📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবু সুফ্যানের প্রতি ঔদার্য প্রদর্শন

📄 আবু সুফ্যানের প্রতি ঔদার্য প্রদর্শন


ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আবূ সুফ্য়ান ছিলেন মুহাম্মদ (س) ও ইসলামের চরম শত্রু। শত্রুতার এমন কোন দিক বাকী থাকে নাই যাহা আবু সুফ্য়ান গ্রহণ করেন নাই। মুহাম্মাদ (س)-এর মাক্কী জীবনে এক মুহূর্তও তিনি তাঁহাকে শাস্তিতে থাকিতে দেন নাই। হিজরত-পরবর্তী জীবনে বদর হইতে শুরু করিয়া মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন এই আবূ সুফ্য়ান। পরিচালিত সকল যুদ্ধের অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় সঙ্গত কারণেই তাহাকে ইসলামের প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা হইত। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হইবার পর মুহাম্মাদ (س)-এর দরবারে তাহাকে উপস্থিত করা হয়। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (را) মুহাম্মাদ (س)-এর সকাশে، তাহাকে হত্যা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (س) তাহাকেই কেবল নয়، বরং তাহার গৃহে যত লোক আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল সকলকে ক্ষমা করিয়া দিবার ঘোষণা দিয়া বিশ্বের ইতিহাসে মহত্ত্বের অনুপম আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন। আবূ সুফ্য়ানকে যখন মুহাম্মদ (س)-এর দরবারে আনা হয় তখন মুহাম্মাদ (س) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন، হে আবু সুফ্য়ান! এখনও কি তোমার সময় হয় নাই যে، তুমি এই কথা বিশ্বাস করিবে، আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই؟ আবূ সুফ্য়ানের পক্ষ হইতে জওয়াব ছিল এইরূপঃ
بابي انت وامى ما احلمك واكرمك واوصلك والله لقد ظننت ان لوكان مع الله غيره لقد اغنى عنى شيئا بعد .
"আপনার প্রতি উৎসর্গিত আমার পিতা-মাতার শপথ করিয়া বলিতেছি، আপনার চাইতে ক্ষমাশীল، দয়াশীল ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যথাযথভাবে রক্ষাকারী অন্য কেহ নাই। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কেহ অংশীদার থাকিত তাহা হইলে এই মুহূর্তে সে আমাকে অল্প হইলেও রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিত।"
মুহাম্মাদ (س) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন، আবূ সুফ্য়ান! আমাকে রাসূল জ্ঞান করিবার সময় কি এখনও হয় নাই؟ তখনও সে মুহাম্মাদ (স)-এর উপরিউক্ত মহৎ গুণগুলির কথা স্বীকার করিয়া বলিল، হাঁ، এখনও এই ব্যাপারে আমার অন্তরে কিঞ্চিত সংশয় রহিয়াছে। ইহার অল্পক্ষণ পরই হযরত আব্বাস ইব্‌ن ابديل মুত্তালিব (রা)-এর উপস্থিতিতে তিনি সর্বান্তকরণে ইসলাম গ্রহণ করিবার ঘোষণা দিলেন। অতঃপর মুহাম্মাদ (س) ঘোষণা করিলেনঃ
من دخل دار ابی سفیان فهو امن .
"আবু সুফ্যানের গৃহে যে ব্যক্তি আশ্রয় গ্রহণ করিবে সেও নিরাপদ"।
বর্ণিত রহিয়াছে যে، মক্কা বিজয়ের দিন আনসারদের পতাকা বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন হযরত সা'দ ইবন উবাদা (را)। তিনি আবু সুফ্য়ান (را)-কে দেখিয়া বলিয়াছিলেন،
اليوم يوم الملحمة اليوم تستحل الحرمة وفى رواية اليوم تستحل الكعبة .
"আজ হইল যুদ্ধের দিন، ক্ষমার দিন নয়। আজ হারাম শরীফের ভিতরও যুদ্ধ করা বৈধ। মতান্তরে আজ কা'বার ভিতর যুদ্ধের জন্য বৈধ।"
আবূ সুফ্য়ান (রা) তাহার এই উক্তি সম্পর্কে মুহাম্মাদ (س)-কে অবহিত করিলেন। মহানবী (س) তাঁহাকে বলিলেন، সা'দ ইবন উবাদার উক্তি ঠিক নয়:
لكن هذا يوم يعظم الكعبة ويوم تكسى فيه الكعبة .
"বরং আজ আল্লাহ তা'আলা কা'বাকে সম্মানিত করিবেন، আজিকার দিন কা'বাকে গিলাফ পরানো হইবে।"
সা'দ ইবন 'উবাদার এই উক্তিতে বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করিয়া মুহাম্মাদ (س) তাঁহার নিকট হইতে আনসারদের পতাকা অপসারণ করিয়া তৎপুত্র কায়س ইবন সা'د (را)-এর হাতে অর্পণ করিলেন (আল-বিদায়া وয়ান-নিহায়া، পৃ. ২৩২-২৩৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কয়েদীকে ক্ষমা প্রদর্শন

📄 কয়েদীকে ক্ষমা প্রদর্শন


পর্যায়ক্রমে আরবের বেশির ভাগ গোত্র ইসলামে দীক্ষিত হয়। কিন্তু মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার মুসায়লামার গোত্রটি ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই দুর্ধর্ষ গোত্রটির নাম ছিল বানূ হানীফা। এই গোত্রের দলপতি ছিলেন ছুমামা ইব্‌ن উছাল (ইমাম নববীর মতে উছাল উচ্চারণ শুদ্ধ، যদিও সাধারণে 'আছাল' বলিয়া প্রসিদ্ধ، পাদটীকা সহীহ মুসলিম، ২খ.، পৃ. ৯৩)। ঘটনাক্রমে ছুমামা মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। তাহাকে পাকড়াও করিয়া মদীনায় আনা হইলে মুহাম্মাদ (س) তাহাকে মসজিদে নববীর খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিবার আদেশ দিলেন। হাদীছে ঘটনাটির বিবরণ নিম্নরূপঃ
عن أبي هريرة يقول بعث رسول الله ﷺ خيلا قبل نجد فجاءت برجل من بني حنيفة يقال له ثمامة بن اثال سيد اهل اليمامة فربطوه بسارية من سواري المسجد فخرج اليه رسول الله ﷺ فقال ماذا عندك يا ثمامة قال عندى يا محمد خير ان تقتل تقتل ذادم وان تنعم تنعم على شاكر وان كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت فتركه رسول الله ﷺ حتى كان بعد الغد فقال ما عندك يا ثمامة قال ما قلت لك ان تنعم تنعم على شاكر وان تقتل تقتل ذادم وان كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت فتركه رسول الله ﷺ حتى كان من الغد فقال ماذا عندك يا ثمامة فقال عندى ما قلت لك ان تنعم تنعم على شاكر وان تقتل تقتل ذادم وان كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت فقال رسول الله ﷺ اطلقوا ثمامة فانطلق الى نخل قريب من المسجد فاغتسل ثم دخل المسجد فقال اشهدو ان لا اله الا الله واشهد ان محمدا عبده ورسوله يا محمد والله ما كان على الارض ابغض الى من وجهك فقد أصبح وجهك احب الوجوه كلها الى والله ما كان من دين ابغض الى من دينك فاصبح دينك احب الدين كله الى والله ما كان من بلد ابغض الى من بلدك فاصبح بلدك احب البلاد كلها الى وان خيلك اخذتني وانا اريد العمرة فما ذا ترى فبشر رسول الله ﷺ وامره ان يعتمر فلما قدم مكة قال له قائل اصبوت فقال لا ولكني اسلمت مع رسول الله ﷺ ولا والله لا تأتيكم من اليمامة حية حنطة حتى يأذن فيها رسول الله ﷺ (رواه مسلم ۹۳/۲).
"আবূ হুরায়রা (রা) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) একটি অশ্বারোহী বাহিনী নজদ অভিমুখে প্রেরণ করিলেন। তাহারা বানু হানীফা গোত্রের ছুমামা ইব্‌ن উছাল নামীয় এক লোককে ধরিয়া লইয়া আসিলেন। সে ছিল ইয়ামামাবাসীদের সরদার। অতঃপর তাহারা তাহাকে মসজিদের একটি খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার প্রতি অগ্রসর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন، হে ছুমামা! এখন তোমার অবস্থা কি؟ সে উত্তর দিল، হে মুহাম্মাদ! আমার বলার কিছুই নাই। যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তাহা হইলে একজন হত্যাকারীকেই হত্যা করিলেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন তাহা হইলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিলেন। যদি মুক্তিপণ আদায় করিতে চাহেন তাহা হইলে বলুন، যাহা চাহিবেন তাহা প্রদান করা হইবে। তাহার কথা শুনিয়া মুহাম্মাদ (س) নীরবে চলিয়া গেলেন।
দ্বিতীয় দিন রাসূলুল্লাহ (س) তাহার নিকট আসিয়া সেই একই প্রশ্ন করিলেন। সে. আগের মত উত্তর দিল। তৃতীয় দিন মুহাম্মাদ (س) তাহাকে আগের মতই জিজ্ঞাসা করিলেন'। সেও' আগের মত একই উত্তর দিল। অতঃপর মুহাম্মাদ (س) তাহাকে বন্ধনমুক্ত করিয়া দিবার আদেশ করিলেন।
সে মুক্ত হইয়া মসজিদের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগানে গিয়া গোসল করিয়া পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করিয়া আশহাদু আন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু 'আন্না মুহাম্মাদান 'আবদুহু ওয়া রাসূলুহু বলিয়া ইসলাম গ্রহণ করিল। অতঃপর সে বলিল، হে মুহাম্মাদ! ইতোপূর্বে আমার নিকট আপনার মুখাবয়ব হইতে ঘৃণিত কোন মুখ ছিল না। এখন আমার নিকট আপনার চেহারা দুনিয়ার সকল কিছু হইতে প্রিয় হইয়া গিয়াছে। আল্লাহর শপথ! আমার দৃষ্টিতে ইতোপূর্বে আপনার ধর্ম হইতে নিকৃষ্ট কোন ধর্ম ছিল না، এখন আমার নিকট দুনিয়ার সকল কিছু হইতে আপনার ধর্মই প্রিয় হইয়া গিয়াছে। আল্লাহর শপথ! আপনার শহর হইতে আমার দৃষ্টিতে অন্য কোন শহর অধিকতর ঘৃন্য ছিল না، এখন আমার নিকট আপনার শহর দুনিয়ার সকল শহর হইতে প্রিয় হইয়া গিয়াছে।
উহার পর ছুমামা (রা) বলিলেন، আমি উমরার উদ্দেশে রওয়ানা করিয়াছিলাম। কিন্তু আপনার অশ্বারোহী বাহিনী আমাকে গ্রেফতার করিয়া লইয়া আসে। এখন এই ব্যাপারে আপনি সিদ্ধান্ত প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে সুসংবাদ প্রদান করিলেন এবং উমরা আদায় করিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। ছুমামা (রা) মক্কায় উপনীত হইলে সেখানকার এক লোক বলিল، আপনি কি ধর্মত্যাগী হইয়া গেলেন؟ তিনি উত্তর দিলেন، আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ঈমান আনিয়াছি। আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি، তোমরা ইয়ামামা হইতে একটি শস্যদানাও আমদানী করিতে পারিবে না যেই পর্যন্ত না মুহাম্মাদ (س) এই ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেন" (মুসলিম، ২খ.، পৃ. ৯৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জাতশত্রুর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন

📄 জাতশত্রুর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন


প্রাণের শত্রুকে ক্ষমা করার উদাহরণ মুহাম্মাদ (স)-এর আদর্শে ছিল। এমন নজীর অন্য কার মধ্যে কল্পনাও করা যায় না। যাহারা তাঁহাকে মক্কায় এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকিতে দিল না، যাহাদের কারণে বাধ্য হইয়া প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করিতে হইল، যাহারা সম্মিলিতভাবে রাসূলুল্লাহ (س)-কে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র করিল، মক্কা বিজয়ের দিন তাহাদের নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করাই ছিল যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু দুনিয়ার সকলেই জানে যে، তাহাদের অপরাধের বিপরীতে শান্তিদান তো দূরের কথা، বিষয়টির প্রতি মুহাম্মাদ (س) ইঙ্গিতও করেন নাই। ক্ষমা ও ঔদার্যের আদর্শ ইহা হইতে অধিক আর কী হইতে পারে؟
সুরাকা ইবনুল জু'শাম একটি ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন ঘোড়ার উপর সওয়ার হইয়া বল্লম হাতে মুহাম্মাদ (س)-এর অনুসন্ধানে বাহির হয়। কুরায়শ কর্তৃক ঘোষিত 'মুহাম্মাদে'র জ্যান্ত অথবা মৃত মাথা আনিয়া দিতে পারিলে এক শত উটের পুরস্কার লাভের প্রতি তাহার লোভ। সুরাকা মুহাম্মাদ (س)-এর সন্ধান পাইয়াও যায়। কিন্তু অলৌকিকভাবে তাহার ঘোড়ার পা এক এক করিয়া তিনবার মাটিতে দাবিয়া যায়। অবশেষে সে মুহাম্মাদ (س)-এর নিকট ক্ষমা চাহিয়া এই অবস্থা হইতে মুক্তি লাভ করে। মুহাম্মাদ (س) তাহাকে এই শর্তে এই অবস্থা হইতে মুক্তি দেন যে، সে যেন কাহারও নিকট তাহাদের গন্তব্য সম্পর্কে সংবাদ প্রদান না করে। সুরাকা মুহাম্মাদ (س)-এর নিকট একটি 'আমান' পত্র লিখিয়া দিবার আবেদন জানাইলে মহানবী (س) আমের ইব্‌ন ফুহায়রা (را)-কে উহা লিখিয়া দিবার নির্দেশ দিলেন। সুরাকা অবশ্য অঙ্গীকার পালন করিয়াছিল। ফিরিয়া আসিবার পথে যাহাকেই এই পথে অগ্রসর হইতে দেখিয়াছিল তাহাকে সে এই দিকে যাওয়ার প্রয়োজন নাই বলিয়া ফিরাইয়া আনিতে সক্ষম হইয়াছিল। মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (س) তাইফ হইতে ফিরিবার প্রাক্কালে জি'ইররানা' নামক স্থানে সুরাকা ইসলামের নবী (س)-এর ক্ষমার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইব্‌ن হিশাম বলেন، সুরাকার প্রকৃত নাম ছিল আবদুর রহমান ইবনুল হারিছ ইব্‌ن মালিক ইب্ন জু'শাম (আল-বিদায়া وয়ান-নিহায়া، ৩খ.، পৃ. ১৪৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উমায়র ইব্‌ন ওয়াত্বকে ক্ষমা প্রদর্শন

📄 উমায়র ইব্‌ন ওয়াত্বকে ক্ষমা প্রদর্শন


কুরায়শ গোত্রের মধ্যে যাহারা মহানবী (س) ও মুসলমানদের চরম শত্রু ছিল তাহাদের মধ্যে অন্যতম ছিল উমায়ر ইব্‌ن ওয়াত্ব আল-জুমাহী ও সাফওয়ান ইবন উমায়‍্যা। উরওয়া ইবনুয-যুবায়র (রা)-এর ভাষায় উমায়র ছিল কুরায়শদের এক শয়তান। তাহার একটি ছেলে ওয়াহ্ ইবন 'উমায়ر বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে ধৃত হইয়াছিল। রিফা'আ ইব্‌ন রাফে' (را)-এর হাতে সে বন্দী হইয়াছিল। সাফওয়ান ইবন উমায়‍্যা و উমায়র ইব্‌ن ওয়াহب একদা বদরের বন্দীদের সম্পর্কে আলাপ করিতেছিল। উমায়র ইব্‌ن ওয়াহب বলিল، যদি আমার সন্তান-সন্ততি ও ঋণের ভয় না হইত তাহা হইলে মুহাম্মাদকে মদীনায় গিয়া হত্যা করিয়া প্রতিশোধ গ্রহণ করিতাম। সাফওয়ান ইব্‌ن উমায়‍্যা বলিল، তোমার ঋণ ও পরিবার-পরিজনের দায়দায়িত্ব আমার উপর। তুমি তোমার মিশন পরিচালনা কর।
অতঃপর গোপনে উমায়ر ইব্‌ن ওয়াহ্র মহানবী (س)-কে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে মদীনায় প্রবেশ করিল। যাওয়ার পূর্বে তাহার তরবারি ধারালো করিল এবং উহাতে বিষ মিশ্রিত করিল। হযরত উমার ইবনুল খাত্তاب (را) একদল মুসলমানকে লইয়া বদর যুদ্ধের কৃতকার्यता ও আল্লাহর মদদদান সম্পর্কে আলাপরত ছিলেন। এই সময় তাঁহার নজরে উমায়র ইব্‌ن 'ওয়াহবের চেহারা উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন، আল্লাহর এই দুশমন এইখানে কোন খারাপ মতলবে আসিয়াছে। এই লোকই আমাদের বিরুদ্ধে মক্কার কাফিরদিগকে যুদ্ধের জন্য উত্তেজিত করিয়াছিল। অতঃপর উমার (را) তাহাকে গ্রেফতার করিয়া মুহাম্মাদ (س)-এর দরবারে উপস্থিত করিয়া বলিলেন، হে আল্লাহ্র রাসূল! এই দুরাচার তরবারি ঝুলাইয়া আগমন করিয়াছে। তাহাকে গ্রেফতার করিয়া উমার (را) তাহার তরবারি গলার সহিত বাঁধিয়া দিলেন। তাহাকে বাঁধা অবস্থায় দেখিয়া মহানবী (س) বলিলেন، হে উমার! তাহাকে বন্ধনমুক্ত করিয়া দাও। উহার পর উমায়رকে মুহাম্মদ (س) পাশে ডাকিয়া আনিলেন। সে انعم صباحا বলিয়া মহানবী (س)-কে অভিবাদন জানাইল। উহা ছিল জাহিলিয়্যা যুগের অভিবাদন। মহানবী (س) উত্তরে বলিলেন، আল্লাহ তা'আলা আমাদিগকে জান্নাতবাসীদের অভিবাদন দ্বারা সম্মানিত করিয়াছেন। আমাদের অভিবাদন হইল اس-সালাম শব্দ দ্বারা। অতঃপর মহানবী (س) তাহাকে তাহার মদীনায় প্রবেশ করিবার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। সে তাহার ছেলেকে মুক্ত করিবার উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছে বলিয়া জানাইল। নবী করীম (س) তাহাকে বলিলেন، তুমি অসত্য কথা বলিতেছ। সাফওয়ান ইবন উমায়‍্যা তোমার সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণ ও ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছে এই শর্তে যে، তুমি আমাকে হত্যা করিবে। কিন্তু তুমি উহা করিতে সক্ষম হইবে না। আল্লাহ তা'আলা অন্তরাল হইতে আমাকে রক্ষা করিবেন। মহানবী (س) বিষয়টি ওহী মারফত অবহিত হইয়াছিলেন। তবুও প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার কোনই মানসিকতা নাই দেখিয়া উমায়র সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করিল।
মহানবী (س) তখন উপস্থিত লোকদিগকে নির্দেশ দিলেন، তোমাদের এই ভাইকে দীনের বিষয়সমূহ শিখাও، তাহাকে আল-কুরআন শিক্ষা দাও، তাহার বন্দী লোককে মুক্ত করিয়া দাও। সঙ্গে সঙ্গে উহাই করা হইল। উমায়র (রা) বলিয়া উঠিলেন، হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি তো ইসলামের প্রদীপ নিভানোর কাজে বিভোর ছিলাম। আল্লাহ্ দীন গ্রহণকারীদিগকে কঠোর যাতনা দানকারী ছিলাম। উহা হইতে আল্লাহ তা'আলা আমাকে হিদায়াত দান করিয়াছেন। আমাকে এখন অনুমতি প্রদান করুন আমি মক্কায় ফিরিয়া যাইব، সেখানকার লোকদিগকে ইসলামের দা'ওয়াত দিব। হয়ত আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে হিদায়াত দান করিবেন। অন্যথায় তাহাদিগকে সেইরূপ কষ্টক্লেশ দিব، যেইরূপ সাহাবীগণকে আমি অমুসলিম অবস্থায় দিয়াছিলাম। তিনি মক্কার পথে রওয়ানা করিলে সাফওয়ান লোকদিগকে শুভ সংবাদ শোনার জন্য অপেক্ষা করিতে বলিয়াছিল। কিন্তু যখন তাহার কাছে উমায়ر (را)-এর ইসলাম গ্রহণ করিবার সংবাদ পৌছিল তখন সে শপথ করিল যে، উমায়ر (را)-এর সহিত কথা বলিবে না، তাহাকে কোন প্রকার সহযোগিতা করিবে না। ইবন ইসহাক বলেন، উমায়ر (را) মক্কাতে প্রত্যাবর্তন করিয়া সেখানে ইসলামের দা'ওয়াতের কাজ পরিচালনা করিলেন। উহাতে যাহারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিবার চেষ্টা করিয়াছিল তাহাদেরকে কঠোরভাবে তিনি দমন করেন। তাহার হাতে তখন বেশ কিছু অমুসলিম ইসলামে দীক্ষিত হয় (ইব্‌ن কাছীর، আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া، প্রাগুক্ত، ৩খ.، পৃ. ২৪৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00