📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে মদীনায় ইসলামের দাওয়াত

📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে মদীনায় ইসলামের দাওয়াত


বায়'আত সমাপ্ত হইলে রাসূলুল্লাহ্-নূতন উদ্যেমে মদীনায় আরও ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে সুসংগঠিত কর্মসূচী ঘোষণা করেন। উহা এই যে, তিনি আগত মুসলমানদের মধ্য হইতে বার সদস্যের একটি "ইসলাম প্রচার সমন্বয় বোর্ড" গঠন করিয়া দেন। তিনি বলিলেন, তোমরা নিজেদের মধ্য হইতে বারজন লোককে নকীব মনোনীত কর। তাঁহারা হযরত 'ঈসা-(আ)-এর হাওয়ারীদের ন্যায় আমাকে কেন্দ্র করিয়া ইসলামের প্রচারে আত্মনিয়োগ করিবে। ইহারা নকীব নামে অভিহিত হইবেন (রাহমাতুললিল আলামীন, ১খ., পৃ. ৯২)।
মদীনায় ইসলাম প্রচারের সমন্বয়ের জন্য মনোনীত এই বারজন নকীব বা সমন্বয়কারী হইলেন: ১. হযরত আস'আদ ইব্‌ন যুরারা; ২. হযরত রাফি' ইবন মালিক; ৩. হযরত উবাদা ইবনুস সামিত; ৪. হযরত সা'দ ইব্‌দুর রবী'; ৫. হযরত মুনযির ইবন 'আমর; ৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা; ৭. হযরত বারা'আ ইব্‌ন মা'রূর; ৮. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন 'আমর; ৯. হযরত সা'দ ইবন উবাদা; ১০. হযরত উসায়দ ইবন হুদায়র; ১১. আবুল হায়ছাম ও ১২. সা'দ ইব্‌ন খায়ছামা (রা) (রাহমাতুললিল আলামীন, ১খ., পৃ. ৯২)।
হজ্জ সমাপনান্তে নকীবগণ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া নূতন উদ্যমে ইসলামের প্রচার-প্রসারে নিজেদের সর্বস্ব নিয়োজিত করিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই মদীনায় ইসলামের সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হইল। মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বীকৃত হইল। মদীনায় মুসলমানদের এইরূপ স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ্ আশ্বস্ত হইলেন এবং মক্কার নির্যাতিত ও নিপীড়িত মুসলমানদেরকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। দলে দলে সাহাবীগণ মদীনায় হিজরত করিতে লাগিলেন। এখন মক্কা হইতে
হিজরতকারী মুহাজির ও মদীনার সহযোগিতাকারী আনসারদের সমন্বয়ে গড়িয়া উঠিল এক স্বাধীন ইসলামের কেন্দ্রভূমি "দারুল ইসলাম আল-মাদীনা"। কিছু দিন পর রবী'উল আওয়াল মাসে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ হিজরত করিয়া মদীনায় চলিয়া আসিলেন।
রাসূলুল্লাহ্-এর মদীনায় হিজরতের সুবাদে মদীনা ইসলাম প্রচারের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হইল। এতদিন মদীনার নবদীক্ষিত মুসলমানগণ নিজ নিজ হিকমত ও প্রজ্ঞা খাটাইয়া সাধ্যমত ইসলামের প্রচার ও প্রসার করিতেছিলেন। এখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্-এর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত নীতি ও কর্মপন্থার মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াতের নবযাত্রা শুরু হইল। ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ্-এর অনুসৃত নীতি ও কর্মপদ্ধতিগুলি ছিল মোটামুটি নিম্নরূপ:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পারস্পরিক ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা

📄 পারস্পরিক ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা


১. মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদ কেন্দ্রিক দাওয়াত, তা'লীম ও তরবিয়তের ব্যবস্থা করা। এই লক্ষ্যে তিনি তৎকালের 'কুবা' পল্লীতে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, অতঃপর মদীনায় বনূ নাজ্জারের মহল্লায় অপর একটি মসজিদও প্রতিষ্ঠা করেন যাহা মসজিদুন নাবাবী নামে সুপরিচিত। ইহাই ছিল মদীনার কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং ইসলামী দাওয়াত, তা'লীম ও তরবিয়তের কেন্দ্রস্থল।
২. সুফফা বা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা : দেশ-দেশান্তর হইতে আগত নবদীক্ষিত মুসলমানদের তা'লীম ও তরবিয়তের জন্য এবং তাঁহাদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে নববী নিমার্ণের পরপরই উহার এক পার্শ্বে একটি সুফফা বা চবুতরা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সাহাবীগণের সহযোগিতায় অতি সহজে এই ছাউনী নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ইসলামী তা'লীম ও তরবিয়ত অর্জনে আগ্রহী মুসলমানগণ এই সুফফায় সমবেত হইতেন এবং কিছু কাল এইখানে থাকিয়া ইসলামী তা'লীম ও তরবিয়তের বাস্তব অনুশীলন ও চর্চা করিতেন। এই সুফফাই ইসলামের সর্বপ্রথম মাদ্রাসা গৃহ। দীন শিক্ষা, দীন প্রচার, ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমত এই ছিল সুফফার ছাত্রদের প্রধান সাধনা (শিবলী নোমানী, সীরাতুন নবী, পৃ. ২৯২-২৯৪)।
৩. ইসলামই একমাত্র সত্য ও সঠিক ধর্ম। এই সত্যকে উপলব্ধির জন্য চাই চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা। কারণ স্বাধীনতার পৃষ্ঠপোষকতার দ্বারাই সত্য জয়লাভ করে, আর চাপ ও যবরদস্তির দ্বারা অসত্য ও বাতিলের প্রসার ঘটে। চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার দ্বারা একই সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্ম ও মতাদর্শী জনগোষ্ঠীর মাঝে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ গড়িয়া উঠে। ফলে সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দ যাচাইয়ের একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পরিণতিতে সুস্থ ও রুচিশীল ব্যক্তিবর্গের পক্ষে সত্যের আহ্বানে সাড়া দেওয়া সহজতর হয়। এই উদ্দেশ্য অজর্নের লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ্ সর্বপ্রথম মদীনায় বসবাসকারী ইয়াহুদী ও পৌত্তলিকসহ সকল জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিশ্বাসের ঘোষণা দেন। ফলে ধর্মমত নির্বিশেষে সকলের নিকট তাঁহার মর্যাদা ও তাঁহার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অত্যন্ত বাড়িয়া যায়। এমনকি এক পর্যায়ে মদীনার সকল জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মানুসারিগণ পরস্পরের মধ্যে একটি সনদ সম্পাদনের জন্য অনুপ্রাণিত
হন। এই সনদে প্রত্যেক ধর্মাদর্শীর চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস ও জান-মাল, ইজ্জত-আবরূর হেফাজতের পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ্ মদীনার সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীর মন জয় করিয়া নেন এবং মদীনা ইসলামী দাওয়াতের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১ খ., পৃ. ৫০১)।
যে কোন মতবাদ ও আদর্শের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য চাই উহার অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য ও সম্প্রীতির সুদৃঢ় বন্ধন। ইহা ছাড়া কোন আদর্শকে বিজয়ী করার চিন্তা সুদূরপরাহত। তাই রাসূলুল্লাহ্ মদীনায় হিজরতর পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেই কাজ সম্পাদন করিয়াছেন তন্মধ্যে অন্যতম ছিল মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামের ব্যাপক-প্রচার ও ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য রাসূলুল্লাহ্-এর এই প্রকার পদক্ষেপ ছিল দূরদর্শিতার পরিচায়ক। কেননা মদীনার কপট মুনাফিক শ্রেণী সর্বদাই মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিবাদ সৃষ্টির জন্য তৎপর ছিল যাহাতে ইসলামের বিকাশ ব্যাহত করা যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্-এর এই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের পদক্ষেপ তাহাদের সকল ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা নস্যাৎ করিয়া দেয় (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৫৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ধারায় দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রসার

📄 হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ধারায় দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রসার


৫. হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ধারায় দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রসার
মদীনায় বসবাসকারী আহলে কিতাব ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের নিকট রাসূলুল্লাহ্ অত্যন্ত হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পন্থায় ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মদীনার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আহলে কিতাব ইয়াহুদীদের অন্যতম ধর্মবেত্তা ও ধর্মীয় নেতা ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম। একবার তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া তাঁহার কথাবার্তা ও গঠনাকৃতি প্রত্যক্ষ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন এবং বলিলেন “হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ইয়াহূদীরা আপনার সত্যতা সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত রহিয়াছি। কিন্তু আমরা হইলাম প্রতিহিংসাপ্রবণ একটি জাতি। আপনি ইহার প্রমাণ দেখিতে পারেন। আপনি আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি গোপন রাখিয়া তাহাদের নিকট আমার অবস্থান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করুন। অতঃপর আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ করুন। তাহা হইলে বুঝিতে পারিবেন তাহারা কি বলে। রাসূলুল্লাহ্ নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদীদেরকে আমন্ত্রণ জানাইলেন। তাহারা সমবেত হইল। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম গৃহাভ্যন্তরে আত্মগোপন করিয়া রহিলেন। কথাবার্তা শুরু হইল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! তোমাদের কি হইল? আল্লাহ্ তোমাদের শুভবুদ্ধি দান করুন। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। ঐ মহান সত্তার শপথ করিয়া বলিতেছি, যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নাই! নিশ্চয় তোমরা অবগত আছ যে, আমি মহান আল্লাহর প্রেরিত একজন সত্য রাসূল। আমি সত্যসহ আবির্ভূত হইয়াছি। অতএব তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। তাহারা বলিল, আমরা এই সম্বন্ধে অবগত আছি। রাসূলুল্লাহ্ তিনবার কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করিলেন। তাহারাও প্রতিবার একই উত্তর প্রদান করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, আচ্ছা বল, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তাহারা সকলেই সমস্বরে বলিয়া উঠিল, 'তিনি তো আমাদের নেতার সুযোগ্য সন্তান। আমাদের

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত

📄 যুদ্ধের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত


রাসূলুল্লাহ্ ইসলামের দাওয়াত না দিয়া কখনও কোন কওমের সহিত যুদ্ধ আরম্ভ করেন নাই। তিনি যে কোন সেনাদল প্রেরণের পূর্বে তাহাদেরকে নির্দেশ দিতেন, "মানুষের অন্তর জয় করিবে। ইসলামের দাওয়াত না দিয়া কাহারও উপর হামলা করিবে না"। একবার হযরত আলী (রা)-কে যুদ্ধে প্রেরণের প্রাক্কালে নসীহত করিয়া তিনি বলিলেন, "শান্তভাবে অগ্রসর হও। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হইয়া প্রথমে তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে যে সকল হক তাহাদের উপর ওয়াজিব হইয়াছে, সে সম্পর্কে তাহাদেরকে অবহিত করিবে। আল্লাহর শপথ! তোমার দ্বারা যদি আল্লাহ তা'আলা একজন লোককেও হেদায়াত দান করেন, তবে উহা তোমার জন্য লাল বর্ণের উষ্ট্র পাল পাওয়া অপেক্ষা উত্তম হইবে" (হায়াতুস-সাহাবা, ১খ., পৃ. ১৬৫)।
একবার রাসূলুল্লাহ লাত ও উয্যার পূজারীদের দিকে এক সেনাদল প্রেরণ করিলেন। উক্ত সেনাদল আরবের এক কবীলার উপর হামলা করিয়া লাত-উয্যার কতিপয়
পূজারীকে যুদ্ধবন্দী অবস্থায় রাসূলের নিকট উপস্থিত করিলেন। রাসূল বন্দীদের জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহারা কি তোমাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিল? বন্দীরা বলিল, না। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, বন্দীদেরকে ছাড়িয়া দাও (কানযুল উম্মাল-এর বরাতে, হায়াতুস্-সাহাবা, ১খ., পৃ. ১৬৯)।
'যুদ্ধের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দাও'-রাসূল-এর এই নির্দেশ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হইয়াছিল। ইহাতে অনেক কবীলা ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পাইয়াছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00