📄 ছাকীফ গোত্রে ইসলাম প্রচার
কুকুরেরও বিনিময় শোধ করেন। সকল ধরনের বিনিময় ও ক্ষতিপুরণ দান করিবার পর তাহার হাতে কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থাকিয়া যায়। তিনি উহাও জনপদবাসীর নিকট বিলাইয়া দিয়া বলেন, অজানা কোন কিছু রহিয়া গেলে উহার বিনিময়স্বরূপ এইগুলি প্রদান করা হইল। রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট তিনি প্রত্যাবর্তন করিলে তিনি তাঁহাকে সাধুবাদ জ্ঞাপন করেন (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)।
তাইফ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ যখন মদীনা অভিমুখে রওয়ানা করেন তখন ছাকীফ গোত্রপতি 'উরওয়া ইবন মাস'উদ তাঁহার সহিত পথিমধ্যে সাক্ষাত করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচার করিবার উদ্দেশ্যে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দান করেন। নিজ গৃহের ছাদের উপর উঠিয়া তিনি ইসলামের দাওয়াত দান করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় কাফির ও মুশরিকরা তাহাকে তীরের আঘাতে হত্যা করে। ইনতিকালের পূর্বে তিনি ওয়াসিয়্যাত করিয়া গিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে যেন মুসলিম শহীদগণের সহিত দাফন করা হয়। তাঁহার শাহাদাত লাভের পর তাঁহার পুত্র আবুল মালীহ্ ও কাবির ইবনুল আসওয়াদ ইবন মাস'উদ ইসলামে দীক্ষিত হন। অতঃপর তাঁহারাও নির্যাতনের শিকার হইয়াছিলেন। উহার পর ছাকীফবাসিগণ অবহিত হইল যে, রাসূলুল্লাহ্ তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আসিতেছেন এবং ইহাও অনুধাবন করিল যে, তাহারা মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীদের প্রতিরোধ করিতে সক্ষম হইবে না। ফলে তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িল। অবশেষে 'আবদ ইয়ালীল ইবন 'আমর ইবন 'উমায়রের শরণাপন্ন হইল। তিনি শর্ত দিলেন যে, মুহাম্মদ -এর নিকট গমন করিতে হইলে তাঁহার সহিত ছাকীফ গোত্রের আরও কিছুলোক পাঠাইতে হইবে। কারণ উরওয়া ইবন মাস'উদ (রা)-এর পরিণতি সম্পর্কে তিনি পূর্বেই অবহিত ছিলেন। অবশেষে একটি প্রতিনিধি দল লইয়া তিনি হিজরী নবম সনের রমাযান মাসে ইসলামের বায়'আত গ্রহণ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হন (আবদুর রহমান আল-খাদরামী, তারীখ ইন্ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫০)।
ইবন ইসহাক বলেন, 'উরওয়া ইবন মাস'উদ (রা) ইসলাম গ্রহণ করিয়া স্বীয় গোত্রের প্রতি যাত্রা করিবার ইচ্ছা পোষণ করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, "উহারা তোমাকে হত্যা করিবে।" তিনি উত্তরে বলিয়াছিলেন, আমি উহাদিগের মধ্যে উহাদের কুমারী কন্যাগণের চেয়েও প্রিয়। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি তাহাদিগের মধ্যে অতি প্রিয় ছিলেন। কিন্তু ইসলামের দা'ওত দানের সংগে সংগে তিনি তাহাদিগের এমন শত্রুতে পরিণত হইয়া গেলেন যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করে। বলা হয় তাহাকে যেই লোকটি হত্যা করিয়াছিল তাহার নাম ছিল ওয়াহ্ব ইবন জাবির। রাসূলুল্লাহ্ 'উরওয়া (রা) সম্পর্কে বলিয়াছিলেন:
ان مثله في قومه كمثل صاحب يس في قومه.
"সে তাহার গোত্রে সেই পরিমাণ সম্মানিত যেই পরিমাণ সূরা ইয়াসীনের সাহিব (হাবীব আন-নাজ্জার) তাহার কওমের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন।"
মূসা ইবন 'উকবার মতে এ ঘটনাটি আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর নেতৃত্ব আদায়কৃত হজ্জের পর সংঘটিত হইয়াছিল। আবূ বাক্স আল-বায়হাকীও এই মত পোষণ করেন। কিন্তু উহা বাস্তব-সম্মত নয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ২৩)।
'উরওয়া ইবন মাসউদ (রা)-এর শাহাদাত লাভের পর বানু ছাকীফ পূর্ণ একমাস পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করা না করার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্ধে ছিল। অবশেষে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট প্রেরণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। উহাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবদ ইয়ালীল ইন্ন 'আমর, মিত্র গোত্রের ছিলেন হাকাম ইবন 'আমর, শুরাহবীল ইব্ন গায়লান, বানু মালিক উপগোত্রের ছিলেন উছমান ইব্ন আবিল আস, আউস ইব্ন আউফ ও বাহাখ ইবন খারশাহ (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০৬)।
মূসা ইব্ন উকবার মতে প্রতিনিধি দলের সংখ্যা ছিল ১৩ জনের মত। কিনানা ইব্ন আব্দ ইয়ালীল ছিলেন তাহাদের নেতা। 'উছমান ইব্ন আবিল আস ছিলেন প্রতিনিধিদলেন সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি। ইবন ইসহাক (র) বলেন, প্রতিনিধিদলটি মদীনার উপকণ্ঠে উপনীত হইলে সর্বপ্রথম তাহাদের সহিত সাক্ষাত হয় মুগীরা ইন্ন শু'বা (রা)-এর। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর বাহন সমূহের পরিচর্যায় তাহাদিগের আগমনকে প্রত্যক্ষ করিয়া তিনি খুশিতে আটখানা হইয়া বিষয়টিকে অবহিত করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর প্রতি দ্রুত ধাবিত হইতে লাগিলেন। পথিমধ্যে আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর সহিত তাঁহার সাক্ষাত হয়। তাঁহাকে বিষয়টি অবহিত করিলে তিনি মুগীরা (রা)-কে বাধা দিয়া বলেন, আমিই বিষয়টি সবার আগে রাসূলুল্লাহ্-কে অবহিত করিতে চাই। মুগীরা (রা) তাঁহার কথা মানিয়া লইলে আবূ বাক্স (রা)-ই সবার আগে তাহাদিগের আগমনের বার্তা রাসূলুল্লাহ্ -কে অবহিত করেন (ইন্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)। মুগীরা ইবন শু'বা (রা) বানু ছাকীফ গোত্রেরই লোক ছিলেন। ফলে তিনি তাহাদিগের সহিত মিলিত হইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সাক্ষাত করিবার রীতি-নীতি শিক্ষা দিয়াছিলেন। তবুও তাহারা জাহিলিয়্যা যুগের প্রথা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। তাহাদিগের অবস্থানের নিমিত্ত মসজিদের পাশেই একটি শিবির তৈরি করা হয়। খালিদ ইব্ন সাঈদ ইবনুল আস (রা) তাহাদিগের মধ্যে ও রাসূলুল্লাহ্-এর মধ্যে মত বিনিময়ের কাজে মধ্যস্থতা করিতেন।
তাহাদিগের জন্য যেই খাবার রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে বরাদ্দ করা হইত তাহারা তাহা খালিদের গ্রহণ করিবার পূর্বে গ্রহণ করিত না। ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্ব পর্যন্ত তাহাদের এই মনোভাব স্থির ছিল। ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্বে তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর বরাবরে এই শর্ত পেশ করিয়াছিল যে, তাহাদিগের প্রতিমা 'লাত' তিন বৎসর পর্যন্ত অপসারণ করা হইবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাহা প্রত্যাখ্যান করিলেন। তাহারা অন্তত একটি মাস পর্যন্ত উহা বহাল রাখার অনুরোধ করিল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহাও হইতে পারেনা। তাহারা উহা স্বহস্তে ভাঙ্গিবে না বলিয়া আবদার করিলে রাসূলুল্লাহ্ উহা মানিয়া লইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্আবৃ সুফয়ান ইবন হারব এবং মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা)-কে উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট সালাত আদায় করিতে অপারগতার শর্ত আরোপ করিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, যেই ধর্মে সালাত নাই সেই ধর্মে কোন কল্যাণ নাই। অর্থাৎ সালাতের ব্যাপারে কোন মার্জনা নাই। অতঃপর তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ্
তাহাদিগকে একটি পত্র লিখিয়া দিলেন। উছমান ইব্ন আবিল আস (রা)-কে তাহাদিগের নেতা নিয়োগ করা হইল (আবদুর রউফ দানাপুরী, প্রাগুক্ত)।
ইবন ইসহাক (র) বলেন, ছাকীফ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করিবার পর রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদেরকে একটি অঙ্গীকারনামা লিখিয়া দিয়াছিলেন। তাহাদিগের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও উছমান ইব্ন আবিল 'আস (রা)-কে তাঁহাদের 'আমীর' নিযুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা)-তাঁহার ব্যাপারে সুপারিশ করিয়াছিলেন যে, ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও আল-কুরআন শিক্ষা করিতে তিনি অতি উৎসাহী ছিলেন।
তাঁহার সূত্রে হাদীছে বর্ণিত আছে:
عن عثمان بن ابي العاص قال كان من اخرما عهد الى رسول الله ﷺ حين بعثني الى ثقيف قال يا عثمان تجوز في الصلاة واقدر الناس باضعفهم فان فيهم الكبير والصغير والضعيف وذا الحاجة. "উছমান ইব্ন আবিল 'আস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন আমাকে ছাকীফ গোত্রে প্রেরণ করেন তখন তিনি বলেন, হে 'উছমান! সালাত সংক্ষেপ কর এবং মানুষের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখিও। কারণ তাহাদের মধ্যে বয়ো-বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, দুর্বল ও কাজে ব্যস্ত লোক রহিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-হিনায়া, প্রাগুক্ত)।
عن عثمان بن أبي العاص قال قلت يا رسول الله اجعلنی امام قومی قال انت امامهم فاقتد باضعفهم واتخذ مؤذنا لا يأخذ على اذانه اجرا (رواه ابو داود ). "উছমান ইব্ন আবিল আস (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্ রাসূল। আমাকে আমার সম্প্রদায়ের ইমাম নিয়োগ করুন। তিনি বলিলেন, তুমি তোমার সম্প্রদায়ের ইমাম। অতএব তুমি দুর্বলদের প্রতি লক্ষ্য রাখিও এবং এক ব্যক্তিকে মুয়াযয্যিন নিয়োগ করিও যে আযানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করিবে না” (আবূ দাউদ, সালাত অধ্যায়, আযানের বিনিময় গ্রহণ করা অনুচ্ছেদ ১খ., পৃ. ৭৯)।
ইবন ইসহাক তদীয় সূত্রে ছাকীফ গোত্রের কোন এক লোক হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা ইসলাম গ্রহণ করিবার পর রাসূলুল্লাহ্ -এর সহিত রামাযানের অবশিষ্ট দিনগুলিতে সাওম পালন করিতাম। বিলাল (রা)-আমাদিগকে সান্ত্রী ও ইফতারী সরবরাহ করিতেন। তিনি যখন সাহরী লইয়া আসিতেন তখন আমরা বলিতাম, আমরা তো ফজর উদিত হইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে করিতেছি। তখন তিনি বলিতেন, সাহরীর সময় অনেক অনেক দীর্ঘায়িত কারণে রাসূলুল্লাহ্ -কে আমি সাহরী খাওয়া অবস্থায় রাখিয়া আসিয়াছি। আবার তিনি যখন ইফতারী লইয়া আসিতেন তখন আমরা বলিতাম, আমরা তো দেখিতেছি সূর্য পরিপূর্ণভাবে অস্তমিত হয় নাই। তখন তিনি বলিতেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর ইফতার করিবার পরই আমি তোমাদিগের নিকট আগমন করিয়াছি। এই কথা শুনিবার পরই তিনি ইফতার করিতেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ২৫)।
ছাকীফ গোত্রের আগত লোকদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ প্রতি রাত্রেই ওয়ায নসীহত করিতেন। বর্ণিত আছে:
عن اوس بن حذيفة قال قدمنا على رسول الله ﷺ في وفد ثقيف قال فنزلت الاحلاف على المغيرة بن شعبة وانزل رسول الله ﷺ بني مالك في قبة له كل ليلة يأتينا بعد العشاء يحدثنا قائما على رجليه حتى يراوح بين رجليه من طول القيام فاكثر ما يحدثنا ما لقى من قومه من قريش ثم يقول لا اسى وكنا مستضعفين مستذلين بمكة فلما خرجنا الى المدينة كانت سجال الحرب بيننا وبينهم ندال عليهم ويدالون علينا فلما كانت ليلة ابطأ عنا الوقت الذي كان يأتينا فيه فقلنا لقد ابطأت علينا الليلة فقال انه طرئ على جزئى من القرآن فكرهت ان اجيئ حتى اتمه قال اوس سألت اصحاب رسول الله ﷺ كيف يجزؤن القرآن فقالوا ثلاث وخمس وسبع وتسع واحدى عشرة وثلاث عشرة. “আওস ইবন হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ছাকীফ প্রতিনিধি হিসাবে আগমন করিলাম। মিত্র গোত্রের লোকেরা আল-মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা)-এর বাড়িতে অবস্থান গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বানু মালিকের মহল্লায় আমাদের নিকট প্রতি রাত্রে এশার সালাতের পর আগমন করিয়া দণ্ডায়মান অবস্থায় আমাদের সহিত আলোচনা করিতেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকার ফলে তাঁহার পদদ্বয় ফুলিয়া যাইত। তাঁহার আলোচনার বেশীরভাগ ছিল কুরায়শগণ কর্তৃক তাহার নিগৃহীত হওয়া সম্পর্কে। তিনি বলিতেন, আমি কোন উষ্মা প্রকাশ করিতেছি না, তবে আমরা মক্কায় ছিলাম দুর্বল নিপীড়িত। আমরা মদীনায় আসিবার পর যুদ্ধে কখন আমরা জয়লাভ করিতাম এবং কখনও তাহারা বিজয়ী হইত। এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ্ নির্ধারিত সময়ে আমাদের নিকট আসিতে বিলম্ব করিলেন। আমরা তাঁহাকে বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি উত্তর দিলেন, আল-কুরআনের যতটুকু অংশ আমি নিয়মিত পড়িতাম তাহা ছুটিয়া যাওয়ায় তাহা পূর্ণ করিবার পূর্বে আসিতে আমার ইচ্ছা ছিল না বিধায় এই বিলম্ব। আওস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবীগণকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহারা আল-কুরআনকে কত অংশ ভাগ করিয়া তিলাওয়াত করিতেন। তাঁহারা উত্তর দিলেন, তিন, পাঁচ সাত, নয়, এগার ও তের অংশে ভাগ করিয়া কুরআন খতম করিতেন” (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবন মাজার বরাতে, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
ছাকীফ গোত্রের লোকেরা সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করিবার পর স্বীয় শহরের দিকে রওয়ানা করে। এদিকে রাসূলুল্লাহ্ আবূ সুফয়ান ইবন হারব ও আল-মুগীরা ইন্ন শু'বা (রা)-কে সামনে অগ্রসর হইবার অনুরোধ জানাইলে তিনি তাহা প্রত্যখ্যান করিয়া বলিলেন, বরং আপনিই আপনার স্বজাতির প্রতি অগ্রসর হউন। মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) কুঠার দ্বারা প্রতিমার উপর চড়াও হইলে তাঁহার স্বজাতীয় বানু মু'তাব গোত্রের লোকেরা তাঁহার আশে-পাশে পাহারা বসাইয়াছিল যাহাতে
'উরওয়া ইবন মাস'উদ (রা)-এর মতে তাহার ভাগ্যবরণ করিতে না হয়। প্রতিমা ভাঙ্গিয়া ফেলার করুণ দৃশ্য দেখিবার উদ্দেশ্যে স্বগোত্রীয় মহিলারা বাহিরে চলিয়া আসে এবং নিজেদের পুরুষগণ- কে কাপুরুষ বলিয়া তিরস্কারমূলক কবিতা আবৃত্তি করিতে থাকে। প্রতিমাটি অপসারণ করিয়া আল-মুগীরা (রা) উহার গায়ে জড়ানো সকল অলংকার লইয়া আসেন। উহা আবু সুফয়ান (রা)-এর নিকট হস্তান্তর করিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ্ উরওয়া ইবন মাস'উদ ও আল-আসওয়াদ ইবন মাস'উদ-এর ঋণ পরিশোধার্থে এই সম্পদরাজি লইয়া আসার নির্দেশ দিয়াছেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
মূসা ইবন 'উকবার রিওয়ায়তে রহিয়াছে যে, বানু ছাকীফ গোত্রের কিনানা ইবন আবদ ইয়ালীল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট যিনা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন। তিনি উত্তরে বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা তাহা হারাম করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়ারেছ : لَا تَقْرَبُوا الزِّنَا "যিনার নিকটবর্তী হইও না"। সূদ খাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا "তোমরা সূদ খাইও না”। শরাব পানের অনুমতি চাহিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা শয়তানী কাজ। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ এَِح "শরাব পান করা ও জুয়া খেলা........ অপবিত্র কাজ"। উহা শ্রবণ করিয়া তাহারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিবার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করিল। কিন্তু তাহাদের প্রতিমাসমূহ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্-এর অভিমত চাহিলে তিনি সব কয়টি ভাঙ্গিয়া ফেলিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তাহারা বলিয়া উঠিল, এই প্রতিমাসমূহ যদি জানিতে পারে যে, আমরা তাহাদিগকে ভাঙ্গিয়া ফেলিব তাহা হইলে উহারা আমাদিগকে উল্টা হত্যা করিয়া ফেলিবে। উহাতে 'উমার (রা) বলিয়া উঠিলেন, ওহে আবদে ইয়ালীল পুত্র! কিসের প্রলাপ বকিতেছ? এইগুলিতো অনুভূতিহীন জড় পদার্থ। 'উমার (রা)-এর কথায় তাঁহারা বিরক্তি প্রকাশ করিল। অবশেষে তাঁহারা স্বহস্তে প্রতিমাসমূহ না ভাঙ্গিবার অনুরোধ জানাইলে রাসূলুল্লাহ্ তাহা মানিয়া লইলেন। অন্যদের দ্বারা উহা ভাঙ্গিয়া ফেলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইল। অতঃপর তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলেন (দানাপুরী, প্রাগুক্ত)।
📄 নাজরানের হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচার
দশম হিজরীর রবিউল আখির কাহারও কাহারও মতে রবিউল আউয়াল অথবা জুমাদাল উলা মাস। রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে নাজরানস্থিত হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত চার শত লোকের একটি বাহিনীও প্রেরণ করেন (তাবারী, আত-তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ৩খ., পৃ. ১২৬)। রওয়ানা হইবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে অসিয়্যত করেন যে, উহাদিগের সহিত প্রথমেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে না। সর্বপ্রথম তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিবে। তাহা যেন সংখ্যায় তিন বারের কম না হয়। যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে সম্মত হয় তাহা হইলে তো ভালই, অন্যথায় তাহাদের সহিত তুমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে। খালিদ (রা) সেখানে পৌঁছিয়া সর্বত্র অশ্বারোহী লোক পাঠাইয়া ইসলামের দাওয়াত ব্যাপকভাবে প্রচার করিলেন। তাহাদিগের ইসলামের দাওয়াত দান ছিল এইরূপ:
📄 নাজরানের খৃস্টানদেরকে ইসলামের দাওয়াত
ايها الناس اسلموا تسلموا
"ওহে লোকসকল! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপদ হইয়া যাইবে।"
তাহারা স্বতঃসিদ্ধভাবে ইসলাম গ্রহণ করিল। দাওয়াত দানকারিগণের সম্মান করিল। অতঃপর খালিদ (রা) তাহাদের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ কারিয়া কুরআন ও সুন্নাহ্ শিক্ষা দানে ব্রতী হইলেন। কিছু দিন অবস্থান গ্রহণ করিবার পর তিনি রাসূলুল্লাহ্ -এর বরাবরে পত্র লিখিলেন:
بسم الله الرحمن الرحيم لمحمد النبى رسول الله من خالد بن الوليد السلام عليك يا رسول الله ﷺ ورحمة الله وبركاته فاني احمد إليك الذي لا اله الا هو اما بعد يا رسول الله ﷺ فانك بعثتني الى بني الحارث بن كعب وامرتني اذا اتيتهم ان لا اقاتلهم وان ادعوهم الى الاسلام فان اسلموا قبلت منهم وعلمتهم معالم الاسلام وكتاب الله وسنة نبيه ﷺ وان لم يسلموا قاتلتهم وانى قدمت فدعوتهم الى الاسلام ثلثة ايام "দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ কর্তৃক মুহাম্মাদ আল্লাহর নবী ও রাসূলের প্রতি। হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ্র রহমত, বরকত ও শান্তি আপনার উপর বর্ষিত হউক। আমি আপনার সামনে প্রশংসা করিতেছি আল্লাহর যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন আল-হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্রের প্রতি। আমাকে আদেশ করিয়াছেন, যখন আমি তাহাদের মধ্যে পৌঁছিব তখন তাহাদের সহিত কোন যুদ্ধে লিপ্ত হইব না। আমি তাহাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাইব। তাহারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাহা গ্রহণ করিব। তাহাদিগকে ইসলামের নীতিমালা আল্লাহর কুরআন ও তাঁহার নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দিব। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইলে তাহাদের সহিত জিহাদ করিব। আমি তাহাদের নিকট আগমন করিয়াছি, তাহাদেরকে তিন দিন ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিয়াছি ........."।
খালিদ (রা)-এর এই পত্র রাসূলুল্লাহ্-এর হস্তগত হইবার পর তিনি তদুত্তরে নিম্নোক্ত পত্র লিখিলেন-
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد النبى رسول الله الى خالد بن الوليد سلام عليك فانی احمد اليك الله الذى لا اله الا هو اما بعد فان كتابك جاءني مع رسولك يخبر أن بني الحارث بن كعب قد اسلموا قبل ان تقاتلهم واجابوا الى ما دعوتهم اليه من الاسلام وشهدوا ان لا اله الا الله وان محمدا عبده ورسوله وان قد هداهم الله بهداه فبشرهم وانذرهم واقبل وليقبل معك وفدهم والسلام عليك ورحمة الله وبركاته.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। মুহাম্মদ আল্লাহ্ নবী ও রাসূলের পক্ষ হইতে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ-এর প্রতি। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমি তোমার নিকট আল্লাহ্ প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর দূত মারফত তোমার পত্র আমার হস্তগত হইয়াছে। উহাতে সংবাদ রহিয়াছে যে, আল-হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে কোন ধরনের যুদ্ধ করা ব্যতিরেকে। তুমি তাহাদেরকে যেই ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলে তাহারা উহা গ্রহণ করিয়াছে। তাহারা সাক্ষী দান করিয়াছে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই; মুহাম্মাদ আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁহার রাসূল। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার রহমতের দ্বারা তাঁহাদেরকে হিদায়াত করিয়াছেন। তুমি উহাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর, ভীতি প্রদর্শন কর। তুমি চলিয়া আস এবং তোমার সহিত উহাদের প্রতিনিধি দল লইয়া আস। আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭৬)।
খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-এর সহিত এই গোত্রের যেই প্রতিনিধি দল আগমন করিয়াছিল তাঁহারা হইল কায়স ইন্ন হুসায়ন যুলগুস্সা, ইয়াযীদ ইব্ন আবদুল মাদান, ইয়াযীদ ইবনুল মাজমাল, আবদুল্লাহ্ ইব্ন কারাদ ও শাদ্দাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমরা জাহিলিয়্যা যুগে কিসের দ্বারা শত্রুদের উপর বিজয়ী হইতে? তাঁহারা প্রথমে বলিয়াছিল, আমরা কাহারাও উপর বিজয়ী হইতাম না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ আবার বলিলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই তোমরা অন্যদের উপর বিজয়ী হইতে। তাহারা তখন উত্তরে বলিল, আমরা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ থাকিতাম, ঝগড়া-বিবাদে লপ্ত হইতাম না, আমরা কাহারও উপর অত্যাচার করিতাম না। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের উত্তর শুনিয়া বলিলেন, তোমরা সত্যই বলিতেছ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ কায়স ইন্ন হুসায়ন (হুসাইন)-কে তাহাদিগের শাসক নিযুক্ত করিলেন। তাঁহারা শাওয়াল মাস কিংবা যিলকা'দা মাসে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। উহার চারমাস পর রাসূলুল্লাহ্-এর ইনতিকাল হইয়া যায় (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬৮)।
প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হইবার পর তিনি তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, উহাদিগকে 'আল-হিন্দ' (ভারতবর্ষের) মানুষের মত দেখা যাইতেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যদি খালিদ এই মর্মে পত্র না লিখিত যে, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ, তোমরা যুদ্ধে উদ্যত হও নাই তাহা হইলে, আমি তোমাদের মাথা স্ব স্ব পদতলে ফেলিয়া দিতাম। তখন ইয়াযীদ ইব্ন আবদুল মাদান বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমরা আপনার হাম্দ (প্রশংসা) করিতেছিনা, খালিদেরও নয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা হইলে তোমরা কাহার হাম্দ করিবে? তাঁহারা উত্তর দিল, যেই আল্লাহ্ আপনার বদৌলতে আমাদিগকে হিদায়াত করিয়াছেন, আমরা তাঁহারই প্রশংসা করি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তোমরা সত্যই বলিয়াছ (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
মক্কা নগরী হইতে সাত মনযিল দূরে ইয়ামানের দিকে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ এলাকার নাম হইল নাজরান। আরবীয় খৃস্টানগণ সেখানে বসবাস বরিত এবং এখানে তাহাদের একটি বিরাট গির্জাও ছিল। গির্জাটিকে তাহারা মুসলামানদের কা'বা-প্রীতির মত সম্মান করিত। আরবের
📄 বানু আসাদ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
বুকে উহার সমপর্যায়ের খৃস্টানগণের অন্য কোন উপাসনালয় ছিলনা। এইখানে অনেক প্রসিদ্ধ ধর্মীয় যাজক বসবাস করিত। ইহাদের উপাধি ছিল সায়্যিদ ও আকিব (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, বঙ্গানুবাদ মুহিউদ্দিন খান, পৃ. ৪২৮)। সত্তর জনের একটি দল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল। উহাদের নেতা ছিল আল-কিনদা গোত্রীয় 'আবদুল মাসীহ্, ধর্মীয় যাজক ছিল বাক্র ইব্ন ওয়াইল গোত্রের আবূ হারিছা এবং সরদার আল-আয়হাম। খৃস্টান এই প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাহাদের ধর্মের যথার্থতা সম্পর্কে ঝগড়ায় লিপ্ত হইল। তখনই সূরা আল-ইমরানের প্রথম দিকের কতিপয় আয়াত ও 'মুবাহালা'র বিধান অবতীর্ণ হয়। কিন্তু তাহারা মুবাহালায় অংশগ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সন্ধিতে উপনীত হয়। সন্ধি অনুযায়ী তাহারা তাহাদের জন্য একজন শাসক প্রেরণের আবেদন জানাইলে রাসূলুল্লাহ্ আবু 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে নাজরানের শাসক নিয়োগ করেন। অতঃপর তাহাদের 'আকিব' ও 'সায়্যিদ' রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করে (ইব্ন খালদুন, কিতাবুল ইবার ওয়াদ-দীওয়ান, তারীখে ইব্ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫৭)।
কুরয ইব্ন আলকামা সূত্রে ইবন ইসহাক বলেন, নাজরানের এই খৃস্টান প্রতিনিধি দলে ষাট জন অশ্বারোহী ছিল। উহাদের মধ্যে চব্বিশ জন ছিল উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিবর্গ। তিন ব্যক্তি ছিল এমন স্তরের লোক, যাহাদের কর্তৃত্বাধীন ছিল গোটা সম্প্রদায়ের দায়ভার। উহাদের পরিভাষায় 'আকিব' বলা হইত যাহার হাতে পুরা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বদানের কর্তৃত্ব থাকিত। তাহার নির্দেশ ও পরামর্শ ব্যতিরেকে নাজরানবাসী কোন কাজ করিত না। তাহাদের এই শাসকের নাম ছিল আবদুল মাসীহ। দলকে সুশৃংখলভাবে পরিচালনা করা ও বাহনের ব্যবস্থাপনা যাহার হাতে ন্যস্ত থাকিত তাহাকে উহাদের পরিভাষায় সায়্যিদ বলা হইত। এই দায়িত্বে তখন নিয়োজিত ছিল 'আয়হাম'। তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন আবূ হারিছা ইব্ন আলকামা। তিনি ছিলেন তাহাদের ধর্মীয় যাজক এবং খৃষ্ট ধর্মের সর্বোচ্চ পণ্ডিত। আবূ হারিছা বাক্স ইব্ন ওয়াইল গোত্রের লোক ছিল। কিন্তু সে বসবাস করিত খৃষ্টানদের সহিত। বাইবেলের উপর ছিল তাহার অগাধ পাণ্ডিত্য। তদানিন্তন খৃস্টান রোম শাহী তাহার ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও গবেষণার কথা অবহিত হইয়া তাহাকে খুবই সমাদর করিয়াছিল এবং তাহাকে একটি গির্জা নির্মাণ করিয়া দিয়াছিল। এই প্রতিনিধিদল মদীনার দিকে রওয়ানা করিলে পথিমধ্যে আবু হারিছা তাহার ভাই কুরয ইব্ন আলকামাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিল, আল্লাহ্ কসম, তিনিই সেই উম্মী নবী যাঁহার প্রতীক্ষায় আমরা ছিলাম। কিন্তু এই কথা প্রকাশ করিয়া দিলে সকল মানুষ আমাদের বিরোধী হইয়া যাইবে। কুরয ইব্ন আলকামা তাহার এই কথা মনে রাখিয়াছিলেন। ফলে মদীনায় পৌঁছিয়া তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া ফেলেন (আবদুর রউফ, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪২৪)। এই সম্পর্কে হাদীছে ইরশাদ হইয়াছে:
عن حذيفة قال جاء العاقب والسيد صاحبا نجران الى رسول الله لا يريدان ان يلاعناه قال فقال احدهما لصاحبه لا تفعل فوالله لئن كان نبيا فلاعنا لا نفلح نحن ولا عقبنا من بعدنا قالا انا نعطيك ما سألتنا وابعث معنا رجلا امينا ولا تبعث معنا الا امينا فقال لا بعثن معكم رجلا امينا حق امين حق امين
"হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজরান অঞ্চলের দুই দলপতি আকিব ও সায়্যিদ রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহার সহিত মুবাহালায় লিপ্ত হইতে ইচ্ছা করিল। তখন তাহাদের একজন তাহার সঙ্গীকে বলিল, তাহা করিও না। যদি তিনি সত্যই নবী হইয়া থাকেন আর আমরা তাঁহার সহিত মুবাহালায় লিপ্ত হই তাহা হইলে আমরা কৃতকার্য হইতে পারিব না এবং আমাদের পশ্চাতের লোকেরাও নয়। অতঃপর তাহারা বলিল, আপনি যাহা চাহিবেন তাহা আমরা দান করিব। আমাদের সহিত একজন বিশ্বস্ত লোক প্রেরণ করুন, বিশ্বস্ত ব্যতীত কাহাকেও প্রেরণ করিবেন না। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট যথার্থ এবং খুবই বিশ্বস্ত এক লোককে পাঠাইব। বিশ্বস্ততার এই মানদণ্ড কাহার ভাগ্যে জুটিবে উহার প্রত্যাশায় ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবীগণ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ আহ্বান করিলেন আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে। তিনি যখন দাঁড়াইলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সে হইল এই উম্মতের বিশ্বস্ত লোক” (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, নাজরানবাসীর ঘটনা অনুচ্ছেদ, ২খ., পৃ. ৬২৯)।
নাজরানবাসীর প্রতি রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত যেই পত্র পাঠাইয়াছিলেন তাহা ছিল নিম্নরূপঃ
باسم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب من محمد النبى رسول الله الى اسقف نجران اسلم انتم فانى احمد اليكم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب اما بعد فاني ادعوكم الى عبادة الله من عبادة العباد وادعوكم الى ولاية الله من ولاية العباد فان ابيتم فالجزية فان ابيتم اذنتكم بحرب والسلام.
"ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর ইলাহের নামে মুহাম্মাদ আল্লাহ্ নবী ও রাসূলের পক্ষ হইতে নাজরানের ধর্মযাজকের প্রতি। আমি তোমাদের নিকট ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর ইলাহের প্রশংসা করিয়া বলিতেছি, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। অতঃপর আমি তোমাদেরকে দাওয়াত প্রদান করিতেছি মানুষের উপাসনা বর্জন করিয়া আল্লাহ্র উপাসনায় ফিরিয়া আসিবার এবং মানুষের অধীনতা পরিহার করিয়া আল্লাহ্র অধীনতা গ্রহণ করিবার জন্য। এই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তোমাদেরকে কর প্রদান করিতে হইবে। করদানে অস্বীকৃতি জানাইলে তোমাদেরকে যুদ্ধের মুখামুখি হইবার কথা জানাইয়া দিতেছি। ওয়াসসালাম।"
এই পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (স) লিখিয়া দিলেন তাঁহার উপর সূরা আন-নামলের বিসমিল্লাহ্ সম্বলিত ৩০ নম্বর আয়াতটি নাযিল হইবার পূর্বে। যাহার ফলে باسم اله ابراهيم الخ বলিয়া শুরু করা হইয়াছিল (আল-বায়হাকী, বরাত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৪২)।
পত্রটি যাজকের হস্তগত হইবার পর সে দারুণভাবে আলোড়িত হইল, শুরাহবীল ইব্ন ওয়াদা'আকে ডাকিয়া পাঠাইল এবং চিঠিটির বিষয়বস্তু অবহিত হইয়া মন্তব্য করিতে নির্দেশ দিল।
সে অভিমত ব্যক্ত করিল যে, আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশধর হইতে যেই নবী প্রেরণ করিবার ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, তিনিই সেই নবী। নুবুওয়াতের ব্যাপারে আমার অন্য কোন অভিমত নাই। উহাতে যাজকটি বিরক্ত হইয়া তাহাকে সেখান হইতে তাড়াইয়া দিল। অতঃপর হিময়ার গেত্রের 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন শুরাহবীলকে ডাকিয়া পাঠাইল। তাহাকে চিঠিটি পড়িয়া অভিমত ব্যক্ত করিতে নির্দেশ দিল। সেও প্রথমোক্ত ব্যক্তির ন্যায় অভিমত ব্যক্ত করিলে তাহাকেও সরিয়া যাইতে নির্দেশ দিল। সর্বশেষ বানুল হারিছ গোত্রের জিবাল ইব্ন ফায়দের নিকট পত্রটি পড়িয়া মন্তব্য করিতে নির্দেশ দিল। সেও পূর্বোক্ত দুই জনের ন্যায় অভিমত ব্যক্ত করিল। তিন জনই যখন অভিন্ন মতামত ব্যক্ত করিল তখন সে সারাদেশের নেতৃস্থানীয় লোকদের সভা আহ্বান করিল। সকলেরই ঐক্যবদ্ধ অভিমত হইল যে, পূর্বোল্লেখিত তিন জনকেই রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট তাঁহার অবস্থা অবগত হওয়ার জন্য প্রেরণ করার ব্যবস্থা করা হউক। তাহারা মদীনায় উপনীত হইয়া ভ্রমণের লেবাস পোশাক পরিবর্তন করিল এবং অহংকারবশত যাজকদের পোশাক ও স্বর্ণের আংটি পরিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইল। অতঃপর তাঁহাকে সালাম দিলে রাসূলুল্লাহ্ সালামের উত্তর প্রদান করেন নাই, তাহাদের কোন কথার উত্তরও দেন নাই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমান রহিবার পর তাহারা উপায়ন্তর না দেখিয়া তাহাদের পূর্বপরিচিত উছমান ইব্ন 'আফফান ও আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (রা)-কে অনুসন্ধান করিতে লাগিল। অতঃপর তাঁহাদের সহিত সাক্ষাত করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিতি ও তাহাদের সালাম ও কালামের উত্তর না দিবার বিষয়টি অবহিত করিল। এই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন আলী ইব্ন আবী তালিব (রা), উছমান ও আবদুর রহমান (রা)। এই বিষয়ে তাঁহার নিকট পরামর্শ চাহিলে তিনি বলিলেন, আমার মনে হয় উহারা তাহাদের এই পোশাক পরিবর্তন করিয়া সফরের বস্ত্র পরিধান করিয়া উপস্থিত হইবে। তাহারা তাহাই করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সালাম দিলে তিনি উত্তর প্রদান করিলেন। অতঃপর বিভিন্ন বিষয়ে তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট অবহিত হইতে চাহিল। এক পর্যায়ে তাহারা বলিল, আমরা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী আমরা আমাদের নবী ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনার অভিমত জানিতে চাহি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আজ আমি তাঁহার সম্পর্কে কিছুই বলিতে পারিবনা। তোমরা অপেক্ষা কর, আল্লাহ্ তা'আলা এই সম্পর্কে আমার উপর যাহা অবতীর্ণ করিবেন তাহা আমি তোমাদিগকে বলিব। পরবর্তী দিন তাহারা আবার উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে।
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُنْ مِّنَ الْمُمْتَرِيْنَ. فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ.
"আল্লাহ্র নিকট নিশ্চয়ই ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, হও, ফলে সে হইয়া গেল। এই সত্য তোমার
প্রতিপালকের নিকট হইতে। সুতরাং তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হইও না। তোমার নিকট জ্ঞান আসিবার পর যে কেহ এই বিষয়ে তোমার সহিত তর্ক করে তাহাকে বল, আইস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারিগণকে এবং তোমাদের নারিগণকে, আমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের নিজদিগকে, অতঃপর আমরা আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দেই আল্লাহর লা'নত" (৩:৫৯-৬১)।
এই আয়াতের বিষয়বস্তুকে নাজরানের এই খৃস্টানগণ মানিয়া লইতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। ফলে পরবর্তী দিন ভোরে রাসূলুল্লাহ্ হযরত হাসান (রা), হুসায়ন (রা) ও তাঁহাদিগের পশ্চাতে হযরত ফাতিমা (রা)-কে লইয়া মুবাহালায় উত্তীর্ণ হইবার জন্য বাহির হইলেন। সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্-এর কোন কোন স্ত্রীও ছিলেন। অবস্থা দৃশ্যে শুরাহবীল বলিয়া উঠিল, বিষয়টি খুবই ঘোরতর। যদি এই লোক নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে মুবাহালা করিবার সঙ্গে সঙ্গে ভুমণ্ডলে আমাদের একটি নখ, এমন কি একটি চুলও অবশিষ্ট থাকিবেনা। তখন তাহার দুই সঙ্গী বলিয়া উঠিল, এখন আমাদের করার কী আছে? শুরাহবীল বলিল, আমার অভিমত হইল, তাঁহাকে আমরা কর্তা হিসাবে মানিয়া লইব। তিনি যাহা বলিবেন, দ্বিধাহীন চিত্তে উহা গ্রহণ করিব। তিনি কখনও অন্যায় আদেশ দিবেন না। তাহার সঙ্গীদ্বয় এই অভিমত মানিয়া লইল। তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে মুবাহালা পরিত্যাগের নিবেদন করিয়া একদিন একরাত্র সময় প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ্ উহা অনুমোদন করিলেন। পরবর্তী দিবস সকাল বেলা তিনি তাহাদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত চুক্তিনামা লিখিয়া দিলেন।
بسم الله الرحمن الرحيم هذا ماكتب محمد النبى الامى رسول الله لنجران ان كان عليهم حكمه في كل صفراء وبيضاء ورقيق فافضل عليهم وترك ذلك كله على الفي حلة في كل رجب الف حلة وفى كل صفر الف حلة وذكر تمام الشرط.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে উম্মী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে এই লিপিকা নাজরানবাসীর প্রতি। তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রাসূল-এর আদেশ ছিল সোনারূপা (নগদ অর্থ) প্রদানের, কিন্তু তিনি তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাদেরকে উহা প্রদান হইতে রেহাই দিলেন এই শর্তে যে, তাহারা প্রতি বৎসর দুই হাজার জোড়া চাদর প্রদান করিবে, এক হাজার রজব মাসে এবং এক হাজার সফর মাসে। লিপিকায় অন্যান্য শর্তও উল্লেখ করিয়া ফরমানটি তাহাদেরকে প্রদান করিলেন" (তাফসীর ইব্ন কাছীর, উর্দু, ১খ., ৩য় পারা, পৃ. ৭৫)।
এই পত্রটি লইয়া নাজরানের উচ্চ পর্যায়ের এই প্রতিনিধি দল স্বদেশে পৌঁছিয়া উহা তাহাদের ধর্মীয় নেতার নিকট হস্তান্তর করিল। সে উহা পাঠ করিয়া আকস্মিক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! তিনি আল্লাহ্র রাসূল। উহা শুনিয়া ধর্মযাজকের মাতৃপক্ষীয় ভাই বিশ্ব ইন্ন মা'রূর মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হইল। সে তখন বহু বাধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও নিবৃত্ত হইল না। সোজা মদীনায় উপনীত হইবার পর তাহার উটটি যাত্রা বিরতি করিল। তাৎক্ষণিক তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কোন এক জিহাদে অংশগ্রহণ করিয়া শাহাদাত লাভের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মদীনাতেই অবস্থান করিতে থাকিলেন (আসাহহু সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩০)।
বানু আসাদ গোত্র ছিল বিভিন্ন রণাঙ্গনে কাফির কুরায়শ গোত্রের দক্ষিণ হস্ত। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা)-এর খিলাফত কালে এ গোত্রেরই লোক তুলায়হা ইব্ন খুওয়ায়লিদ মিথ্যা নবুওয়তের দাবী করিয়াছিল। হিজরী নবম সনে উহারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং এই উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, অনুবাদ মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৪২৯)।
আল-ওয়াকিদীর বিররণ মতে বানু আসাদ গোত্রের দশজন লোক রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগমন করিয়াছিল। এই প্রতিনিধি দলের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা ছিলেন ওয়াবিসা ইব্ন মা'বাদ, তুলায়হা ইব্ন খুওয়ায়লিদ, নাফাদা ইবন 'আবদিল্লাহ্ ইব্ন খালফ ও হাফ্রামী ইব্ন আমির। উহাদের নেতা ছিল হাফ্রামী ইবন 'আমির। তুলায়হা ইন্ন খুওয়ায়লিদ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ৬৮)।
এই গোত্রীয় লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আসে এবং বলে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা মুসলমান হইয়াছি, অন্যান্য আরব জাতিরা আপনার সহিত যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন কোন ধরনের ঝগড়া-বিবাদ ব্যতিরেকে আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহাদের অনুভূতি বড়ই দুর্বল, শয়তান উহাদের কথার উপর কথা বলিতেছে। তখন এই আয়াত নাযিল হয়। يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَى إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَوْكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ.
"উহারা আত্মসমর্পণ করিয়া তোমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করে। বল, তোমাদের আত্মসমর্পণ আমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করিও না; বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করিয়া তোমাদেরকে ধন্য করিয়াছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও” (৪৯: ১৭)।
অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার জ্ঞানের পরিধি যে সুগভীর ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলে সকল সৃষ্টির জ্ঞানই যে তিনি রাখেন সেই কথা অবহিত করেন (মুসনাদে বাযযার, বরাত তাফসীর ইন্ন কাছীর (উর্দু), ৫খ, ২৭ পারা, পৃ. ৯০)।