📄 মদীনায় ইসলামের দাওয়াতের ক্রমবিকাশ
কাফেলার নিকট উপস্থিত হইলেন। প্রাথমিক পরিচয় ও কুশল বিনিময়ের পর রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিলেন এবং পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করিয়া শুনাইলেন। তাহারা অভিভূত হইয়া পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিল, “ইনিই তো সেই নবী, যাহার কথা আমরা সর্বদা ইয়াহুদীদের মুখে শুনিয়া আসিতেছি। ইয়াহুদীরা তাঁহার আগমনের বার্তা শুনিতে পারিলে আমাদের আগে ইসলাম গ্রহণ করিতে পারে। চল, আমরা তাহাদের আগেই এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করি।” এই কথা বলিয়া তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ১খ., পৃ. ২২৮)। এই সৌভাগ্যশালী মহাত্মাদের সংখ্যা ছিল মোট ছয়জন। যথাঃ
১. আবুল হায়সাম মালিক ইব্ন তায়্যিহান ২. আবূ উমামা আল'আব্দ ইব্ন মুরারা ৩. আওফ ইবনুল হারিছ ৪. রাফি' ইব্ন মালিক ৫. কুতবা ইব্ন আসির এবং ৬. জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন বায়ারাহ।
ইহাদের মধ্যে 'প্রথমোক্ত আবুল হায়সাম ছিলেন আওস গোত্রীয়। বাকী পাঁচজন খাযরাজ গোত্রীয়। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ -এর সমীপে নিজেদের (অর্থাৎ আওস ও খাষরাজের) মধ্যে বিরাজমান আত্মকলহ ও বিবাদ-বিসম্বাদের কথা তুলিয়া ধরিলেন এবং এই মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করিলেন, “আমাদের কওমের মধ্যে যে অনৈক্য এবং সংঘাত বিরাজ করিতেছে, আশা করি আপনার মাধ্যমে উহার অবসান ঘটিবে”। আমরা দেশে ফিরিয়া আমাদের কওমকে এই বিষয়টি অবহিত করিব এবং তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিব। আপনিও তাহাদের নিকট সেই সমস্ত জিনিস 'পেশ করুন যাহা আমরা কবুল করিয়াছি। আল্লাহ যদি তাহাদেরকে আপনার অনুসরণের তৌফিক দেন, তাহা হইলে আপনার চেয়ে অধিক সম্মানের অধিকারী আর কেহই হইবে না (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ২২৯)।
ইসলামে দীক্ষিত ইয়াছরিবের ক্রয়জনের হজ্জ কাফেলা মক্কা হইতে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ বিগত দশ বৎসরে যে পরিমাণ কুরআন নাযিল হইয়াছে, উহার একটি কপি লিখাইয়া হযরত রাফি' ইব্ন মালিকের হাতে সোপর্দ করেন এবং ইয়াছরিবের নব দীক্ষিত মুসলমানদেরকে উহার তা'লীম দেওয়ার নির্দেশ দেন।
নবদীক্ষিত সাহাবীগণ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা আত্মীয়-স্বজনকে অবহিত করিলেন এবং তাহাদেরকেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। ফলে তাহাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অল্পদিনের মধ্যেই মদীনা ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রত্যেকটি ঘরে ইসলামের চর্চা আরম্ভ হইয়া যায় এবং প্রত্যেক ঘর হইতেই একজন-দুইজন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিতে লাগিল। যাহারাই ইসলাম গ্রহণ করিতেন, হযরত রাফি' ইব্ন মালিক (রা) তাহাদেরকে
📄 মদীনার প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের ইসলাম গ্রহণ
কুরআনের তা'লীম দিতেন। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তিনি ও তাঁহার সঙ্গীগণ ছিলেন অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ ও নিষ্ঠাবান (শায়খ মুহাম্মাদ খেদরী বেক, নূরুল-য়াকীন, পৃ. ৬৪, শিবলী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ২৬৩; ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪২৯)।
ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের প্রভাবে মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যকার বিরাজমান অনৈক্য ও যুদ্ধ-ফাসাদের মূলোৎপাটন ঘটিল। তাহাদের মাঝে গড়িয়া উঠিল ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব এবং সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সুদৃঢ় ঐক্য ও একাত্মতা যাহা আরবে বসবাসকারী অন্যান্য গোত্রগুলিকেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে (দ্র. আল-কুরআনুল কারীম, সূরা আল 'ইমরান, ১০৩)।
পরবর্তী বৎসর অর্থাৎ নবুওয়াতের দ্বাদশ বৎসর যখন হজ্জের মৌসুম আসিল, তখন ইতোপূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী এবং ইসলাম গ্রহণে আগ্রহীদের সমন্বয়ে একটি "মদীনার হজ্জ কাফেলা" তৈরী হইল। ইহার সদস্য সংখ্যা ছিল মোট বারজন। এই কাফেলার বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, মদীনা ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকার প্রত্যেক গোত্র হইতে এক-একজন করিয়া প্রতিনিধি এই কাফেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁহারা মক্কায় পৌঁছিয়া মীনা পর্বতের নিকটস্থ উপত্যকার একটি পাহাড়ী ঘাঁটিতে (আকাবায়) অবস্থান করিলেন। রাসূলুল্লাহ তাদের আগমন বার্তা পাইয়া উক্ত 'আকাবায় তাহাদের সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন। ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আগত ব্যক্তিগণ রাসূলুল্লাহ-এর হাতে হাত রাখিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। তৎপর রাসূলুল্লাহ তাদের সকলের নিকট হইতে বিশেষ কয়েকটি বিষয়ের উপর বিশেষভাবে বায়'আত করাইলেন। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে 'আকাবার প্রথম বায়'আত' নামে খ্যাত (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪৩১)। তাহাদের বায়'আতের বিষয়গুলি ছিল এই:
১. আমরা মহান আল্লাহর সহিত কাহাকেও শরীক করিব না। ২. চুরি করিব না। ৩. ব্যভিচার করিব না। ৪. নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করিব না। ৫. কাহারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিব না। ৬. মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল যাহা কিছু সৎকাজের নির্দেশ দেন, উহা অমান্য করিব না (বুখারী, ১খ., পৃ. ৭, ৫৫, ২খ., পৃ. ৭২৭)।
বায়'আত সমাপনান্তে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, এই সমস্ত শর্ত পূরণ করিলে প্রতিদান হিসাবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে বেহেস্ত প্রদান করিবেন, অন্যথায় আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন এবং যাহাকে ইচ্ছা ক্ষমা করিবেন। ইহা সম্পূর্ণই তাঁহার এখতিয়ারাধীন (মুহাম্মদ হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মদ, ই. ফা. বা., ১৯৯৮ খৃ., পৃ. ২৬৪)।
এই বায়'আতে অংশগ্রহণকারী বারজনের মধ্যে ছয়জন ছিলেন এমন যাহারা গত বৎসর রাসূলের হাতে ইসলামের দীক্ষা নিয়াছেন। বাকী ছয়জন এই বৎসর নূতন ইসলাম গ্রহণকারী। ইহারা হইলেন: ১. যাকওয়ান ইবন 'আব্দ কায়স; ২. 'উবাদা ইবনুস-সামিত; ৩. আব্বাস ইবনুল উবাদা; ৪. সা'লাবা; ৫. উকবা ইবন 'আমির; ৬. 'উয়ায়স ইবন সাইদা।
📄 মদীনার আবদুল আশহাল গোত্রে ইসলামের দাওয়াত
হজ্জ সমাপনান্তে কাফেলাটি যখন মদীনায় ফিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিল, তখন রাসূলুল্লাহ্ হযরত মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-কে ইমাম ও মু'আল্লিম হিসাবে তাহাদের সহিত প্রেরণ করিলেন। এইবার হযরত মুস'আব-এর নেতৃত্বে মদীনায় পূর্ণ উদ্যমে ইসলামের দাওয়াত ও চর্চা শুরু হইল। তিনি মদীনায় হযরত আস'আদ ইরন যুরারার গৃহে অবস্থান করিয়া নব-দীক্ষিত মুসলমানদেরকে পবিত্র কুরআনের তা'লীমসহ ইসলামের মৌলিক ও আনুসঙ্গিক বিষয়াদি শিক্ষা দিতে থাকিলেন। তাঁহাকে মদীনার "মুকরী” অর্থাৎ "কুরআনের পাঠ দানকারী" বলিয়া সম্বোধন করা হইত (ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪০৪)।
হযরত মুস'আব (রা) অতি উন্নত চরিত্র, বিনয়-নম্রতা ও মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁহার ওয়াজ ও নসীহত ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তাঁহার চারিত্রিক উৎকর্ষ ও মর্মস্পর্শী বয়ানের মাধ্যমে ইসলাম মদীনাবাসীদের মধ্যে অতি অল্প সময়ে ছড়াইয়া পড়িল। ফলে মদীনায় এত দ্রুত ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটিল যে, প্রত্যহ দুই-একজন করিয়া মদীনাবাসী ইসলামে দীক্ষিত হইতে লাগিলেন (ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪০৫)।
মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রে দুইজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন সা'দ ইবন মু'আয এবং উসায়দ ইবন হুদায়র। তাহারা যখন জানিতে পারিলেন, সুদূর মক্কা হইতে মুস'আব নামক এক ব্যক্তি তাহাদেরই বংশীয় ভাই আস'আদ-এর গৃহে অবস্থান করিয়া এক নূতন ধর্মাদর্শের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতেছেন, তখন তাহারা উহার সঠিক তথ্যানুসন্ধানের উদ্দেশ্যে আস'আদের বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। আর্স'আদের বাড়ীর নিকট পৌঁছিয়া সা'দ বলিলেন, উসায়দ! আমি এখানে অপেক্ষায় রহিলাম। তুমি যাইয়া খবর লইয়া আইস। উসায়দ আস'আদের গৃহের দিকে অগ্রসর হইলেন। আস'আদ ইহা দেখিয়া হযরত মুস'আবকে বলিলেন, হযরত! আমাদের বংশীয় নেতা উসায়দ আসিতেছেন। যদি তিনি আপনার কথা গ্রহণ করেন তবে তো বড়ই ভাল হইবে।
উসায়দ আস'আদের গৃহে প্রবেশ করিয়া হযরত মুস'আব (রা)-কে অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় তিরস্কার করিলেন এবং কঠোর ভাষায় বলিয়া দিলেন, "শীঘ্র মদীনা ছাড়িয়া চলিয়া যাও, নতুবা ভাল হইবে না"। হযরত মুস'আব অতি নম্র ভাষায় তদুত্তরে বলিলেন, "জনাব! বসুন, আমাদের বক্তব্য শুনুন। তারপর যদি কোন অন্যায় দেখেন তখন যাহা ইচ্ছা করিবেন"। হযরত মুস'আবের এইরূপ নম্র ও ভদ্র ব্যবহার উসায়দের অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করিল। উসায়দ আর কিছু না বলিয়া শান্তভাবে বসিয়া পড়িলেন। হযরত মুস'আব (রা) তাহাকে পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন এবং তাঁহার সামনে ইসলামের মহিমা ও শিক্ষা তুলিয়া ধরিলেন। উসায়দ ক্ষণিকের মধ্যেই মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় অভিভূত হইয়া ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। হযরত মুস'আব মহান আল্লাহ্ শুকরিয়া আদায় করিলেন। উসায়দ বলিলেন, আমার পশ্চাতে আমার একজন ঘনিষ্ঠ লোক রহিয়াছেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করিলে মদীনায় ইসলামের বিরোধিতা করিবার আর কেহই সাহস পাইবে না। আমি এখনই তাঁহাকে লইয়া আসিতেছি। উসায়দ নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখিয়া সা'দকে বলিলেন,
📄 মদীনায় ইসলাম প্রচারের গৃহীত কর্মসূচী
আমি তো যাহা বলিবার তাহা বলিয়াছি। এখন আপনি না গেলে কাজ হইবে না। তৎক্ষণাত সা'দ আস'আদের বাড়ীতে আসিয়া হাযির হইলেন। তাহার মুখমণ্ডল ক্রোধে অগ্নিবৎ। গৃহে প্রবেশ করিয়াই আস'আদ ও হযরত মুস'আবকে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় শাসাইতে লাগিলেন। কিন্তু হযরত মুস'আব (রা) পূর্বের ন্যায় অতিশয় বিনয় ও নম্রতার সহিত সা'দকে বসিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। তাঁহার মধুর আচরণে মুগ্ধ হইয়া সা'দ শান্তভাবে বসিয়া পড়িলেন। হযরত মুস'আব সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত আরম্ভ করিলেন এবং তাঁহার নিকট ইসলামের শিক্ষা ও মর্মবাণী তুলিয়া ধরিলেন। ক্ষণিকের মধ্যেই সা'দ ইসলাম গ্রহণের জন্য তৈরী হইয়া গেলেন (ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪৩৬-৪৩৭)।
আবদুল আশহাল মদীনার আওস গোত্রের একটি শাখা- গোত্র। হযরত সা'দ-ইবন মু'আয (রা) ছিলেন এই গোত্রের নেতা। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর নিজেকে ইসলাম প্রচারের একজন একনিষ্ঠ দা'ঈ ও আহবায়ক হিসাবে নিয়োজিত করেন। সর্বপ্রথম তিনি আপন পরিবার-পরিজনকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তাঁহার আন্তরিক প্রচেষ্টায় ও নিষ্ঠাপূর্ণ দাওয়াতে সাড়া দিয়া তাঁহার গোটা পরিবার ইসলাম কবুল করে। মদীনার ইতিহাসে তাঁহার পরিবারের সকল সদস্য সর্বপ্রথম ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। এই সৌভাগ্যের কারণে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে "সায়্যিদুল আনসার" উপাধিতে আখ্যায়িত করেম (খতীব তাবরীযি, আল্-ইকমাল ফী আসমাইর রিজাল, সা'দ ইবন মু'আয শিরো., আসাহ্হুল মাতাবি, দিল্লী)।
হ হযরত সা'দ ইবন মু'আয (রা) আপন পরিবারবর্গকে ইসলামে দীক্ষিত করার পর তাঁহার আপন গোত্র বানু 'আশহালে দাওয়াতী অভিযান শুরু করিলেন। এই ক্ষেত্রে তিনি অবলম্বন করিলেন একটি হিকমতপূর্ণ পন্থা। সর্বপ্রথম তিনি বনূ আশহালের সর্বস্তরের জনতার এক জমায়েত আহবান করিলেন। প্রাণপ্রিয় নেতার আহবানে সর্বস্তরের জনতা সমবেত হইল। এইভাবে হযরত সা'দ (রা) আশহাল গোত্রের বৃহত্তর সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “হে আমার জাতি! তোমরা সত্য করিয়া বল, আমি কেমন লোক"? সকলে সমস্বরে বলিয়া উঠিল, "আপনি আমাদের সর্দার, মহান নেতা। আপনি আমাদের মাঝে সম্মানিত ব্যক্তি। আপনার জ্ঞান-গভীরতা ও সুষ্ঠু সিদ্ধান্তের প্রতি আমরা আস্থাশীল। আপনার ন্যায়নিষ্ঠা ও উন্নত চরিত্র সর্বজনস্বীকৃত”। বৃহত্তর জনতার অকুণ্ঠ স্বীকৃতির পর হযরত সা'দ বলিলেন, "আচ্ছা, যদি তাহাই হয়, তবে এই শিরক ও পৌত্তলিকতার সহিত আমার আজ হইতে আর কোন সম্পর্ক নাই। আমার গোত্রের যে কোন ব্যক্তি অনাদি অনন্ত সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করিবে তাহার সহিত কোন প্রকার খারাপ কথাবার্তা বলিব না।" প্রাণপ্রিয় মহান নেতার মুখে এই বলিষ্ঠ প্রতিজ্ঞার কথা শুনিয়া আশহাল গোত্রের সকল নর-নারী দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করিতে লাগিল। ঐ দিন সূর্যাস্তের পূর্বেই গোটা বনূ আশহাল গোত্র ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় লইল (ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪৩৭)।
হযরত মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর হিকমতপূর্ণ দাওয়াত এবং নবদীক্ষিত মুসলমানদের প্রচেষ্টায় মদীনার প্রতিটি গোত্রের মধ্যে দ্রুত ইসলামের প্রসার ঘটিতে লাগিল। মাত্র এক বৎসরের মেহনতে শতাধিক মদীনাবাসী ইসলাম কবুল করিলেন। নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বৎসর হজ্জের মৌসুম আসিলে নব-দীক্ষিত মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ্-কে এক নজর দেখিবার জন্য মক্কায় হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে সফরের প্রস্তুতি লইলেন। তাঁহারা নিজেদের মধ্যে এই মর্মে পরামর্শও করিলেন যে, রাসূলুল্লাহ্-কে মদীনায় হিজরত করিবার অনুরোধ জানাইবেন। এই উদ্দেশ্যে হজ্জ কাফেলায় মদীনার সকল গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হইল। মোট ৭৩ জনের বিশাল হজ্জ কাফেলা। তাঁহাদের মধ্যে উম্মে আম্মারা ও আসমা নাম্নী দুইজন মহিলাও ছিলেন। কাফেলা মক্কায় পৌঁছিলে ১২ যিলহজ্জ গভীর রজনীতে রাসূলুল্লাহ্ 'আকাবা' নামক স্থানে তাঁহাদের সহিত সাক্ষাৎ করেন। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-কে মদীনায় হিজরতের দাওয়াত দেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাদের দাওয়াত কবুল করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের নিকট হইতে কতিপয় বিষয়ের উপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। ইতিহাসে ইহাকে "আকাবার দ্বিতীয় বায়'আত" নামে উল্লেখ করা হয় (তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, পৃ. ২৪৪)।