📄 মুক্তির লিখিত চুক্তিপত্র
ইসলামী বিধানে দাসমুক্তির দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল 'মুকাতাবাত' অর্থাৎ লিখিত চুক্তি পদ্ধতি। যদি কোন দাস তাহার মনিবের নিকট মুক্তি লাভের দাবি করিত তবে মুকাতাবাতের এই পদ্ধতি অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ লাভের পরিবর্তে সেই দাসকে মুক্তি দেওয়া মনিবের জন্য অপরিহার্য হইত। 'মুকাতাবাত' চুক্তি অনুসারে দাস যখন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করিত তখন তাহাকে আযাদ করা ছাড়া মনিবের কোন উপায় থাকিত না। কোন মনিব মুক্তি দিতে না চাহিলে দাস আদালতে বিচার প্রার্থনা করিত। আদালত উক্ত অর্থ আদায় করিয়া দাসের নিকট মুক্তিপত্র প্রদান করিত।
কোন দাস চুক্তির মাধ্যমে আযাদ হওয়ার আবেদন করিলে তাহার মনিব উক্ত আবেদন প্রত্যাখ্যান করিতে পারিত না। স্বয়ং ইসলামী সরকারই হইত তাহার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। মুকাতাবাত চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর মনিবকেই তাহার দাসকে তাহার খেদমতের বিনিময়ে বাধ্যতামূলকভাবে কিছু পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করিয়া দিতে হইত যাহাতে সে চুক্তির অর্থ সংগ্রহ করিতে পারে। মনিব ইহাতে সম্মত না হইলে দাসকে এতটুকু সময় ও সুযোগ অবশ্যই দিতে হইত যাহাতে সে অন্য কাহারও কাজ করিয়া উক্ত অর্থ উপার্জনের সুযোগ পায় এবং ঐ অর্থ দিয়া মুক্তি লাভ করিতে পারে।
📄 সরকারী কোষাগার হইতে সাহায্য প্রদান
রাষ্ট্রীয় কোষাগার হইতে মুক্তিপ্রার্থী দাসের জন্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করা হইত। দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার জন্য ইসলাম যে কতদূর দৃঢ়সংকল্প ও তৎপর উহার বাস্তব প্রমাণ এখানেও বিদ্যমান। আর এই সাহায্য প্রদানের মূলে কোন পার্থিব স্বার্থও নিহিত ছিল না; বরং একমাত্র উদ্দেশ্য হইত মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন। মানুষ যাহাতে পুরাপুরিভাবে একমাত্র আল্লাহ্র দাসত্ব করার সুযোগ লাভ করিতে পারে ইসলাম সেজন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে।
সূরা আত-তাওবার ৬০ নং আয়াত হইতে জানা যায়, যে সকল দাস নিজেদের অর্জিত অর্থ দ্বারা মুক্তিলাভ করিতে অক্ষম তাহাদিগকে যাকাত তহবিল হইতে সাহায্য করিতে হইবে।
📄 বিস্ময়কর ইতিহাস
ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় 'ইত্ক' ও মুকাতাবাত' (নিঃশর্ত মুক্তি ও অর্থের বিনিময়ে মুক্তি) দাসপ্রথায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনিয়াছে অবশিষ্ট দুনিয়ার সেই পর্যন্ত পৌঁছিতে অন্ততপক্ষে সাত শত বৎসর লাগিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইসলাম দাসদের অনুকূলে সর্বাত্মক হেফাযত ও পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া মানবতাকে সমুন্নত করার যে পরিকল্পনা দিয়াছে সেই ধারণা প্রাচীন কাল তো দূরের কথা-আধুনিক যুগের কোন ইতিহাসেও বিদ্যমান নাই। ইসলাম মানুষকে দাসদের সহিত যে মহত্ত্ব, উদারতা ও মহানুভবতা প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়াছে এবং কোন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ কিংবা কোনরূপ লোভ-লালসা ছাড়াই দাসদিগকে স্বেচ্ছায় মুক্তি প্রদানের অদম্য প্রেরণা সৃষ্টি করিয়াছে উহার কোন নজীর মানবেতিহাসে নাই। পরবর্তী কালে ইউরোপে দাসরা যে স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে তাহাতে তাহারা ততটুকু সামাজিক মর্যাদাও লাভ করিতে পারে নাই যতটুকু ইসলামী সমাজে দেওয়া হইয়াছিল বহু শতাব্দী পূর্বে।
📄 একটি প্রশ্ন
এই প্রসংগে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে যে, ইসলাম দাসদের মুক্তির জন্য এতদূর বৈপ্লবিক পরিবর্তন সৃষ্টি করিতে সক্ষম হইয়াও চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসাবে কেন এই প্রথাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করে নাই? ইহার উত্তর দেওয়ার পূর্বে দাসপ্রথার কারণে যে নানা প্রকার সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সমস্যার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। কেননা উক্ত পরিবেশ ও সমস্যার কারণেই ইসলাম দাসপ্রথার উপর সর্বশেষ আঘাত হানিতে অগ্রসর হয় নাই, বরং পরবর্তী কিছু কালের জন্য ইহাকে বিলম্বিত করিয়াছে। বিষয়টির এই দিকের সমীক্ষণের জন্য আমাদের একথাও মনে রাখিতে হইবে যে, দাসপ্রথার পূর্ণ উচ্ছেদের ক্ষেত্রে যতটুকু বিলম্ব হইয়াছে উহা ইসলামের কাম্য ছিল না। এই বিলম্বের কারণ ছিল ভিন্নতর।
ইসলামের যখন আগমন ঘটে তখন এই দাসপ্রথার প্রচলন ছিল সমস্ত দুনিয়ায় এবং ইহা ছিল তৎকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংগ। মানব জীবনের জন্য ইহা ছিল অপরিহার্য। সুতরাং এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন তথা দাসপ্রথাকে চিরতরে বিলুপ্ত করার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হওয়াই ছিল বিজ্ঞজনোচিত কাজ। দীর্ঘমেয়াদ ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের এই নীতি ইসলামের অন্যান্য বিধান কার্যকর করার ব্যবস্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মদ্যপানকে হঠাৎ করিয়া একেবারেই পুরাপুরিভাবে নিষিদ্ধ করা হয় নাই, বরং সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার পূর্বে কয়েক বৎসর যাবত উহার বিপক্ষে মানুষের মন-মানসিকতা তৈরি করা হইয়াছে। যদিও ইহা ছিল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ এবং সেই জাহিলিয়াতের যুগে আরবে এমন লোকও বর্তমান ছিল যাহারা মদ্যপানকে অভদ্র জনোচিত কাজ মনে করিয়া উহা কখনও স্পর্শ করিত না। কিন্তু দাসপ্রথা সম্পর্কে আরবদের দৃষ্টিভংগি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতর। তৎকালীন সমাজ কাঠামো এবং প্রচলিত মন-মানসিকতায় ইহার শিকড় ছিল অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। কেননা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অসংখ্য কর্মকাণ্ডই ইহার সহিত ছিল সম্পর্কিত। একমাত্র এই কারণেই এই প্রথার পুরাপুরি বিলুপ্তির জন্য মহানবী (স)-এর পবিত্র জীবন তথা পবিত্র কুরআনের অবতরণ শেষ হওয়ার পর হইতে আরও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল। অতঃপর যথাসময়ে এই প্রথা বিলুপ্ত হইয়া যায়।