📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিস্ময়কর ইতিহাস

📄 বিস্ময়কর ইতিহাস


ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় 'ইত্ক' ও মুকাতাবাত' (নিঃশর্ত মুক্তি ও অর্থের বিনিময়ে মুক্তি) দাসপ্রথায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনিয়াছে অবশিষ্ট দুনিয়ার সেই পর্যন্ত পৌঁছিতে অন্ততপক্ষে সাত শত বৎসর লাগিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইসলাম দাসদের অনুকূলে সর্বাত্মক হেফাযত ও পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া মানবতাকে সমুন্নত করার যে পরিকল্পনা দিয়াছে সেই ধারণা প্রাচীন কাল তো দূরের কথা-আধুনিক যুগের কোন ইতিহাসেও বিদ্যমান নাই। ইসলাম মানুষকে দাসদের সহিত যে মহত্ত্ব, উদারতা ও মহানুভবতা প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়াছে এবং কোন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ কিংবা কোনরূপ লোভ-লালসা ছাড়াই দাসদিগকে স্বেচ্ছায় মুক্তি প্রদানের অদম্য প্রেরণা সৃষ্টি করিয়াছে উহার কোন নজীর মানবেতিহাসে নাই। পরবর্তী কালে ইউরোপে দাসরা যে স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে তাহাতে তাহারা ততটুকু সামাজিক মর্যাদাও লাভ করিতে পারে নাই যতটুকু ইসলামী সমাজে দেওয়া হইয়াছিল বহু শতাব্দী পূর্বে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি প্রশ্ন

📄 একটি প্রশ্ন


এই প্রসংগে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে যে, ইসলাম দাসদের মুক্তির জন্য এতদূর বৈপ্লবিক পরিবর্তন সৃষ্টি করিতে সক্ষম হইয়াও চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসাবে কেন এই প্রথাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করে নাই? ইহার উত্তর দেওয়ার পূর্বে দাসপ্রথার কারণে যে নানা প্রকার সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সমস্যার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। কেননা উক্ত পরিবেশ ও সমস্যার কারণেই ইসলাম দাসপ্রথার উপর সর্বশেষ আঘাত হানিতে অগ্রসর হয় নাই, বরং পরবর্তী কিছু কালের জন্য ইহাকে বিলম্বিত করিয়াছে। বিষয়টির এই দিকের সমীক্ষণের জন্য আমাদের একথাও মনে রাখিতে হইবে যে, দাসপ্রথার পূর্ণ উচ্ছেদের ক্ষেত্রে যতটুকু বিলম্ব হইয়াছে উহা ইসলামের কাম্য ছিল না। এই বিলম্বের কারণ ছিল ভিন্নতর।
ইসলামের যখন আগমন ঘটে তখন এই দাসপ্রথার প্রচলন ছিল সমস্ত দুনিয়ায় এবং ইহা ছিল তৎকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংগ। মানব জীবনের জন্য ইহা ছিল অপরিহার্য। সুতরাং এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন তথা দাসপ্রথাকে চিরতরে বিলুপ্ত করার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হওয়াই ছিল বিজ্ঞজনোচিত কাজ। দীর্ঘমেয়াদ ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের এই নীতি ইসলামের অন্যান্য বিধান কার্যকর করার ব্যবস্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মদ্যপানকে হঠাৎ করিয়া একেবারেই পুরাপুরিভাবে নিষিদ্ধ করা হয় নাই, বরং সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার পূর্বে কয়েক বৎসর যাবত উহার বিপক্ষে মানুষের মন-মানসিকতা তৈরি করা হইয়াছে। যদিও ইহা ছিল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ এবং সেই জাহিলিয়াতের যুগে আরবে এমন লোকও বর্তমান ছিল যাহারা মদ্যপানকে অভদ্র জনোচিত কাজ মনে করিয়া উহা কখনও স্পর্শ করিত না। কিন্তু দাসপ্রথা সম্পর্কে আরবদের দৃষ্টিভংগি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতর। তৎকালীন সমাজ কাঠামো এবং প্রচলিত মন-মানসিকতায় ইহার শিকড় ছিল অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। কেননা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অসংখ্য কর্মকাণ্ডই ইহার সহিত ছিল সম্পর্কিত। একমাত্র এই কারণেই এই প্রথার পুরাপুরি বিলুপ্তির জন্য মহানবী (স)-এর পবিত্র জীবন তথা পবিত্র কুরআনের অবতরণ শেষ হওয়ার পর হইতে আরও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল। অতঃপর যথাসময়ে এই প্রথা বিলুপ্ত হইয়া যায়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 স্বাধীনতার অপরিহার্য শর্ত

📄 স্বাধীনতার অপরিহার্য শর্ত


দাসপ্রথা সম্পর্কে আলোচনা করার সময়ে একথা অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে যে, স্বাধীনতা কোন স্থান হইতে দান হিসাবে পাওয়া যায় না, শক্তির জোরেই উহা অর্জন করিতে হয়। কোন আইন রচনা করিলে কিংবা কোন ফরমান জারি করিলেই শত শত বৎসরের পুরাতন দাসপ্রথা আপনা আপনি বিলুপ্ত হইয়া যাইত না। আমেরিকাবাসীদের এই পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এই সত্যটির এক স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কলমের এক খোঁচায় সেই দেশের দাসদের স্বাধীনতার ফরমান জারি করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাতে কি বংশানুক্রমে চলিয়া আসা দাসরা সত্যিই স্বাধীন হইয়া গিয়াছিল? না, হয় নাই। কেননা মানসিক ও আত্মিক দিক হইতে তাহারা এই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হইতে পারে নাই এবং পারে নাই বলিয়াই তখনও এইরূপ দৃশ্য দেখা গিয়াছে যে, আইনগতভাবে স্বাধীন হওয়ার পরও তাহারা প্রাক্তন মনিবদের নিকট যাইতেছে এবং তাহাদিগকে অনুরোধ করিতেছে যে, তাহারা যেন তাহাদিগকে তাড়াইয়া না দেয়, বরং আগের মতই দাস হিসাবে রাখিয়া দেয়।
মানবীয় মনস্তত্ত্বের আলোকে এই বিষয়টির বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে যে, বাহ্যদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর মনে হইলেও প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি ততদূর বিস্ময়কর নহে। প্রত্যেক মানুষের জীবনই কিছু সংখ্যক ধরাবাঁধা অভ্যাস ও তৎপরতার সমষ্টি। যে পরিবেশ ও অবস্থাসমূহের মধ্যে তাহার জীবন অতিবাহিত হয় উহা তাহার যাবতীয় ধ্যান-ধারণা ও চিন্তাধারা বরং তাহার গোটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবধারাকেই প্রভাবিত করে। এই কারণেই একজন দাসের 'মনস্তাত্ত্বিক গঠন প্রক্রিয়া ও প্রকৃতি একজন স্বাধীন মানুষের মানবিক ও বাস্তব দৃষ্টিভংগি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এই পার্থক্যের মূল কারণ হইল, স্থায়ী দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকিতে থাকিতে দাসের মনস্তাত্ত্বিক জীবনে একটি বিশেষ মেষাজের সৃষ্টি হয়। ইহার ফলে আনুগত্য ও এক প্রশ্নাতীত স্বভাব তাহাকে প্রতিনিয়ত আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। উহার বাহিরে কিছু কল্পনা করার ইচ্ছা বা শক্তিও সে হারাইয়া ফেলে। স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে কোন দায়িত্ব পালনের অনুভূতি বলিতে তাহার কিছুই থাকে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে যথাযথভাবে নিজ দায়িত্ব পালনের কোন ক্ষমতা তাহার থাকে না। সে যেমন নিজ হইতে স্বাধীনভাবে কোন কিছু চিন্তা করিতে পারে না, তেমনি সাহসী হইয়া কোন কাজের বাস্তব পদক্ষেপও গ্রহণ করিতে পারে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রাচ্য জগতে দাসত্বের প্রভাব

📄 প্রাচ্য জগতে দাসত্বের প্রভাব


নিকট অতীতের মিসর ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলির ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ প্রাচ্যের মুসলিম অধিবাসীদের জীবনকে মানসিক, দৈহিক ও চিন্তাগত দাসত্বের নিগড়ে বাঁধিয়া কতদূর মূল্যহীন ও অথর্ব করিয়া দিয়াছে। পাশ্চাত্যমনা নামধারী মুসলমানদের কথাবার্তা ও বক্তৃতার মাধ্যমে এই মানসিক দাসত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহারা যখন ইসলামের কতক আইন-কানুনকে অকেজো সাব্যস্ত করিয়া এইরূপ ধারণা পোষণ করে যে, বর্তমান যুগে উহা সম্পূর্ণরূপে অচল তখন ইহার অন্তরালে তাহাদের সেই দাস মনোবৃত্তিই সক্রিয় হইয়া উঠে যাহার ফলে একজন দাস স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং উহার সুফল-কুফলকে পৌরুষের সহিত মুকাবিলা করার যোগ্যতা হারাইয়া ফেলে। যদি কোন ইংরেজ বা আমেরিকান আইনবিদ কোন ঘৃণ্য আইনকে সমর্থন করে তাহা হইলে এই লোকেরা খুব আনন্দের সহিত উহা জারি করার জন্য প্রস্তুত হইয়া যায়। প্রাচ্যের দেশসমূহে এখন যে অফিস ব্যবস্থাপনা (Official Management) দেখা যায় উহাও সেই গোলামী যুগের স্মৃতি বহন করিতেছে। এই সকল কার্যালয়ের নিষ্প্রাণ কর্মপদ্ধতি এবং উহার ভীতসন্ত্রস্ত কর্মচারীদের প্রতি তাকাইলে সহজেই অনুমান করা যায়, দাসত্বের অভিশপ্ত ছায়া এখনও প্রাচ্যের অধিবাসীদিগকে কীরূপে গ্রাস করিয়া রাখিয়াছে! এই দাস মনোবৃত্তিই একজন স্বাধীন মানুষকে দাসে পরিণত করে। যতই দিন যাইতে থাকে ততই উহার বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর হইতে থাকে এবং পরিশেষে ইহা এক স্বতন্ত্র স্বভাবে পরিণত হয়। এই প্রকার দাস্য মনোবৃত্তিকে কেবল দাসত্ব বিরোধী আইন করিয়াই নির্মূল করা যায় না। উহা নির্মূল করার জন্য প্রয়োজন নূতন পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ বিপ্লব। তাহা হইলে দাসদের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রকৃতিগত ধারাকে সম্পূর্ণ নূতন খাতে প্রবাহিত করা যাইতে পারে এবং ব্যক্তিচরিত্রের সেই সকল দিককে অনুপ্রাণিত করা যাইতে পারে যাহার ফলে একজন মানুষ স্বাধীন মানুষ হিসাবে জীবন যাপনের সকল ক্ষেত্রে যাবতীয় দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দ্বিধায় অগ্রসর হইতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00