📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত উমার ও হযরত বিলাল (রা)

📄 হযরত উমার ও হযরত বিলাল (রা)


হযরত উমার (রা)-এর জীবন-চরিত অধ্যয়ন করিলে ইসলামী সমাজে আরও একটি দিক হইতে দাসদের মর্যাদা স্পষ্ট হইয়া উঠে। মদ সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে একজন মুক্তদাস হযরত বিলাল ইবন রাবাহ (রা) যখন হযরত উমারের মতকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন তখন হযরত উমার (রা), যিনি ছিলেন তৎকালীন খলীফাতুল মুসলিমীন, কোনক্রমেই বিলাল (রা)-কে সম্মত করাইতে না পারিয়া শুধু আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন:
اللهُمَّ اكْفِنِي بِلالاً وأَصْحَابَهُ.
“হে আল্লাহ! বিলাল এবং তাঁহার সাথীদিগকে আমার জন্য যথেষ্ট বানাইয়া দাও”।
নাগরিকদের মধ্যে মাত্র এক ব্যক্তির একজন ভূতপূর্ব দাসের বিরোধিতার জবাবে একজন খলীফাতুল মুসলিমীনের মানসিক প্রতিক্রিয়া যে কতদূর অর্থবহ ও মর্মস্পর্শী তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় কি?
মহানবী (স) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) দাসদের এই যে মর্যাদা দান করিয়াছেন, পরবর্তীকালেও তাহা অব্যাহত থাকে এবং দাসগণ মুসলিম জাহানের শাসকও হইয়াছিলেন। উদাহরণস্বরূপ মিসরের মামলুক (দাস) বংশের দীর্ঘ শাসন এবং ভারতে দাস বংশের শাসনের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইতিহাস খ্যাত শাসক কুতবুদ্দীন আয়বাক, সুলতান মাহমুদ, সুলতান সবক্তগীন প্রমুখ বর্ণবাদী হিন্দু ভারতে দাস বংশীয় মুসলিম শাসক ছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধ ও দাসত্ব

📄 যুদ্ধ ও দাসত্ব


ইতোপূর্বে আমরা আলোচনা করিয়াছি যে, দীন ইসলাম দাস হওয়ার একটিমাত্র কারণ ছাড়া সকল কারণ অত্যন্ত সাফল্যের সহিত দূর করিতে সক্ষম হইয়াছে। সেই কারণটি হইল 'যুদ্ধ'। ইহা দূর করা বাস্তবেই ইসলামের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
প্রাচীন কাল হইতেই দুনিয়ার সকল জাতির মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, যুদ্ধের ময়দানে যে সেনাবাহিনী পরাজিত হইয়া ধৃত হইত তাহাদের সকলকে হয় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হইত কিংবা দাস বানাইয়া রাখা হইত। Universal History of the World নামক ঐতিহাসিক বিশ্বকোষের ২২৭৩ পৃষ্ঠায় বলা হইয়াছে, "৫৯৯ খৃস্টাব্দে খৃস্টান রোম সম্রাট Marius বিভিন্ন যুদ্ধে প্রতিপক্ষের কয়েক লক্ষ সৈন্যকে কয়েদী হিসাবে বন্দী করেন। তিনি তাহাদিগকে মুক্তি দিতে কিংবা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করেন এবং তাহাদের হত্যা করেন। অতঃপর কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় যুদ্ধের এই ঐতিহ্য অতীত মানব গোষ্ঠীর জীবনের জন্য এক অপরিহার্য প্রয়োজন হিসাবে পরিগণিত হয়।
দুনিয়ার এই সামাজিক পটভূমিকায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটে এবং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদিগকে কিছু সংখ্যক যুদ্ধও করিতে হয়। এই সকল যুদ্ধে যে সমস্ত মুসলমানকে বন্দী করা হইত কাফিররা তাহাদিগকে দাসে পরিণত করিত, তাহাদের যাবতীয় অধিকার হরণ করা হইত এবং সেই যুগের দাসদের জন্য নির্ধারিত উৎপীড়ন ও নির্যাতন তাহাদের উপরও চালানো হইত। নারীদের সতীত্ব ও ইজ্জতের প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন করা হইত না। বস্তুত নারীদের সতীত্ব বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে বিজয়ীদের দ্বিধা বা সংকোচ বলিতে কিছুই ছিল না। কোন কোন সময় পিতা-পুত্র ও বন্ধু-বান্ধবগণ মিলিত হইয়া একই নারীকে ধর্ষণ করিত এবং এরূপে সে তাহাদের সাধারণ রক্ষিতা বলিয়া গণ্য হইত।
এই পরিস্থিতিতে শত্রু পক্ষের যুদ্ধবন্দীদিগকে হঠাৎ করিয়া মুক্তি দেওয়া ইসলামের পক্ষে বাস্তবেই সম্ভব ছিল না। কেননা এরূপ করিলে তাহা কিছুতেই কল্যাণকর হইত না। শত্রুরা এরূপ সুযোগ পাইলে পাল্টা পদক্ষেপের আশংকা হইতে মুক্ত হইয়া সম্মানিত মুসলমানদিগকে দাস বানাইয়া ইচ্ছামত নির্যাতন করিতে থাকিত। এই পরিস্থিতিতে ইসলামের জন্য একটি পথই উন্মুক্ত ছিল যে, শত্রুরা মুসলমান কয়েদীগণের সহিত যেমন ব্যবহার করিবে শত্রুপক্ষের কয়েদীদের সহিতও অনুরূপ ব্যবহার করা হইবে। মোটকথা ইসলামের সহিত শত্রুপক্ষের সহযোগিতা না করা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে বিশ্বের সমস্ত জাতির একটি সাধারণ কর্মনীতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত ইসলাম ইহার অস্তিত্বকে সাময়িকভাবে বরদাশত করিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাসপ্রথা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অংশ নয়

📄 দাসপ্রথা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অংশ নয়


প্রসংগত বলা প্রয়োজন যে, যুদ্ধবন্দীদের সহিত ব্যবহার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের মাত্র একটি আয়াতে বলা হইয়াছে:
فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً.
"অতঃপর হয় অনুগ্রহ প্রদর্শন নতুবা মুক্তিপণ গ্রহণ করিয়া ছাড়িয়া দিবে" (৪৭:৪)।
এই আয়াতে যুদ্ধবন্দীদিগকে দাস বানানোর কোন কথাই নাই, যদি থাকিত তবে ইহা চিরকালের জন্য ইসলামের যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি আইনে পরিণত হইত। আয়াতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হইয়াছে: হয় মুক্তিপণ গ্রহণ করিয়া অথবা মুক্তিপণ ব্যতীত শুধু অনুগ্রহ প্রদর্শন করিয়া যুদ্ধবন্দীদিগকে মুক্ত করিয়া দিতে হইবে। যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের হুকুম অনুযায়ী উক্ত দুইটি পন্থাই কেবল গ্রহণযোগ্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দীন ইসলাম দাসপ্রথা কখনও চালু রাখিতে চাহে নাই

📄 দীন ইসলাম দাসপ্রথা কখনও চালু রাখিতে চাহে নাই


ইসলাম কখনও যুদ্ধবন্দীদিগকে দাস বানাইতে চাহে নাই, বরং অবস্থা ছিল ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামের নিয়ম ছিল: যদি শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়া আসিত তাহা হইলে কাহাকেও দাস বানানো হইত না। মহানবী (স) স্বয়ং ইসলামের সর্বপ্রথম বৃহৎ যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে ধৃত মক্কার নেতাদের কাহাকেও মুক্তিপণ লইয়া এবং কাহাকেও বিনা পণেই মুক্তিদান করেন। অনুরূপভাবে তিনি নাজরানের খৃস্টানদের নিকট হইতে জিয়া লইতে সম্মত হন এবং উহার বিনিময়ে তাহাদের সকল বন্দীকে মুক্ত করিয়া দেন। এইভাবে যুদ্ধবন্দীদের সমস্যাটি একটি মানবিক সমাধান খুঁজিয়া পাইল।
বিভিন্ন যুদ্ধে প্রতিপক্ষের যেসব যোদ্ধা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয় তাহাদের সহিত কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করা হয় নাই, কোনরূপ নির্যাতন করা হয় নাই, কখনও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হেয় করার চেষ্টা করা হয় নাই, বরং তাহাদের হারানো স্বাধীনতা ফিরাইয়া দেয়ার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। তাহাদের জন্য শুধু এতটুকু শর্ত আরোপ করা হইয়াছে যে, মুক্তির পর সে যেন স্বাধীন মানুষের মত দায়িত্বশীল জীবনযাপন করিতে সক্ষম হয়। এই শর্ত পূর্ণ হইলে কোনরূপ ইতস্তত না করিয়াই তাহাকে মুক্তি দেওয়া হইত। অথচ তাহাদের মধ্যে এমন লোকও থাকিত যে মুসলমানদের হাতে বন্দী হওয়ার পূর্বে কয়েক পুরুষ ধরিয়া দাস হিসাবে জীবনযাপন করিয়া আসিতেছিল। মূলত ইহাদিগকে ইরান ও রোমের সম্রাটগণ অন্যান্য দেশ হইতে জোরপূর্বক ধরিয়া আনিত এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময়ে ইহাদিগকে সৈন্য হিসাবে ব্যবহার করিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00