📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাজরানের হারিছ ইব্‌ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচার

📄 নাজরানের হারিছ ইব্‌ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচার


দশম হিজরীর রবিউল আখির কাহারও কাহারও মতে রবিউল আউয়াল অথবা জুমাদাল উলা মাস। রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে নাজরানস্থিত হারিছ ইব্‌ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত চার শত লোকের একটি বাহিনীও প্রেরণ করেন (তাবারী, আত-তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ৩খ., পৃ. ১২৬)। রওয়ানা হইবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে অসিয়্যত করেন যে, উহাদিগের সহিত প্রথমেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে না। সর্বপ্রথম তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিবে। তাহা যেন সংখ্যায় তিন বারের কম না হয়। যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে সম্মত হয় তাহা হইলে তো ভালই, অন্যথায় তাহাদের সহিত তুমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে। খালিদ (রা) সেখানে পৌঁছিয়া সর্বত্র অশ্বারোহী লোক পাঠাইয়া ইসলামের দাওয়াত ব্যাপকভাবে প্রচার করিলেন। তাহাদিগের ইসলামের দাওয়াত দান ছিল এইরূপ:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাজরানের খৃস্টানদেরকে ইসলামের দাওয়াত

📄 নাজরানের খৃস্টানদেরকে ইসলামের দাওয়াত


ايها الناس اسلموا تسلموا
"ওহে লোকসকল! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপদ হইয়া যাইবে।"
তাহারা স্বতঃসিদ্ধভাবে ইসলাম গ্রহণ করিল। দাওয়াত দানকারিগণের সম্মান করিল। অতঃপর খালিদ (রা) তাহাদের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ কারিয়া কুরআন ও সুন্নাহ্ শিক্ষা দানে ব্রতী হইলেন। কিছু দিন অবস্থান গ্রহণ করিবার পর তিনি রাসূলুল্লাহ্ -এর বরাবরে পত্র লিখিলেন:
بسم الله الرحمن الرحيم لمحمد النبى رسول الله من خالد بن الوليد السلام عليك يا رسول الله ﷺ ورحمة الله وبركاته فاني احمد إليك الذي لا اله الا هو اما بعد يا رسول الله ﷺ فانك بعثتني الى بني الحارث بن كعب وامرتني اذا اتيتهم ان لا اقاتلهم وان ادعوهم الى الاسلام فان اسلموا قبلت منهم وعلمتهم معالم الاسلام وكتاب الله وسنة نبيه ﷺ وان لم يسلموا قاتلتهم وانى قدمت فدعوتهم الى الاسلام ثلثة ايام "দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ কর্তৃক মুহাম্মাদ আল্লাহর নবী ও রাসূলের প্রতি। হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ্র রহমত, বরকত ও শান্তি আপনার উপর বর্ষিত হউক। আমি আপনার সামনে প্রশংসা করিতেছি আল্লাহর যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন আল-হারিছ ইব্‌ন কা'ব গোত্রের প্রতি। আমাকে আদেশ করিয়াছেন, যখন আমি তাহাদের মধ্যে পৌঁছিব তখন তাহাদের সহিত কোন যুদ্ধে লিপ্ত হইব না। আমি তাহাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাইব। তাহারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাহা গ্রহণ করিব। তাহাদিগকে ইসলামের নীতিমালা আল্লাহর কুরআন ও তাঁহার নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দিব। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইলে তাহাদের সহিত জিহাদ করিব। আমি তাহাদের নিকট আগমন করিয়াছি, তাহাদেরকে তিন দিন ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিয়াছি ........."।
খালিদ (রা)-এর এই পত্র রাসূলুল্লাহ্-এর হস্তগত হইবার পর তিনি তদুত্তরে নিম্নোক্ত পত্র লিখিলেন-
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد النبى رسول الله الى خالد بن الوليد سلام عليك فانی احمد اليك الله الذى لا اله الا هو اما بعد فان كتابك جاءني مع رسولك يخبر أن بني الحارث بن كعب قد اسلموا قبل ان تقاتلهم واجابوا الى ما دعوتهم اليه من الاسلام وشهدوا ان لا اله الا الله وان محمدا عبده ورسوله وان قد هداهم الله بهداه فبشرهم وانذرهم واقبل وليقبل معك وفدهم والسلام عليك ورحمة الله وبركاته.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। মুহাম্মদ আল্লাহ্ নবী ও রাসূলের পক্ষ হইতে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ-এর প্রতি। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমি তোমার নিকট আল্লাহ্ প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর দূত মারফত তোমার পত্র আমার হস্তগত হইয়াছে। উহাতে সংবাদ রহিয়াছে যে, আল-হারিছ ইব্‌ন কা'ব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে কোন ধরনের যুদ্ধ করা ব্যতিরেকে। তুমি তাহাদেরকে যেই ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলে তাহারা উহা গ্রহণ করিয়াছে। তাহারা সাক্ষী দান করিয়াছে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই; মুহাম্মাদ আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁহার রাসূল। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার রহমতের দ্বারা তাঁহাদেরকে হিদায়াত করিয়াছেন। তুমি উহাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর, ভীতি প্রদর্শন কর। তুমি চলিয়া আস এবং তোমার সহিত উহাদের প্রতিনিধি দল লইয়া আস। আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭৬)।
খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর সহিত এই গোত্রের যেই প্রতিনিধি দল আগমন করিয়াছিল তাঁহারা হইল কায়স ইন্ন হুসায়ন যুলগুস্সা, ইয়াযীদ ইব্‌ন আবদুল মাদান, ইয়াযীদ ইবনুল মাজমাল, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কারাদ ও শাদ্দাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমরা জাহিলিয়্যা যুগে কিসের দ্বারা শত্রুদের উপর বিজয়ী হইতে? তাঁহারা প্রথমে বলিয়াছিল, আমরা কাহারাও উপর বিজয়ী হইতাম না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ আবার বলিলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই তোমরা অন্যদের উপর বিজয়ী হইতে। তাহারা তখন উত্তরে বলিল, আমরা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ থাকিতাম, ঝগড়া-বিবাদে লপ্ত হইতাম না, আমরা কাহারও উপর অত্যাচার করিতাম না। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের উত্তর শুনিয়া বলিলেন, তোমরা সত্যই বলিতেছ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ কায়স ইন্ন হুসায়ন (হুসাইন)-কে তাহাদিগের শাসক নিযুক্ত করিলেন। তাঁহারা শাওয়াল মাস কিংবা যিলকা'দা মাসে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। উহার চারমাস পর রাসূলুল্লাহ্-এর ইনতিকাল হইয়া যায় (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬৮)।
প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হইবার পর তিনি তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, উহাদিগকে 'আল-হিন্দ' (ভারতবর্ষের) মানুষের মত দেখা যাইতেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যদি খালিদ এই মর্মে পত্র না লিখিত যে, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ, তোমরা যুদ্ধে উদ্যত হও নাই তাহা হইলে, আমি তোমাদের মাথা স্ব স্ব পদতলে ফেলিয়া দিতাম। তখন ইয়াযীদ ইব্‌ন আবদুল মাদান বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমরা আপনার হাম্দ (প্রশংসা) করিতেছিনা, খালিদেরও নয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা হইলে তোমরা কাহার হাম্দ করিবে? তাঁহারা উত্তর দিল, যেই আল্লাহ্ আপনার বদৌলতে আমাদিগকে হিদায়াত করিয়াছেন, আমরা তাঁহারই প্রশংসা করি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তোমরা সত্যই বলিয়াছ (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
মক্কা নগরী হইতে সাত মনযিল দূরে ইয়ামানের দিকে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ এলাকার নাম হইল নাজরান। আরবীয় খৃস্টানগণ সেখানে বসবাস বরিত এবং এখানে তাহাদের একটি বিরাট গির্জাও ছিল। গির্জাটিকে তাহারা মুসলামানদের কা'বা-প্রীতির মত সম্মান করিত। আরবের

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু আসাদ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 বানু আসাদ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


বুকে উহার সমপর্যায়ের খৃস্টানগণের অন্য কোন উপাসনালয় ছিলনা। এইখানে অনেক প্রসিদ্ধ ধর্মীয় যাজক বসবাস করিত। ইহাদের উপাধি ছিল সায়্যিদ ও আকিব (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, পৃ. ৪২৮)। সত্তর জনের একটি দল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল। উহাদের নেতা ছিল আল-কিনদা গোত্রীয় 'আবদুল মাসীহ্, ধর্মীয় যাজক ছিল বাক্র ইব্‌ন ওয়াইল গোত্রের আবূ হারিছা এবং সরদার আল-আয়হাম। খৃস্টান এই প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাহাদের ধর্মের যথার্থতা সম্পর্কে ঝগড়ায় লিপ্ত হইল। তখনই সূরা আল-ইমরানের প্রথম দিকের কতিপয় আয়াত ও 'মুবাহালা'র বিধান অবতীর্ণ হয়। কিন্তু তাহারা মুবাহালায় অংশগ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সন্ধিতে উপনীত হয়। সন্ধি অনুযায়ী তাহারা তাহাদের জন্য একজন শাসক প্রেরণের আবেদন জানাইলে রাসূলুল্লাহ্ আবু 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে নাজরানের শাসক নিয়োগ করেন। অতঃপর তাহাদের 'আকিব' ও 'সায়্যিদ' রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করে (ইব্‌ন খালদুন, কিতাবুল ইবার ওয়াদ-দীওয়ান, তারীখে ইব্‌ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫৭)।
কুরয ইব্‌ন আলকামা সূত্রে ইবন ইসহাক বলেন, নাজরানের এই খৃস্টান প্রতিনিধি দলে ষাট জন অশ্বারোহী ছিল। উহাদের মধ্যে চব্বিশ জন ছিল উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিবর্গ। তিন ব্যক্তি ছিল এমন স্তরের লোক, যাহাদের কর্তৃত্বাধীন ছিল গোটা সম্প্রদায়ের দায়ভার। উহাদের পরিভাষায় 'আকিব' বলা হইত যাহার হাতে পুরা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বদানের কর্তৃত্ব থাকিত। তাহার নির্দেশ ও পরামর্শ ব্যতিরেকে নাজরানবাসী কোন কাজ করিত না। তাহাদের এই শাসকের নাম ছিল আবদুল মাসীহ। দলকে সুশৃংখলভাবে পরিচালনা করা ও বাহনের ব্যবস্থাপনা যাহার হাতে ন্যস্ত থাকিত তাহাকে উহাদের পরিভাষায় সায়্যিদ বলা হইত। এই দায়িত্বে তখন নিয়োজিত ছিল 'আয়হাম'। তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন আবূ হারিছা ইব্‌ন আলকামা। তিনি ছিলেন তাহাদের ধর্মীয় যাজক এবং খৃষ্ট ধর্মের সর্বোচ্চ পণ্ডিত। আবূ হারিছা বাক্স ইব্‌ন ওয়াইল গোত্রের লোক ছিল। কিন্তু সে বসবাস করিত খৃষ্টানদের সহিত। বাইবেলের উপর ছিল তাহার অগাধ পাণ্ডিত্য। তদানিন্তন খৃস্টান রোম শাহী তাহার ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও গবেষণার কথা অবহিত হইয়া তাহাকে খুবই সমাদর করিয়াছিল এবং তাহাকে একটি গির্জা নির্মাণ করিয়া দিয়াছিল। এই প্রতিনিধিদল মদীনার দিকে রওয়ানা করিলে পথিমধ্যে আবু হারিছা তাহার ভাই কুরয ইব্‌ন আলকামাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিল, আল্লাহ্ কসম, তিনিই সেই উম্মী নবী যাঁহার প্রতীক্ষায় আমরা ছিলাম। কিন্তু এই কথা প্রকাশ করিয়া দিলে সকল মানুষ আমাদের বিরোধী হইয়া যাইবে। কুরয ইব্‌ন আলকামা তাহার এই কথা মনে রাখিয়াছিলেন। ফলে মদীনায় পৌঁছিয়া তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া ফেলেন (আবদুর রউফ, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪২৪)। এই সম্পর্কে হাদীছে ইরশাদ হইয়াছে:
عن حذيفة قال جاء العاقب والسيد صاحبا نجران الى رسول الله لا يريدان ان يلاعناه قال فقال احدهما لصاحبه لا تفعل فوالله لئن كان نبيا فلاعنا لا نفلح نحن ولا عقبنا من بعدنا قالا انا نعطيك ما سألتنا وابعث معنا رجلا امينا ولا تبعث معنا الا امينا فقال لا بعثن معكم رجلا امينا حق امين حق امين
"হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজরান অঞ্চলের দুই দলপতি আকিব ও সায়্যিদ রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার সহিত মুবাহালায় লিপ্ত হইতে ইচ্ছা করিল। তখন তাহাদের একজন তাহার সঙ্গীকে বলিল, তাহা করিও না। যদি তিনি সত্যই নবী হইয়া থাকেন আর আমরা তাঁহার সহিত মুবাহালায় লিপ্ত হই তাহা হইলে আমরা কৃতকার্য হইতে পারিব না এবং আমাদের পশ্চাতের লোকেরাও নয়। অতঃপর তাহারা বলিল, আপনি যাহা চাহিবেন তাহা আমরা দান করিব। আমাদের সহিত একজন বিশ্বস্ত লোক প্রেরণ করুন, বিশ্বস্ত ব্যতীত কাহাকেও প্রেরণ করিবেন না। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট যথার্থ এবং খুবই বিশ্বস্ত এক লোককে পাঠাইব। বিশ্বস্ততার এই মানদণ্ড কাহার ভাগ্যে জুটিবে উহার প্রত্যাশায় ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবীগণ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ আহ্বান করিলেন আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে। তিনি যখন দাঁড়াইলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সে হইল এই উম্মতের বিশ্বস্ত লোক” (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, নাজরানবাসীর ঘটনা অনুচ্ছেদ, ২খ., পৃ. ৬২৯)।
নাজরানবাসীর প্রতি রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত যেই পত্র পাঠাইয়াছিলেন তাহা ছিল নিম্নরূপঃ
باسم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب من محمد النبى رسول الله الى اسقف نجران اسلم انتم فانى احمد اليكم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب اما بعد فاني ادعوكم الى عبادة الله من عبادة العباد وادعوكم الى ولاية الله من ولاية العباد فان ابيتم فالجزية فان ابيتم اذنتكم بحرب والسلام.
"ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর ইলাহের নামে মুহাম্মাদ আল্লাহ্ নবী ও রাসূলের পক্ষ হইতে নাজরানের ধর্মযাজকের প্রতি। আমি তোমাদের নিকট ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর ইলাহের প্রশংসা করিয়া বলিতেছি, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। অতঃপর আমি তোমাদেরকে দাওয়াত প্রদান করিতেছি মানুষের উপাসনা বর্জন করিয়া আল্লাহ্র উপাসনায় ফিরিয়া আসিবার এবং মানুষের অধীনতা পরিহার করিয়া আল্লাহ্র অধীনতা গ্রহণ করিবার জন্য। এই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তোমাদেরকে কর প্রদান করিতে হইবে। করদানে অস্বীকৃতি জানাইলে তোমাদেরকে যুদ্ধের মুখামুখি হইবার কথা জানাইয়া দিতেছি। ওয়াসসালাম।"
এই পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (স) লিখিয়া দিলেন তাঁহার উপর সূরা আন-নামলের বিসমিল্লাহ্ সম্বলিত ৩০ নম্বর আয়াতটি নাযিল হইবার পূর্বে। যাহার ফলে باسم اله ابراهيم الخ বলিয়া শুরু করা হইয়াছিল (আল-বায়হাকী, বরাত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৪২)।
পত্রটি যাজকের হস্তগত হইবার পর সে দারুণভাবে আলোড়িত হইল, শুরাহবীল ইব্‌ন ওয়াদা'আকে ডাকিয়া পাঠাইল এবং চিঠিটির বিষয়বস্তু অবহিত হইয়া মন্তব্য করিতে নির্দেশ দিল।
সে অভিমত ব্যক্ত করিল যে, আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশধর হইতে যেই নবী প্রেরণ করিবার ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, তিনিই সেই নবী। নুবুওয়াতের ব্যাপারে আমার অন্য কোন অভিমত নাই। উহাতে যাজকটি বিরক্ত হইয়া তাহাকে সেখান হইতে তাড়াইয়া দিল। অতঃপর হিময়ার গেত্রের 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন শুরাহবীলকে ডাকিয়া পাঠাইল। তাহাকে চিঠিটি পড়িয়া অভিমত ব্যক্ত করিতে নির্দেশ দিল। সেও প্রথমোক্ত ব্যক্তির ন্যায় অভিমত ব্যক্ত করিলে তাহাকেও সরিয়া যাইতে নির্দেশ দিল। সর্বশেষ বানুল হারিছ গোত্রের জিবাল ইব্‌ন ফায়দের নিকট পত্রটি পড়িয়া মন্তব্য করিতে নির্দেশ দিল। সেও পূর্বোক্ত দুই জনের ন্যায় অভিমত ব্যক্ত করিল। তিন জনই যখন অভিন্ন মতামত ব্যক্ত করিল তখন সে সারাদেশের নেতৃস্থানীয় লোকদের সভা আহ্বান করিল। সকলেরই ঐক্যবদ্ধ অভিমত হইল যে, পূর্বোল্লেখিত তিন জনকেই রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট তাঁহার অবস্থা অবগত হওয়ার জন্য প্রেরণ করার ব্যবস্থা করা হউক। তাহারা মদীনায় উপনীত হইয়া ভ্রমণের লেবাস পোশাক পরিবর্তন করিল এবং অহংকারবশত যাজকদের পোশাক ও স্বর্ণের আংটি পরিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইল। অতঃপর তাঁহাকে সালাম দিলে রাসূলুল্লাহ্ সালামের উত্তর প্রদান করেন নাই, তাহাদের কোন কথার উত্তরও দেন নাই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমান রহিবার পর তাহারা উপায়ন্তর না দেখিয়া তাহাদের পূর্বপরিচিত উছমান ইব্‌ন 'আফফান ও আবদুর রহমান ইব্‌ন আউফ (রা)-কে অনুসন্ধান করিতে লাগিল। অতঃপর তাঁহাদের সহিত সাক্ষাত করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিতি ও তাহাদের সালাম ও কালামের উত্তর না দিবার বিষয়টি অবহিত করিল। এই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা), উছমান ও আবদুর রহমান (রা)। এই বিষয়ে তাঁহার নিকট পরামর্শ চাহিলে তিনি বলিলেন, আমার মনে হয় উহারা তাহাদের এই পোশাক পরিবর্তন করিয়া সফরের বস্ত্র পরিধান করিয়া উপস্থিত হইবে। তাহারা তাহাই করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সালাম দিলে তিনি উত্তর প্রদান করিলেন। অতঃপর বিভিন্ন বিষয়ে তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট অবহিত হইতে চাহিল। এক পর্যায়ে তাহারা বলিল, আমরা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী আমরা আমাদের নবী ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনার অভিমত জানিতে চাহি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আজ আমি তাঁহার সম্পর্কে কিছুই বলিতে পারিবনা। তোমরা অপেক্ষা কর, আল্লাহ্ তা'আলা এই সম্পর্কে আমার উপর যাহা অবতীর্ণ করিবেন তাহা আমি তোমাদিগকে বলিব। পরবর্তী দিন তাহারা আবার উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে।
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُنْ مِّنَ الْمُمْتَرِيْنَ. فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ.
"আল্লাহ্র নিকট নিশ্চয়ই ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, হও, ফলে সে হইয়া গেল। এই সত্য তোমার
প্রতিপালকের নিকট হইতে। সুতরাং তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হইও না। তোমার নিকট জ্ঞান আসিবার পর যে কেহ এই বিষয়ে তোমার সহিত তর্ক করে তাহাকে বল, আইস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারিগণকে এবং তোমাদের নারিগণকে, আমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের নিজদিগকে, অতঃপর আমরা আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দেই আল্লাহর লা'নত" (৩:৫৯-৬১)।
এই আয়াতের বিষয়বস্তুকে নাজরানের এই খৃস্টানগণ মানিয়া লইতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। ফলে পরবর্তী দিন ভোরে রাসূলুল্লাহ্ হযরত হাসান (রা), হুসায়ন (রা) ও তাঁহাদিগের পশ্চাতে হযরত ফাতিমা (রা)-কে লইয়া মুবাহালায় উত্তীর্ণ হইবার জন্য বাহির হইলেন। সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্-এর কোন কোন স্ত্রীও ছিলেন। অবস্থা দৃশ্যে শুরাহবীল বলিয়া উঠিল, বিষয়টি খুবই ঘোরতর। যদি এই লোক নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে মুবাহালা করিবার সঙ্গে সঙ্গে ভুমণ্ডলে আমাদের একটি নখ, এমন কি একটি চুলও অবশিষ্ট থাকিবেনা। তখন তাহার দুই সঙ্গী বলিয়া উঠিল, এখন আমাদের করার কী আছে? শুরাহবীল বলিল, আমার অভিমত হইল, তাঁহাকে আমরা কর্তা হিসাবে মানিয়া লইব। তিনি যাহা বলিবেন, দ্বিধাহীন চিত্তে উহা গ্রহণ করিব। তিনি কখনও অন্যায় আদেশ দিবেন না। তাহার সঙ্গীদ্বয় এই অভিমত মানিয়া লইল। তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে মুবাহালা পরিত্যাগের নিবেদন করিয়া একদিন একরাত্র সময় প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ্ উহা অনুমোদন করিলেন। পরবর্তী দিবস সকাল বেলা তিনি তাহাদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত চুক্তিনামা লিখিয়া দিলেন।
بسم الله الرحمن الرحيم هذا ماكتب محمد النبى الامى رسول الله لنجران ان كان عليهم حكمه في كل صفراء وبيضاء ورقيق فافضل عليهم وترك ذلك كله على الفي حلة في كل رجب الف حلة وفى كل صفر الف حلة وذكر تمام الشرط.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে উম্মী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে এই লিপিকা নাজরানবাসীর প্রতি। তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রাসূল-এর আদেশ ছিল সোনারূপা (নগদ অর্থ) প্রদানের, কিন্তু তিনি তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাদেরকে উহা প্রদান হইতে রেহাই দিলেন এই শর্তে যে, তাহারা প্রতি বৎসর দুই হাজার জোড়া চাদর প্রদান করিবে, এক হাজার রজব মাসে এবং এক হাজার সফর মাসে। লিপিকায় অন্যান্য শর্তও উল্লেখ করিয়া ফরমানটি তাহাদেরকে প্রদান করিলেন" (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, উর্দু, ১খ., ৩য় পারা, পৃ. ৭৫)।
এই পত্রটি লইয়া নাজরানের উচ্চ পর্যায়ের এই প্রতিনিধি দল স্বদেশে পৌঁছিয়া উহা তাহাদের ধর্মীয় নেতার নিকট হস্তান্তর করিল। সে উহা পাঠ করিয়া আকস্মিক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! তিনি আল্লাহ্র রাসূল। উহা শুনিয়া ধর্মযাজকের মাতৃপক্ষীয় ভাই বিশ্ব ইন্ন মা'রূর মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হইল। সে তখন বহু বাধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও নিবৃত্ত হইল না। সোজা মদীনায় উপনীত হইবার পর তাহার উটটি যাত্রা বিরতি করিল। তাৎক্ষণিক তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কোন এক জিহাদে অংশগ্রহণ করিয়া শাহাদাত লাভের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মদীনাতেই অবস্থান করিতে থাকিলেন (আসাহহু সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩০)।
বানু আসাদ গোত্র ছিল বিভিন্ন রণাঙ্গনে কাফির কুরায়শ গোত্রের দক্ষিণ হস্ত। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা)-এর খিলাফত কালে এ গোত্রেরই লোক তুলায়হা ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ মিথ্যা নবুওয়তের দাবী করিয়াছিল। হিজরী নবম সনে উহারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং এই উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, অনুবাদ মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৪২৯)।
আল-ওয়াকিদীর বিররণ মতে বানু আসাদ গোত্রের দশজন লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল। এই প্রতিনিধি দলের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা ছিলেন ওয়াবিসা ইব্‌ন মা'বাদ, তুলায়হা ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ, নাফাদা ইবন 'আবদিল্লাহ্ ইব্‌ন খালফ ও হাফ্রামী ইব্‌ন আমির। উহাদের নেতা ছিল হাফ্রামী ইবন 'আমির। তুলায়হা ইন্ন খুওয়ায়লিদ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৬৮)।
এই গোত্রীয় লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আসে এবং বলে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা মুসলমান হইয়াছি, অন্যান্য আরব জাতিরা আপনার সহিত যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন কোন ধরনের ঝগড়া-বিবাদ ব্যতিরেকে আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহাদের অনুভূতি বড়ই দুর্বল, শয়তান উহাদের কথার উপর কথা বলিতেছে। তখন এই আয়াত নাযিল হয়। يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَى إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَوْكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ.
"উহারা আত্মসমর্পণ করিয়া তোমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করে। বল, তোমাদের আত্মসমর্পণ আমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করিও না; বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করিয়া তোমাদেরকে ধন্য করিয়াছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও” (৪৯: ১৭)।
অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার জ্ঞানের পরিধি যে সুগভীর ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলে সকল সৃষ্টির জ্ঞানই যে তিনি রাখেন সেই কথা অবহিত করেন (মুসনাদে বাযযার, বরাত তাফসীর ইন্ন কাছীর (উর্দু), ৫খ, ২৭ পারা, পৃ. ৯০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আব্দ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 আব্দ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


ইবন ইসহাকের বর্ণনা মতে আব্দ গোত্রের দলপতি সুরদ ইব্‌ন 'আবদিল্লাহ্ সদলবলে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পরও রাসূলুল্লাহ্র তাঁহাকে গোত্রপতি হিসাবে বহাল রাখেন। তাঁহাকে ইয়ামানের বিভিন্ন মুশরিক গোত্রের সহিত জিহাদ করিবার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া ইয়ামানের সর্বাধিক সংরক্ষিত অঞ্চল জুরুশ অবরোধ করেন। খাছ'আম গোত্রের লোকেরা তাহাদিগকে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হইবার কথা অবহিত করেন। তাহারা স্ব-স্ব বাসস্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। এক মাস পর্যন্ত তাহারা অবরুদ্ধ থাকে। অতঃপর সুরদ ইবন 'আবদিল্লাহ্ (রা)
অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া লইলে জুরুশবাসীরা মনে করে যে মুসলিমগণ ব্যর্থতা স্বীকার করিয়া পালাইতেছে। ফলে তাহারা শহরের নিকটস্থ 'শুক্র নামক পাহাড়ের কাছে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। সুরদ ইবন 'আবদিল্লাহ্ (রা) ও তাঁহার বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করিয়া প্রতিশোধ গ্রহণ করে। উহাদিগকে কতল করা হয়। জুরুশবাসীরা পূর্বেই রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট মদীনায় দুইজন দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহারা ঐ দিবসের আসরের সালাতের পর রাসূলুল্লাহ্ -এর সহিত সাক্ষাত করে। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, শুক্র কোন অঞ্চলে অবস্থিত? তাহারা উত্তর দিল, আমাদের এলাকার একটি পাহাড়ের নাম কুশর। জুরুশবাসীরা উহাকে কুশর হিসাবেই আখ্যায়িত করিত। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা কুশর নয় বরং উহার নাম শুক্র। দূত হিসাবে আগত লোক দুইটি জিজ্ঞাসা করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেখানকার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার নিকট কি সংবাদ রহিয়াছে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সেখানে আল্লাহ্ উটগুলিকে বর্তমানে কুরবানী দেওয়া হইতেছে। তাহারা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া আবূ বাক্ সিদ্দীক ও উছমান (রা)-এর মধ্যস্থলে বসিয়া পড়িল। বিশিষ্ট এই দুই সাহাবী তখন তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিলেন যে, এই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ্ তোমাদিগকে তোমাদিগের স্বজাতির ইনতিকালের সংবাদ প্রদান করিলেন। তাহারা তখন রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট স্বজাতির দুর্দশা লাঘবের জন্য দু'আ চাহিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তখন দু'আ করিলেন اللهم ارفع عنهم "হে আল্লাহ্! উহাদের সংকট বিদূরিত কর।" তাহারা যখন জুরুশ প্রত্যাবর্তন করিল, তখন অবহিত হইল যে যেই দিবসে যেই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ্ উহাদের দুর্দশার সংবাদ জানাইয়াছিলেন ঠিক সেই সময় উহাদিগকে কতল করা হইয়াছিল। অতঃপর সেখানকার যাহারা জীবিত ছিলেন তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম হিসাবে তাহারা গণ্য হইতে লাগিল। উহাদের অঞ্চলকে নিরাপদ অঞ্চল হিসাবে রাসূলুল্লাহ্ ঘোষণা দিলেন (আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, পৃ. ১৩০-১৩১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00