📄 প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী দ্বারা শিকার
আদী ইব্ন হাতিম (রা) একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি শিকারের উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ছাড়িয়া দেই এবং উহারা শিকার করিয়া আমার জন্য রাখিয়া দেয়। আমি তখন আল্লাহর নাম লই অর্থাৎ 'বিসমিল্লাহ' বলি। এই শিকারকৃত জন্তু আমি খাইতে পারি কি? তিনি বলেন: যখন তুমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর আল্লাহ্ নাম লইয়া ছাড়، তখন তুমি উহা খাইতে পার। আমি বলিলাম، যদি উহারা শিকারকে হত্যা করিয়া ফেলে؟ তিনি বলিলেন: উহারা শিকারকে হত্যা করিলেও। কেননা উহার ধরাটাই (শিকার করাই) ছিল যবেহ। কিন্তু উহার সাথে অন্য কুকুর শামিল হইলে খাইতে পারিবে না। তবে যদি কুকুর তাহা হইতে কিছু অংশ খাইয়া ফেলে তাহা হইলে তুমি উহাও খাইবে না। আর যদি এই শিকারে অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরও যোগ দিয়া থাকে তাহা হইলে তুমি ইহা মোটেও খাইবে না। কেননা তুমি তো কেবল তোমার কুকুর ছাড়িতেই আল্লাহর নাম লইয়াছ (বিস্মিল্লাহ বলিয়াছ)، অন্যটার ব্যাপারে লও নাই। তুমি তো জান না যে، কোন কুকুরটি শিকারকে হত্যা করিয়াছে। অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়া শিকার করিলে যদি তুমি যবেহ করিবার সুযোগ পাও، তবে উহা খাইতে পার।
আমি তাঁহাকে বলিলাম، আমি অনেক সময় শিকারের উদ্দেশ্যে، মিরবাদ (কাঠ বা তীক্ষ্ণ ছড়ি ইত্যাদি) নিক্ষেপ করিয়া থাকি، যদি তাহাতে শিকার কুপোকাৎ হইয়া যায়؟ রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: যখন তুমি 'মিরবাদ নিক্ষেপ কর এবং তাহার সম্মুখের তীক্ষ্ণভাগ প্রবিষ্ট হইয়া শিকার মারা যায় তবে তুমি তাহা খাইতে পার। আর যদি পাশের ভাগ লাগিয়া শিকার মারা যায়، তবে তুমি উহা খাইবে না। যখন তুমি তোমার তীর নিক্ষেপ করিবে তখন আল্লাহর নাম লইবে। যদি তুমি শিকার মৃত অবস্থায় পাও، তবে উহা খাইতে পার؛ যদি তাহা পানিতে পাও তবে খাইবে না। কেননা তুমি তো নিশ্চিতভাবে জান না যে، পানিই উহাকে হত্যা করিল নাকি তোমার তীর। যখন তুমি তোমার তীর নিক্ষেপ করিলে এবং উহা তোমার নিকট হইতে নিরুদ্দেশ হইয়া গেল، ইহার পর তুমি তাহা পাও তবে যতক্ষণ উহা হইতে দুর্গন্ধ বাহির না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি উহা খাইতে পার (صحیح مسلم، ۶خ.، পৃ. ۴۰۷-۱۲؛ جامع ترمذی، ۴خ.، পৃ. ۱۰۳-۸)۔
📄 পশু যবেহ-এর ক্ষেত্রে নম্রতা অবলম্বন
মনুষ্য খাদ্যের প্রয়োজনে যদি পশু যবেহ করিতে হয়، সেই ক্ষেত্রে পশুর সহিত নম্র ও দয়ার্দ্র আচরণ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (س) নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলেন، আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বিষয়ে তোমাদের উপর 'ইহসান' অত্যাবশ্যক করিয়াছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করিবে، দয়ার্দ্রতার সহিত হত্যা করিবে؛ আর যখন যবেহ করিবে، দয়ার সহিত যবেহ করিবে। তোমাদের সকলেই যেন তাহায় ছুরি ধার করিয়া লয় এবং যবেহকৃত জন্তুকে আরাম (নিস্তেজ হইতে) দেয়। দাঁত، নখ، ছুরি و পাথর দ্বারা পশু যবেহ করা নিষিদ্ধ। এক কথায়، বিনা প্রয়োজনে পশুকে শারীরিক কষ্ট দেওয়া جائیز নয়। জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যখন ছাগل যবেহ করি তখন উহার প্রতি আমার দয়া হয়। উত্তরে তিনি বলিলেন، 'তুমি যদি ছাগলের উপর দয়া কর তাহা হইলে আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করিবেন।' যেইসব হালাল পশু আল্লাহর নামে অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলিয়া যবেহ করা হয় নাই তাহা হারাম। দেব-দেবী ও মূর্তির নামে যবেহকৃত জন্তু ভক্ষণ করা ঈমানদারদের জন্য অবৈধ (صحیح بخاری، ۹خ.، পৃ. ১৭২-৬؛ صحیح مسلم، ۶خ.، পৃ. ۴৩৪؛ مسند احمد، ۶خ.، পৃ. ۴۳۶)۔
উপর্যুক্ত আলোচনা হইতে এই কথা স্পষ্টত বুঝা গেল যে، মানুষ، জীব-জন্তু، পশু-পাখি নির্বিশেষে সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য রাসূলুল্লাহ (س)-এর অন্তর مایا، ममता و অনুকম্পায় পরিপূর্ণ ছিল। গোষ্ঠী، বর্ণ، বংশ، দেশ، কাল، পাত্র و জাতীয়তার ঊর্ধ্বে ছিল তাঁহার দয়া ও মায়া। তাঁহার করুণা و মহানুভবতা সর্বপ্লাবী و সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। পশু-পাখিদের সহিত নির্দয় আচরণের যে পৈশাচিক প্রথা আরবে প্রচলিত ছিল তাঁহার কালজয়ী আদর্শ ও বাস্তব শিক্ষার ফলে উহা সমাজ হইতে নির্মূল হইয়া যায়। জীবজন্তুর সহিত মানবিকতাপূর্ণ ব্যবহারের কেবল নির্দেশ দিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই، বরং ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আচরণের মাধ্যমে সমাজে অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্তও স্থাপন করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (س) অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত ও পশুপাখি যবেহ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। ইহার পিছনে যে বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য লুকাইয়া রহিয়াছে তাহা আবিষ্কার করিতে বিজ্ঞানীদের দেড় হাজার বৎসর সময় লাগিয়াছে। বৃটেন، কানাডা و নিউজিল্যান্ডসহ পৃথিবীর ২২টি দেশে গরু و নানা জীবের মধ্যে Bovire Spongiform Eneephalopathy (BSE)، Variant Creutzfeledt Jakob Disease (VCJD)، Transmissible Spongiform Eneephalopathies (TSES) নামক রোগের প্রار্দুভাব দেখা দিয়াছে। এইসব রোগাক্রান্ত পশুর গোশত ভক্ষণ করিলে মানুষের দেহে মারাত্মক উপর্সগের সৃষ্টি হয়؛ মস্কিষ্কে ক্ষতচিহ্ন তৈরী হয়؛ ক্রমে ক্রমে তাহা ছিঁদ হইয়া যায় এবং প্রোটিনের পিণ্ড সৃষ্টি হইয়া মস্কিষ্কে অকেজো হইয়া পড়ে। ইতোমধ্যে বৃটেনে এক লক্ষ আশি হাজার ঘটনা পাওয়া গিয়াছে এবং আগামীতে এক লক্ষ ছত্রিশ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িতে পারে বলিয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানিগণ আশংকা প্রকাশ করিয়াছেন। ৮০-এর দশক হইতে মধ্য ৯০-এর দশক এই সময়ে ۱.۹ মিলিয়ন গরু এই রোগের প্রকোপে অসুস্থ হইয়া পড়ে (فضل الحق، দৈনিক আজাদী، চট্টগ্রাম، ۱۱ সেপ্টেম্বর، ۲۰۰۳، পৃ. ۱۰)۔
জীব-জন্তু و পশু-পাখিদের প্রতি সদয় আচরণ، সংরক্ষণ এবং ইহার যুৎসই ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করিয়া মানবতার নবী রাসূলুল্লাহ (س) দেড় হাজার বৎসর আগে যে ঘোষণা দেন তাহারই প্রতিধ্বনি শোনা যায় ১৯৯২ খৃস্টাব্দে রি و డి জেনারিওতে অনুষ্ঠিত প্রথম ধরিত্রী সম্মেলনে।
এই সম্মেলনে The Convention of Biological Diversity (CBD) প্রণীত হয় ও বিকাশ লাভ করে।