📄 হিন্দ-এর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন
উহুদের যুদ্ধে আবূ সুফ্যানের পত্নী হিন্দ হযরত হামযা (রা)-এর কলিজা চিবাইতে চিবাইতে নৃত্য করিয়াছিল। সে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত কঠোর শত্রুতা পোষণ করিত। মক্কা বিজয়ের সময় বিপদের সমূহ আশংকাবোধ করা সত্ত্বেও সে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত ধৃষ্টতা করা হইতে পিছপা হয় নাই। অতঃপর হিনদ মুখমণ্ডল আবৃত করিয়া নিকাব পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। সম্ভ্রান্ত মহিলারা তখন সাধারণত নিকاب পরিয়াই বাহির হইত। কিন্তু তাহার নিকاب পরিবার উদ্দেশ্য ছিল যাহাতে লোকেরা তাহাকে চিনিতে না পারে। বায়'আতের সময় তাহার ধৃষ্টতাপূর্ণ কথোপকথনের ধরন ছিল নিম্নরূপ:
হিন্দঃ "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের নিকট হইতে কি কি বিষয়ের বায়'আত লইবেন।"
রাসূলুল্লাহ (س): "আল্লাহর সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না"
হিন্দ: "এই বায়আত তো আপনি পুরুষদের নিকট হইতে গ্রহণ করেন নাই। যাহা হউক، আমরা উহা গ্রহণ করিলাম।"
রাসولুল্লাহ (س): "চুরি করিও না।"
হিন্দ: আমি আমার স্বামীর (আবূ সুফ্যানের) অর্থ হইতে কোন কোন সময় অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যয় করিয়া থাকি। উহা বৈধ হইবে কি না?
রাসূলুল্লাহ (س): "সন্তান-সন্ততি হত্যা করিও না।"
হিন্দঃ "আমরা আমাদের সন্তানদিগকে শৈশবে লালন-পালন করিয়াছি। বড় হইবার পর (বদরের যুদ্ধে) আপনি তাহাদিগকে হত্যা করিয়াছেন। তখন আপনি ও তাহারা বোঝা-পড়া করিবেন।” উল্লেখ্য বদরের যুদ্ধে হিন্দ-এর ছেলেরা যুদ্ধ করিতে গিয়া নিহত হয় (শিবলী নু'মানী، প্রাগুক্ত، পৃ. ৩২৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে 'চিনিয়া ফেলিলেন، তবুও তাহাকে কিছু না বলিয়া ক্ষমা করিয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (س)-এর এই মহানুভবতায় আকৃষ্ট হইয়া সে যাহা বলিল، বুখারীর বর্ণনায় উহা নিম্নরূপ:
عن عائشة قالت لما جاءت هند بنت عتبة قالت يارسول الله ﷺ ما كان على ظهر الاض من أهل خباء احب الى ان يذلوا من اهل خباءك ثم ما اصبح اليوم على ظهر الأرض من اهل خباء احب الى ان يعزوا من اهل خباءك (رواه البخاري (٥٣٩/١) .
“আইশা (রা) বলেন، হিন্দ বিন্ত ‘উতবা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল، হে আল্লাহ্র রাসূল! ভূপৃষ্ঠে আপনার তাঁবু হইতে কোন ঘৃণিত তাঁবু আমার নিকট ছিল না। অতঃপর আজ আপনার সেই তাঁবু হইতে অধিক প্রিয় কোন তাঁবু আমার চোখের সম্মুখে আর একটিও নাই” (বুখারী، ১খ.، পৃ. ৫৩৯)।
📄 হুবার ইবনুল আসওয়াদকে ক্ষমা প্রদর্শন
হুবার ইবনুল আসওয়াদ ছিলেন সেই সকল দুবৃত্তদের অন্যতম মক্কা বিজয়ের পর যাহাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হইয়াছিল। তাহার বর্বরতা ছিল ইতিহাসখ্যাত। নবী দুলালী হযرت যায়নাব (রা) হিজরত করিয়া মক্কা হইতে মদীনা যাওয়ার প্রাক্কালে সে তাঁহাকে আটক করিয়া অবর্ণনীয় নির্যাতন করিয়াছিল। হযরত যায়নাব (রা) ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। হুবার তাহাকে উটের পিঠ হইতে ফেলিয়া এমন নির্মম আঘাত করিয়াছিল যে، উহার ফলে তাহার গর্ভপাত ঘটে। এই ঘৃণ্য ও নির্মম আচরণ ছাড়াও তাহার উপর আরও বহু অকল্পনীয় নির্যাতন করিয়াছিল। ফলে মক্কা বিজয়ের পর তাহার মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা শুনিয়া সে ইরানে পলাইয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই মতে ইরানের পথে রওয়ানাও করে। কিন্তু কিছু পথ অগ্রসর হইবার পর তাহার অন্তরে ঈমানের আলো জ্বলিয়া উঠে। অতঃপর সে ফিরিয়া আসিয়া দরবারে নবৃওয়াতে নিবেদন করিল:
السلام عليك يا نبي الله اشهد ان لا اله الا الله واشهد ان محمدا رسول الله لقد هربت منك في البلاد واردت اللحاق بالاعاجم ثم ذكرت عائدتك وصلتك وصفحك فاصفح عن جهلى وعما كان بلغك عنى مقر بسوء فعلى معترف بذنبي .
“আসসালামু আলায়কা ইয়া নাবীয়্যাল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে، আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে، মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আমি আপনার ভয়ে দেশত্যাগের মনস্থ করিয়াছিলাম এবং অনারব অমুসলিমদের সহিত বসবাস করিবার মানসে রওয়ানা করিয়াছিলাম। অতঃপর আমার স্মরণ হইল আপনার অসীম দয়া، সম্পর্ক বজায় রাখা ও ক্ষমাসুলভ ঔদার্যের কথা। আমি এখন আপনার করুণার প্রত্যাশী। আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার নিকট আমার অসদাচারণের যত অভিযোগ পৌঁছিয়াছে সবই সত্য। আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করিতেছি।" তাহার এই ক্ষমা প্রার্থনার ভাষায় রাসূলুল্লাহ (س)-এর কোমল হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হইল। তিনি ঘোষণা করিলেন:
قد عفوت عنك وقد احسن الله اليك حيث هداك الى الاسلام.
“আমি তোমাকে ক্ষমা করিয়া দিলাম। আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিয়াছেন বলিয়াই হিদায়াতের আলোর পথে তোমাকে পথ দেখাইয়াছেন” (আল-ইসাবা ফী তাম্মীযিস সাহাবা، ৩খ.، পৃ. ৫৮৭)।
📄 সাফওয়ান ইবন উমায়্যাকে ক্ষমা
অবিশ্বাসী কুরায়শদের অন্যতম প্রধান নেতা ছিল সাফওয়ান ইব্ন উমায়্যা। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার জন্য বড় অংকের পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া উমায়র ইব্ন ওয়াহবকে নিযুক্ত করিয়াছিল। মক্কা বিজয়ের পর ইয়ামানে পলায়নের জন্য সে মক্কা হইতে বাহির হইয়া জিদ্দায় গিয়া আত্মগোপন করিয়াছিল। উমায়ের ইব্ন ওয়াহ্হ্ব রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাহার নিরাপত্তার জন্য নিবেদন করিল। রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে নিরাপত্তা দানের ঘোষণা দিলেন। উমায়র পুনরায় নিবেদন করিলেন, নিরাপত্তার নিদর্শন প্রদান করিলে তাহার মনে আস্থা সৃষ্টি হইত। তাহার এই আবেদনে সাড়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পাগড়ী তাহার হাতে তুলিয়া দিলেন।
উমায়র এই পবিত্র পাগড়ী সঙ্গে লইয়া সাফওয়ানের নিকট পৌছিলেন এবং তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক নিরাপত্তা দানের কথা অবহিত করিলেন। সাফওয়ান শুনিয়া বলিলেন, দরবারে নবৃওয়াতে উপনীত হইলে আমার জীবন সংকটাপন্ন হইতে পারে। উমায়র বলিলেন, আপনি মুহাম্মাদ (স)-এর মহানুভবতা ও ক্ষমা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হইবার কারণেই এমন ধারণা পোষণ করিতেছেন। আসুন, আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করা হইবে না। এই কথা শুনিয়া সাফওয়ান উমায়রের সঙ্গে দরবারে নবৃওয়াতে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাহার প্রথম প্রশ্ন ছিল, হে আল্লাহর রাসুল। আপনি কি আমাকে ক্ষমা করিয়া নিরাপত্তা দান করিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, হাঁ, তোমাকে নিরাপত্তা প্রদান করা হইয়াছে। অতঃপর সাফওয়ান নিবেদন করিল, আমাকে দুই মাসের সময় দিন। রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন, দুইমাস নয়، তোমাকে চার মাসের সময় প্রদান করা হইল। উহার পর সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ (س)-এর ক্ষমা ও ঔদার্যে অভিভূত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন (ইবন কাছীর، আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা، ৩খ.، পৃ. ৫৮৪)।
📄 আবু সুফ্যানের প্রতি ঔদার্য প্রদর্শন
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আবূ সুফ্য়ান ছিলেন মুহাম্মদ (س) ও ইসলামের চরম শত্রু। শত্রুতার এমন কোন দিক বাকী থাকে নাই যাহা আবু সুফ্য়ান গ্রহণ করেন নাই। মুহাম্মাদ (س)-এর মাক্কী জীবনে এক মুহূর্তও তিনি তাঁহাকে শাস্তিতে থাকিতে দেন নাই। হিজরত-পরবর্তী জীবনে বদর হইতে শুরু করিয়া মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন এই আবূ সুফ্য়ান। পরিচালিত সকল যুদ্ধের অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় সঙ্গত কারণেই তাহাকে ইসলামের প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা হইত। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হইবার পর মুহাম্মাদ (س)-এর দরবারে তাহাকে উপস্থিত করা হয়। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (را) মুহাম্মাদ (س)-এর সকাশে، তাহাকে হত্যা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (س) তাহাকেই কেবল নয়، বরং তাহার গৃহে যত লোক আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল সকলকে ক্ষমা করিয়া দিবার ঘোষণা দিয়া বিশ্বের ইতিহাসে মহত্ত্বের অনুপম আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন। আবূ সুফ্য়ানকে যখন মুহাম্মদ (س)-এর দরবারে আনা হয় তখন মুহাম্মাদ (س) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন، হে আবু সুফ্য়ান! এখনও কি তোমার সময় হয় নাই যে، তুমি এই কথা বিশ্বাস করিবে، আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই؟ আবূ সুফ্য়ানের পক্ষ হইতে জওয়াব ছিল এইরূপঃ
بابي انت وامى ما احلمك واكرمك واوصلك والله لقد ظننت ان لوكان مع الله غيره لقد اغنى عنى شيئا بعد .
"আপনার প্রতি উৎসর্গিত আমার পিতা-মাতার শপথ করিয়া বলিতেছি، আপনার চাইতে ক্ষমাশীল، দয়াশীল ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যথাযথভাবে রক্ষাকারী অন্য কেহ নাই। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কেহ অংশীদার থাকিত তাহা হইলে এই মুহূর্তে সে আমাকে অল্প হইলেও রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিত।"
মুহাম্মাদ (س) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন، আবূ সুফ্য়ান! আমাকে রাসূল জ্ঞান করিবার সময় কি এখনও হয় নাই؟ তখনও সে মুহাম্মাদ (স)-এর উপরিউক্ত মহৎ গুণগুলির কথা স্বীকার করিয়া বলিল، হাঁ، এখনও এই ব্যাপারে আমার অন্তরে কিঞ্চিত সংশয় রহিয়াছে। ইহার অল্পক্ষণ পরই হযরত আব্বাস ইব্ن ابديل মুত্তালিব (রা)-এর উপস্থিতিতে তিনি সর্বান্তকরণে ইসলাম গ্রহণ করিবার ঘোষণা দিলেন। অতঃপর মুহাম্মাদ (س) ঘোষণা করিলেনঃ
من دخل دار ابی سفیان فهو امن .
"আবু সুফ্যানের গৃহে যে ব্যক্তি আশ্রয় গ্রহণ করিবে সেও নিরাপদ"।
বর্ণিত রহিয়াছে যে، মক্কা বিজয়ের দিন আনসারদের পতাকা বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন হযরত সা'দ ইবন উবাদা (را)। তিনি আবু সুফ্য়ান (را)-কে দেখিয়া বলিয়াছিলেন،
اليوم يوم الملحمة اليوم تستحل الحرمة وفى رواية اليوم تستحل الكعبة .
"আজ হইল যুদ্ধের দিন، ক্ষমার দিন নয়। আজ হারাম শরীফের ভিতরও যুদ্ধ করা বৈধ। মতান্তরে আজ কা'বার ভিতর যুদ্ধের জন্য বৈধ।"
আবূ সুফ্য়ান (রা) তাহার এই উক্তি সম্পর্কে মুহাম্মাদ (س)-কে অবহিত করিলেন। মহানবী (س) তাঁহাকে বলিলেন، সা'দ ইবন উবাদার উক্তি ঠিক নয়:
لكن هذا يوم يعظم الكعبة ويوم تكسى فيه الكعبة .
"বরং আজ আল্লাহ তা'আলা কা'বাকে সম্মানিত করিবেন، আজিকার দিন কা'বাকে গিলাফ পরানো হইবে।"
সা'দ ইবন 'উবাদার এই উক্তিতে বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করিয়া মুহাম্মাদ (س) তাঁহার নিকট হইতে আনসারদের পতাকা অপসারণ করিয়া তৎপুত্র কায়س ইবন সা'د (را)-এর হাতে অর্পণ করিলেন (আল-বিদায়া وয়ান-নিহায়া، পৃ. ২৩২-২৩৪)।