📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু আসাদ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 বানু আসাদ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


বুকে উহার সমপর্যায়ের খৃস্টানগণের অন্য কোন উপাসনালয় ছিলনা। এইখানে অনেক প্রসিদ্ধ ধর্মীয় যাজক বসবাস করিত। ইহাদের উপাধি ছিল সায়্যিদ ও আকিব (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, পৃ. ৪২৮)। সত্তর জনের একটি দল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল। উহাদের নেতা ছিল আল-কিনদা গোত্রীয় 'আবদুল মাসীহ্, ধর্মীয় যাজক ছিল বাক্র ইব্‌ন ওয়াইল গোত্রের আবূ হারিছা এবং সরদার আল-আয়হাম। খৃস্টান এই প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাহাদের ধর্মের যথার্থতা সম্পর্কে ঝগড়ায় লিপ্ত হইল। তখনই সূরা আল-ইমরানের প্রথম দিকের কতিপয় আয়াত ও 'মুবাহালা'র বিধান অবতীর্ণ হয়। কিন্তু তাহারা মুবাহালায় অংশগ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সন্ধিতে উপনীত হয়। সন্ধি অনুযায়ী তাহারা তাহাদের জন্য একজন শাসক প্রেরণের আবেদন জানাইলে রাসূলুল্লাহ্ আবু 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে নাজরানের শাসক নিয়োগ করেন। অতঃপর তাহাদের 'আকিব' ও 'সায়্যিদ' রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করে (ইব্‌ন খালদুন, কিতাবুল ইবার ওয়াদ-দীওয়ান, তারীখে ইব্‌ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫৭)।
কুরয ইব্‌ন আলকামা সূত্রে ইবন ইসহাক বলেন, নাজরানের এই খৃস্টান প্রতিনিধি দলে ষাট জন অশ্বারোহী ছিল। উহাদের মধ্যে চব্বিশ জন ছিল উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিবর্গ। তিন ব্যক্তি ছিল এমন স্তরের লোক, যাহাদের কর্তৃত্বাধীন ছিল গোটা সম্প্রদায়ের দায়ভার। উহাদের পরিভাষায় 'আকিব' বলা হইত যাহার হাতে পুরা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বদানের কর্তৃত্ব থাকিত। তাহার নির্দেশ ও পরামর্শ ব্যতিরেকে নাজরানবাসী কোন কাজ করিত না। তাহাদের এই শাসকের নাম ছিল আবদুল মাসীহ। দলকে সুশৃংখলভাবে পরিচালনা করা ও বাহনের ব্যবস্থাপনা যাহার হাতে ন্যস্ত থাকিত তাহাকে উহাদের পরিভাষায় সায়্যিদ বলা হইত। এই দায়িত্বে তখন নিয়োজিত ছিল 'আয়হাম'। তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন আবূ হারিছা ইব্‌ন আলকামা। তিনি ছিলেন তাহাদের ধর্মীয় যাজক এবং খৃষ্ট ধর্মের সর্বোচ্চ পণ্ডিত। আবূ হারিছা বাক্স ইব্‌ন ওয়াইল গোত্রের লোক ছিল। কিন্তু সে বসবাস করিত খৃষ্টানদের সহিত। বাইবেলের উপর ছিল তাহার অগাধ পাণ্ডিত্য। তদানিন্তন খৃস্টান রোম শাহী তাহার ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও গবেষণার কথা অবহিত হইয়া তাহাকে খুবই সমাদর করিয়াছিল এবং তাহাকে একটি গির্জা নির্মাণ করিয়া দিয়াছিল। এই প্রতিনিধিদল মদীনার দিকে রওয়ানা করিলে পথিমধ্যে আবু হারিছা তাহার ভাই কুরয ইব্‌ন আলকামাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিল, আল্লাহ্ কসম, তিনিই সেই উম্মী নবী যাঁহার প্রতীক্ষায় আমরা ছিলাম। কিন্তু এই কথা প্রকাশ করিয়া দিলে সকল মানুষ আমাদের বিরোধী হইয়া যাইবে। কুরয ইব্‌ন আলকামা তাহার এই কথা মনে রাখিয়াছিলেন। ফলে মদীনায় পৌঁছিয়া তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া ফেলেন (আবদুর রউফ, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪২৪)। এই সম্পর্কে হাদীছে ইরশাদ হইয়াছে:
عن حذيفة قال جاء العاقب والسيد صاحبا نجران الى رسول الله لا يريدان ان يلاعناه قال فقال احدهما لصاحبه لا تفعل فوالله لئن كان نبيا فلاعنا لا نفلح نحن ولا عقبنا من بعدنا قالا انا نعطيك ما سألتنا وابعث معنا رجلا امينا ولا تبعث معنا الا امينا فقال لا بعثن معكم رجلا امينا حق امين حق امين
"হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজরান অঞ্চলের দুই দলপতি আকিব ও সায়্যিদ রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার সহিত মুবাহালায় লিপ্ত হইতে ইচ্ছা করিল। তখন তাহাদের একজন তাহার সঙ্গীকে বলিল, তাহা করিও না। যদি তিনি সত্যই নবী হইয়া থাকেন আর আমরা তাঁহার সহিত মুবাহালায় লিপ্ত হই তাহা হইলে আমরা কৃতকার্য হইতে পারিব না এবং আমাদের পশ্চাতের লোকেরাও নয়। অতঃপর তাহারা বলিল, আপনি যাহা চাহিবেন তাহা আমরা দান করিব। আমাদের সহিত একজন বিশ্বস্ত লোক প্রেরণ করুন, বিশ্বস্ত ব্যতীত কাহাকেও প্রেরণ করিবেন না। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট যথার্থ এবং খুবই বিশ্বস্ত এক লোককে পাঠাইব। বিশ্বস্ততার এই মানদণ্ড কাহার ভাগ্যে জুটিবে উহার প্রত্যাশায় ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবীগণ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ আহ্বান করিলেন আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে। তিনি যখন দাঁড়াইলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সে হইল এই উম্মতের বিশ্বস্ত লোক” (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, নাজরানবাসীর ঘটনা অনুচ্ছেদ, ২খ., পৃ. ৬২৯)।
নাজরানবাসীর প্রতি রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত যেই পত্র পাঠাইয়াছিলেন তাহা ছিল নিম্নরূপঃ
باسم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب من محمد النبى رسول الله الى اسقف نجران اسلم انتم فانى احمد اليكم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب اما بعد فاني ادعوكم الى عبادة الله من عبادة العباد وادعوكم الى ولاية الله من ولاية العباد فان ابيتم فالجزية فان ابيتم اذنتكم بحرب والسلام.
"ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর ইলাহের নামে মুহাম্মাদ আল্লাহ্ নবী ও রাসূলের পক্ষ হইতে নাজরানের ধর্মযাজকের প্রতি। আমি তোমাদের নিকট ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর ইলাহের প্রশংসা করিয়া বলিতেছি, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। অতঃপর আমি তোমাদেরকে দাওয়াত প্রদান করিতেছি মানুষের উপাসনা বর্জন করিয়া আল্লাহ্র উপাসনায় ফিরিয়া আসিবার এবং মানুষের অধীনতা পরিহার করিয়া আল্লাহ্র অধীনতা গ্রহণ করিবার জন্য। এই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তোমাদেরকে কর প্রদান করিতে হইবে। করদানে অস্বীকৃতি জানাইলে তোমাদেরকে যুদ্ধের মুখামুখি হইবার কথা জানাইয়া দিতেছি। ওয়াসসালাম।"
এই পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (স) লিখিয়া দিলেন তাঁহার উপর সূরা আন-নামলের বিসমিল্লাহ্ সম্বলিত ৩০ নম্বর আয়াতটি নাযিল হইবার পূর্বে। যাহার ফলে باسم اله ابراهيم الخ বলিয়া শুরু করা হইয়াছিল (আল-বায়হাকী, বরাত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৪২)।
পত্রটি যাজকের হস্তগত হইবার পর সে দারুণভাবে আলোড়িত হইল, শুরাহবীল ইব্‌ন ওয়াদা'আকে ডাকিয়া পাঠাইল এবং চিঠিটির বিষয়বস্তু অবহিত হইয়া মন্তব্য করিতে নির্দেশ দিল।
সে অভিমত ব্যক্ত করিল যে, আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশধর হইতে যেই নবী প্রেরণ করিবার ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, তিনিই সেই নবী। নুবুওয়াতের ব্যাপারে আমার অন্য কোন অভিমত নাই। উহাতে যাজকটি বিরক্ত হইয়া তাহাকে সেখান হইতে তাড়াইয়া দিল। অতঃপর হিময়ার গেত্রের 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন শুরাহবীলকে ডাকিয়া পাঠাইল। তাহাকে চিঠিটি পড়িয়া অভিমত ব্যক্ত করিতে নির্দেশ দিল। সেও প্রথমোক্ত ব্যক্তির ন্যায় অভিমত ব্যক্ত করিলে তাহাকেও সরিয়া যাইতে নির্দেশ দিল। সর্বশেষ বানুল হারিছ গোত্রের জিবাল ইব্‌ন ফায়দের নিকট পত্রটি পড়িয়া মন্তব্য করিতে নির্দেশ দিল। সেও পূর্বোক্ত দুই জনের ন্যায় অভিমত ব্যক্ত করিল। তিন জনই যখন অভিন্ন মতামত ব্যক্ত করিল তখন সে সারাদেশের নেতৃস্থানীয় লোকদের সভা আহ্বান করিল। সকলেরই ঐক্যবদ্ধ অভিমত হইল যে, পূর্বোল্লেখিত তিন জনকেই রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট তাঁহার অবস্থা অবগত হওয়ার জন্য প্রেরণ করার ব্যবস্থা করা হউক। তাহারা মদীনায় উপনীত হইয়া ভ্রমণের লেবাস পোশাক পরিবর্তন করিল এবং অহংকারবশত যাজকদের পোশাক ও স্বর্ণের আংটি পরিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইল। অতঃপর তাঁহাকে সালাম দিলে রাসূলুল্লাহ্ সালামের উত্তর প্রদান করেন নাই, তাহাদের কোন কথার উত্তরও দেন নাই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমান রহিবার পর তাহারা উপায়ন্তর না দেখিয়া তাহাদের পূর্বপরিচিত উছমান ইব্‌ন 'আফফান ও আবদুর রহমান ইব্‌ন আউফ (রা)-কে অনুসন্ধান করিতে লাগিল। অতঃপর তাঁহাদের সহিত সাক্ষাত করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিতি ও তাহাদের সালাম ও কালামের উত্তর না দিবার বিষয়টি অবহিত করিল। এই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা), উছমান ও আবদুর রহমান (রা)। এই বিষয়ে তাঁহার নিকট পরামর্শ চাহিলে তিনি বলিলেন, আমার মনে হয় উহারা তাহাদের এই পোশাক পরিবর্তন করিয়া সফরের বস্ত্র পরিধান করিয়া উপস্থিত হইবে। তাহারা তাহাই করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সালাম দিলে তিনি উত্তর প্রদান করিলেন। অতঃপর বিভিন্ন বিষয়ে তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট অবহিত হইতে চাহিল। এক পর্যায়ে তাহারা বলিল, আমরা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী আমরা আমাদের নবী ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনার অভিমত জানিতে চাহি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আজ আমি তাঁহার সম্পর্কে কিছুই বলিতে পারিবনা। তোমরা অপেক্ষা কর, আল্লাহ্ তা'আলা এই সম্পর্কে আমার উপর যাহা অবতীর্ণ করিবেন তাহা আমি তোমাদিগকে বলিব। পরবর্তী দিন তাহারা আবার উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে।
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُنْ مِّنَ الْمُمْتَرِيْنَ. فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ.
"আল্লাহ্র নিকট নিশ্চয়ই ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, হও, ফলে সে হইয়া গেল। এই সত্য তোমার
প্রতিপালকের নিকট হইতে। সুতরাং তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হইও না। তোমার নিকট জ্ঞান আসিবার পর যে কেহ এই বিষয়ে তোমার সহিত তর্ক করে তাহাকে বল, আইস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারিগণকে এবং তোমাদের নারিগণকে, আমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের নিজদিগকে, অতঃপর আমরা আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দেই আল্লাহর লা'নত" (৩:৫৯-৬১)।
এই আয়াতের বিষয়বস্তুকে নাজরানের এই খৃস্টানগণ মানিয়া লইতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। ফলে পরবর্তী দিন ভোরে রাসূলুল্লাহ্ হযরত হাসান (রা), হুসায়ন (রা) ও তাঁহাদিগের পশ্চাতে হযরত ফাতিমা (রা)-কে লইয়া মুবাহালায় উত্তীর্ণ হইবার জন্য বাহির হইলেন। সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্-এর কোন কোন স্ত্রীও ছিলেন। অবস্থা দৃশ্যে শুরাহবীল বলিয়া উঠিল, বিষয়টি খুবই ঘোরতর। যদি এই লোক নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে মুবাহালা করিবার সঙ্গে সঙ্গে ভুমণ্ডলে আমাদের একটি নখ, এমন কি একটি চুলও অবশিষ্ট থাকিবেনা। তখন তাহার দুই সঙ্গী বলিয়া উঠিল, এখন আমাদের করার কী আছে? শুরাহবীল বলিল, আমার অভিমত হইল, তাঁহাকে আমরা কর্তা হিসাবে মানিয়া লইব। তিনি যাহা বলিবেন, দ্বিধাহীন চিত্তে উহা গ্রহণ করিব। তিনি কখনও অন্যায় আদেশ দিবেন না। তাহার সঙ্গীদ্বয় এই অভিমত মানিয়া লইল। তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে মুবাহালা পরিত্যাগের নিবেদন করিয়া একদিন একরাত্র সময় প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ্ উহা অনুমোদন করিলেন। পরবর্তী দিবস সকাল বেলা তিনি তাহাদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত চুক্তিনামা লিখিয়া দিলেন।
بسم الله الرحمن الرحيم هذا ماكتب محمد النبى الامى رسول الله لنجران ان كان عليهم حكمه في كل صفراء وبيضاء ورقيق فافضل عليهم وترك ذلك كله على الفي حلة في كل رجب الف حلة وفى كل صفر الف حلة وذكر تمام الشرط.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে উম্মী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে এই লিপিকা নাজরানবাসীর প্রতি। তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রাসূল-এর আদেশ ছিল সোনারূপা (নগদ অর্থ) প্রদানের, কিন্তু তিনি তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাদেরকে উহা প্রদান হইতে রেহাই দিলেন এই শর্তে যে, তাহারা প্রতি বৎসর দুই হাজার জোড়া চাদর প্রদান করিবে, এক হাজার রজব মাসে এবং এক হাজার সফর মাসে। লিপিকায় অন্যান্য শর্তও উল্লেখ করিয়া ফরমানটি তাহাদেরকে প্রদান করিলেন" (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, উর্দু, ১খ., ৩য় পারা, পৃ. ৭৫)।
এই পত্রটি লইয়া নাজরানের উচ্চ পর্যায়ের এই প্রতিনিধি দল স্বদেশে পৌঁছিয়া উহা তাহাদের ধর্মীয় নেতার নিকট হস্তান্তর করিল। সে উহা পাঠ করিয়া আকস্মিক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! তিনি আল্লাহ্র রাসূল। উহা শুনিয়া ধর্মযাজকের মাতৃপক্ষীয় ভাই বিশ্ব ইন্ন মা'রূর মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হইল। সে তখন বহু বাধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও নিবৃত্ত হইল না। সোজা মদীনায় উপনীত হইবার পর তাহার উটটি যাত্রা বিরতি করিল। তাৎক্ষণিক তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কোন এক জিহাদে অংশগ্রহণ করিয়া শাহাদাত লাভের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মদীনাতেই অবস্থান করিতে থাকিলেন (আসাহহু সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩০)।
বানু আসাদ গোত্র ছিল বিভিন্ন রণাঙ্গনে কাফির কুরায়শ গোত্রের দক্ষিণ হস্ত। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা)-এর খিলাফত কালে এ গোত্রেরই লোক তুলায়হা ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ মিথ্যা নবুওয়তের দাবী করিয়াছিল। হিজরী নবম সনে উহারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং এই উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, অনুবাদ মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৪২৯)।
আল-ওয়াকিদীর বিররণ মতে বানু আসাদ গোত্রের দশজন লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল। এই প্রতিনিধি দলের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা ছিলেন ওয়াবিসা ইব্‌ন মা'বাদ, তুলায়হা ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ, নাফাদা ইবন 'আবদিল্লাহ্ ইব্‌ন খালফ ও হাফ্রামী ইব্‌ন আমির। উহাদের নেতা ছিল হাফ্রামী ইবন 'আমির। তুলায়হা ইন্ন খুওয়ায়লিদ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৬৮)।
এই গোত্রীয় লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আসে এবং বলে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা মুসলমান হইয়াছি, অন্যান্য আরব জাতিরা আপনার সহিত যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন কোন ধরনের ঝগড়া-বিবাদ ব্যতিরেকে আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহাদের অনুভূতি বড়ই দুর্বল, শয়তান উহাদের কথার উপর কথা বলিতেছে। তখন এই আয়াত নাযিল হয়। يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَى إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَوْكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ.
"উহারা আত্মসমর্পণ করিয়া তোমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করে। বল, তোমাদের আত্মসমর্পণ আমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করিও না; বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করিয়া তোমাদেরকে ধন্য করিয়াছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও” (৪৯: ১৭)।
অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার জ্ঞানের পরিধি যে সুগভীর ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলে সকল সৃষ্টির জ্ঞানই যে তিনি রাখেন সেই কথা অবহিত করেন (মুসনাদে বাযযার, বরাত তাফসীর ইন্ন কাছীর (উর্দু), ৫খ, ২৭ পারা, পৃ. ৯০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আব্দ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 আব্দ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


ইবন ইসহাকের বর্ণনা মতে আব্দ গোত্রের দলপতি সুরদ ইব্‌ন 'আবদিল্লাহ্ সদলবলে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পরও রাসূলুল্লাহ্র তাঁহাকে গোত্রপতি হিসাবে বহাল রাখেন। তাঁহাকে ইয়ামানের বিভিন্ন মুশরিক গোত্রের সহিত জিহাদ করিবার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া ইয়ামানের সর্বাধিক সংরক্ষিত অঞ্চল জুরুশ অবরোধ করেন। খাছ'আম গোত্রের লোকেরা তাহাদিগকে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হইবার কথা অবহিত করেন। তাহারা স্ব-স্ব বাসস্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। এক মাস পর্যন্ত তাহারা অবরুদ্ধ থাকে। অতঃপর সুরদ ইবন 'আবদিল্লাহ্ (রা)
অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া লইলে জুরুশবাসীরা মনে করে যে মুসলিমগণ ব্যর্থতা স্বীকার করিয়া পালাইতেছে। ফলে তাহারা শহরের নিকটস্থ 'শুক্র নামক পাহাড়ের কাছে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। সুরদ ইবন 'আবদিল্লাহ্ (রা) ও তাঁহার বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করিয়া প্রতিশোধ গ্রহণ করে। উহাদিগকে কতল করা হয়। জুরুশবাসীরা পূর্বেই রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট মদীনায় দুইজন দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহারা ঐ দিবসের আসরের সালাতের পর রাসূলুল্লাহ্ -এর সহিত সাক্ষাত করে। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, শুক্র কোন অঞ্চলে অবস্থিত? তাহারা উত্তর দিল, আমাদের এলাকার একটি পাহাড়ের নাম কুশর। জুরুশবাসীরা উহাকে কুশর হিসাবেই আখ্যায়িত করিত। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা কুশর নয় বরং উহার নাম শুক্র। দূত হিসাবে আগত লোক দুইটি জিজ্ঞাসা করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেখানকার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার নিকট কি সংবাদ রহিয়াছে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সেখানে আল্লাহ্ উটগুলিকে বর্তমানে কুরবানী দেওয়া হইতেছে। তাহারা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া আবূ বাক্ সিদ্দীক ও উছমান (রা)-এর মধ্যস্থলে বসিয়া পড়িল। বিশিষ্ট এই দুই সাহাবী তখন তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিলেন যে, এই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ্ তোমাদিগকে তোমাদিগের স্বজাতির ইনতিকালের সংবাদ প্রদান করিলেন। তাহারা তখন রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট স্বজাতির দুর্দশা লাঘবের জন্য দু'আ চাহিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তখন দু'আ করিলেন اللهم ارفع عنهم "হে আল্লাহ্! উহাদের সংকট বিদূরিত কর।" তাহারা যখন জুরুশ প্রত্যাবর্তন করিল, তখন অবহিত হইল যে যেই দিবসে যেই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ্ উহাদের দুর্দশার সংবাদ জানাইয়াছিলেন ঠিক সেই সময় উহাদিগকে কতল করা হইয়াছিল। অতঃপর সেখানকার যাহারা জীবিত ছিলেন তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম হিসাবে তাহারা গণ্য হইতে লাগিল। উহাদের অঞ্চলকে নিরাপদ অঞ্চল হিসাবে রাসূলুল্লাহ্ ঘোষণা দিলেন (আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, পৃ. ১৩০-১৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হামদান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 হামদান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


তাবুক যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ্-এর মদীনায় প্রত্যাবর্তন কালে হামদান গোত্রের প্রতিনিধিগণ তাঁহার নিকট আগমন করেন। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন মালিক ইব্‌ন নামাত, আবূ ছাওর যুলামিশ'আর, মালিক ইব্‌ন আয়ফা, যিমাম ইবন মালিক আস-সালামানী ও 'উমায়রা ইব্‌ন মালিক আল-খারিফী। তাহাদের পরিধানে ছিল তখন হিব্রী চাদর, মাথায় ছিল 'আদনিয়া' পাগড়ী। তাহারা 'মাহরিয়া' উটের উপর আরোহণ করিয়াছিল। মালিক ইব্‌ন নামাত তখন স্বীয় গোত্রের প্রশংসায় রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে কবিতা পাঠ করিতেছিলেন। মালিক ইব্‌ন নামাত আরও বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা কতিপয় লোক হামদান গোত্রের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে আগমন করিয়াছি। ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াই আমাদের আগমন। হামদান গোত্র এই ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না। তাহারা বাতিল ইলাহগুলিকে সম্পূর্ণভাবে পরিহার করিয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর দাওয়াতে সাড়া দিয়াছে (আস-সুহায়লী, আর-রাওযুল উনুফ,
মালিক ইন্ন নামাত একজন কবি ছিলেন। তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ্ স্ব-জাতির উপর ‘আমীর' নিয়োগ করেন। তাঁহাকে একটি পত্র লিখিয়া দেন। তাহারা যাহাই প্রার্থনা করিয়াছিল তাহা মঞ্জুর করেন। তাহাদিগকে ছাকীফ গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদের আদেশ করিয়াছিলেন। ফলে ছাকীফ গোত্রের কোন কাফেলা বাহির হইলেই উহাদের উপর তাহারা আক্রমণ করিত। উহাদিগকে ছাকীফ গোত্রের সহিত জিহাদের আদেশ দানের বর্ণনার সহিত আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা দ্বিমত পোষণ করেন। কারণ হামদানী গোত্র ছিল ইয়ামানের অধিবাসী আর ছাকীক গোত্র ছিল তাইফের বাসিন্দা।
সুনানে বায়হাকীতে সহীহ সনদে হযরত বারা ইবন 'আযিব (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ করিলেন। উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার লোকদিগকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। আমিও ছিলাম তাঁহার অন্যতম সঙ্গী। আমরা ছয় মাস পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলাম। কিন্তু কেহই ইসলাম গ্রহণ করিল না। তখন রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-কে সেখানে প্রেরণ করিলেন এবং খালিদ (রা)-কে ডাকিয়া পাঠাইলেন। কিন্তু এই আদেশও দান করিলেন যে, খালিদ (রা)-এর সঙ্গিগণের কেহ আলী (রা)-এর সহিত থাকিয়া যাইতে চাহিলে থাকিতে পারিবে। ফলে আমি সেখানে রহিয়া গিয়াছিলাম। আমরা যখন সেখানকার লোকদিগের প্রতি রওয়ানা করিলাম তখন তাহারা আমাদের সহিত মিলিত হইল। আমরা একই কাতারে সারিবদ্ধ হইয়া আলী (রা)-এর ইমামতিতে সালাত আদায় করিলাম। সালাত আদায়ান্তে আলী (রা) তাঁহাদিগকে রাসূলুল্লাহ্-এর পত্র পাঠ করিয়া শুনাইলেন। তখন হামদান গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিল। আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে উহাদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানাইয়া পত্র লিখিলেন। পত্র পাঠ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ সিজদায় পতিত হইলেন। সিজদা হইতে উঠিয়া বলিতে লাগিলেন, আসসালামু 'আলা হামদান, আসসালামু 'আলা হামদান : হামদানবাসীদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক, হামদানবাসীদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক (আবদুর রউফ দানা পুরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪২২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ মূসা ও মু'আয (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ

📄 আবূ মূসা ও মু'আয (রা)-কে ইয়ামানে প্রেরণ


আরব রাজ্যসমূহের মধ্যে ইয়ামন ছিল সর্বাধিক স্বাচ্ছন্দ্যশীল এলাকা। প্রাচীন কাল হইতেই উহা উন্নতমানের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছিল। সাবা ও হিময়ারীদের বিশাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এখানেই। রাসূলুল্লাহ্-এর ইহলোকে আগমনের প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে ৫২৫ খৃষ্টাব্দে আবিসিনিয়ার খৃস্টানগণ ইয়ামন দখল করিয়া লয়। তাঁহার জন্মের কয়েক বৎসর পর পারসিকগণ উহা জবরদখল করিয়া ফেলে। পারসিক গভর্নর কর্তৃকই উহা শাসিত হইতেছিল। ইয়ামনবাসীরা ছিল জাতিগত দিক দিয়া কাহতাল বংশোদ্ভূত। এই দিকে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন ইসমাঈল (আ)-এর রক্তধারার অন্তর্গত আরব। এই জাতিগত পার্থক্যের ফলে সেখানে ইসলাম প্রচারের কিছু সমস্যা অনুভূত হইত। ইয়ামনীরা নিজেদের সংস্কৃতি ও রাজ্য শাসন লইয়া অপরদের উপর গর্ববোধ করিত। সমগ্র আরব জাতি তাহাদিগের উন্নত মর্যাদাকে একবাক্যে স্বীকার করিত। আরবে ইয়ামনীগণই শাসক হিসাবে বিবেচিত হইত। উহার প্রমাণ মিলে যখন ইয়ামন বংশোদ্ভূত কিনদা গোত্রভুক্ত প্রতিনিধি দল মক্কায়
রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিত তখন গোত্রপতি বলিয়া উঠে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ও আমরা কি একই বংশোদ্ভূত নই! রাসূলুল্লাহ্ জওয়াবে বলিতেন, না, আমরা নাঘ্র ইবন কিনানা বংশের লোক। আমরা আপন মাতার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করিতে পারি না। স্বীয় পিতাকেও অস্বীকার করি না (ইবনুল কায়ি‍্যম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩২)।
সাধারণভাবে ইয়ামনে ইসলাম প্রচারের জন্য রাসূলুল্লাহ্ মু'আয ইবন জাবাল এবং আবূ মুসা আল-আশআরী (রা)-কে প্রেরণ করেন। তাঁহারা স্বতন্ত্র দুইটি অঞ্চলের দায়িত্ব লইয়া সেখানে প্রেরিত হইয়াছিলেন। বিদায় হজ্জ্বের পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাদেরকে প্রেরণ করেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
عن أبي بردة قال بعث رسول الله الله ابا موسى ومعاذ بن جبل قال بعث كل واحد منهما على مخلاف قال واليمن مخلافان ثم قال يسرا ولا تعسرا وبشرا ولا تنفرا فانطلق كل واحد منهما الى عمله قال وكان كل واحد منهما اذا سار في ارضه كان قريبا من صاحبه احدث به عهدا فسلم عليه فسار معاذ في ارضه قريبا من صاحبه ابي موسى فجاء يسير على بغلته حتى انتهى واذا هو جالس وقد اجتمع اليه الناس واذا رجل عنده قد جمعت يداه الى عنقه فقال له معاذ يا عبد الله بن قيس ايم هذا قال رجل كفر بعد اسلامه قال لا انزل حتى يقتل قال انما جئ به لذلك فانزل قال ما انزل حتى يقتل فامر به فقتل ثم نزل فقال يا عبد الله كيف تقرأ القرآن قال اتفوقه لفوقا قال فكيف تقرأ انت يا معاذ قالا انام أول الليل فاقوم وقد قضيت جزئى من النوم فاقرأ ما كتب الله لى فاحتسب نومتي كما احتسب قومتي (رواه البخاري). "আবূ বুরদা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আবূ মূসা ও মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে ইয়ামান অভিমুখে প্রেরণ করেন। তিনি (আবূ বুরদা) বলেন, তিনি দুইজনকে দুইটি অঞ্চলে প্রেরণ করেন। সেদিনকার ইয়ামান দুইটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। রওয়ানা হইবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা মানুষের সহিত কোমল আচরণ করিবে, রুঢ় আচরণ করিবে না। সুসংবাদ প্রদান করিবে, কাহারও মনে ঘৃণার উদ্রেক করিবে না। অতঃপর তাঁহারা আপন আপন কাজে রওয়ানা হইয়া গেলেন। তাহাদের মধ্যে একজন স্বীয় এলাকা পরিদর্শন করিবার সময় অপরজনের নিকটবর্তী হইলে নূতনভাবে পরস্পর সাক্ষাত করিতেন, সালাম বিনিময় করিতেন। একদা মু'আয (রা) একটি গাধায় সওয়ার হইয়া স্বীয় এলাকা পরিদর্শন করিতে গিয়া আবূ মুসা (রা)-এর সহিত সাক্ষাত করিলেন। আবূ মুসা (রা) তখন উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁহার আশেপাশে লোকজন ভিড় জমাইয়াছিল। সেখানে একটি লোককে দেখা গেল তাহার দুই হাত ঘাড়ের সহিত বাঁধা। মু'আয (রা) বলিলেন, হে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কায়স! এই লোকটি কে?
আবূ মূসা (রা) বলিলেন, সে ইসলাম গ্রহণ করিবার পর কাফির হইয়া গিয়াছে। মু'আয (রা) বলিলেন, আমি গাধার উপর হইতে অবতরণ করিব না যেই পর্যন্ত তাহাকে হত্যা করা না হইবে। তিনি বলিলেন, আপনি অবতরণ করুন, তাহাকে হত্যা করিবার জন্যই এখানে উপস্থিত করা হইয়াছে। তিনি বলিলেন, উহাকে যেই পর্যন্ত হত্যা করা হইবে না আমি অবতরণ করিব না। অতঃপর তিনি হত্যা করিবার নির্দেশ দিলে তাহাকে হত্যা করা হয়। মু'আয (রা) অবতরণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবদুল্লাহ! আপনি কিভাবে আল-কুরআন তিলাওয়াত করেন? তিনি বলিলেন, আমি অল্প অল্প করিয়া সব সময় তিলাওয়াত করি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মু'আয! আপনি কিভাবে তিলাওয়াত করেন? তিনি বলিলেন, আমি রাত্রের শুরুতে ঘুমাইয়া পড়ি, অতঃপর আমার ঘুমের অংশ শেষ করিয়া জাগ্রত হই এবং আল্লাহ্ কর্তৃক আমার জন্য নির্ধারিত অংশ পাঠ করি। আমি ছওয়াবের নিয়তে ঘুমাই যেভাবে ছওয়াবের নিয়তে জাগ্রত হই” (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২২)।
عن ابن عباس قال قال رسول الله الله لمعاذ بن جبل حين بعثه الى اليمن انك ستأتى قوما اهل كتاب فاذا جئتهم فadعوهم الى ان يشهدوا ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله فان هم اطاعوالك بذلك فاخبرهم ان الله فرض عليهم خمس صلوات كل يوم وليلة فانهم اطاعوا لك بذالك فاخبرهم ان الله فرض عليهم صدقة تؤخذ من اغنيائهم فترد على فقرائهم فانهم اطاعوالك بذلك فاياك وكرائم اموالهم واتق دعوة المظلوم فانه ليس بينه وبين الله حجاب (رواه البخاري). "ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন মু'আয ইবন জাবাল (রা)-কে ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের নিকট যাইতেছ। সেখানে যাওয়ার পর তুমি তাহাদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ এই দুইটি কথার সাক্ষী দেওয়ার দাওয়াত দিও। যদি উহারা তাহা মানিয়া লয় তাহা হইলে তাহাদেরকে অবহিত করিও, নিশ্চয় আল্লাহ্ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করিয়াছেন। যদি উহা তাহারা গ্রহণ করে তখন তাহাদিগকে জানাইয়া দিও, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের উপর সাদাকা (যাকাত) ফরয করিয়াছেন। উহা সচ্ছলদের নিকট হইতে আদায় করিয়া অসচ্ছলদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে। যদি উহারা তাহা মান্য করে তাহা হইলে উহাদের উত্তম মালগুলি গ্রহণ করা হইতে দূরে থাকিও। নির্যাতিত ব্যক্তির বদদু'আ হইতে বাঁচিয়া থাকিও। কারণ তাহার মধ্যে ও আল্লাহ্ মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নাই" (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
ইমাম আহমাদ তদীয় সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, মু'আয ইবন জাবাল (রা)-কে যখন রাসূলুল্লাহ্ ইয়ামনের দিকে প্রেরণ করেন তখন তাহাকে বিদায় দানের সময় তাহার সহিত হাঁটিতে হাঁটিতে বলিয়াছিলেন, হে মু'আয! সম্ভবত এই বৎসরের পর তুমি আমার সহিত সাক্ষাত করিতে পারিবেনা। আমার অনুপস্থিতিতে আমার এই মসজিদ ও কবর পরিদর্শন করিবে। মু'আয (রা) উহা
শ্রবণ করিয়া বিরহ হইয়া যাওয়ার ব্যথায় খুক্ক্রন্দন করিলেন। অঃপর কিছুদূর অগ্রসর হইয়া মদীনার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, আমার নিকট মুত্তাকীরাই সর্বোত্তম মানুষ, তাহারা যে কোন গোত্রের এবং যে কোন স্থানের হউক না কেন। অপর একটি রিওয়ায়েত রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ মু'আয (রা)-কে ক্রন্দন করিতে নিষেধ করিয়া বলিয়াছিলেন, ان البكاء من الشيطان "নিশ্চয় ক্রন্দন শয়তানের তরফ হইতে"। অপর একটি বর্ণনায় রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ মু'আয (রা)-কে বিদায় সম্ভাষণ জ্ঞাপন কালে বলিয়াছিলেন, আমি তোমাকে এমন একটি জাতির প্রতি প্রেরণ করিতেছি যাহাদের হৃদয় অত্যন্ত কোমল। উহারা সত্যের জন্য মরিয়া হইয়া লড়াই করিবে। উহাদের মধ্যে যাহারা তোমার অনুসরণ করিবে তাহাদেরকে সঙ্গে লইয়া অবাধ্যদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিবে। তখন দেখিবে তাহারা ইসলামের দিকে ধাবিত হইতেছে। এমনকি স্ত্রী তাহার স্বামীর পূর্বে, সন্তান পিতার পূর্বে, এক ভাই অপর ভাইয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করিবার জন্য প্রতিযোগিতা করিবে।
উপরিউক্ত হাদীছ হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হয় যে, মু'আয (রা) ইয়ামন হইতে ফিরিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত মিলিত হইতে পারিবেন না। বাস্তবে হইয়াছিল তাহাই। কারণ তাঁহার ইয়ামনে অবস্থান কালেই বিদায় হজ্জ অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। উহার একাশি দিন পর রাসূলুল্লাহ্ -এর ইনতিকাল হয়।
কোন কোন রিওয়ায়াতের বর্ণনামতে মু'আয ইবন জাবাল (রা) ইয়ামন হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট তাহাকে তা'যীমী সিজদার জন্য প্রার্থনা জানাইয়াছিলেন। কারণ তিনি ইয়ামনে দেখিয়াছেন যে ছোটরা বড়দেরকে সম্মানার্থে সিজদা করেন। রাসুলুল্লাহ্ তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছিলেন যে, যদি আমি মানুষকে মানুষের জন্য সিজদা করিবার অনুমতি প্রদান করিতাম তাহা হইলে স্ত্রীকে তাহার স্বামীর উদ্দেশ্যে সিজদা করিবার অনুমতি প্রদান করিতাম।
এই ধরনের রিওয়ায়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ্র -এর জীবদ্দশায় মু'আয ইবন জাবাল (রা)-এর ইয়ামন হইতে প্রত্যাবর্তনের পক্ষে দলীল উপস্থাপন করা যায় না। কারণ পূর্বোক্ত রিওয়ায়াত শক্তি-শালী ভিত্তির উপর উপস্থাপিত। বিশেষ করিয়া যেখানে কোন কোন রিওয়ায়াতে বর্ণিত রহিয়াছে যে, মু'আয (রা) শাম হইতে ফিরিয়া সিজদা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭৮)।
মু'আয ইবন জাবাল (রা)-কে ইয়ামনের দিকে প্রেরণ করিবার সময় রাসূলুল্লাহ্ আরও কিছু অসিয়্যত করিয়াছিলেন, বর্ণিত আছে: عن معاذ بن جبل ان رسول الله الله لما بعثه الى اليمن قال اياك والتنعم فان عباد الله ليسوا بالمتنعمين. "মু'আয ইবন জাবাল (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন তাঁহাকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন বলিলেন, তুমি বিলাসবহুল জীবন যাপন পরিহার করিবে। কারণ আল্লাহ্র বান্দাগণ বিলাসী হয় না" (ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হামবাল, আল-মুসনাদ, বরাত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00