📄 আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা)-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর আচরণ
আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) ছিলেন আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী একজন মহিলা সাহাবী। খায়বার বিজয়ের সময় তিনি ও তাঁহার সঙ্গীরা মদীনায় ফিরিয়া আসেন। একদা তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসা (রা)-এর সহিত সাক্ষাত করিতে গেলে সেখানে উমার (রা)-এর সহিত তাঁহার কথা হয়। হযরত উমার (রা) তাঁহার পরিচয় জানিতে গিয়া বলিলেন, তিনি কি সেই আসমা' যিনি সমুদ্র পাড়ি দিয়া হাবশায় হিজরত করিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন, হাঁ, আমিই সেই আসমা'। কোন এক প্রসঙ্গে 'উমার (রা) তখন বলিলেন, আমরা তোমাদের আগেই মদীনায় হিজরত করিয়াছি। সুতরাং তোমাদের তুলনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি আমাদের হক বেশী। তাঁহার কথা শুনিয়া আসমা' (রা) অসন্তুষ্ট হইলেন এবং বলিলেন, উহা কখনও হইতে পারে না। আপনারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আশ্রয়ে ছিলেন। তিনি না খাইয়া ক্ষুধার্তকে আহার দিতেন, তোমাদিগের অজ্ঞদিগকে নসীহত করিতেন। আর আমরা স্বদেশত্যাগী হইয়া বহু দূরে শত্রুদের দেশে ছিলাম। আমাদের দেশত্যাগের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ্হ্হ্র সন্তুষ্টি বিধান ও তাঁহার রাসূলের মনোত্তুষ্টি। আল্লাহ্র কসম! আমি কোন খাবার ও পানীয় গ্রহণ করিব না যেই পর্যন্ত আপনার উক্তিটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট না বলিব। আমরা যে সেখানে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত ছিলাম তাহাও বলিব। অবশ্য অতিরঞ্জিত কিছুই বলিব না। ইতোমধ্যে হাফসা (রা)-এর গৃহে রাসূলুল্লাহ (স) তাশরীফ আনিলেন। আসমা (রা) তখন রাসূলুল্লাহ (س)-কে উমার (রা)-এর উক্তিগুলি শুনাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, উহার উত্তরে তুমি কি বলিয়াছ? তিনি যাহা বলিয়াছিলেন রাসূলুল্লাহ (س)-কে উহা অবহিত করিলেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ليس باحق بي منكم وله ولاصحابه هجرة واحدة ولكم انتم اهل السفينة هجرتان .
"আমার প্রতি উমারের হক তোমাদের হইতে বেশী নয়। উমার ও তাঁহার সঙ্গিগণ মাত্র একটি হিজরত করিয়াছে। আর তোমরা নৌযানে আরোহিগণ দুইটি হিজরতের অধিকারী।"
অতঃপর আসমা (রা) বলেন, "কথাটি প্রচারিত হইয়া গেলে আমি দেখিতে পাইলাম, আবু মূসা (রা) ও হাবশায় হিজরতকারী নৌযানে আরোহী লোকজন দলে দলে আমার নিকট আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই উক্তি সম্পর্কে জানিতে চাহিত। তাহাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কথাগুলি হইতে আনন্দদায়ক অন্য কিছুই ছিল না” (বুখারী, সাহীহ, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬০৮)।
📄 মুলায়কা (রা)-এর দা'ওয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশগ্রহণ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিশিষ্ট খাদিম হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর দাদী ছিলেন হযরত মুলায়কা (রা)। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য কিছু খাবার তৈরি করিয়া তাঁহাকে দা'ওয়াত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই দা'ওয়াত গ্রহণে কুণ্ঠাবোধ করিলেন না। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس بن مالك ان جدته مليكة دعت رسول الله ﷺ لطعام صنعته له فاكل منه ثم قال قوموا فلاصلى لكم قال انس فقمت الى حضير لنا قد اسود من طول ما لبس فنضحته بماء فقام رسول الله ﷺ وصففت واليتيم وراءه والعجوز من ورائنا فصلى لنا رسول الله ﷺ ركعتين ثم انصرف (رواه البخاري (٥٥).
“আনাস ইবন মালিক (را) হইতে বর্ণিত। তাঁহার দাদী (বা নানী) মুলায়কা (را) খাবার তৈরি করিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-কে দা'ওয়াত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার খাদ্য গ্রহণ করিলেন, অতঃপর বলিলেন, তোমরা সকলে দাঁড়াও, আমি তোমাদিগকে লইয়া সালাত আদায় করিব। আনাস (را) বলেন, আমি তখন আমাদের পুরাতন একটি চাটাইর দিকে অগ্রসর হইলাম। চাটাইটি পুরাতন হওয়ায় ময়লাযুক্ত থাকায় ধৌত করিলাম। রাসূলুল্লাহ (س) সালাতে দাঁড়াইলেন। আমি ও আমাদের ইয়াতীম তাঁহার পিছনে দাঁড়াইলাম আর বৃদ্ধা আমাদের পিছনে দাঁড়াইলেন। এইভাবে রাসূলুল্লাহ (س) আমাদিগকে লইয়া দুই রাক'আত সালাত আদায় করিলেন, অতঃপর আমাদের নিকট হইতে প্রস্থান করিলেন” (বুখারী, সাহীহ, ১খ., পৃ. ৫৫)।
কুরায়শ গোত্রের কিছু মহিলা একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আলাপরত অবস্থায় ছিলেন। ইত্যবসরে হযরত উমার (را) মজলিসে উপস্থিত হইলেন। মহিলারা তাঁহাকে দেখিয়া আড়ালে চলিয়া গেলেন। উহা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (س) হাসিতে লাগিলেন। উমার (را) তখন মহিলাদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, আমাকে দেখিয়া তোমরা পালাইতেছ কেন؟ তাহারা উত্তরে বলিল, আপনি যে রাসূলুল্লাহ (س)-এর তুলনায় কঠোর প্রকৃতির লোক। বর্ণিত হইয়াছে:
عن سعد بن ابي وقاص انه قال استاذن عمر بن الخطاب على رسول الله ﷺ وعنده نسوة من قريش يكلمنه ويستكثرنه عالية اصواتهن على صوته فلما استاذن عمر بن الخطاب قمن بادرن الحجاب فاذن له رسول الله ﷺ فدخل عمر ورسول الله ﷺ يضحك فقال عمر اضحك الله سنك يارسول الله فقال النبي ﷺ عجبت من هؤلاء اللاتي كنا عندى فلما سمعن صوتك ابتدر الحجاب فقال عمر فانت ان يهبن يارسول الله ثم قال عمر يا عدوات انفسهن اتهبننى ولا تهبن رسول الله ﷺ. فقلن نعم انت افظ واغظ من رسول الله ﷺ فقال رسول الله ﷺ ايه يا ابن الخطاب والذي نفسي بيده ما لقيك الشيطان سالكا فجا قط الاسلك فجا غير فجك (رواه البخاري - ٥٢).
সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (را) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট কুরায়শ গোত্রের কতিপয় মহিলার আলাপরত অবস্থায় 'উমার ইব্নুল খাত্তাব (را) প্রবেশের অনুমতি চাহিলেন। মহিলারা তখন উচ্চস্বরে তাহাদিগকে বেশি পরিমাণে দীনের জন্য আবদার করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (س)-এর কণ্ঠস্বর হইতে তাহাদিগের কণ্ঠস্বর বেশী উঁচু ছিল। উমার (را) প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করিবার সঙ্গে সঙ্গে তাহারা উঠিয়া দাঁড়াইল এবং পর্দার অন্তরালে চলিয়া গেল। উমার (را)-কে প্রবেশের অনুমতি দান করিলে তিনি প্রবেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে দেখিয়া হাসিতে লাগিলেন। উমার (را) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ আপনাকে আনন্দিত করুন। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আশ্চর্য হইলাম, তোমার ধ্বনি শুনিবামাত্র তাহারা দ্রুত পর্দার অন্তরালে চলিয়া গেল। 'উমার (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনাকেই তো উহাদিগের বেশী ভয় করা উচিত ছিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে নিজেদের ধ্বংসকারিনিগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর অথচ রাসূলুল্লাহ্ (س) ভয় কর না। তাহারা উত্তর দিল, হাঁ, আপনি যে রাসূলুল্লাহ (س) হইতে কঠোর বাক্য প্রয়োগকারী ও কঠোর মনোভাব পোষণকারী। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র উমার! শপথ সেই আল্লাহর যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! তুমি যেই পথ দিয়া চলাচল করিবে সেই পথে চলিয়া শয়তান কখনও তোমার সহিত সাক্ষাত করিবে না। হাঁ, তোমার যাওয়ার পথ ত্যাগ করিয়া শয়তান অন্য পথ ধরিবে” (বুখারী, আস-সাহীহ, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৫২০, ৪৬৫)।
পুরুষ লোকেরা অহরহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্নিধ্য লাভ করিত এবং তাঁহার ওয়াজ-নসীহত শুনিয়া ধন্য হইত। কিন্তু নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে মহিলারা সেই সুযোগ হইতে বঞ্চিত ছিল। তাই তাহাদিগকে উপদেশ প্রদানের লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (স) পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابي سعيد قال جاءت امرأة الى رسول الله ﷺ فقالت يا رسول الله ذهب الرجال بحديثك فاجعل لنا من نفسك يوما نأتيك فيه تعلمنا مما علمك الله فقال اجتمعن في يوم كذا وكذا في مكان كذا وكذا فاجتمعن فاتاهن رسول الله ﷺ فعلمهن مما علمه الله ثم قال ما منكن تقدم بين يديها من ولدها ثلثة الا كان لها حجابا من النار فقالت امرأة منهن يارسول الله اثنين قال فاعادتها مرتين ثم قال واثنين واثنين واثنين .
“আবু সা'ঈদ (রা) বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! পুরুষরা আপনার ওয়াজ-নসীহতে সার্বক্ষণিক অংশগ্রহণ করিয়া উপকৃত হইতেছে। আপনি আপনার পক্ষ হইতে আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করিয়া দিন, আমরা সেদিন আপনার নিকট উপস্থিত হইব এবং আপনি আমাদিগকে শিক্ষা দিবেন, যাহা আল্লাহ তা'আলা আপনাকে শিক্ষা দিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, অমুক অমুক দিন অমুক অমুক স্থানে তোমরা সমবেত হইবে। কথামত তাহারা একত্র হইল। রাসূলুল্লাহ (س) সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে তাহা শিক্ষা দিলেন, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে শিখাইয়াছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাদের মধ্যে যেই মহিলার তিনটি সন্তান ইন্তিকাল করিবে, উহারা তাহার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হইবে। এক মহিলা বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! দুইটি সন্তানের মৃত্যু হইলেও কি তাহাই হইবে؟ সে কথাটি দুইবার পুনরাবৃত্তি করিল। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, হাঁ, দুই সন্তান হইলেও, দুই সন্তান হইলেও, দুই সন্তান হইলেও” (বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ১০৮৭)।
📄 নারীদের কোমল স্বভাব ও অনুভূতির প্রতি বিশেষ দৃষ্টিদান
আনজাশা (রা) ছিল রাসূলুল্লাহ (س)-এর অন্যতম গোলাম। সে হাবশী সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। তাঁহার কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মধুর। এক সফরে হূদী (উষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গীত) আবৃত্তি করিয়া উষ্ট্রারোহীদের লইয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। সুরের তালে উটগুলিও দ্রুত্ত আগাইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন আনজাশা-কে ডাকিয়া বলিলেন, তোমার সুর লহরীতে যেন স্ত্রীলোকদের অন্তর আকৃষ্ট না হয়। বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس قال كان رسول الله له في بعض أسفاره وغلام اسود يقال له انجشة يحدوا فقال رسول الله الله يا انجشة رويدك سوقا بالقوارير وفي رواية فقال له رسول الله الله رویدا یا انجشة لا تكسر القوارير يعني ضعفة النساء رواه مسلم في صحيحه - ٢٥٠ ) .
"আনাস (را) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) এক সফরে ছিলেন। উহাতে তাঁহার সঙ্গে আনজাশা নামীয় তাঁহার কাল একটি গোলামও ছিল। সে 'হৃদী' আবৃত্তি করিয়া (উষ্ট্রারোহী) কাফেলা হাঁকাইয়া লইয়া যাইত। রাসূলুল্লাহ্ (س) তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আনজাশা! কাঁচের চালানের প্রতি লক্ষ্য রাখ। অপর রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে বলিলেন, তোমার উট জোরে হাঁকিয়া কাঁচের চালান ভাঙ্গিয়া ফেলিও না” (মুসলিম, আস্-সাহীহ, হিন্দ বিন্ত উতবা (را) ছিলেন আবু সুফ্য়ান (را)-এর স্ত্রী। স্বামী কর্তৃক বরাদ্দকৃত খোরপোষ তাঁহার জন্য যথেষ্ট হইত না। একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট বিষয়টি উত্থাপন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে প্রয়োজন মাফিক স্বামীর অগোচরে তাহার সম্পত্তি হইতে খোরপোষ গ্রহণ করিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। বর্ণিত হইয়াছেঃ
عن عائشة قالت دخلت هند بنت عتبة امرأة أبي سفيان على رسول الله ﷺ فقالت يا رسول الله ان أبا سفيان رجل شحيح لا يعطيني من النفقة ما يكفيني ويكفي بني الا ما اخذت من ماله بغير علمه فهل على في ذلك من جناح فقال رسول الله ﷺ خذى من ماله بالمعروف ما يكفيك ويكفي بنيك (رواه مسلم - ٧٥) .
“আইশা (را) বলেন, আবু সুফ্য়ান (را)-এর স্ত্রী হিন্দ বিন্ত 'উতবা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট প্রবেশ করিলেন এবং বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আবু সুف্য়ান একজন কৃপণ লোক। তিনি আমার ও আমার সন্তানদের জন্য প্রয়োজন পরিমাণ খورপোষ দেন না। আমি তাহার অজ্ঞাতসারে তাহার মাল হইতে কিছু গ্রহণ করা ব্যতীত আমার সংসার চলে না। উহাতে আমার কোন গোনাহ্ হইবে কি؟ রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তোমার ও তোমার সন্তানদের জন্য যেই পরিমাণে যথেষ্ট হয় সেই পরিমাণ তুমি ন্যায়সঙ্গতভাবে (তাহার অজ্ঞাতসারে) গ্রহণ করিতে পার” (মুসলিম, আস্-সাহীহ, ২খ, পৃ. ৭৫; ইনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল-মা'আদ, ৫খ., পৃ. ৪৯০)।
আসমা বিন্ত আবী বাক্স (را) ছিলেন উন্নত জননী 'আইশা (রা)-এর বৈমাত্রেয় ভগ্নী এবং হযরত যুবায়র (রা)-এর স্ত্রী। হিজরতের সময় তিনি সর্বস্বান্ত হইয়া মদীনায় আগমন করিয়াছিলেন। হযরত যুবায়র (را)-এর একটি ঘোড়া ব্যতীত তাঁহার আর কিছুই ছিল না। হযরত আসমা (را) নিজ হস্তে ঘোড়াটির ঘাস-পানির ব্যবস্থা করিতেন। একদা মাথায় করিয়া তিনি ঘোড়ার ঘাস বহন করিতেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (س) তাঁহাকে এমতাবস্থায় দেখিয়া স্বীয় উট হইতে অবতরণ করিলেন এবং তাহাকে তাঁহার উটের উপর সওয়ার হইবার আহ্বান জানাইলেন।
عن أسماء بنت ابي بكر قالت تزوجنى الزبير وماله في الارض من مال ولا مملوك ولا شيئ غير فرسه قالت فكنت اعلف فرسه واكفيه مؤنته واسوسه وادق النوى لناضحه واعلقه واستقى الماء واخرز غربه واعجن ولم اكن احسن اخبز فكان يخبز لي جارات لى من الانصار وكن نسوة صدق قالت وكنت انقل النوى من ارض الزبير التي اقطعه رسول الله ﷺ على رأسي وهي على ثلثي فرسخ قالت فجئت يوما والنوى على رأسى فلقيت رسول الله ﷺ ومعه نفر من اصحابه فدعاني ثم قال اخ اخ ليحملني خلفه قالت فاستحييت وعرفت غيرتك فقال والله لحملك النوى على رأسك اشد من ركوبك معه قالت حتى ارسل الى ابو بكر بعد ذلك بخادم فكفتنى سياسة الفرس فكانما اعتقني (رواه مسلم (۲۱۸) .
"আসমা বিন্ত আবী বাক্স (را) বলেন, আমাকে আয-যুবায়র (রা) বিবাহ করিলেন। তাঁহার না ছিল কোন সম্পদ, না দাস-দাসী এবং না অন্য কিছু, শুধু ছিল তাঁহার একটি ঘোড়া। আমি তাঁহার ঘোড়ার ঘাসপাতা কাটিতামা, উহার প্রয়োজনাদির ব্যবস্থা করিতাম, উহা চরাইতাম এবং পানি পান করানোর স্থানে লইয়া যাইতাম, তাহার জন্য বড় গামলা বসাইয়া রাখিতাম, রুটির কাই তৈরি করিতাম। আমি কিন্তু উত্তমভাবে রুটি তৈরি করিতে পারিতাম না। আমাকে আনসার গোত্রের মেয়েরা রুটি বানাইয়া দিত। উহারা ছিল সত্যবাদী মহিলা। তিনি বলেন, আয-যুবায়র (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (س) যেই ভূমি দান করিয়াছিলেন তথা হইতে আমি ঘোড়ার ঘাস মাথায় করিয়া বহন করিতাম। সেই স্থানটি ছিল মদীনা হইতে দুই মাইল দূরে অবস্থিত। একদা আমি মাথায় করিয়া ঘাস লইয়া আসিতেছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত আমার সাক্ষাত ঘটে। তাঁহার সহিত একদল সাহাবীও ছিলেন। আমাকে দেখিয়া তিনি সওয়ারীতে তাঁহার পিছনে উপবেশন করিবার আহ্বান জানাইলেন। আমাকে তাঁহার পিছনে উঠাইবার জন্য উটকে বসাইবার ধ্বনি দিলেন। আমি তাঁহার পিছনে বসিতে লজ্জাবোধ করিলাম এবং বলিলাম, আপনার মর্যাদা সম্পর্কে তো আমি অবহিত। রাসূলুল্লাহ (س) তখন বলিলেন, তোমার মাথায় ঘাসের বোঝাটি আমার নিকট উটের উপর সওয়ার হওয়া হইতে অধিক কষ্টদায়ক মনে হইতেছে। আসমা (را) বলেন, কিছুদিন পর আবু বকর (را) আমার উদ্দেশ্যে একটি খাদেম প্রেরণ করেন। তখন হইতে উটের ঘাসপাতা সংগ্রহ করিবার জন্য সে-ই যথেষ্ট হইল। খাদেমটি দান করিয়া তিনি যেন আমাকে মুক্ত করিলেন” (মুসলিম, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ২১৮)।
রাসূলুল্লাহ (س) স্বীয় হাত দ্বারা কোন মহিলাকে কোন দিন প্রহার করেন নাই। এমনকি উম্মতের প্রতি তাহাদিগকে প্রহার না করিবার নিষেধাজ্ঞাও প্রদান করিয়া গিয়াছেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عائشة ما ضرب رسول الله ﷺ خادما له ولا امرأة ولا ضرب بيده شيئا (رواه ابن ماجه - ١٤٢) .
"হযরত 'আইশা (را) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার কোন খাদেমকে প্রহার করেন নাই, কোন মহিলাকেও নয়, এমনকি স্বীয় হাত দ্বারা কোন প্রাণীকেই প্রহার করেন নাই” (ইব্ন মাজা, প্রাগুক্ত, ১৪২)।
عن اياس بن عبد الله قال قال النبي الله لا تضرين اما ء الله فجاء عمر الى النبي فقال يا رسول الله قد ذئرن النساء على أزواجهن فامر بضربهن فضربن فطاف بال محمد ﷺ طائف نساء كثير فلما اصبح قال لقد طاف الليلة بال محمد سبعون امرأة كل امرأة تشتكى زوجها فلا تجدون اولئك خياركم (رواه ابن ماجه ١٤٢) .
“ইয়াস ইবুন আবদিল্লাহ্ (را) বলেন, রাসুলুল্লাহ্ (س) বলিয়াছেন, তোমরা আল্লাহ্ বাঁদীদেরকে (মহিলাদের) কখনও মারপিট করিও না। অতঃপর উমার (را) রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, মহিলাগণ স্বীয় স্বামীদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করিতেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) মৃদু প্রহারের অনুমতি প্রদান করিলেন। অনুমতি লাভের পর মহিলার্দিগকে প্রহার করা হইল। তাহাতে রাসূলুল্লাহ (س)-এর পরিবারে মহিলাদিগের বিরাট একটি দল আসিয়া তাঁহাকে বিষয়টি অবহিত করিল। ভোর হইলে রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আজ রাত্রে রাসূল পরিবারে সত্তরজন মহিলা আগমন করিয়া স্ব-স্ব স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করিয়াছে। যাহারা নিজ স্ত্রীদিগকে প্রহার করিয়াছে তাহাদিগকে ভাল মানুষ জ্ঞান করিও না” (ইবন মাজা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪২)।
রাজা-বাদশাহ ও অন্যান্য সমাজপতিগণ অবশ্যই দায়িত্বশীল। তাহাদের সহিত মিলিত করিয়া রাসূলুল্লাহ (س) গৃহবধূকে গৃহের দায়িত্বশীল বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বর্ণিত হইয়াছেঃ
عن عبد الله بن عمر أنه سمع رسول الله ﷺ يقول كلكم راع ومسئول عن رعيته فالامام راع وهو مسئول عن رعيته والرجل فى اهله راع وهو مسئول عن رعيته والمرأة فى بيت زوجها راعية وهى مسئولة عن رعيتها والخادم فى مال سيده راع وهو مسئول عن رعيته (رواه البخاري (٣٢٤).
"আবদুল্লাহ ইবন উমার (را) হইতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে বলিতে শুনিয়াছেন: তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবে। নেতা একজন দায়িত্বশীল, তিনি তাহার কর্তৃত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবেন। পুরুষ লোক তাহার পরিবারের উপর দায়িত্বশীল এবং তাহার দায়িত্ব সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হইবে। গৃহবধূ তাহার স্বামীর সংসারের দায়িত্বশীলা এবং সেই সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হইবে। খাদেম তাহার মনিবের সম্পদের উপর দায়িত্বশীল এবং সেই সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হইবে" (বুখারী, আস্-সাহীহ, ১খ., পৃ. ৩২৪)।
কোন এক জিহাদে জনৈক মহিলার লাশ দেখিতে পাইয়া রাসূলুল্লাহ (س) খুবই মর্মাহত হইলেন। অতঃপর তিনি মহিলা ও শিশুদিগকে হত্যা না করিবার নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن عمر ان امرأة وجدت في بعض مغازى رسول الله ﷺ مقتولة فانكر رسول الله ﷺ قتل النساء والصبيان (رواه مسلم (٨٤) وفي رواية فنهى عن قتل النساء الخ .
"আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। জনৈকা মহিলাকে কোন এক জিহাদে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মহিলা ও শিশুগণকে হত্যা করিতে বারণ করিলেন” (মুসলিম, আস্-সাহীহ, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৮৪)।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় আল্লামা নববী বলেন, মহিলাগণ যদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে তবে তাহাদিগকে হত্যা করা বৈধ হইবার ব্যাপারে উলামায়ে কিরাম ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন। শিশুদের ব্যাপারেও একই হুকুম (নববী পাদটীকা, সহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত)।
রাসূলুল্লাহ (স) মহিলাদের বিবাহের ক্ষেত্রে স্ব-স্ব পসন্দ ও অপসন্দকে অগ্রাধিকার প্রদান করিয়াছেন। এক মহিলাকে তাহার পিতা আপন মতের বিরুদ্ধে অন্যত্র বিবাহ দান করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা প্রত্যখ্যান করিয়া তাহার পসন্দনীয় পাত্রের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে বলিলেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الرحمن بن يزيد ومجمع بن يزيد الانصاريين ان رجلا منهم يدعى خداما انكح ابنة له فكرهت نكاح ابيها فاتت رسول الله ﷺ فذكرت له فرد عليها نكاح ابيها فنكحت ابا لبابة بن عبد المنذر .
"আবদুর রহমান ইব্ন ইয়াযীদ ও মুজাম্মি' ইব্ন ইয়াযীদ আনসারী (را) হইতে বর্ণিত। তাঁহাদের মধ্যকার এক লোকের নাম ছিল খিদাম। তিনি তাহার এক মেয়েকে বিবাহ দান করিলে মেয়েটি তাহা অপসন্দ করিয়া বসে। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বিষয়টি তাঁহাকে অবহিত করিলে তিনি তাহার পিতার বিবাহদানকে নাকচ করিয়া দেন। অতঃপর মেয়েটি তাহার পসন্দনীয় পাত্র আবু লুবাবা ইব্ন আবদিল মুনযির (রা)-কে বিবাহ করে" (ইব্ন মাজা, সুনান, পৃ. ১৩৪)।
عن ابن عباس قال قال رسول الله ﷺ الايم اولى بنفسها من وليها والبكر تستأمر في نفسها قيل يارسول الله ان البكر تستحيى ان تتكلم قال اذنها سكوتها .
"ইব্ন আব্বাস (را) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, 'আল-আয়ি্যম' স্বীয় বিবাহের ব্যাপারে নিজ অভিভাবক হইতে নিজ সিদ্ধান্তই উত্তম। কুমারী মেয়েকে তাহার বিবাহের ক্ষেত্রে তাহার অনুমতি চাওয়া হইবে। কেহ প্রশ্ন করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! কুমারী মেয়ে তো লজ্জাবশত কথা বলিবে না। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তাহার নীরব থাকাই তাহার অনুমতি দান হিসাবে গণ্য হইবে" (ইবন মাজা, প্রাগুক্ত)।
আল-আয়ি্যম অর্থ যাহার পূর্বে বিবাহ হইয়াছিল এমন পুরুষ বা মহিলা অথবা যাহার স্বামী বা স্ত্রী নাই।
عن أبي هريرة عن النبي ﷺ لا تنكح الشيب حتى تستأمر ولا البكر حتى تستأذن واذنها الصموت .
"আবু হুরায়রা (را) হইতে বর্ণিত। নবী (س) বলেন, ছায়্যিবকে (পূর্বে বিবাহ হইয়াছিল এমন সাবালিকা মেয়ে) তাহার অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাইবে না, কুমারী মেয়েকেও নয়, যতক্ষণ তাহার অনুমতি গ্রহণ করা না হইবে। কুমারীর চুপ থাকাই তাহার সম্মতির লক্ষণ" (ইবন মাজা, প্রাগুক্ত)।
রাসূলুল্লাহ (س) সফরে কোন না কোন স্ত্রীকে সঙ্গী লইয়া যাইতেন। ইচ্ছা করিলে তিনি পসন্দমত যে কোন স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া যাইতে পারিতেন, কিন্তু দয়ার সাগর মহানবী (س) স্ত্রীগণের মনরক্ষা করিতে তাহাদের মধ্য হইতে কাহাকে সঙ্গে লইয়া যাইবেন সেই নিমিত্ত লটারী করিতেন। লটারীতে যাহার নাম আসিত তাহাকেই তিনি সফরসঙ্গী করিতেন। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عائشة قالت كان رسول الله ﷺ اذا اراد سفرا اقرع بين نسائه فايتهن خرج سهمها خرج بها معه وكان يقسم لكل امرأة منهن يومها وليلتها غير ان سودة بنت زمعة وهبت يومها وليلتها لعائشة زوج النبى ﷺ تبتغى بذلك رضى رسول الله ﷺ (البخاري (٣٥٣) .
"হযরত 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করিতেন তখন তিনি তাঁহার স্ত্রীগণের মধ্যে লটারী করিতেন। লটারীতে যাঁহার নাম আসিত তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া তিনি সফরে যাইতেন। প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য তিনি একদিন একরাত পালা বণ্টন করিয়া দিয়াছিলেন। তবে সাওদা বিন্ত যাম'আ (রা) তাঁহার পালার দিনটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে সন্তুষ্ট রাখিবার লক্ষ্যে 'আইশা (রা)-কে বরাদ্দ করিয়াছিলেন” (বুখারী, সাহীহ, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৫৩)।
নিজ স্ত্রীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স) মধুর আচরণ করিতেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنْ تَتُوبًا إِلَى اللهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا وَإِنْ تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلُهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَلِكَ ظَهِيرٌ.
"যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর তবে ভাল। কারণ তোমাদের হৃদয় তো ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। কিন্তু তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরের পোষকতা কর তবে জানিয়া রাখ, আল্লাহই তাহার বন্ধু এবং জিবরাঈল ও সৎকর্মপরায়ণ মু'মিনগণও। তাহা ছাড়া অন্যান্য ফেরেশতাও তাহার সাহায্যকারী" (৬৬:৪)।
উপরিউক্ত আয়াত কাহাদের ব্যাপারে নাযিল হইয়াছিল, এই ব্যাপারে আবদুল্লাহ্ ইব্ আব্বাস (রা) হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (را)-কে প্রশ্ন করিলে তিনি উত্তর দিলেন, উহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুই সহধর্মিণী 'আইশা ও হাফসা (را) সম্পর্কে নাযিল হইয়াছিল। হযরত উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س)-এর স্ত্রীগণ তাঁহার কথার উপরে কথা বলিতে উদ্যত হইলেন। কোন একজন পূর্ণ দিন রাত তাহার সহিত কথা বলাই ত্যাগ করিলেন। বিষয়টি অবহিত হইয়া আমি খুবই উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলাম। অতঃপর সর্বনাশ সর্বনাশ বলিতে বলিতে হাফসার গৃহে প্রবেশ করিলাম। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমাদের কোন একজন কি আজ গোটা দিন রাসূলুল্লাহ (س)-কে ক্রোধান্বিত করিয়া রাখিয়াছ؟ সে উত্তর দিল, হাঁ। আমি বলিলাম, বোকা، নির্বোধ। রাসূলুল্লাহ (س)-কে ক্রোধান্বিত করিয়া কি আল্লাহর ক্রোধ হইতে নিরাপদ থাকিতে পারিবে؟ কখনও না، বরং ধ্বংস অনিবার্য। রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট কোন কিছু বেশি পরিমাণ দানের আবদার করিও না। তাঁহার সহিত কোন কূটতর্কে জড়াইও না। তোমার যাহা প্রয়োজন উহা আমাকে বলিও। 'আইশা (রা)-এর কমনীয়তা ও রাসূলুল্লাহ (س)-এর তাহার প্রতি অনুরাগ প্রত্যক্ষ করিয়া তুমি প্রতারিত হইও না।... ইত্যাদি কথাবার্তায় আমরা লিপ্ত ছিলাম। ইত্যবসরে আমার সঙ্গী সেই লোকটি যাহার সহিত পালাক্রমে আমরা রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত থাকিতাম—তিনি আসিয়া বলিলেন، ভয়াবহ একটি কাজ সংঘটিত হইয়াছে যে، রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার স্ত্রীগণকে তালাক প্রদান করিয়াছেন।
সংবাদটি শুনিয়া আমি হাফসার উপর ক্ষোভে ফাটিয়া পড়িলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত ফজরের সালাত আদায় করিলাম। সালাতান্তে তিনি তাঁহার সংগ্রহশালায় প্রবেশ করিয়া একাকী বসিয়া পড়িলেন। এইদিকে আমি হাফসার গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম، সে কাঁদিতেছে। আমি বলিলাম، এখন কাঁদিয়া কি হইবে। আমি কি তোমাকে এই ব্যাপারে সাবধান করি নাই؟ রাসূলুল্লাহ (س) তোমাদিগকে তালাক প্রদান করিয়াছেন কি؟ সে বলিল، আমি উহা জানিনা। তবে তিনি সংগ্রহশালায় এই তো আমাদের হইতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসিয়া আছেন।
আমি তথা হইতে বাহির হইয়া মসজিদের মিম্বরের পাশে উপবিষ্ট লোকদের নিকট আসিয়া দেখিলাম অনেকেই কাঁদিতেছে। এখানে অল্পক্ষণ অবস্থান করিবার পর সেই স্থানের দিকে অগ্রসর হইলাম যেখানে রাসূলুল্লাহ (س) একাকী বসিয়া আছেন। সেখানে দায়িত্ব পালনরত ছেলেটিকে বলিলাম، আমার জন্য প্রবেশের অনুমতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট হইতে লইয়া আস। সে সেখানে আমার পক্ষে অনুমতি প্রার্থনা করিল، কিন্তু কোন উত্তরই রাসূলুল্লাহ (س) দিলেন না। আমি ফিরিয়া গিয়া মিম্বরের পাশে বসিয়া গেলাম। আবার কিছুক্ষণ পর আসিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করিলাম। কিন্তু এইবারও কোন উত্তর আসিল না। তৃতীয়বারও একই রকম অনুমতি প্রার্থনা করিলাম। এইবারও পূর্বের মত কোন উত্তর না আসায় আমি বাহির হইয়া রওয়ানা করিলে সংবাদ বাহক সেই ছেলেটি আমাকে ডাকিয়া প্রবেশের অনুমতির কথা জানাইল।
অতএব আমি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট প্রবেশ করিয়া দেখিলাম، তিনি একটি চাটাইর উপর শুইয়া রহিয়াছেন। তাঁহার বাহুতে চাটাইর চিহ্ন প্রতিভাত হইতেছিল। আমি তাঁহাকে সালাম দিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম، হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি স্ত্রীগণকে তালাক প্রদান করিয়াছেন কি؟ তখন তিনি আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন، না، আমি তালাক প্রদান করি নাই। অতঃপর বিস্ময়ে হতবাক হইয়া আমি আল্লাহু আকবার বলিয়া উঠিলাম। আরও বলিলাম، মক্কায় অবস্থানকালে আমরা যাহারা কুরায়শ নারী জাতির প্রতি কর্তৃত্বশালী ছিলাম মদীনায় আগমন করিবার পর দেখিতেছি، এখানকার মহিলাগণ পুরুষদের উপর কর্তৃত্বশালী। উহার প্রভাব কুরায়শ মহিলাগণের উপরও পড়িতেছে। এই কথা শ্রবণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (س) মুচকি হাসি দিলেন (বুখারী، সাহীহ، ২খ.، পৃ. ৭৮১)।
এই হাদীছে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (را) বিভিন্ন ঘটনার সহিত সংশ্লিষ্ট কতিপয় ঘটনাকে একত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু সবকয়টি বিষয়ের সহিত রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহধর্মিণীদের সঙ্গে তাঁহার আচরণের কথা ফুটিয়া উঠিয়াছে। যেমন তাহাদের পক্ষ হইতে অতি বাড়াবাড়ি প্রত্যক্ষ করিয়াও তিনি নিজেকে সামলাইয়া লইয়া নিরাপদ দূরত্বে এক মাস কাটাইয়াছেন। সাহাবীগণ যেখানে মনে করিয়াছেন তিনি স্ত্রীগণকে তালাক প্রদান করিয়াছেন، সেখানে তিনি নীরব রহিয়া এইভাবে একমাস পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন। এই কথাও প্রতিভাত হয় যে، ইসলামের প্রাথমিক যুগ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর মক্কী জীবনে নারী সমাজের প্রতি ততটুকু কোমল আচরণ করা হইত না যতটুকু মাদানী জীবনে প্রদর্শন করা হইত। 'উমার (را)-এর কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর মুচকি হাসি ও কোমল আচরণের প্রতি সমর্থন বুঝায়। স্ত্রীদের প্রতি কোমলতা প্রদর্শনের লক্ষ্যে তিনি কোন বৈধ কাজকেও না করিবার জন্য শপথ পর্যন্ত করিয়াছিলেন যাহার পরিপ্রেক্ষিতে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"হে নবী! আল্লাহ যাহা তোমার জন্য বৈধ করিয়াছেন তুমি উহা নিষিদ্ধ করিতেছে কেন؟ তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাহিতেছ। আল্লাহ ক্ষমাশীল، পরম দয়ালু" (৬৬:১)।
আপন স্ত্রীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (س)-এর কোমল আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায় 'হাদীছে উম্মু যারা' নামক প্রসিদ্ধ হাদীছে। হাদীছটি ইমাম বুখারী (حسن المعاشرة مع الأهل )পরিবার- পরিজনের সহিত সুন্দর আচরণ) অধ্যায় বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি হইল:
عن عائشة قالت جلس احدى عشرة امرأة فتعاهدن وتعاقدن ان لا يكتمن من اخبار ازواجهن شيئا قالت الأولى زوجى لحم جمل غث على رأس جبل لا سهل فيرتقى ولا سمين فينتقل . قالت الثانية زوجي لا ابت خبره اني اخاف ان لا اذره ان اذكره اذكر عجره وبجره. قالت الثالثة زوجى العشنق ان انطق اطلق وان اسکت اعلق . قالت الرابعة زوجي كليل تهامة لا حر ولا قر ولا مخافة ولا سأمة قالت الخامسة زوجي ان دخل فهد وان خرج اسد ولا يسأل عما عهد . قالت السادسة زوجي ان اكل لف وان شرب اشتف وان اضطجع التف ولا يولج الكف ليعلم البث. قالت السابعة زوجي غياياء اوعياياء طباقاء كل داء له داء شجك او فلك او جمع كلالك . قالت الثامنة زوجي المس مس ارنب واريح ريح زرنب. قالت التاسعة زرجي رفيع العماد طويل النجار عظيم الرماد قريب البيت من النار . قالت العاشرة زوجى مالك وما مالك مالك خير من ذلك له ابل كثيرات المبارك قليلات المارح واذا سمعن صوت المزهر ايقن انهن هو الك . قالت الحادية عشرة زوجى ابو زرع فما ابو زرع اناس من حلى ادنى وملأ من شحم عضدى وبججنى فبججت الى نفسي وجدني في اهل غنيمة بشق فجعلني في اهل صهيل واطيط ودائس ومنق فهنده اقول فلا أقبح وارقد فاتصبح واشرب فاتقنح ام ابي زرع فما ام ابي زرع حكومها رداح وبيتها نساح ابن ابی زرع فما ابن ابي زرع مضجعه كمسل شطبة وتشبعه ذراع الجفرة بنت أبي زرع فما بنت ابي زرع طوع أبيها وطوع أمها وملأ كسائها وغيظ جارتها جارتة أبي زرع فما جارية ابي زرع لا تبث حديثنا تبتيشا ولا تنقث ميرتنا تنقينا ولا تملأ بيتنا تعشيشا قالت خرج ابو زرع ولا وطاب تمخض فلقى امرأة معها ولدان لها كالفهدين يلعبان من تحت خصرها برमानتين وطلقنى ونكحها فنكحت بعده رجلا سريا ركب شريا واخذ خطيا واراح على نعما ثريا واعطانى من كل رائحة زوجا وقال كلى ام زرع وميرى اهلك قالت فلو جمعت كل شيئ اعطانيه ما بلغ اصغر انية أبي زرع . قالت عائشة قال رسول الله كنت لك كابي زرع لام زرع 1
“আইশা (রা) বলেন، একদা এগারোজন মহিলা পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হইল যে، তাহাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বামীর সম্পূর্ণ অবস্থা খুলিয়া বলিবে، কিছুই গোপন করিবে না। প্রথম মহিলা বলিল، আমার স্বামী দুর্বল উটের গোস্ত সদৃশ। গোশতটিও আবার সুকঠিন পাহাড়ের শৃঙ্গে। পাহাড়ের পথও সুগম নয় যে، অনায়াসে সেখানে আরোহণ করা যাইতে পারে। গোশতটি মোটাও নয় যে স্থানান্তরিত করা যায়। দ্বিতীয় মহিলা বলিল، আমার স্বামীর কথা আমি প্রকাশ করিতে পারি না। আমার আশঙ্কা হইতেছে، যদি তাহার দোষ বর্ণনা শুরু করি তাহা হইলে উহা শেষ করিতে পারিষ না، প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের দোষ বর্ণনা করিতে হইবে। তৃতীয় মহিলা বলিল، আমায় স্বামী লম্বা তালপাহ। কোন কিছু বলিলে তৎক্ষণাত তালাক، আর যদি কিছু না বলি তাহা হইলে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকিতে হয়। চতুর্থ মহিলা বলিল، আমার স্বামী তিহামার রাত্রির ন্যায়। সে না অতি গরম এবং না অতি ঠাণ্ডা। ভয়ংকর ও বিরক্তিকর কিছুই তাহার মধ্যে নাই। পঞ্চম মহিলা'খলির، আমায় স্বামী গৃহে প্রবেশ করিলে চিতাবাঘ، আর বাহির হইলে সিংহ। গৃহের কোন খবর রাখে নাগ ষষ্ঠ মহিলা বলিল، আমার স্বামী আহার গ্রহণ করিতে বসিলে সবকিছু সাবাড় করিয়া দেয়، আর পান করিতে গেলে সব পান করিয়া লয়। শুইতে গেলে লেপ দিয়া শয়ন করে، আমার দিকে হস্ত প্রসারিত করে না। সপ্তম মহিলা বলিল، আমার স্বামী সম্পূর্ণভাবে যৌনাক্ষম। এমন কোন রোগই নাই যাহা তাহার মধ্যে নাই। খুবই বদমেযাজী، হয়ত তোমার মাথা ফাটাইয়া দিবে، না হয় আহত করিবে কিংবা উভয়টাই করিয়া বসিবে। অষ্টম মহিলা বলিল، আমার স্বামীর ত্বক খরগোশের ত্বকের ন্যায় নরম। তাহার শরীরের সুগন্ধি জাফরানের ন্যায়। নবম মহিলা বলিল، আমার স্বামী উচ্চ মর্যাদার অধিকারী، অতিথিপরায়ণ، বৃহৎ ভগ্ন স্তূপের অধিকারী। তাহার গৃহ মজলিসও পরামর্শ গৃহের সন্নিকটে। দশম মহিলা বলিল، আমার স্বামীর নাম হইল মালিক। মালিক সম্পর্কে কি বলিব؟ সে আলোচিত সকল হইতে উত্তম। সে বহু উটের অধিকারী। অধিকাংশ উট বাড়ির নিকটে বাঁধিয়া রাখা হয়، মাঠে খুবই কম চরানো হয়। উটগুলি যখন বাদ্য শুনিতে পায় তখন তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে، তাহাদিগকে যবেহ করা হইবে। একাদশ মহিলা বলিল، আমার স্বামী ছিল আবূ যারা। তাহার সম্পর্কে কি বলিব। সে অলঙ্কার দিয়া আমার কান ঝুঁকাইয়া দিয়াছে। খাদ্য দিতে দিতে আমার উভয় বাহু চর্বিযুক্ত করিয়া তুলিয়াছে। সে আমাকে এতই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখিয়াছে যে، উহার ফলে আমি আত্মাভিমান ও খুশিতে আটখানা। আমাকে সে গুটিকয়েক ছাগলের অধিকারী দরিদ্র পরিবারের একটি মেয়ে হিসাবে পাইয়াছিল। অতঃপর সে আমাকে উট، ঘোড়া، গরু কৃষি সরঞ্জামের অধিকারী এক ধনাঢ্য পরিবারে লইয়া আসিল। তাহার নিকট আমি কথা বলিলে সে আমাকে ভর্ৎসনা করিত না। ভোর পর্যন্ত আমি ঘুমাইয়া রহিতাম، কিছুই বলিত না। খানাপিনা এতই পর্যাপ্ত ছিল যে، পরিতৃপ্তি লাভ করিয়া আমি রাখিয়া দিতাম।
"আবু যারার মাতার প্রশংসা কি করিব! তাহার বড় বড় পাত্রগুলি সর্বদা খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর থাকিত। তাহার ঘরটি ছিল বিরাট বড়। আবু যারার ছেলে সম্পর্কে কি বলিব। তাহার শয্যাস্থল তরবারির ন্যায় সরু। ছাগলের একটি রানই তাহাকে পরিতৃপ্ত করিয়া তুলিত অর্থাৎ সে হাল্কা- পাতলা দেহের অধিকারী। আবূ যারার মেয়ে সম্পর্কে কি বলিব। সে মাতা-পিতার খুবই বাধ্যগত ছিল। সে ছিল হৃষ্টপুষ্ট এবং সতীনের হিংসা করার মত দেহের অধিকারী। আবু যারার দাসীর কথা কি বলিব! সে কোন সময়ই গৃহের আভ্যন্তরীণ বিষয় বাহিরে প্রকাশ করিত না، খাদ্যদ্রব্য বিনা অনুমতিতে কাহাকেও দিত না، বাড়ি-ঘর সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখিত، কখনও ময়লা জমিতে দিত না।
"একদিন আবূ যারা গৃহ হইতে বাহির হইল، তখন দুধ দোহনের পর ফেনা পরিষ্কার করা হইতেছিল। পথিমধ্যে জনৈকা মহিলার সহিত তাহার সাক্ষাত হইল। তাহার কটিদেশের নিচে দুইটি শিশু ব্যঘ্রছানার ন্যায় দুইটি ডালিম লইয়া খেলা করিতেছিল। উক্ত মহিলার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া সে আমাকে তালাক প্রদান করিল। অতঃপর তাহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইল। পরবর্তী কালে আমি সরদার শ্রেণীর এক লোককে বিবাহ করিলাম। সে ছিল এক অশ্বারোহী সৈনিক। সে আমাকে প্রচুর পরিমাণ সুখসম্ভার দান করিয়াছে؛ উট، ঘোড়া، গরু কৃষি সরঞ্জামের অধিকারী এক ধনাঢ্য পরিবারে লইয়া আসিয়াছে। অতঃপর সে আমাকে বলিয়াছে: উম্মু যারা! তুমি খাও এবং তোমার পিত্রালয়ে প্রেরণ কর। কিন্তু কথা হইতেছে، তাহার সকল সুখসম্ভার যদি একত্র করা হয় তবুও উহা আবু যারার ক্ষুদ্র একটি বস্তুর সমানও হইবে না। হযরত 'আইশা (রা) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) আমাকে উক্ত ঘটনা শোনানোর পর বলিলেন، (হে আইশা।) আমি তোমার জন্য আবূ যারা সদৃশ। আর তুমি হইতেছ উন্মু যারা সদৃশ” (বুখারী، সাহীহ، ২খ.، পৃ. ৭৭৯-৭৮০؛ তিরমিযী، শামাইল، অনুবাদ، মাওলানা মুতিউর রহমান ও মাওলানা আবদুল্লাহ، পৃ. ২৪৫)।
উপরিউক্ত মহিলাগণ স্ব-স্ব স্বামী সম্পর্কে যেইসব উক্তি করিয়াছে তাহা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (س)-এর সম্মুখেই হইতে পারে। যদি তাহা বাস্তবে হইয়া থাকে তাহা হইলে তিনি তাহাদের প্রতি কত যত্নবান ছিলেন যে، তাহারা অনায়াসে তাঁহার মজলিসে এইসব গল্পালাপ করিতে পারিল। অপর দিকে 'আইশা (রা)-এর নিকট বিষয়টি ব্যক্ত করা، নিজেকে আইশা (রা)-এর জন্য আবূ যারা হিসাবে উত্থাপন করা এবং তাহাকে উম্মু যারা হিসাবে আখ্যায়িত করার মধ্যে স্ত্রীদের প্রতি তাহার অসাধারণ কোমল আচরণের কথা প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছও প্রণিধানযোগ্য:
عن عائشة قالت حدث رسول الله ﷺ ذات ليلة نسا حديثا فقالت امرأة منهن كأن الحديث حديث خرافة فقال اتدرون ما خرافة ان خرافة كان رجلا من عذرة أسرته الجن في الجاهلية فمكث فيهم دهرا ثم ردّوه الى الانس فكان يحدث الناس بما رأى فيهم من الاعاجيب فقال الناس حديث خرافة
“হযরত 'আইশা (را) বলেন، এক বাত্রে রাসূলুল্লাহ (س) নিজ গৃহিণীদেরকে একটি কাহিনী শুনাইলেন। উপস্থিতদের মধ্য হইতে একজন বলিলেন، কাহিনীটি যেন খুরাফার কাহিনীর ন্যায়। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، খুরাফার ঘটনা কি তোমরা জান؟ খুরাফা ছিল বনী উযরা গোত্রের লোক। তাহাকে জাহিলিয়্যা যুগে জিনেরা বন্দী করিয়া লইয়া গিয়াছিল। সেখানে সে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করে। অতঃপর তাহারা তাহাকে লোকালয়ে ফিরাইয়া দেয়। সে তাহাদের মধ্যে যেইসকল বিস্ময়কর ঘটনা দেখিয়াছিল তাহা মানুষের নিকট বলিত। উহার পর সকল আশ্চর্যজনক ঘটনাকে মানুষ খুরাফার কাহিনী বলিয়া অভিহিত করিতে লাগিল" (ইমাম তিরমিযী، সুনান، শামাইল، অংশ، পৃ. ১৬)।