📄 উন্নত আখলাক ও সদাচারের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত
তিনি তাঁহার উন্নত আখলাক, উৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণাবলী, দয়া-মায়া-মমতা, আদর্শ আচার-ব্যবহার এবং দূরদর্শী চিন্তা ও পরিকল্পনার দ্বারা এই সুমহান দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিটি কথা, কাজ ও পদক্ষেপে ইহার বাস্তব প্রমাণ রহিয়াছে। তাঁহার উন্নত আখলাক ও অনুপম চরিত্র দেখিয়া অভিভূত হইয়া অসংখ্য কাফের-মুশরিক ও ইয়াহুদী-খৃস্টান ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। ইহা ছিল ইসলামের প্রতি তাঁহার আমলী দাওয়াত। দৃষ্টান্তস্বরূপ মদীনায় তাঁহার উন্নত আখলাকে প্রভাবান্বিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করার কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করা হইল:
📄 ইয়াহুদী আলেম যায়দ ইবন সা'নার ইসলাম গ্রহণ
১. ইয়াহুদী আলেম যায়দ ইবন সা'নার ইসলাম গ্রহণ মদীনায় বসবাসকারী ইয়াহূদীদের শ্রেষ্ঠ আলেম যায়দ ইবন সা'না বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মদীনায় আগমন করিলে তাঁহার চেহারার প্রতি প্রথম দৃষ্টিতেই আমি নবুওয়াতের সকল নিদর্শন দেখিতে পাই। কিন্তু দুইটি বিষয় তখনও আমার অজ্ঞাত ছিল। (এক) "নবীর ধৈর্য তাঁহার মূর্খতার উপর প্রবল হইবে"। (দুই) "তাঁহার সহিত যতই মূর্খতার আচরণ করা হইবে, ততই তাঁহার ধৈর্য বৃদ্ধি পাইবে"।
আমি এই দুইটি নিদর্শনের অপেক্ষায় ছিলাম। একদা দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি মুসলিম এলাকায় সাহায্যের জন্য রাসূলের অর্থের প্রয়োজন হইলে আমি স্বেচ্ছায় তাঁহাকে একটি খেজুরের বাগানের বিপরীতে আশি মিছকাল স্বর্ণমুদ্রা ধার দিলাম। তিনি খেজুর পরিশোধের একটি মেয়াদ নির্ধারণ করিয়া দিলেন। কিছুদিন পর মেয়াদ পূর্তির দুই-তিন দিন পূর্বে একটি জানাযার অনুষ্ঠানে রাসূল (স) হাযির হইলেন। তাঁহার সহিত হযরত আবূ বকর, উমার, উছমান (রা)-সহ আরও অনেক সাহাবী ছিলেন। আমি তখন রাসূলুল্লাহ-এর বুকের জামা ও চাদর ধরিয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাঁহার প্রতি তাকাইলাম এবং বলিলাম, আপনি কি আমার পাওনা পরিশোধ করিবেন না? আল্লাহ্র কসম! তোমরা আবদুল মুত্তালিবের বংশ শুধু টালবাহানাই করিতে শিখিয়াছ। আমার এই ক্রুদ্ধ আচরণ দেখিয়া হযরত উমার ক্ষোভে ফাটিয়া পড়িলেন। বলিলেন, আল্লাহর দুশমন! তুই রাসূলের সাথে কী আচরণ করিতেছিস তাহা আমি দেখিতেছি? আল্লাহর কসম! রাসূলের মজলিসের আদবের কথা চিন্তা না করিলে আমি তোর গর্দান উড়াইয়া দিতাম।
যায়দ ইবন সা'না বলেন, আমি রাসূলের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, আমার এই মূর্খতাপূর্ণ অন্যায় আচরণ সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত শান্ত দৃষ্টিতে আমার প্রতি তাকাইয়া আছেন এবং উমার
(রা)-কে বলিলেন, উমার! তোমার নিকট হইতে ইহা আশা করি নাই। তোমার উচিৎ ছিল, তুমি আমাকে উত্তমরূপে ঋণ পরিশোধের কথা বলিতে। আর তাহাকে সুন্দরভাবে তাকাদা জানাইতে বলিতে। আচ্ছা! তাহাকে লইয়া যাও, তাহার পাওনা দিয়া দাও। যেহেতু তুমি তাহাকে ভয় দেখাইয়াছ সেইজন্য বিশ সা' খেজুর অতিরিক্ত দিবে।
যায়দ ইবন সা'না বলেন, হযরত উমার আমাকে লইয়া গেলেন এবং আমার পাওনার অতিরিক্ত বিশ সা' খেজুর আমাকে বেশী দিলেন। আমি বলিলাম, উমার। তুমি কি আমাকে চিনিতে পারিয়াছ? তিনি বলিলেন, না। আমি বলিলাম, আমি যায়দ ইবন সা'না। তিনি বলিলেন, তবে কি ইয়াহুদীদের সেই বড় আলেম? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, এত বড় আলেম হইয়া রাসূলের সহিত এইরূপ আচরণ করিলেন কেন? আমি বলিলাম, রাসূলকে প্রথম দৃষ্টিতে দেখিয়াই আমি তাঁহার নবৃওয়াতের সকল নিদর্শন বুঝিয়া পাইয়াছি। তবে দুইটি বিষয়ে অবগত হইতে পারি নাই। (এক) নবীর ধৈর্য তাঁহার প্রতি মূর্খতার আচরণের উপর প্রবল হইবে। (দুই) তাঁহার সহিত যতই মুর্খতাপূর্ণ আচরণ করা হইবে ততই তাঁহার ধৈর্য বৃদ্ধি পাইবে। এখন আমি এই দুইটি নিদর্শনের পরীক্ষা লইয়াছি। অতঃপর তিনি রাসূলের খিদমতে উপস্থিত হইলেন এবং বলিয়া উঠিলেন, "আশহাদু আন-লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াশাহাদু আন্না মুহাম্মাদান 'আবদুহু ওয়া রাসূলুহু"। তৎপর তাঁহার প্রাপ্ত মালের অর্ধেক মুসলমানদের কল্যাণে উৎসর্গ করিলেন (সংক্ষেপিত, তাবারানীর বরাতে, হায়াতুস সাহাবা, ১খ., পৃ. ২৩১)।
২. বদরের যুদ্ধে সত্তরজন কুরায়শ বংশীয় লোক মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। মদীনায় পৌছিবার পর রাসূলুল্লাহ আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে বন্দীদেরকে ভাগ করিয়া দিলেন এবং আদেশ করিলেন প্রত্যেক বন্দীকে আপন গৃহে রাখিবে, তাহাদেরকে অতি যত্নের সহিত মেহমানদারী করিবে। তাহাদের সহিত সদাচরণ করিবে। সাহাবা-ই কিরাম রাসূলের আদেশকে যথার্থ বাস্তবায়ন করিলেন। এমনকি তাহারা বন্দীদেরকে রুটি খাওয়াইয়া নিজেরা শুধু খেজুর খাইয়া থাকিলেন। প্রাণের শত্রুর প্রতি রাসূলের এই সদাচরণ বন্দীদেরকে ভীষণ আন্দোলিত করিল। রাসূলুল্লাহ ও মুসলমানদের এই আদর্শে মুগ্ধ হইয়া অনেক বন্দীই ইসলাম গ্রহণ করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৪৭৫)।
৩. ৫ম হিজরীতে বনূ মুস্তালিকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে তাহারা চরমভাবে পরাজিত হয় এবং মুসলমানদের হাতে তাহাদের প্রায় শতাধিক পরিবারের ছয় শত নর-নারী বন্দী হয়। বনূ মুস্তালিক ছিল আরবের সম্ভ্রান্ত বংশ। বন্দীদের মধ্যে বনী মুস্তালিকের সর্দার কন্যা বাররাও ছিলেন। নিয়ম মাফিক বন্দীদেরকে দাস ও দাসীরূপে মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করে হয়। কিন্তু আরবের সম্ভ্রান্ত বংশের সম্ভ্রান্ত নর-নারীদিগকে দাস-দাসীরূপে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ -এর কোমল হৃদয় অত্যন্ত ব্যথিত হইল। তিনি তাহাদের মুক্তির উপায় তালাশ করিতে লাগিলেন। অবশেষে তিনি সর্দার কন্যা বাররাকে স্বাধীন করিয়া আপন স্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করিলেন। যখন এই সংবাদ মদীনায় প্রচারিত হইল যে, রাসূলুল্লাহ বনূ মুস্তালিকের সর্দার হারিছের কন্যা বাররাকে বিবাহ করিয়াছেন, তখন মুজাহিদগণ পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিলেন এখন বনূ মুস্তালিক গোত্র রাসূলুল্লাহ -এর শ্বশুরকুল হইয়াছে। কাজেই তাহারা আমাদের বিশেষ
শ্রদ্ধা ও সম্মানভাজন। তাঁহাদেরকে দাস-দাসীরূপে রাখা আমাদের জন্য কিছুতেই শোভা পায় না। এই আলোচনার পর তাহারা সকলেই বনু মুস্তালিকের সকল নারী-পুরুষকে আযাদ করিয়া দিলেন। মুস্তালিকগণ রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের এইরূপ আশাতীত সদ্ব্যবহার ও বদান্যতা দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন এবং গোটা মুস্তালিক গোত্র ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ২৮৯)।
৪. ষষ্ঠ হিজরীতে বনূ হানীফা গোত্রের সর্দার ছুমামা মুসলমানদের হাতে বন্দী হইয়া মদীনায় নীত হন। তাহাকে মসজিদে নববীর একটি স্তম্ভের সহিত বাঁধিয়া রাখা হইল। আসা- যাওয়ার পথে রাসূলুল্লাহ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতেন, হে ছুমামা! ব্যাপার কি? ছুমামা উত্তর দিতেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে নিহত হওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকেই হত্যা করিবেন। যদি মুক্তি দেন তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই মুক্তি দিবেন এবং যদি অর্থ চান তবে যে পরিমাণ চাহিবেন দেওয়া হইবে।" এইভাবে তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ তাহাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলেন। ছুমামা অবাক হইয়া গেলেন। প্রাণের শত্রুকে হাতে পাইয়াও মানুষ এইভাবে দয়া করিতে পারে? ছুমামা অভিভূত হইয়া মসজিদ হইতে বাহির হইয়া একটি বৃক্ষতলে গিয়া গোসল করিয়া রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে ফিরিয়া আসিলেন এবং ইসলাম কবূলের ঘোষণা দিলেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ১৫৪-১৫৫, সংক্ষেপিত)।
গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) মুল্লা মাজদুদ্দীন, সীরাতে মুস্তাফা, মাকতাবা উসমানিয়্যা, দিল্লী ১৯৫৭ খৃ.; (২) শিবলী নো'মানী, সীরাতুন নবী, ১খ.; (৩) ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া মাকতাবাতুস সাআদা, মিসর ১৯৩২ খৃ., ৩খ.।
মাসউদুল করীম