ইহরাম করিয়াছিলেন। ...... ইত্যবসরে আমাদের নিকট আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) ইয়ামান হইতে হজ্জ করার উদ্দেশ্যে আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কিভাবে ইহরাম করিয়াছ? কারণ আমাদের সহিত রহিয়াছে তোমার স্ত্রী। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ যেইভাবে ইহরাম করিয়াছেন আমিও সেইভাবে ইহরাম করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা হইলে তুমি তাহা অব্যাহত রাখ। কারণ আমাদের সহিত কুরবানীর পশু রহিয়াছে” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বালের রিওয়ায়াতে রহিয়াছে যে, আলী (রা)-কে যখন রাসূলুল্লাহ্ ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তিনি বলিয়াছিলেন, আমি অল্প বয়স্ক যুবক। বিচার কার্য সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতা নাই, অথচ আমাকে প্রবীণ একটি জাতির প্রতি প্রেরণ করিতেছেন। তাঁহার এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার বুকে হাত রাখিয়া দু'আ করিয়াছিলেন :
اللهم ثبت لسانه واهد قلبه. "হে আল্লাহ! তাহার জিহবাকে অবিচল রাখিও এবং তাহার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করিও"।
অতঃপর তিনি তাঁহাকে অসিয়্যত করেন যে, হে আলী! যখন তোমার সম্মুখে বাদী বিবাদী নালিশ লইয়া আসে তখন প্রথম ব্যক্তি যেই অভিযোগ করে তাহা শুনিয়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিও না যেই পর্যন্ত এই বিষয়টি দ্বিতীয় ব্যক্তি হইতে না শুনিবে। উহাতে বিষয়টি তোমার নিকট স্পষ্ট হইয়া যাইবে। আলী (রা) বলেন, উহার পর সমাধান দানে আমি কোন সমস্যায় পড়ি নাই। মুসনাদে আহমাদে আরও বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ্ ইয়ামানে প্রেরণ করিবার পর আমি এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছিলাম যাহারা সিংহ নিধনের জন্য একটি গর্ত খনন করিয়াছিল। সেখানে একটি সিংহ ধরা পড়িবার পর লোকজন ধাক্কা ধাক্কি করিতে লাগিল। ইত্যবসরে গর্তে একটি লোক পড়িয়া যাওয়ার উপক্রম হইলে সে আরও একজনকে টানিয়া ধরিল এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি অন্য একজনকে জড়াইয়া ধরিল। এইভাবে গর্তে চারজন পড়িয়া গেল। সিংহ তখন তাহাদিগের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া সকলকে আহত করিল। অতঃপর এক লোক তীর নিক্ষেপ করিয়া সিংহটিকে খতম করিয়া দিল। অপর দিকে সিংহের আক্রমণের ফলে আহত চার জন লোক মারা গেল। নিহত প্রথম লোকটির আত্মীয়-স্বজনরা দ্বিতীয় লোকটির আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে চাহিল। আলী (রা) তখন তাহাদিগের মধ্যে দাঁড়াইয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ জীবিত থাকা অবস্থায় তোমরা পরস্পর কিতালে অবতীর্ণ হইবে? তাহা হইতে পারেনা। আমি তোমাদের মধ্যে বিচার-নিষ্পত্তি করিয়া দিব যদি তোমার উভয় পক্ষ উহাতে সম্মত হও। অন্যথায় আমি তোমাদিগকে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পাঠাইয়া দিব। তিনি তোমাদের এই বিবাদের সমাধান করিবেন। এতদসত্ত্বেও যাহারা অন্যায় করিবে তাহারা অধিকার হইতে বঞ্চিত হইবে। উহার পর তিনি সমাধান দিলেন যে, গর্তের নিকট যে সকল গোত্র উপস্থিত ছিল সবাই মিলিয়া দিয়াতের এক-চতুর্থাংশ, তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও পূর্ণ অংশ একত্রিত
কর। প্রথম যেই লোকটি গর্ভে পড়িয়াছিল তাহার আত্মীয়-স্বজনরা পাইবেন এক চতুর্থাংশ, দ্বিতীয় লোকটি পাইবে এক-তৃতীয়াংশ, তৃতীয় লোকটি পাইবে অর্ধাংশ এবং চতুর্থ লোকটি পাইবে পূর্ণ অংশ।
আলী (রা)-এর এই সমাধান মানিয়া লইতে তাহারা অস্বীকার করিল। ফলে তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিল। তিনি তখন মাকামে ইবরাহীমে অবস্থান রত ছিলেন। তাঁহারা তাঁহার নিকট বিষয়টির বিবরণ দিলেন। ইতোমধ্যে এক লোক বলিয়া উঠিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আলী (রা) এই ব্যাপারে আমাদেরকে একটি সমাধান দান করিয়াছেন। অতঃপর বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট ব্যক্ত করা হইল। রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-এর সমাধানকে স্থির রাখিলেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৮৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওস গোত্রে ইসলাম প্রচার

📄 দাওস গোত্রে ইসলাম প্রচার


দাওস আরবের একটি প্রসিদ্ধ গোত্রের নাম। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ও আবূ হুরায়রা (রা) এই গোত্রেরই লোক ছিলেন। গোত্রপতি তুফায়ল ইবন 'আমর আদ-দাওসী ছিলেন এক প্রসিদ্ধ কবি। রাসূলুল্লাহ্-এর হিজরতের পূর্বেই তিনি মক্কায় উপনীত হইয়াছিলেন। কিন্তু মক্কার কাফিরগণ তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিতে বারণ করিয়াছিল। দৈবাৎ তিনি হারাম শরীফে গেলে সেখানে রাসূলুল্লাহ্ -কে সালাত আদায়রত দেখিতে পাইলেন। পাশে দাঁড়াইয়া তাঁহার কিরা'আত শুনিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে বিপ্লব সংঘটিত হইল। আরয করিলেন, আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে খুলিয়া বলুন। তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের স্বরূপ খুলিয়া বলিলেন এবং আল-কুরআনের তিলাওয়াত শুনাইলেন। সংগে সংগে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হইয়া গেলেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া তুফায়ল (রা) গোত্রীয় অন্যান্য লোককেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। দাওস গোত্রে ছিল যিনার বাজার খুবই গরম। তাহারা মনে করিল ইসলাম গ্রহণ করিবার পর এই স্বাধীনতা থাকিবে কিনা। এই কারণে তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে সংকোচ বোধ করিল।
তুফায়ল (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হইয়া উহাদের অবস্থা শুনাইলেন। তিনি তাহাদের দু'আ করিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, ১৪২১ হি.)। দাওস নেতা তুফায়ল হিজরতের একাদশ বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি মক্কায় সেই সময় উপস্থিত হইলে মক্কার কাফিররা তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ্ হইতে দূরে থাকিবার জন্য খুবই ভয় দেখাইয়াছিল, যাহার ফলে তিনি স্বীয় কানে তুলা ঢুকাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন যাহাতে মুহাম্মাদ-এর কথা তাহার কর্ণ কুহরে প্রবেশ না করে। কিন্তু দৈবাৎ কোন এক ফজরের সালাতে তিনি রাসূলুল্লাহ-এর কিরা'আত শুনিয়া ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া গিয়াছিলেন।
অতঃপর তিনি তাহার গোত্র যাহাতে ইসলাম গ্রহণ করে সেইজন্য রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট দু'আ চাহিয়াছিলেন। তাহার মধ্যে এমন একটি লক্ষণও সৃষ্টি করিয়া দিরার জন্য আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করিবার কথা বলিয়া দিলেন যাহার ফলে স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচার সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহার জন্য দু'আ করিলেন:
اللهم اجعل له اية. "হে আল্লাহ! তাহার মধ্যে একটি লক্ষণ সৃষ্টি করিয়া দাও।"
তুফায়ল (রা) বলেন, আমি যখন স্বীয় আবাসভূমির নিকটবর্তী হইয়া গোলাম তখন আমার দুই চক্ষুর মধ্যবর্তী স্থলে আলোকবর্তিকার ন্যায় একটি 'নূর' সৃষ্টি হইয়া গেল। আমি তখন আল্লাহ তা'আলার দরবারে আলোটি অন্য কোন স্থানে স্থানান্তরিত হইবার জন্য প্রার্থনা করিলাম যাহাতে স্বজাতি লোকেরা দেশ ত্যাগের ফলে আমার দৈহিক কোন পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে বলিয়া মনে না করে। অতঃপর এই আলোটি আমার হাতের লাঠিতে স্থানান্তরিত হইয়া গেল। আর লাঠিটি একটি হারিকেনের আকৃতি ধারণ করিল। অতঃপর আমি ইসলাম প্রচার করা আরম্ভ করিলাম। আমার আহ্বানে সাড়া দিয়া আমার পিতা, আমার সহধর্মীনি ও আবূ হুরায়রা (রা) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কিন্তু অন্যান্য লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইল। ফলে পুনরায় আমি মক্কা মুকাররামায় রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া এখানকার অবস্থা শুনাইলাম। তিনি তখন দু'আ করিলেন (উসমান গণী, নায়রুল বারী, দেওবন্দ, ১৪১৭ হি., ৮খ., পৃ. ৪৬৮)
এই সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছে:
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال جاء الطفيل بن عمرو الى النبي ﷺ فقال ان دوسا قد هلكت عصت وابت فادع الله عليهم فقال اللهم اهد دوسا وأت بهم (رواه البخاري). "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুফায়ল ইন্ন 'আমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, দাওস গোত্র ধ্বংস হইয়া গিয়াছে, অবাধ্যতা অবলম্বন করিয়াছে ও ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাইয়াছে। আপনি উহাদের বদদু'আ করুন। তিনি দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান কর এবং তাহাদেরকে আমার নিকট লইয়া আস” (বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬৩০)।
রাসূলুল্লাহ্-এর এই দু'আর পর তুফায়ল ইবন আমর (রা) স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া ইসলাম প্রচার করিতে লাগিলেন। লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ যখন খায়বারে অবস্থান গ্রহণ করিতেছিলেন তখন ৭০ কিংবা ৮০ জনের একটি মুসলিম কাফিলা লইয়া তিনি তাঁহার নিকট আগমন করিলেন (আল-কাসতাল্লানী, ইরশাদুস সারী, বরাত পাদটীকা সহীহ বুখারী, কৃত আহমদ আলী সাহারান পুরী, ২খ., ৬৩০)।
দাওস গোত্রীয় আবূ হুরায়রা (রা) যখন সপ্তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করিতে আসিতেছিলেন তখন তাঁহার এক অভিব্যক্তি স্বয়ং তিনিই প্রকাশ করেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن ابي هريرة قال لما قدمت على النبي الله قلت في الطريق يا ليلة من طولها وعنائها على انها من دارة الكفر نجت وابق غلام لى فى الطريق فلما قدمت على
النبي ﷺ فبايعته فبينا انا عنده اذ طلع الغلام فقال لى النبي ﷺ يا أبا هريرة هذا غلامك فقال هو لوجه الله فاعتقته. "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিতেছিলাম, তখন পথিমধ্যে (কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে) বলিলাম, হে রাত্রি! তোমার দীর্ঘতা ও যাতনা দান সত্ত্বেও আমাকে কুফরীর স্থান হইতে মুক্তি দাও। অতঃপর তিনি বলেন, পথিমধ্যে আমার গোলাম পালাইয়া গিয়াছিল। আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার নিকট বায়'আত গ্রহণ করিলাম। ইতোমধ্যে আমার গোলামটি আসিল। তিনি আমাকে বলিলেন, আবূ হুরায়রা! এইতো তোমার গোলাম। তখন আল্লাহর ওয়াস্তে তিনি তাহাকে আযাদ করিয়া দিলেন” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাঈ গোত্রে ইসলাম প্রচার

📄 তাঈ গোত্রে ইসলাম প্রচার


জালহামা নামক এক ব্যক্তির উপাধিছিল তাঈ। এই গোত্র তাহার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া উহাদিগকে বানু তাঈ বা তাঈ গোত্র বলিয়া অভিহিত করা হয়। হিজরী নবম বা দশম সনে এই গোত্রের একদল লোক যায়দুল খায়ল নামক এক লোকের নেতৃত্বে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কাফেলার সদস্য সংখ্যা ছিল পনের জন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর গোত্রপতি "যায়দুল খায়ল" (অশ্বের যায়দ)-এর নাম পরিবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম যায়দুল খায়র বা মঙ্গলের যায়দ বলিয়া আখ্যায়িত করেন। অশ্ব চালনায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিলে তাঁহার এই উপাধি পড়িয়া গিয়াছিল।
রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার নাম পরিবর্তন করিয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, আরবে যাহারই প্রশংসা আমি শুনিয়াছি বাস্তবে তাঁহাকে প্রশংসার তুলনায় কম পাইয়াছি, ব্যতিক্রম শুধু যায়দুল খায়ল। তাহার গুণগান যাহা আমি শুনিয়াছিলাম কার্যক্ষেত্রে আমি তাহাকে তদপেক্ষা বেশী পাইয়াছি (উসমান গণী, নায়রুল বারী, প্রাগুক্ত, ৮খ., ৪৭)।
আল্লামা শিবলী নু'মানীর মতে বানু তাঈ ইয়ামানেরই একটি প্রসিদ্ধ গেত্রের নাম। গোত্রপতি ছিলেন দুইজন - এক জন যায়দুল খায়ল এবং অপর জন আদী ইবন হাতিম তাঈ (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ১৩০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00