📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাসদের সহিত বিবাহ

📄 দাসদের সহিত বিবাহ


রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার ফুফাতো বোন হযরত যয়নবকে স্বীয় মুক্ত দাস হযরত যায়দের সহিত বিবাহ দেন। এই বিবাহ স্থায়ী না হইলেও ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যে লক্ষ্য ছিল তাহা অর্জিত হইয়াছিল নিঃসন্দেহে। নিজ বংশের একজন মেয়েকে একজন দাসের সহিত বিবাহ দিয়া তিনি বিশ্ববাসীর নিকট এই সত্যই তুলিয়া ধরিয়াছেন যে, অত্যাচারী, মানবগোষ্ঠী তাহাদেরই একটি শ্রেণীকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার যে গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত করিয়াছে উহা হইতে বাহির হইয়া একজন দাসও কুরায়শ দলপতিদের ন্যায় ইজ্জত ও সম্ভ্রমের শীর্ষে আরোহণ করিতে পারে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব

📄 ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব


ইসলাম দাসদিগকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব এবং জাতীয় অধিনায়কত্বের পদও প্রদান করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ (স) যখন আনসার ও মুহাজিরদের সমন্বয়ে একটি সেনাবাহিনী গঠন করেন তখন উহার প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করেন তাঁহারই দাস হযরত যায়দ (রা)-কে। হযরত যায়দের ইন্তিকালের পর তিনি এই দায়িত্বভার তাঁহার পুত্র হযরত উসামা (রা)-এর উপর ন্যস্ত করেন। অথচ এই সেনাবাহিনীতে হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমার (রা)-এর ন্যায় মহাসম্মানীয় ও সর্বজনমান্য আরব নেতৃবৃন্দও ছিলেন যাহারা তাঁহার জীবদ্দশায় তাঁহার সুবিশ্বস্ত পরামর্শদাতা ছিলেন এবং তাঁহার ওফাতের পর তাঁহারই স্থলাভিষিক্ত হন। এইভাবে মহানবী (স) দাসদিগকে শুধু স্বাধীন মানুষের মর্যাদা প্রদান করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং স্বাধীন সৈন্যদের সুউচ্চ নেতৃত্বের পদও অলংকৃত করার সুযোগ দিয়াছেন। এই পর্যায়ে তিনি এতদূর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন যে, তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন :
"শোন এবং নেতৃবৃন্দের আনুগত্য কর, একজন মস্তক মুণ্ডিত হাবশী দাসকেও যদি তোমাদের নেতা বানানো হয় তবুও তাহার আনুগত্য কর যতক্ষণ সে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর আইন জারি করে" (আল-বুখারী)।
অন্য কথায়, ইসলাম একজন দাসের এই অধিকারেরও স্বীকৃতি দিয়াছে যে, সে ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদও অলংকৃত করিতে পারে। হযরত উমার (রা) যখন তাঁহার স্থলাভিষিক্ত খলীফা নির্বাচিত করার প্রয়োজন অনুভব করেন তখন তিনি বলিলেন, "আবূ হুযায়ফার মুক্ত দাস সালিম যদি এখন জীবিত থাকিতেন তবে আমি তাহাকে খলীফা নিয়োগ করিতাম"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত উমার ও হযরত বিলাল (রা)

📄 হযরত উমার ও হযরত বিলাল (রা)


হযরত উমার (রা)-এর জীবন-চরিত অধ্যয়ন করিলে ইসলামী সমাজে আরও একটি দিক হইতে দাসদের মর্যাদা স্পষ্ট হইয়া উঠে। মদ সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে একজন মুক্তদাস হযরত বিলাল ইবন রাবাহ (রা) যখন হযরত উমারের মতকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন তখন হযরত উমার (রা), যিনি ছিলেন তৎকালীন খলীফাতুল মুসলিমীন, কোনক্রমেই বিলাল (রা)-কে সম্মত করাইতে না পারিয়া শুধু আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন:
اللهُمَّ اكْفِنِي بِلالاً وأَصْحَابَهُ.
“হে আল্লাহ! বিলাল এবং তাঁহার সাথীদিগকে আমার জন্য যথেষ্ট বানাইয়া দাও”।
নাগরিকদের মধ্যে মাত্র এক ব্যক্তির একজন ভূতপূর্ব দাসের বিরোধিতার জবাবে একজন খলীফাতুল মুসলিমীনের মানসিক প্রতিক্রিয়া যে কতদূর অর্থবহ ও মর্মস্পর্শী তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় কি?
মহানবী (স) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) দাসদের এই যে মর্যাদা দান করিয়াছেন, পরবর্তীকালেও তাহা অব্যাহত থাকে এবং দাসগণ মুসলিম জাহানের শাসকও হইয়াছিলেন। উদাহরণস্বরূপ মিসরের মামলুক (দাস) বংশের দীর্ঘ শাসন এবং ভারতে দাস বংশের শাসনের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইতিহাস খ্যাত শাসক কুতবুদ্দীন আয়বাক, সুলতান মাহমুদ, সুলতান সবক্তগীন প্রমুখ বর্ণবাদী হিন্দু ভারতে দাস বংশীয় মুসলিম শাসক ছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধ ও দাসত্ব

📄 যুদ্ধ ও দাসত্ব


ইতোপূর্বে আমরা আলোচনা করিয়াছি যে, দীন ইসলাম দাস হওয়ার একটিমাত্র কারণ ছাড়া সকল কারণ অত্যন্ত সাফল্যের সহিত দূর করিতে সক্ষম হইয়াছে। সেই কারণটি হইল 'যুদ্ধ'। ইহা দূর করা বাস্তবেই ইসলামের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
প্রাচীন কাল হইতেই দুনিয়ার সকল জাতির মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, যুদ্ধের ময়দানে যে সেনাবাহিনী পরাজিত হইয়া ধৃত হইত তাহাদের সকলকে হয় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হইত কিংবা দাস বানাইয়া রাখা হইত। Universal History of the World নামক ঐতিহাসিক বিশ্বকোষের ২২৭৩ পৃষ্ঠায় বলা হইয়াছে, "৫৯৯ খৃস্টাব্দে খৃস্টান রোম সম্রাট Marius বিভিন্ন যুদ্ধে প্রতিপক্ষের কয়েক লক্ষ সৈন্যকে কয়েদী হিসাবে বন্দী করেন। তিনি তাহাদিগকে মুক্তি দিতে কিংবা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করেন এবং তাহাদের হত্যা করেন। অতঃপর কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় যুদ্ধের এই ঐতিহ্য অতীত মানব গোষ্ঠীর জীবনের জন্য এক অপরিহার্য প্রয়োজন হিসাবে পরিগণিত হয়।
দুনিয়ার এই সামাজিক পটভূমিকায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটে এবং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদিগকে কিছু সংখ্যক যুদ্ধও করিতে হয়। এই সকল যুদ্ধে যে সমস্ত মুসলমানকে বন্দী করা হইত কাফিররা তাহাদিগকে দাসে পরিণত করিত, তাহাদের যাবতীয় অধিকার হরণ করা হইত এবং সেই যুগের দাসদের জন্য নির্ধারিত উৎপীড়ন ও নির্যাতন তাহাদের উপরও চালানো হইত। নারীদের সতীত্ব ও ইজ্জতের প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন করা হইত না। বস্তুত নারীদের সতীত্ব বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে বিজয়ীদের দ্বিধা বা সংকোচ বলিতে কিছুই ছিল না। কোন কোন সময় পিতা-পুত্র ও বন্ধু-বান্ধবগণ মিলিত হইয়া একই নারীকে ধর্ষণ করিত এবং এরূপে সে তাহাদের সাধারণ রক্ষিতা বলিয়া গণ্য হইত।
এই পরিস্থিতিতে শত্রু পক্ষের যুদ্ধবন্দীদিগকে হঠাৎ করিয়া মুক্তি দেওয়া ইসলামের পক্ষে বাস্তবেই সম্ভব ছিল না। কেননা এরূপ করিলে তাহা কিছুতেই কল্যাণকর হইত না। শত্রুরা এরূপ সুযোগ পাইলে পাল্টা পদক্ষেপের আশংকা হইতে মুক্ত হইয়া সম্মানিত মুসলমানদিগকে দাস বানাইয়া ইচ্ছামত নির্যাতন করিতে থাকিত। এই পরিস্থিতিতে ইসলামের জন্য একটি পথই উন্মুক্ত ছিল যে, শত্রুরা মুসলমান কয়েদীগণের সহিত যেমন ব্যবহার করিবে শত্রুপক্ষের কয়েদীদের সহিতও অনুরূপ ব্যবহার করা হইবে। মোটকথা ইসলামের সহিত শত্রুপক্ষের সহযোগিতা না করা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে বিশ্বের সমস্ত জাতির একটি সাধারণ কর্মনীতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত ইসলাম ইহার অস্তিত্বকে সাময়িকভাবে বরদাশত করিয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00