📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে বানু জাযীমায় প্রেরণ
কোন কোন গ্রন্থে জাযীমার স্থলে জুযায়মা বলা হইয়াছে। কিন্তু ইব্ন হাজার 'আসকালানী পরিষ্কার ভাষায় বলিয়াছেন যে, শব্দটি জুযায়মা নহে, উহার শুদ্ধ রূপ হইল জাযীমা (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৭১)। এই গোত্রের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ হইলেন যথাক্রমে বানু জাযীমা ইবন 'আমির ইন্ন আব্দ মানাত ইন্ন কিনানা। 'আল্লামা কিরমানী অসতর্কতা বশত বলিয়া ফেলিয়াছেন, বানু জাযীমা ইব্ন আওফ ইন্ন বাক্স ইন আওফ যাহা আবদে কায়স্ গোত্রের একটি উপগোত্র। উহারা মক্কার নিম্নাঞ্চলস্থিত ইয়ালামলাম নামক স্থানের অধিবাসী ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে তিন শত পঞ্চাশ জন মুহাজির ও আনসার সাহাবীকে এই জনপদে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন, উহাদিগকে কোন যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করা হয় নাই। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
عن أبي جعفر الباقر قال بعث رسول الله الله خالد بن الوليد حين افتتح مكة الى بني جذيمة داعيا ولم يبعثه مقاتلا. "আবূ জা'ফার আল-বাকির (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে মক্কা বিজয়ের পর বানু জাযীমার নিকট প্রচারক হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন, যোদ্ধা হিসাবে তাহাকে প্রেরণ করেন নাই" (ইবন হাজার আল-আ'সকালানী, প্রাগুক্ত)।
এই দলটিকে মক্কা বিজয়ের পর হুনায়ন অভিযানে বাহির হইবার পূর্বে শাওয়াল মাসে প্রেরণ করা হইয়াছিল। এই ব্যাপারে সকল গাযওয়াবিদ ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন। দা'ওয়াতী কাফিলার অধিপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-এর ইজতিহাদী অসাবধানতার দরুন এই অভিযানে অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট খবরটি পৌঁছার পর তিনি মহান আল্লাহ্র দরবারে উহার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হইয়াছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن سالم بن عبد الله عن ابيه قال بعث النبى ﷺ خالد بن الوليد الى بني جذيمة فدعاهم الى الاسلام فلم يحسنوا ان يقولوا اسلمنا فجعلوا يقولون صبأنا صبأنا فجعل خالد يقتل منهم ويأسر منهم ودفع الى كل رجل منا اسيره حتى اذا كان يوم امر خالد ان يقتل كل رجل منا اسيره فقلت والله لا اقتل اسيرني ولا يقتل رجل من اصحابی اسیره حتى قدمنا على النبي ﷺ فذكرناه فرفع النبي ﷺ يديه فقال اللهم انی ابرأ اليك مما صنع خالد مرتين (رواه البخاري).
“সালিম ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) হইতে তাহার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বানু জাযীমা গোত্রের দিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করেন। কিন্তু তাহারা "اسلمنا" ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি, এই কথাটি সুন্দরভাবে উচ্চারণ করিতে না পারিয়া বলিল, "صبأنا صبأنا" আমরা ধর্মান্তরিত হইয়াছি, ধর্মান্তরিত হইয়াছি"। উহা শুনিয়া খালিদ (রা) তাহাদিগের কতিপয় লোককে হত্যা করিলেন, আবার কতিপয় লোককে বন্দী করিলেন এবং আমাদের প্রত্যেকের নিকট বন্দী হস্তান্তর করিলেন। অতঃপর একদিন খালিদ (রা) আদেশ দিলেন, যাহার নিকট বন্দী রহিয়াছে সে যেন তাহাকে হত্যা করে। আমি আবদুল্লাহ বলিলাম, আল্লাহ্র শপথ! আমার নিকট যেই বন্দী রহিয়াছে, তাহাকে আমি হত্যা করিব না। এমনকি আমার সঙ্গী কোন লোকই তাহার বন্দীকে হত্যা করিবে না, যাবত না আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট ফিরিয়া আসি। আমরা তাঁহার নিকট বিষয়টি ব্যক্ত করিলাম। উহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ ﷺ দুই হাত উত্তোলন করিয়া বলিলেন, 'হে আল্লাহ্! খালিদ যাহা করিয়াছে তাহা হইতে আমি মুক্ত' এইভাবে দুইবার বলিলেন” (বুখারী, ২খ., ৬২২)।
صبأنا শব্দের অর্থ হইল, আমি এক ধর্ম ত্যাগ করিয়া অন্য ধর্ম গ্রহণ করিলাম। তখনকার আরবে ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হইত। ফলে সেখানকার লোকজন এই শব্দটি বলিয়া ইসলাম গ্রহণের কথা বুঝাইয়াছিল। কিন্তু খালিদ (রা)-এর নিকট মুসলিম হওয়া বুঝানোর জন্য এই উক্তিটি যথেষ্ট বলিয়া বিবেচিত হয় নাই বিধায় তিনি তাহাদিগকে হত্যা করেন এবং হত্যা করিবার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন (ইব্ন হাজার আল-আসকালানী, প্রাগুক্ত)।
সীরাতবিদগণের মতে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) এই গোত্রের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমাদের পরিচয় কি? তাঁহারা উত্তরে বলিয়াছিল, আমরা মুসলিম, আমরা সালাত আদায় করি, সাদাকাহ দান করি, আমাদের এখানে মসজিদ রহিয়াছে, সেখানে আযানও হয়। তখন তিনি তাঁহাদিগকে বলিলেন, তোমরা মুসলিম হইলে তোমাদের হাতে অস্ত্র কেন? অস্ত্র লইয়া কি কারণে বাহিরে আসিয়াছ। তাঁহারা উত্তরে বলিলেন, আমাদের ধারণা ছিল হয়তো কোন শত্রুদলের অনুপ্রবেশ ঘটিয়াছে। খালিদ (রা) বলেন, উহাদিগের রণমূর্তি প্রত্যক্ষ করিয়া আমার ধারণা হইয়াছিল, উহারা সম্ভবত শত্রুবাহিনীর লোক হইবে (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৬৯)।
পরবর্তী দিন ভোরে খালিদ (রা) বন্দীদেরকে হত্যা করিবার নির্দেশ প্রদান করেন। বানূ সুলায়ম গোত্রের যেই সকল লোক তাহার সঙ্গে ছিল আদেশ পাওয়া মাত্র তাঁহারা কার্যকর করেন। কিন্তু
মুহাজির ও আনসার সঙ্গীরা কোন বন্দীকে হত্যা করেন নাই বরং তাঁহারা বন্দীদেরকে রাসূলুল্লাহ্ -এর খিদমতে লইয়া আসেন। এই বিষয়টি লইয়া খালিদ (রা) ও আবদুর রহমান ইব্ন 'আউফ (রা)-এর মধ্যে কিছু বাদানুবাদও ঘটিয়া যায়। রাসূলুল্লাহ্ খালিদ (রা)-কে শাসাইয়া বলেন, যদি উহুদ পাহাড়ও তোমার জন্য স্বর্ণে পরিণত হইয়া যায় আর তুমি সম্পূর্ণভাবে তাহা আল্লাহ্র পথে ব্যয় কর, তবুও তুমি আমার কোন সাহাবীর মর্যাদায় পৌঁছিতে সক্ষম হইবেনা। অতঃপর কিছুকাল রাসূলুল্লাহ্ এই ব্যাপারে খালিদ (রা)-এর উপর মনোক্ষুণ্ণ ছিলেন (আবদুর রউফ দানাপূরী, প্রাগুক্ত)।
ইবন হিশাম বলেন, একদল লোক যখন রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট এই সংবাদটি পৌঁছায় তখন রাসূলুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাঁহার এই আদেশ কেহ অমান্য করিয়াছিল কি? উত্তর দেওয়া হইল, হ্যাঁ, গৌরবর্ণের এক লোক ও লম্বা প্রকৃতির এক লোক কঠোরভাবে উহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রথম অমান্যকারী লোকটি ছিল আমার পুত্র আবদুল্লাহ্ ও দ্বিতীয় লোকটি ছিল আবূ হুযায়ফার মুক্ত দাস সালিম (রা) (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫১)।
ইবন কাছীর ইবন ইসহাক সূত্রে বলেন, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের সঙ্গে আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোক ছিল, সুলায়ম ইন্ন মানসুর ও মুদাল্লাজ ইবন মুররাহও ছিল। তাহারা বানু জাযীমায় প্রবেশ করিয়া আতংক সৃষ্টি করে। খালিদ (রা)-কে দেখিবার পর তাহারা অস্ত্র ধারণ করে। তিনি তাহাদিগকে অস্ত্র সংবরণ করিবার নির্দেশ প্রদান করেন। তখন এক লোক বলিয়া উঠিল, হে বানু জাযীমার লোকজন! এই লোক হইল খালিদ। সুতরাং তাঁহার ব্যাপারে সাবধান থাকিও। অস্ত্র সংবরণ করিবার পরই তোমাদেরকে বন্দী করা হইবে। আর বন্দী করিবার পরই তোমাদিগের গর্দান উড়াইয়া দেওয়া হইবে। আল্লাহ্র শপথ! আমি অস্ত্র সংবরণ করিব না। এই লোকটির নাম ছিল জাহদাম )جهدم(। তখন স্বগোত্রীয় কিছু লোক তাহাকে ধরিয়া বলিল, হে জাহদাম! তুমি কি আমাদের রক্ত প্রবাহিত করিতে চাহিতেছ? লোকজন ইসলাম গ্রহণ করিয়া লইয়াছে, অস্ত্র সংবরণ করিয়াছে ও নিরাপদ হইয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহারা তাহাকে অস্ত্রমুক্ত করিয়া লয়। আর সকলেই খালিদ (রা)-এর কথামত অস্ত্র মুক্ত হইয়া যায়। উহার পর খালিদ (রা) তাহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলেন এবং অনেককে হত্যা করিয়া ফেলেন। রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উহার সংবাদ পৌঁছিলে তিনি অত্যাধিক মর্মাহত হন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫০)।
এই মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হইবার পর রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-কে সেখানে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-কে বলেন: يا على اخرج الى هؤلاء القوم فانظر في امرهم واجعل امر الجاهلية تحت قدميك.
"হে আলী! তুমি ঐ গোত্রে গমন কর। উহাদের ব্যাপারটি গভীরভাবে অনুধাবন কর। জাহিলিয়্যা যুগের সকল মন্দ কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা কর।"
'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক প্রদত্ত সম্পদসহ তথায় গমন করেন এবং সকল হত্যার দিয়াত আদায় করেন, ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এমনকি নিহত
📄 ছাকীফ গোত্রে ইসলাম প্রচার
কুকুরেরও বিনিময় শোধ করেন। সকল ধরনের বিনিময় ও ক্ষতিপুরণ দান করিবার পর তাহার হাতে কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থাকিয়া যায়। তিনি উহাও জনপদবাসীর নিকট বিলাইয়া দিয়া বলেন, অজানা কোন কিছু রহিয়া গেলে উহার বিনিময়স্বরূপ এইগুলি প্রদান করা হইল। রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট তিনি প্রত্যাবর্তন করিলে তিনি তাঁহাকে সাধুবাদ জ্ঞাপন করেন (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)।
তাইফ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ যখন মদীনা অভিমুখে রওয়ানা করেন তখন ছাকীফ গোত্রপতি 'উরওয়া ইবন মাস'উদ তাঁহার সহিত পথিমধ্যে সাক্ষাত করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় গোত্রে ইসলাম প্রচার করিবার উদ্দেশ্যে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দান করেন। নিজ গৃহের ছাদের উপর উঠিয়া তিনি ইসলামের দাওয়াত দান করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় কাফির ও মুশরিকরা তাহাকে তীরের আঘাতে হত্যা করে। ইনতিকালের পূর্বে তিনি ওয়াসিয়্যাত করিয়া গিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে যেন মুসলিম শহীদগণের সহিত দাফন করা হয়। তাঁহার শাহাদাত লাভের পর তাঁহার পুত্র আবুল মালীহ্ ও কাবির ইবনুল আসওয়াদ ইবন মাস'উদ ইসলামে দীক্ষিত হন। অতঃপর তাঁহারাও নির্যাতনের শিকার হইয়াছিলেন। উহার পর ছাকীফবাসিগণ অবহিত হইল যে, রাসূলুল্লাহ্ তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আসিতেছেন এবং ইহাও অনুধাবন করিল যে, তাহারা মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীদের প্রতিরোধ করিতে সক্ষম হইবে না। ফলে তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িল। অবশেষে 'আবদ ইয়ালীল ইবন 'আমর ইবন 'উমায়রের শরণাপন্ন হইল। তিনি শর্ত দিলেন যে, মুহাম্মদ -এর নিকট গমন করিতে হইলে তাঁহার সহিত ছাকীফ গোত্রের আরও কিছুলোক পাঠাইতে হইবে। কারণ উরওয়া ইবন মাস'উদ (রা)-এর পরিণতি সম্পর্কে তিনি পূর্বেই অবহিত ছিলেন। অবশেষে একটি প্রতিনিধি দল লইয়া তিনি হিজরী নবম সনের রমাযান মাসে ইসলামের বায়'আত গ্রহণ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হন (আবদুর রহমান আল-খাদরামী, তারীখ ইন্ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫০)।
ইবন ইসহাক বলেন, 'উরওয়া ইবন মাস'উদ (রা) ইসলাম গ্রহণ করিয়া স্বীয় গোত্রের প্রতি যাত্রা করিবার ইচ্ছা পোষণ করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, "উহারা তোমাকে হত্যা করিবে।" তিনি উত্তরে বলিয়াছিলেন, আমি উহাদিগের মধ্যে উহাদের কুমারী কন্যাগণের চেয়েও প্রিয়। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি তাহাদিগের মধ্যে অতি প্রিয় ছিলেন। কিন্তু ইসলামের দা'ওত দানের সংগে সংগে তিনি তাহাদিগের এমন শত্রুতে পরিণত হইয়া গেলেন যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করে। বলা হয় তাহাকে যেই লোকটি হত্যা করিয়াছিল তাহার নাম ছিল ওয়াহ্ব ইবন জাবির। রাসূলুল্লাহ্ 'উরওয়া (রা) সম্পর্কে বলিয়াছিলেন:
ان مثله في قومه كمثل صاحب يس في قومه.
"সে তাহার গোত্রে সেই পরিমাণ সম্মানিত যেই পরিমাণ সূরা ইয়াসীনের সাহিব (হাবীব আন-নাজ্জার) তাহার কওমের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন।"
মূসা ইবন 'উকবার মতে এ ঘটনাটি আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর নেতৃত্ব আদায়কৃত হজ্জের পর সংঘটিত হইয়াছিল। আবূ বাক্স আল-বায়হাকীও এই মত পোষণ করেন। কিন্তু উহা বাস্তব-সম্মত নয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ২৩)।
'উরওয়া ইবন মাসউদ (রা)-এর শাহাদাত লাভের পর বানু ছাকীফ পূর্ণ একমাস পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করা না করার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্ধে ছিল। অবশেষে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে তাহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট প্রেরণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। উহাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবদ ইয়ালীল ইন্ন 'আমর, মিত্র গোত্রের ছিলেন হাকাম ইবন 'আমর, শুরাহবীল ইব্ন গায়লান, বানু মালিক উপগোত্রের ছিলেন উছমান ইব্ন আবিল আস, আউস ইব্ন আউফ ও বাহাখ ইবন খারশাহ (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০৬)।
মূসা ইব্ন উকবার মতে প্রতিনিধি দলের সংখ্যা ছিল ১৩ জনের মত। কিনানা ইব্ন আব্দ ইয়ালীল ছিলেন তাহাদের নেতা। 'উছমান ইব্ন আবিল আস ছিলেন প্রতিনিধিদলেন সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি। ইবন ইসহাক (র) বলেন, প্রতিনিধিদলটি মদীনার উপকণ্ঠে উপনীত হইলে সর্বপ্রথম তাহাদের সহিত সাক্ষাত হয় মুগীরা ইন্ন শু'বা (রা)-এর। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর বাহন সমূহের পরিচর্যায় তাহাদিগের আগমনকে প্রত্যক্ষ করিয়া তিনি খুশিতে আটখানা হইয়া বিষয়টিকে অবহিত করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর প্রতি দ্রুত ধাবিত হইতে লাগিলেন। পথিমধ্যে আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর সহিত তাঁহার সাক্ষাত হয়। তাঁহাকে বিষয়টি অবহিত করিলে তিনি মুগীরা (রা)-কে বাধা দিয়া বলেন, আমিই বিষয়টি সবার আগে রাসূলুল্লাহ্-কে অবহিত করিতে চাই। মুগীরা (রা) তাঁহার কথা মানিয়া লইলে আবূ বাক্স (রা)-ই সবার আগে তাহাদিগের আগমনের বার্তা রাসূলুল্লাহ্ -কে অবহিত করেন (ইন্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)। মুগীরা ইবন শু'বা (রা) বানু ছাকীফ গোত্রেরই লোক ছিলেন। ফলে তিনি তাহাদিগের সহিত মিলিত হইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সাক্ষাত করিবার রীতি-নীতি শিক্ষা দিয়াছিলেন। তবুও তাহারা জাহিলিয়্যা যুগের প্রথা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। তাহাদিগের অবস্থানের নিমিত্ত মসজিদের পাশেই একটি শিবির তৈরি করা হয়। খালিদ ইব্ন সাঈদ ইবনুল আস (রা) তাহাদিগের মধ্যে ও রাসূলুল্লাহ্-এর মধ্যে মত বিনিময়ের কাজে মধ্যস্থতা করিতেন।
তাহাদিগের জন্য যেই খাবার রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে বরাদ্দ করা হইত তাহারা তাহা খালিদের গ্রহণ করিবার পূর্বে গ্রহণ করিত না। ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্ব পর্যন্ত তাহাদের এই মনোভাব স্থির ছিল। ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্বে তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর বরাবরে এই শর্ত পেশ করিয়াছিল যে, তাহাদিগের প্রতিমা 'লাত' তিন বৎসর পর্যন্ত অপসারণ করা হইবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাহা প্রত্যাখ্যান করিলেন। তাহারা অন্তত একটি মাস পর্যন্ত উহা বহাল রাখার অনুরোধ করিল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহাও হইতে পারেনা। তাহারা উহা স্বহস্তে ভাঙ্গিবে না বলিয়া আবদার করিলে রাসূলুল্লাহ্ উহা মানিয়া লইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্আবৃ সুফয়ান ইবন হারব এবং মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা)-কে উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট সালাত আদায় করিতে অপারগতার শর্ত আরোপ করিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, যেই ধর্মে সালাত নাই সেই ধর্মে কোন কল্যাণ নাই। অর্থাৎ সালাতের ব্যাপারে কোন মার্জনা নাই। অতঃপর তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ্
তাহাদিগকে একটি পত্র লিখিয়া দিলেন। উছমান ইব্ন আবিল আস (রা)-কে তাহাদিগের নেতা নিয়োগ করা হইল (আবদুর রউফ দানাপুরী, প্রাগুক্ত)।
ইবন ইসহাক (র) বলেন, ছাকীফ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করিবার পর রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদেরকে একটি অঙ্গীকারনামা লিখিয়া দিয়াছিলেন। তাহাদিগের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও উছমান ইব্ন আবিল 'আস (রা)-কে তাঁহাদের 'আমীর' নিযুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা)-তাঁহার ব্যাপারে সুপারিশ করিয়াছিলেন যে, ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও আল-কুরআন শিক্ষা করিতে তিনি অতি উৎসাহী ছিলেন।
তাঁহার সূত্রে হাদীছে বর্ণিত আছে:
عن عثمان بن ابي العاص قال كان من اخرما عهد الى رسول الله ﷺ حين بعثني الى ثقيف قال يا عثمان تجوز في الصلاة واقدر الناس باضعفهم فان فيهم الكبير والصغير والضعيف وذا الحاجة. "উছমান ইব্ন আবিল 'আস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন আমাকে ছাকীফ গোত্রে প্রেরণ করেন তখন তিনি বলেন, হে 'উছমান! সালাত সংক্ষেপ কর এবং মানুষের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখিও। কারণ তাহাদের মধ্যে বয়ো-বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, দুর্বল ও কাজে ব্যস্ত লোক রহিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-হিনায়া, প্রাগুক্ত)।
عن عثمان بن أبي العاص قال قلت يا رسول الله اجعلنی امام قومی قال انت امامهم فاقتد باضعفهم واتخذ مؤذنا لا يأخذ على اذانه اجرا (رواه ابو داود ). "উছমান ইব্ন আবিল আস (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্ রাসূল। আমাকে আমার সম্প্রদায়ের ইমাম নিয়োগ করুন। তিনি বলিলেন, তুমি তোমার সম্প্রদায়ের ইমাম। অতএব তুমি দুর্বলদের প্রতি লক্ষ্য রাখিও এবং এক ব্যক্তিকে মুয়াযয্যিন নিয়োগ করিও যে আযানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করিবে না” (আবূ দাউদ, সালাত অধ্যায়, আযানের বিনিময় গ্রহণ করা অনুচ্ছেদ ১খ., পৃ. ৭৯)।
ইবন ইসহাক তদীয় সূত্রে ছাকীফ গোত্রের কোন এক লোক হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা ইসলাম গ্রহণ করিবার পর রাসূলুল্লাহ্ -এর সহিত রামাযানের অবশিষ্ট দিনগুলিতে সাওম পালন করিতাম। বিলাল (রা)-আমাদিগকে সান্ত্রী ও ইফতারী সরবরাহ করিতেন। তিনি যখন সাহরী লইয়া আসিতেন তখন আমরা বলিতাম, আমরা তো ফজর উদিত হইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে করিতেছি। তখন তিনি বলিতেন, সাহরীর সময় অনেক অনেক দীর্ঘায়িত কারণে রাসূলুল্লাহ্ -কে আমি সাহরী খাওয়া অবস্থায় রাখিয়া আসিয়াছি। আবার তিনি যখন ইফতারী লইয়া আসিতেন তখন আমরা বলিতাম, আমরা তো দেখিতেছি সূর্য পরিপূর্ণভাবে অস্তমিত হয় নাই। তখন তিনি বলিতেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর ইফতার করিবার পরই আমি তোমাদিগের নিকট আগমন করিয়াছি। এই কথা শুনিবার পরই তিনি ইফতার করিতেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৫খ., পৃ. ২৫)।
ছাকীফ গোত্রের আগত লোকদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ প্রতি রাত্রেই ওয়ায নসীহত করিতেন। বর্ণিত আছে:
عن اوس بن حذيفة قال قدمنا على رسول الله ﷺ في وفد ثقيف قال فنزلت الاحلاف على المغيرة بن شعبة وانزل رسول الله ﷺ بني مالك في قبة له كل ليلة يأتينا بعد العشاء يحدثنا قائما على رجليه حتى يراوح بين رجليه من طول القيام فاكثر ما يحدثنا ما لقى من قومه من قريش ثم يقول لا اسى وكنا مستضعفين مستذلين بمكة فلما خرجنا الى المدينة كانت سجال الحرب بيننا وبينهم ندال عليهم ويدالون علينا فلما كانت ليلة ابطأ عنا الوقت الذي كان يأتينا فيه فقلنا لقد ابطأت علينا الليلة فقال انه طرئ على جزئى من القرآن فكرهت ان اجيئ حتى اتمه قال اوس سألت اصحاب رسول الله ﷺ كيف يجزؤن القرآن فقالوا ثلاث وخمس وسبع وتسع واحدى عشرة وثلاث عشرة. “আওস ইবন হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ছাকীফ প্রতিনিধি হিসাবে আগমন করিলাম। মিত্র গোত্রের লোকেরা আল-মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা)-এর বাড়িতে অবস্থান গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বানু মালিকের মহল্লায় আমাদের নিকট প্রতি রাত্রে এশার সালাতের পর আগমন করিয়া দণ্ডায়মান অবস্থায় আমাদের সহিত আলোচনা করিতেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকার ফলে তাঁহার পদদ্বয় ফুলিয়া যাইত। তাঁহার আলোচনার বেশীরভাগ ছিল কুরায়শগণ কর্তৃক তাহার নিগৃহীত হওয়া সম্পর্কে। তিনি বলিতেন, আমি কোন উষ্মা প্রকাশ করিতেছি না, তবে আমরা মক্কায় ছিলাম দুর্বল নিপীড়িত। আমরা মদীনায় আসিবার পর যুদ্ধে কখন আমরা জয়লাভ করিতাম এবং কখনও তাহারা বিজয়ী হইত। এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ্ নির্ধারিত সময়ে আমাদের নিকট আসিতে বিলম্ব করিলেন। আমরা তাঁহাকে বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি উত্তর দিলেন, আল-কুরআনের যতটুকু অংশ আমি নিয়মিত পড়িতাম তাহা ছুটিয়া যাওয়ায় তাহা পূর্ণ করিবার পূর্বে আসিতে আমার ইচ্ছা ছিল না বিধায় এই বিলম্ব। আওস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবীগণকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহারা আল-কুরআনকে কত অংশ ভাগ করিয়া তিলাওয়াত করিতেন। তাঁহারা উত্তর দিলেন, তিন, পাঁচ সাত, নয়, এগার ও তের অংশে ভাগ করিয়া কুরআন খতম করিতেন” (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবন মাজার বরাতে, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
ছাকীফ গোত্রের লোকেরা সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করিবার পর স্বীয় শহরের দিকে রওয়ানা করে। এদিকে রাসূলুল্লাহ্ আবূ সুফয়ান ইবন হারব ও আল-মুগীরা ইন্ন শু'বা (রা)-কে সামনে অগ্রসর হইবার অনুরোধ জানাইলে তিনি তাহা প্রত্যখ্যান করিয়া বলিলেন, বরং আপনিই আপনার স্বজাতির প্রতি অগ্রসর হউন। মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) কুঠার দ্বারা প্রতিমার উপর চড়াও হইলে তাঁহার স্বজাতীয় বানু মু'তাব গোত্রের লোকেরা তাঁহার আশে-পাশে পাহারা বসাইয়াছিল যাহাতে
'উরওয়া ইবন মাস'উদ (রা)-এর মতে তাহার ভাগ্যবরণ করিতে না হয়। প্রতিমা ভাঙ্গিয়া ফেলার করুণ দৃশ্য দেখিবার উদ্দেশ্যে স্বগোত্রীয় মহিলারা বাহিরে চলিয়া আসে এবং নিজেদের পুরুষগণ- কে কাপুরুষ বলিয়া তিরস্কারমূলক কবিতা আবৃত্তি করিতে থাকে। প্রতিমাটি অপসারণ করিয়া আল-মুগীরা (রা) উহার গায়ে জড়ানো সকল অলংকার লইয়া আসেন। উহা আবু সুফয়ান (রা)-এর নিকট হস্তান্তর করিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ্ উরওয়া ইবন মাস'উদ ও আল-আসওয়াদ ইবন মাস'উদ-এর ঋণ পরিশোধার্থে এই সম্পদরাজি লইয়া আসার নির্দেশ দিয়াছেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
মূসা ইবন 'উকবার রিওয়ায়তে রহিয়াছে যে, বানু ছাকীফ গোত্রের কিনানা ইবন আবদ ইয়ালীল রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট যিনা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন। তিনি উত্তরে বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা তাহা হারাম করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়ারেছ : لَا تَقْرَبُوا الزِّنَا "যিনার নিকটবর্তী হইও না"। সূদ খাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا "তোমরা সূদ খাইও না”। শরাব পানের অনুমতি চাহিলে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, উহা শয়তানী কাজ। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ এَِح "শরাব পান করা ও জুয়া খেলা........ অপবিত্র কাজ"। উহা শ্রবণ করিয়া তাহারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিবার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করিল। কিন্তু তাহাদের প্রতিমাসমূহ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্-এর অভিমত চাহিলে তিনি সব কয়টি ভাঙ্গিয়া ফেলিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তাহারা বলিয়া উঠিল, এই প্রতিমাসমূহ যদি জানিতে পারে যে, আমরা তাহাদিগকে ভাঙ্গিয়া ফেলিব তাহা হইলে উহারা আমাদিগকে উল্টা হত্যা করিয়া ফেলিবে। উহাতে 'উমার (রা) বলিয়া উঠিলেন, ওহে আবদে ইয়ালীল পুত্র! কিসের প্রলাপ বকিতেছ? এইগুলিতো অনুভূতিহীন জড় পদার্থ। 'উমার (রা)-এর কথায় তাঁহারা বিরক্তি প্রকাশ করিল। অবশেষে তাঁহারা স্বহস্তে প্রতিমাসমূহ না ভাঙ্গিবার অনুরোধ জানাইলে রাসূলুল্লাহ্ তাহা মানিয়া লইলেন। অন্যদের দ্বারা উহা ভাঙ্গিয়া ফেলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইল। অতঃপর তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলেন (দানাপুরী, প্রাগুক্ত)।
📄 নাজরানের হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচার
দশম হিজরীর রবিউল আখির কাহারও কাহারও মতে রবিউল আউয়াল অথবা জুমাদাল উলা মাস। রাসূলুল্লাহ্ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে নাজরানস্থিত হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্রে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত চার শত লোকের একটি বাহিনীও প্রেরণ করেন (তাবারী, আত-তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ৩খ., পৃ. ১২৬)। রওয়ানা হইবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে অসিয়্যত করেন যে, উহাদিগের সহিত প্রথমেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে না। সর্বপ্রথম তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিবে। তাহা যেন সংখ্যায় তিন বারের কম না হয়। যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে সম্মত হয় তাহা হইলে তো ভালই, অন্যথায় তাহাদের সহিত তুমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে। খালিদ (রা) সেখানে পৌঁছিয়া সর্বত্র অশ্বারোহী লোক পাঠাইয়া ইসলামের দাওয়াত ব্যাপকভাবে প্রচার করিলেন। তাহাদিগের ইসলামের দাওয়াত দান ছিল এইরূপ:
📄 নাজরানের খৃস্টানদেরকে ইসলামের দাওয়াত
ايها الناس اسلموا تسلموا
"ওহে লোকসকল! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপদ হইয়া যাইবে।"
তাহারা স্বতঃসিদ্ধভাবে ইসলাম গ্রহণ করিল। দাওয়াত দানকারিগণের সম্মান করিল। অতঃপর খালিদ (রা) তাহাদের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ কারিয়া কুরআন ও সুন্নাহ্ শিক্ষা দানে ব্রতী হইলেন। কিছু দিন অবস্থান গ্রহণ করিবার পর তিনি রাসূলুল্লাহ্ -এর বরাবরে পত্র লিখিলেন:
بسم الله الرحمن الرحيم لمحمد النبى رسول الله من خالد بن الوليد السلام عليك يا رسول الله ﷺ ورحمة الله وبركاته فاني احمد إليك الذي لا اله الا هو اما بعد يا رسول الله ﷺ فانك بعثتني الى بني الحارث بن كعب وامرتني اذا اتيتهم ان لا اقاتلهم وان ادعوهم الى الاسلام فان اسلموا قبلت منهم وعلمتهم معالم الاسلام وكتاب الله وسنة نبيه ﷺ وان لم يسلموا قاتلتهم وانى قدمت فدعوتهم الى الاسلام ثلثة ايام "দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ কর্তৃক মুহাম্মাদ আল্লাহর নবী ও রাসূলের প্রতি। হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ্র রহমত, বরকত ও শান্তি আপনার উপর বর্ষিত হউক। আমি আপনার সামনে প্রশংসা করিতেছি আল্লাহর যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন আল-হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্রের প্রতি। আমাকে আদেশ করিয়াছেন, যখন আমি তাহাদের মধ্যে পৌঁছিব তখন তাহাদের সহিত কোন যুদ্ধে লিপ্ত হইব না। আমি তাহাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাইব। তাহারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাহা গ্রহণ করিব। তাহাদিগকে ইসলামের নীতিমালা আল্লাহর কুরআন ও তাঁহার নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দিব। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইলে তাহাদের সহিত জিহাদ করিব। আমি তাহাদের নিকট আগমন করিয়াছি, তাহাদেরকে তিন দিন ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিয়াছি ........."।
খালিদ (রা)-এর এই পত্র রাসূলুল্লাহ্-এর হস্তগত হইবার পর তিনি তদুত্তরে নিম্নোক্ত পত্র লিখিলেন-
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد النبى رسول الله الى خالد بن الوليد سلام عليك فانی احمد اليك الله الذى لا اله الا هو اما بعد فان كتابك جاءني مع رسولك يخبر أن بني الحارث بن كعب قد اسلموا قبل ان تقاتلهم واجابوا الى ما دعوتهم اليه من الاسلام وشهدوا ان لا اله الا الله وان محمدا عبده ورسوله وان قد هداهم الله بهداه فبشرهم وانذرهم واقبل وليقبل معك وفدهم والسلام عليك ورحمة الله وبركاته.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। মুহাম্মদ আল্লাহ্ নবী ও রাসূলের পক্ষ হইতে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ-এর প্রতি। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমি তোমার নিকট আল্লাহ্ প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর দূত মারফত তোমার পত্র আমার হস্তগত হইয়াছে। উহাতে সংবাদ রহিয়াছে যে, আল-হারিছ ইব্ন কা'ব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে কোন ধরনের যুদ্ধ করা ব্যতিরেকে। তুমি তাহাদেরকে যেই ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলে তাহারা উহা গ্রহণ করিয়াছে। তাহারা সাক্ষী দান করিয়াছে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই; মুহাম্মাদ আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁহার রাসূল। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার রহমতের দ্বারা তাঁহাদেরকে হিদায়াত করিয়াছেন। তুমি উহাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর, ভীতি প্রদর্শন কর। তুমি চলিয়া আস এবং তোমার সহিত উহাদের প্রতিনিধি দল লইয়া আস। আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭৬)।
খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-এর সহিত এই গোত্রের যেই প্রতিনিধি দল আগমন করিয়াছিল তাঁহারা হইল কায়স ইন্ন হুসায়ন যুলগুস্সা, ইয়াযীদ ইব্ন আবদুল মাদান, ইয়াযীদ ইবনুল মাজমাল, আবদুল্লাহ্ ইব্ন কারাদ ও শাদ্দাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমরা জাহিলিয়্যা যুগে কিসের দ্বারা শত্রুদের উপর বিজয়ী হইতে? তাঁহারা প্রথমে বলিয়াছিল, আমরা কাহারাও উপর বিজয়ী হইতাম না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ আবার বলিলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই তোমরা অন্যদের উপর বিজয়ী হইতে। তাহারা তখন উত্তরে বলিল, আমরা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ থাকিতাম, ঝগড়া-বিবাদে লপ্ত হইতাম না, আমরা কাহারও উপর অত্যাচার করিতাম না। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের উত্তর শুনিয়া বলিলেন, তোমরা সত্যই বলিতেছ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ কায়স ইন্ন হুসায়ন (হুসাইন)-কে তাহাদিগের শাসক নিযুক্ত করিলেন। তাঁহারা শাওয়াল মাস কিংবা যিলকা'দা মাসে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। উহার চারমাস পর রাসূলুল্লাহ্-এর ইনতিকাল হইয়া যায় (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬৮)।
প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হইবার পর তিনি তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, উহাদিগকে 'আল-হিন্দ' (ভারতবর্ষের) মানুষের মত দেখা যাইতেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, যদি খালিদ এই মর্মে পত্র না লিখিত যে, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ, তোমরা যুদ্ধে উদ্যত হও নাই তাহা হইলে, আমি তোমাদের মাথা স্ব স্ব পদতলে ফেলিয়া দিতাম। তখন ইয়াযীদ ইব্ন আবদুল মাদান বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমরা আপনার হাম্দ (প্রশংসা) করিতেছিনা, খালিদেরও নয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তাহা হইলে তোমরা কাহার হাম্দ করিবে? তাঁহারা উত্তর দিল, যেই আল্লাহ্ আপনার বদৌলতে আমাদিগকে হিদায়াত করিয়াছেন, আমরা তাঁহারই প্রশংসা করি। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, তোমরা সত্যই বলিয়াছ (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
মক্কা নগরী হইতে সাত মনযিল দূরে ইয়ামানের দিকে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ এলাকার নাম হইল নাজরান। আরবীয় খৃস্টানগণ সেখানে বসবাস বরিত এবং এখানে তাহাদের একটি বিরাট গির্জাও ছিল। গির্জাটিকে তাহারা মুসলামানদের কা'বা-প্রীতির মত সম্মান করিত। আরবের