📄 মক্কা বিজয়ের পর কাফিরদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
মক্কার অবিশ্বাসীদের যাতনায় রাসূলুল্লাহ (س)-কে এক সময় মাতৃভূমি ত্যাগ করিতে হইয়াছিল। মক্কার জীবনে এখানকার কাফিররা তাঁহার উপর، তাঁহার অনুসারীদের উপর ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি যে সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার করিয়াছিল উহা ইতিহাসের পাঠকমাত্রই অবহিত। দীর্ঘ তিনটি বৎসর রাসূলুল্লাহ (س) বানু হাশিমসহ শি'বে আবু তালিবে পরিবার-পরিজনসহ বন্দী জীবন কাটাইয়াছিলেন। সেই কঠিন দিনগুলিতে জালিমরা সেই তৃণলতাহীন গিরি উপত্যকায় শস্যের দানা পর্যন্ত পৌঁছিতে দেয় নাই। ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হইয়া শিশু সন্তানরা যখন আর্তস্বরে ক্রন্দন করিত তখন দুরাত্মারা অদূরে বসিয়া অট্টহাসিতে ফাটিয়া পড়িত। আরও কতইনা অকল্পনীয় নিপীড়ন চালাইয়াছিল উহা ব্যক্ত করা যায় না। অবশেষে তাঁহাকে হত্যা করিবার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করিলে তিনি মক্কা ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। মক্কা ত্যাগ করিবার প্রাক্কালে তিনি বারবার মক্কার দিকে তাকাইয়া বলিতেন، ওহে মক্কা! আমি তো তোমাকে ত্যাগ করিতে চাহি নাই। কিন্তু দূরাত্মারা আমাকে এখানে থাকিতে দিল না। সেই মক্কায় যখন তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করিলেন তখন তো তাঁহার প্রতিশোধ গ্রহণের সর্বাপেক্ষা উত্তম সুযোগ ছিল। কাফিরদেরকে যখন অবনত মস্তকে তাঁহার সম্মুখে আনা হইল তখন তিনি ঘোষণা করিলেন :
لا تثريب عليكم اليوم اذهبوا انتم الطلقاء.
"আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নাই। যাও، তোমরা সবাই মুক্ত-স্বাধীন" (শিবলী নু'মানী، سيرة النبي، বঙ্গানুবাদ، পৃ. ৬৮২)।
📄 ওয়াহ্শীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন
সায়্যিদুশ শুহাদা' হযরত হামযা (را)-এর হত্যাকারী ছিল ওয়াহ্শী। উহুদ যুদ্ধে সর্বাপেক্ষা দৃঢ়বাহু হযরত হামযা (را)-কে অত্যন্ত নির্মমভাবে এই ওয়াহ্শী হত্যা করে। শাহাদাতের মর্যাদা লাভকারীদের নেতা হিসাবে স্বীকৃত এই হামযা (را) রাসূলুল্লাহ (س)-এর পিতৃব্যও ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর ওয়াহ্শী তাইফে পালাইয়া গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু তাইফও যখন রাসূলুল্লাহ (س)-এর করতলগত হইল তখন উপায়ন্তর না দেখিয়া ওয়াহশী প্রতিনিধির রূপ ধারণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইল। কারণ সে জানিত، রাসূলুল্লাহ (س) কোন প্রতিনিধি দলের সদস্যের সহিত কঠোরতা প্রদর্শন করেন না। খোদ ওয়াহ্শীর মুখ হইতেই বিষয়টি এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
قال ثم خرجت الى الطائف فارسلوا الى رسول الله ﷺ فقيل له انه لا يهيج الرسل قال فخرجت معهم حتى قدمت على رسول الله ﷺ فلما رآني قال انت وحشي قلت نعم قال انت قتلت حمزة قلت قد كان من الامر ما قد بلغك قال فهل تستطيع أن تغيب وجهك عنى قال فخرجت فلما قبض رسول الله ﷺ فخرج مسيلمة الكذاب قلت لا خرجن الى مسيلمة لعلى اقتله فاکافی به حمزة رواه البخاري (٥٨٣/٢) .
“ওয়াহ্শী বলিল، অতঃপর আমি তাইফ চলিয়া গেলাম। এখান হইতে লোকেরা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট প্রতিনিধিদল প্রেরণ করিল। কারণ তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল، রাসূলুল্লাহ (س) কোন প্রতিনিধি দলের সহিত অসদাচরণ করেন না। ওয়াহ্শী বলিল، আমি প্রতিনিধি দলের সহিত রওয়ানা হইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আগমন করিলাম। আমাকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (س) জিজ্ঞাসা করিলেন، তুমি ওয়াহ্শী! আমি বলিলাম হাঁ। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন، তুমি কি হামযাকে হত্যা করিয়াছ؟ আমি বলিলাম، আপনার নিকট যেই সংবাদ পৌছিয়াছে উহা ঠিক সেইভাবে সংঘটিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، তুমি কি আমার সম্মুখ হইতে দূরে থাকিতে সক্ষম হইবে؟ আমি হাঁ সূচক উত্তর দিয়া সেই স্থান হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম। রাসূলুল্লাহ (س)-এর ইনতিকালের পর যখন মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার মুসায়লামার আবির্ভাব হইল তখন আমি এই সংকল্প করিয়া বাহির হইলাম যে، তাহাকে হত্যা করিব এবং এই হত্যাই হইবে হামযাকে হত্যা করিবার কাফফারাস্বরূপ” (বুখারী، সাহীহ، ২খ.، পৃ. ৫৮৫)।
📄 আবূ জাল-পুত্র ইকরিমার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন
আবু জাহল ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর চিরশত্রু। তাহার মর্মান্তিক হত্যার পর তাহার পুত্র ইকরামা তাহার স্থান দখল করে। রাসূলুল্লাহ (س)-ও ইসলামের শত্রুতায় পিতার অবর্তমানে সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে এবং কাফির কুরায়শদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। মক্কা বিজয়ের পর উপায়ন্তর না দেখিয়া সে ইয়ামানে পালাইয়া যায়। অতঃপর মক্কায় অবস্থানরত তাহার স্ত্রী ইসলামে দীক্ষিত হন। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর স্বীয় স্বামীর নিকট তিনিও ইয়ামানে চলিয়া যান। সেখানে স্বামী ইকরামাকে ইসলামে দীক্ষিত করিতে তিনি সক্ষম হন। অতঃপর তাহাকে সঙ্গে লইয়া তিনি মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে দরবারে নবুওয়্যাতে আসিতে দেখিয়া তাহার পূর্বের সকল কৃতকর্ম ক্ষমা করিয়া দেন। তাহাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে স্বাগত জানাইতে এতই উচ্ছ্বসিত হন যে، তখন তাঁহার দেহের চাদর খসিয়া পড়িয়া যায়। পবিত্র মুখ হইতে উচ্চারিত হয়:
مرحبا بالراكب المهاجر . "সু-স্বাগতম হে মুহাজির আরোহী" (তিরমিযী، বরাত মিশকাত، পৃ. ৪০২)।
📄 হিন্দ-এর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন
উহুদের যুদ্ধে আবূ সুফ্যানের পত্নী হিন্দ হযরত হামযা (রা)-এর কলিজা চিবাইতে চিবাইতে নৃত্য করিয়াছিল। সে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত কঠোর শত্রুতা পোষণ করিত। মক্কা বিজয়ের সময় বিপদের সমূহ আশংকাবোধ করা সত্ত্বেও সে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত ধৃষ্টতা করা হইতে পিছপা হয় নাই। অতঃপর হিনদ মুখমণ্ডল আবৃত করিয়া নিকাব পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। সম্ভ্রান্ত মহিলারা তখন সাধারণত নিকاب পরিয়াই বাহির হইত। কিন্তু তাহার নিকاب পরিবার উদ্দেশ্য ছিল যাহাতে লোকেরা তাহাকে চিনিতে না পারে। বায়'আতের সময় তাহার ধৃষ্টতাপূর্ণ কথোপকথনের ধরন ছিল নিম্নরূপ:
হিন্দঃ "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের নিকট হইতে কি কি বিষয়ের বায়'আত লইবেন।"
রাসূলুল্লাহ (س): "আল্লাহর সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না"
হিন্দ: "এই বায়আত তো আপনি পুরুষদের নিকট হইতে গ্রহণ করেন নাই। যাহা হউক، আমরা উহা গ্রহণ করিলাম।"
রাসولুল্লাহ (س): "চুরি করিও না।"
হিন্দ: আমি আমার স্বামীর (আবূ সুফ্যানের) অর্থ হইতে কোন কোন সময় অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যয় করিয়া থাকি। উহা বৈধ হইবে কি না?
রাসূলুল্লাহ (س): "সন্তান-সন্ততি হত্যা করিও না।"
হিন্দঃ "আমরা আমাদের সন্তানদিগকে শৈশবে লালন-পালন করিয়াছি। বড় হইবার পর (বদরের যুদ্ধে) আপনি তাহাদিগকে হত্যা করিয়াছেন। তখন আপনি ও তাহারা বোঝা-পড়া করিবেন।” উল্লেখ্য বদরের যুদ্ধে হিন্দ-এর ছেলেরা যুদ্ধ করিতে গিয়া নিহত হয় (শিবলী নু'মানী، প্রাগুক্ত، পৃ. ৩২৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে 'চিনিয়া ফেলিলেন، তবুও তাহাকে কিছু না বলিয়া ক্ষমা করিয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (س)-এর এই মহানুভবতায় আকৃষ্ট হইয়া সে যাহা বলিল، বুখারীর বর্ণনায় উহা নিম্নরূপ:
عن عائشة قالت لما جاءت هند بنت عتبة قالت يارسول الله ﷺ ما كان على ظهر الاض من أهل خباء احب الى ان يذلوا من اهل خباءك ثم ما اصبح اليوم على ظهر الأرض من اهل خباء احب الى ان يعزوا من اهل خباءك (رواه البخاري (٥٣٩/١) .
“আইশা (রা) বলেন، হিন্দ বিন্ত ‘উতবা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল، হে আল্লাহ্র রাসূল! ভূপৃষ্ঠে আপনার তাঁবু হইতে কোন ঘৃণিত তাঁবু আমার নিকট ছিল না। অতঃপর আজ আপনার সেই তাঁবু হইতে অধিক প্রিয় কোন তাঁবু আমার চোখের সম্মুখে আর একটিও নাই” (বুখারী، ১খ.، পৃ. ৫৩৯)।