📄 স্বাধীনতার অপরিহার্য শর্ত
দাসপ্রথা সম্পর্কে আলোচনা করার সময়ে একথা অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে যে, স্বাধীনতা কোন স্থান হইতে দান হিসাবে পাওয়া যায় না, শক্তির জোরেই উহা অর্জন করিতে হয়। কোন আইন রচনা করিলে কিংবা কোন ফরমান জারি করিলেই শত শত বৎসরের পুরাতন দাসপ্রথা আপনা আপনি বিলুপ্ত হইয়া যাইত না। আমেরিকাবাসীদের এই পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এই সত্যটির এক স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কলমের এক খোঁচায় সেই দেশের দাসদের স্বাধীনতার ফরমান জারি করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাতে কি বংশানুক্রমে চলিয়া আসা দাসরা সত্যিই স্বাধীন হইয়া গিয়াছিল? না, হয় নাই। কেননা মানসিক ও আত্মিক দিক হইতে তাহারা এই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হইতে পারে নাই এবং পারে নাই বলিয়াই তখনও এইরূপ দৃশ্য দেখা গিয়াছে যে, আইনগতভাবে স্বাধীন হওয়ার পরও তাহারা প্রাক্তন মনিবদের নিকট যাইতেছে এবং তাহাদিগকে অনুরোধ করিতেছে যে, তাহারা যেন তাহাদিগকে তাড়াইয়া না দেয়, বরং আগের মতই দাস হিসাবে রাখিয়া দেয়।
মানবীয় মনস্তত্ত্বের আলোকে এই বিষয়টির বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে যে, বাহ্যদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর মনে হইলেও প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি ততদূর বিস্ময়কর নহে। প্রত্যেক মানুষের জীবনই কিছু সংখ্যক ধরাবাঁধা অভ্যাস ও তৎপরতার সমষ্টি। যে পরিবেশ ও অবস্থাসমূহের মধ্যে তাহার জীবন অতিবাহিত হয় উহা তাহার যাবতীয় ধ্যান-ধারণা ও চিন্তাধারা বরং তাহার গোটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবধারাকেই প্রভাবিত করে। এই কারণেই একজন দাসের 'মনস্তাত্ত্বিক গঠন প্রক্রিয়া ও প্রকৃতি একজন স্বাধীন মানুষের মানবিক ও বাস্তব দৃষ্টিভংগি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এই পার্থক্যের মূল কারণ হইল, স্থায়ী দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকিতে থাকিতে দাসের মনস্তাত্ত্বিক জীবনে একটি বিশেষ মেষাজের সৃষ্টি হয়। ইহার ফলে আনুগত্য ও এক প্রশ্নাতীত স্বভাব তাহাকে প্রতিনিয়ত আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। উহার বাহিরে কিছু কল্পনা করার ইচ্ছা বা শক্তিও সে হারাইয়া ফেলে। স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে কোন দায়িত্ব পালনের অনুভূতি বলিতে তাহার কিছুই থাকে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে যথাযথভাবে নিজ দায়িত্ব পালনের কোন ক্ষমতা তাহার থাকে না। সে যেমন নিজ হইতে স্বাধীনভাবে কোন কিছু চিন্তা করিতে পারে না, তেমনি সাহসী হইয়া কোন কাজের বাস্তব পদক্ষেপও গ্রহণ করিতে পারে না।
📄 প্রাচ্য জগতে দাসত্বের প্রভাব
নিকট অতীতের মিসর ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলির ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ প্রাচ্যের মুসলিম অধিবাসীদের জীবনকে মানসিক, দৈহিক ও চিন্তাগত দাসত্বের নিগড়ে বাঁধিয়া কতদূর মূল্যহীন ও অথর্ব করিয়া দিয়াছে। পাশ্চাত্যমনা নামধারী মুসলমানদের কথাবার্তা ও বক্তৃতার মাধ্যমে এই মানসিক দাসত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহারা যখন ইসলামের কতক আইন-কানুনকে অকেজো সাব্যস্ত করিয়া এইরূপ ধারণা পোষণ করে যে, বর্তমান যুগে উহা সম্পূর্ণরূপে অচল তখন ইহার অন্তরালে তাহাদের সেই দাস মনোবৃত্তিই সক্রিয় হইয়া উঠে যাহার ফলে একজন দাস স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং উহার সুফল-কুফলকে পৌরুষের সহিত মুকাবিলা করার যোগ্যতা হারাইয়া ফেলে। যদি কোন ইংরেজ বা আমেরিকান আইনবিদ কোন ঘৃণ্য আইনকে সমর্থন করে তাহা হইলে এই লোকেরা খুব আনন্দের সহিত উহা জারি করার জন্য প্রস্তুত হইয়া যায়। প্রাচ্যের দেশসমূহে এখন যে অফিস ব্যবস্থাপনা (Official Management) দেখা যায় উহাও সেই গোলামী যুগের স্মৃতি বহন করিতেছে। এই সকল কার্যালয়ের নিষ্প্রাণ কর্মপদ্ধতি এবং উহার ভীতসন্ত্রস্ত কর্মচারীদের প্রতি তাকাইলে সহজেই অনুমান করা যায়, দাসত্বের অভিশপ্ত ছায়া এখনও প্রাচ্যের অধিবাসীদিগকে কীরূপে গ্রাস করিয়া রাখিয়াছে! এই দাস মনোবৃত্তিই একজন স্বাধীন মানুষকে দাসে পরিণত করে। যতই দিন যাইতে থাকে ততই উহার বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর হইতে থাকে এবং পরিশেষে ইহা এক স্বতন্ত্র স্বভাবে পরিণত হয়। এই প্রকার দাস্য মনোবৃত্তিকে কেবল দাসত্ব বিরোধী আইন করিয়াই নির্মূল করা যায় না। উহা নির্মূল করার জন্য প্রয়োজন নূতন পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ বিপ্লব। তাহা হইলে দাসদের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রকৃতিগত ধারাকে সম্পূর্ণ নূতন খাতে প্রবাহিত করা যাইতে পারে এবং ব্যক্তিচরিত্রের সেই সকল দিককে অনুপ্রাণিত করা যাইতে পারে যাহার ফলে একজন মানুষ স্বাধীন মানুষ হিসাবে জীবন যাপনের সকল ক্ষেত্রে যাবতীয় দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দ্বিধায় অগ্রসর হইতে পারে।
📄 ইসলামের ধারাবহিক কর্মপদ্ধতি
বস্তুত ইসলাম ঠিক এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসূচী গ্রহণ করিয়াছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম দাসদের প্রতি উহার ভদ্রজনোচিত ও সুবিচার ভিত্তিক ব্যবহারের শিক্ষা দিয়াছে। দাসদের মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তাহাদের মধ্যে মানবীয় মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য ইহাই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। কেননা মানুষ একবার যখন মানবীয় মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে তখন তাহারা উহার দাবি ও দায়দায়িত্ব সম্বন্ধে আর শংকিত হয় না এবং আমেরিকার নূতন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দাসদের ন্যায় পুনরায় দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ হইয়া নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপনের জন্যও লালায়িত হয় না। দাসদের সহিত সদ্ব্যবহার এবং তাহাদের মানবিক মর্যাদা ও সম্মান পুনরুদ্ধার পর্যায়ে মুসলিম জাতির ইতিহাস চরম বিস্ময়কর ও প্রশংসনীয় দৃষ্টান্তে ভরপুর। এই পর্যায়ে আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীছের কিছু উদ্ধৃতি ইতোপূর্বে পেশ করিয়াছি। এখানে অত্যন্ত সংক্ষেপে মহানবী (স)-এর বাস্তব জীবন হইতে কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হইল :
📄 দাস হইল মনিবের ভাই
মদীনায় আগমনের পর রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের মধ্যে যে ভ্রাতত্বের বন্ধন স্থাপন করেন তাহাতে তিনি আরব মনিবদিগকে আযাদকৃত দাসদের ভাই বানাইয়া দেন। তিনি হযরত বিলাল (রা)-কে হযরত খালিদ ইব্ন রুওয়ায়হার, হযরত যায়দ ইব্ন হারিছাকে হযরত হামযার এবং হযরত খারিজাকে হযরত আবূ বকর (রা)-র ভাই বানাইয়া দেন। ভ্রাতৃত্বের এই সম্পর্ক রক্ত সম্পর্কের তুলনায় কোন অংশেই কম শক্তিশালী ছিল না।