📄 দাসদের সম্পর্কে মানবীয় ধারণা
ইসলাম মনিবদিগকে এই ধারণা দিতে সক্ষম হইয়াছে যে, দাসগণ তাহাদের ভাই। বিশ্বনবী (স) বলেনঃ "তোমাদের দাসগণ তোমারে ভাই। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাহার অধীনে তাহার কোন ভাই থাকিবে সে যেন তাহার জন্য সেইরূপ খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে যেরূপ সে নিজের জন্য করে এবং যে কাজ করার মত শক্তি তাহার নাই সেই কাজ করার হুকুম যেন লে তাহাকে না দেয়। একান্তই যদি সে সেইরূপ কাজের হুকুম দেয় তবে সে নিজে যেন তাহার সাহায্য করে"।
ইসলাম দাসদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি-উপলব্ধির প্রতিও যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করিয়াছে। মহানবী (স) বলেনঃ তোমাদের কেহ যেন (দাসদের সম্বন্ধে) এরূপ না বলে, সে আমার দাস এবং সে আমার দাসী। উহার পরিবর্তে বলিতে হইবে, ঐ আমার সেবক এবং এই আমার সেবিকা।
হাদীছের এই শিক্ষা অনুযায়ী হযরত আবূ হুরায়রা (রা) যখন দেখিতে পান, এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়িয়া যাইতেছে এবং তাহার গোলাম তাহার পিছনে পদব্রজে যাইতেছে তখন তিনি ঐ ব্যক্তিকে বলিলেন, তাহাকে ঘোড়ার পিঠে তোমার পিছনে বসাইয়া দাও। কেননা সে তোমার ভাই। তোমার ন্যায় তাহারও একটি প্রাণ আছে।
ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর দাসদের জীবনে যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় তাহার ফলে তাহারা আর বেচা-কেনার পণ্য থাকিল না। মানবেতিহাসে এই প্রথমবারই তাহারা স্বাধীন মানুষের মর্যাদা ও অধিকার লাভের সৌভাগ্য অর্জন করিল। ইহার পূর্বে তাহাদিগকে মানুষ বলিয়া গণ্য করা হইত না। তাহাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইল, তাহারা অন্যদের সেবা করিবে এবং মনিবের অত্যাচার-উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নীরবে সহ্য করিবে। দাসদের সম্পর্কে এইরূপ ন্যক্কারজনক দৃষ্টিভংগীর কারণে তাহাদিগকে বেধড়ক হত্যা করা হইত, বর্বরোচিত ও পাশবিক শাস্তির চর্চাস্থল গণ্য করা হইত, চরম ঘৃণার্হ মনে করা হইত এবং কঠিন কাজ করিতে বাধ্য করা হইত। কাহারও অন্তরে তাহাদের জন্য সামান্যতম দয়া বা সহানুভূতির উদ্রেক হইত না। ইসলামে রাসুলুল্লাহ (স) দাসদিগকে এই করুণ অবস্থা হইতে উদ্ধার করিয়া স্বাধীন মানুষদের সহিত একই কাতারে দাঁড় করাইয়া ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছে। ইসলামে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কীর্তি কোন মুখরোচক ঘোষণামাত্র নয়, বরং মানবেতিহাসের এক অমোঘ সত্য; উহার পাতায় পাতায় ইহার সাক্ষ্য বর্তমান।
📄 ইউরোপের সাক্ষ্য
ইউরোপের পক্ষপাতদুষ্ট তথা ইসলাম বিদ্বেষী লেখকগণও এই সত্যকে অস্বীকার করিতে পারেন নাই যে, ইসলামের প্রথম যুগে দাসগণ এমন এক সমুন্নত সামাজিক মর্যাদা লাভ করিয়াছিল যাহার নজীর বিশ্বের কোন দেশ বা জাতির মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। ইসলামী সমাজব্যবস্থায় তাহাদিগকে এইরূপ সম্মানজনক আসন দান করা হইয়াছিল যে, দাসত্বের বন্ধন হইতে মুক্ত হওয়ার পরও কোন দাস তাহার পূর্ববর্তী মনিবদের বিরুদ্ধে সামান্যতম বিশ্বাসঘাতকতার কথাও কল্পনা করে নাই; বরং এরূপ বিশ্বাসঘাতকতা করাকে তাহারা চরম ঘৃণার্হ ও জঘন্য কাজ মনে করিত। মুক্তিলাভের পর একদিকে যেমন পূর্ববর্তী মনিবের পক্ষ হইতে কোন বিপদাশংকার কারণ থাকিত না, অন্যদিকে পূর্বের মত তাহার মুখাপেক্ষী হওয়ারও কোন হেতু অবশিষ্ট থাকিত না। সে তাহার প্রাক্তন মনিবের মতই একজন স্বাধীন মানুষ হিসাবে বিবেচিত হইত। এইভাবে স্বাধীন হওয়ার পর সে তাহার মনিব গোত্রের একজন স্বাধীন সদস্য হিসাবেই গণ্য হইত। ইসলাম মনিব ও দাসদের মধ্যে অভিভাবকত্বের এমন এক বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করিল যে, পরবর্তী পর্যায়ে ইহাকে রক্তের বন্ধনের চাইতে কোন অংশেই কম শক্তিশালী বিবেচনা করা হইত না।
📄 দাসদের জীবন ও মানবিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন
অধিকন্তু দাসদের জীবনের প্রতিও এতদূর সম্মান প্রদর্শন করা হইল যে, একজন স্বাধীন মানুষের মতই তাহার জীবনেরও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হইল এবং এই নিরাপত্তার জন্য যাবতীয় আইন-কানুনও রচিত হইল। মহানবী (স) মুসলমানদিগকে তাহাদের দাস-দাসীকে দাস বা দাসী, গোলাম ও বাঁদী বলিয়া সম্বোধন করিতে নিষেধ করিলেন এবং শিক্ষা দিলেন যে, তাহাদিগকে এমনভাবে ডাকিতে হইবে যাহাতে তাহাদের মানসিক দূরত্ববোধ বিলুপ্ত হয় এবং তাহারা নিজদিগকে তাহাদের মনিবদের পরিবারভুক্ত মনে করিতে পারে। মহানবী (স) বলেনঃ "ইহা নিশ্চিত যে, আল্লাহই তোমাদিগকেও দাস বানাইয়া তাহাদের অধীনস্থ করিতে পারিতেন" (ইহুয়াই উলূমিদ্দীন)। তাহারা এক বিশেষ অবস্থায় ও ঘটনাচক্রে দাস হইতে বাধ্য হইয়াছে। কেননা মানুষ হিসাবে তাহাদের এবং তাহাদের মনিবদের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। ইসলাম মনিবদের সহিত আবদ্ধ করিয়া এক অনাবিল মানবীয় সম্পর্কের বন্ধনে তাহাদিগকে আবদ্ধ করিয়াছে। ফলে মনিব ও দাস পরস্পর ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে, পারস্পরিক মৈত্রী ও ভালবাসা বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে এই ভালোবাসাই সমস্ত মানবীয় সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করিয়াছে। দৈহিক নিপীড়ন বা ক্ষতিসাধনের জন্য মনিব ও দাস উভয়ের জন্য একই প্রকার দণ্ডের ব্যবস্থা করা হইয়াছে এবং এইক্ষেত্রে তাহাদের মধ্যে আদৌ কোন পার্থক্য করা কিংবা বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় নাই। যে আমাদের কোন দাসকে হত্যা করিবে তাহাকেও হত্যা করা হইবে- ইসলামের এই সুদূরপ্রসারী বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইহা নিষ্কলুষ মানবীয় স্তরে মনিব ও দাসদের মধ্যে পূর্ণাংগ সাম্য স্থাপন করিয়াছে। উভয়ই জীবনের সকল দিক ও বিভাগে সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করুক- ইহাই ইসলামে রাসূলুল্লাহ (র)-এর-কাম্য।
📄 দাসদের মানবিক অধিকার
ইসলামী শিক্ষার ফলে এই সত্যটিও স্পষ্ট হইল যে, দাস থাকা অবস্থায়ও কোন দাসকে তাহার মানবিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হয় নাই। ইসলামী শারী'আতের এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা শুধু দাসদের জীবন ও ইয্যতের নিরাপত্তার জন্যই যথেষ্ট ছিল না, বরং ইহা এতদূর উদার ও ভদ্রতাপূর্ণ ছিল যে, ইসলামের পূর্বাপর কোন ইতিহাসেই ইহার নজীর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এই পর্যায়ে ইসলাম এতদূর অগ্রসর হইয়াছে যে, ইহা কোন দাসের চেহারায় চপেটাঘাত করাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছে। আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার জন্য চপেটাঘাত করার যে অনুমতি মনিবকে দেয়া হইয়াছে উহার জন্যও সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন বিধিবদ্ধ করা হইয়াছে যাহাতে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রেও সে বৈধ সীমালংঘন করিতে না পারে। প্রকৃতপক্ষে শিশুদের দুষ্টামি বন্ধ করার জন্য বড়রা যে ধরনের শাস্তি দিয়া থাকে উহার চেয়ে কঠিন শাস্তি দাসদের জন্য কখনও বৈধ করা হয় নাই। এই ধরনের শাস্তিও ইসলামের বিপ্লবোত্তর যুগে দাসদের মুক্তির জন্য আইনগত ভিত্তি রচনা করিয়াছে এবং তাহারা মুক্তিলাভের ন্যায্য অধিকার লাভে সমর্থ হইয়াছে।
প্রথম পর্যায়ে ইসলাম দাসদিগকে মানবিক ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা দান করিয়াছে, তাহাদের অতীতের মানবীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার করিয়াছে এবং স্পষ্টভাবে জানাইয়া দিয়াছে যে, একই যৌথ মানবতার সূত্রে গ্রথিত বলিয়া সকল দাসই তাহাদের মনিবদের ন্যায় একই মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। স্বাধীনতার গৌরব হইতে বঞ্চিত হইয়া তাহারা কোন দিন মানবতাকে হারায় নাই এবং প্রাকৃতিক বা জন্মগত কোন দুর্বলতারও শিকার হয় নাই, বরং কিছু বাহ্যিক অবস্থা ও পরিবেশের কারণেই তাহাদের স্বাধীনতাকে হরণ করা হইয়াছিল এবং যাবতীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডের পথ তাহাদের জন্য রুদ্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই বাহ্যিক অবস্থা তথা দাসত্বকে বাদ দিলে তাহারা অন্যান্য লোকদের মতই মানুষ এবং মানুষ হিসাবে তাহাদের মনিবদের ন্যায় তাহারা যাবতীয় মানবীয় অধিকার লাভের উপযুক্ত।
ইসলাম এতটুকু করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই। কেননা অন্যতম মূলনীতি হইতেছে মানুষের পূর্ণাংগ সমতা বিধান। এই নীতির দাবিই হইল, বিশ্বের সমস্ত মানুষ সমান এবং স্বাধীন মানুষ হিসাবে মানবীয় অধিকার লাভের ক্ষেত্রে সকলে সমান। তাই ইসলাম দাসদিগকে পুরাপুরি স্বাধীন করিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে দুইটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। প্রথমটি হইল সরাসরি মুক্তিদান (বা 'ইত্ক°) অর্থাৎ মনিবদের পক্ষ হইতে দাসদিগকে স্বেচ্ছায় মুক্তি প্রদান করা। দ্বিতীয়টি হইল মুক্তির লিখিত চুক্তি (মুকাতাবাত) অর্থাৎ মনিব ও দাসের মধ্যে মুক্তিদানের লিখিত চুক্তি সম্পাদন।