📄 ইসলামের বৈপ্লবিক ঘোষণা
বিশ্বমানবতার এই অধঃপতনের যুগেই ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম দাসদিগকে তাহাদের হারানো মানবিক মর্যাদা পুনরায় ফিরাইয়া দিল। প্রভু ও দাস উভয়কে সম্বোধন করিয়া ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিল:
بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضٍ. "তোমরা একে অপরের সমান" (৪: ২৫)।
ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিল, যে ব্যক্তি আমাদের কোন দাসকে হত্যা করিবে তাহাকে উহার বদলা হিসাবে হত্যা করা হইবে। কেহ তাহার নাক কর্তন করিলে তাহার নাকও কর্তন করা হইবে। যে তাহাকে খাসী (পুরুষত্বহীন) করিবে তাহাকেও তদ্রূপ করা হইবে” (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ)। "তোমরা সকলেই আদমের সন্তান এবং আদমকে সৃষ্টি করা হইয়াছে মৃত্তিকা হইতে” (মুসলিম, আবু দাউদ)। ইসলাম মনিবকে কখনও প্রভু হিসাবে মর্যাদা দেয় নাই, বরং মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের জন্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকেই ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে। বলা হইয়াছে: "তাকওয়া ছাড়া কোন আরব কোন আজমীর চেয়ে, কোন শ্বেতাংগের চেয়ে কোন কৃষ্ণাংগ কিংবা কৃষ্ণাংগের চেয়ে কোন শ্বেতাংগ মর্যাদায় উন্নত হইতে পারে না” (বুখারী)।
ইসলাম মনিবদিগকে তাহাদের অধীনস্থ দাস-দাসীর সহিত ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا. مُخْتَالاً فَخُورًا .
"মাতা-পিতার সহিত সদ্ব্যবহার কর....... তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদের প্রতি বদান্যতা প্রদর্শন কর। নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিত ব্যক্তিকে পসন্দ করেন না" (৪:৩৬)।
ইসলাম মানুষের নিকট এই সত্যও পেশ করিয়াছে যে, মনিব ও দাসের মূল সম্পর্ক মনিব ও গোলাম কিংবা হুকুমদাতা ও হুকুম পালনকারীর নয়; বরং তাহা হইল ভ্রাতৃত্ব ও ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। অতএব ইসলাম মনিবকে তাহার অধীনস্থ দাসীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করার অনুমতি দিয়াছে। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طولاً أَنْ يُنْكِحَ المُحْصَنَتِ الْمُؤْمِنِتِ فَمِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِّنْ فَتَيْتِكُمُ الْمُؤْمِنِتِ ، وَاللهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِكُمْ ، بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضَ ، فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوف .
"তোমাদের মধ্যে কাহারও স্বাধীনা ঈমানদার নারী বিবাহের সামর্থ্য না থাকিলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিবাহ করিবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান; সুতরাং তাহাদিগকে বিবাহ করিবে তাহাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং তাহাদিগকে তাহাদের মাহর ন্যায়সংগতভাবে দিবে" (৪:২৫)।
📄 দাসদের সম্পর্কে মানবীয় ধারণা
ইসলাম মনিবদিগকে এই ধারণা দিতে সক্ষম হইয়াছে যে, দাসগণ তাহাদের ভাই। বিশ্বনবী (স) বলেনঃ "তোমাদের দাসগণ তোমারে ভাই। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাহার অধীনে তাহার কোন ভাই থাকিবে সে যেন তাহার জন্য সেইরূপ খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে যেরূপ সে নিজের জন্য করে এবং যে কাজ করার মত শক্তি তাহার নাই সেই কাজ করার হুকুম যেন লে তাহাকে না দেয়। একান্তই যদি সে সেইরূপ কাজের হুকুম দেয় তবে সে নিজে যেন তাহার সাহায্য করে"।
ইসলাম দাসদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি-উপলব্ধির প্রতিও যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করিয়াছে। মহানবী (স) বলেনঃ তোমাদের কেহ যেন (দাসদের সম্বন্ধে) এরূপ না বলে, সে আমার দাস এবং সে আমার দাসী। উহার পরিবর্তে বলিতে হইবে, ঐ আমার সেবক এবং এই আমার সেবিকা।
হাদীছের এই শিক্ষা অনুযায়ী হযরত আবূ হুরায়রা (রা) যখন দেখিতে পান, এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়িয়া যাইতেছে এবং তাহার গোলাম তাহার পিছনে পদব্রজে যাইতেছে তখন তিনি ঐ ব্যক্তিকে বলিলেন, তাহাকে ঘোড়ার পিঠে তোমার পিছনে বসাইয়া দাও। কেননা সে তোমার ভাই। তোমার ন্যায় তাহারও একটি প্রাণ আছে।
ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর দাসদের জীবনে যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় তাহার ফলে তাহারা আর বেচা-কেনার পণ্য থাকিল না। মানবেতিহাসে এই প্রথমবারই তাহারা স্বাধীন মানুষের মর্যাদা ও অধিকার লাভের সৌভাগ্য অর্জন করিল। ইহার পূর্বে তাহাদিগকে মানুষ বলিয়া গণ্য করা হইত না। তাহাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইল, তাহারা অন্যদের সেবা করিবে এবং মনিবের অত্যাচার-উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নীরবে সহ্য করিবে। দাসদের সম্পর্কে এইরূপ ন্যক্কারজনক দৃষ্টিভংগীর কারণে তাহাদিগকে বেধড়ক হত্যা করা হইত, বর্বরোচিত ও পাশবিক শাস্তির চর্চাস্থল গণ্য করা হইত, চরম ঘৃণার্হ মনে করা হইত এবং কঠিন কাজ করিতে বাধ্য করা হইত। কাহারও অন্তরে তাহাদের জন্য সামান্যতম দয়া বা সহানুভূতির উদ্রেক হইত না। ইসলামে রাসুলুল্লাহ (স) দাসদিগকে এই করুণ অবস্থা হইতে উদ্ধার করিয়া স্বাধীন মানুষদের সহিত একই কাতারে দাঁড় করাইয়া ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছে। ইসলামে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কীর্তি কোন মুখরোচক ঘোষণামাত্র নয়, বরং মানবেতিহাসের এক অমোঘ সত্য; উহার পাতায় পাতায় ইহার সাক্ষ্য বর্তমান।
📄 ইউরোপের সাক্ষ্য
ইউরোপের পক্ষপাতদুষ্ট তথা ইসলাম বিদ্বেষী লেখকগণও এই সত্যকে অস্বীকার করিতে পারেন নাই যে, ইসলামের প্রথম যুগে দাসগণ এমন এক সমুন্নত সামাজিক মর্যাদা লাভ করিয়াছিল যাহার নজীর বিশ্বের কোন দেশ বা জাতির মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। ইসলামী সমাজব্যবস্থায় তাহাদিগকে এইরূপ সম্মানজনক আসন দান করা হইয়াছিল যে, দাসত্বের বন্ধন হইতে মুক্ত হওয়ার পরও কোন দাস তাহার পূর্ববর্তী মনিবদের বিরুদ্ধে সামান্যতম বিশ্বাসঘাতকতার কথাও কল্পনা করে নাই; বরং এরূপ বিশ্বাসঘাতকতা করাকে তাহারা চরম ঘৃণার্হ ও জঘন্য কাজ মনে করিত। মুক্তিলাভের পর একদিকে যেমন পূর্ববর্তী মনিবের পক্ষ হইতে কোন বিপদাশংকার কারণ থাকিত না, অন্যদিকে পূর্বের মত তাহার মুখাপেক্ষী হওয়ারও কোন হেতু অবশিষ্ট থাকিত না। সে তাহার প্রাক্তন মনিবের মতই একজন স্বাধীন মানুষ হিসাবে বিবেচিত হইত। এইভাবে স্বাধীন হওয়ার পর সে তাহার মনিব গোত্রের একজন স্বাধীন সদস্য হিসাবেই গণ্য হইত। ইসলাম মনিব ও দাসদের মধ্যে অভিভাবকত্বের এমন এক বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করিল যে, পরবর্তী পর্যায়ে ইহাকে রক্তের বন্ধনের চাইতে কোন অংশেই কম শক্তিশালী বিবেচনা করা হইত না।
📄 দাসদের জীবন ও মানবিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন
অধিকন্তু দাসদের জীবনের প্রতিও এতদূর সম্মান প্রদর্শন করা হইল যে, একজন স্বাধীন মানুষের মতই তাহার জীবনেরও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হইল এবং এই নিরাপত্তার জন্য যাবতীয় আইন-কানুনও রচিত হইল। মহানবী (স) মুসলমানদিগকে তাহাদের দাস-দাসীকে দাস বা দাসী, গোলাম ও বাঁদী বলিয়া সম্বোধন করিতে নিষেধ করিলেন এবং শিক্ষা দিলেন যে, তাহাদিগকে এমনভাবে ডাকিতে হইবে যাহাতে তাহাদের মানসিক দূরত্ববোধ বিলুপ্ত হয় এবং তাহারা নিজদিগকে তাহাদের মনিবদের পরিবারভুক্ত মনে করিতে পারে। মহানবী (স) বলেনঃ "ইহা নিশ্চিত যে, আল্লাহই তোমাদিগকেও দাস বানাইয়া তাহাদের অধীনস্থ করিতে পারিতেন" (ইহুয়াই উলূমিদ্দীন)। তাহারা এক বিশেষ অবস্থায় ও ঘটনাচক্রে দাস হইতে বাধ্য হইয়াছে। কেননা মানুষ হিসাবে তাহাদের এবং তাহাদের মনিবদের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। ইসলাম মনিবদের সহিত আবদ্ধ করিয়া এক অনাবিল মানবীয় সম্পর্কের বন্ধনে তাহাদিগকে আবদ্ধ করিয়াছে। ফলে মনিব ও দাস পরস্পর ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে, পারস্পরিক মৈত্রী ও ভালবাসা বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে এই ভালোবাসাই সমস্ত মানবীয় সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করিয়াছে। দৈহিক নিপীড়ন বা ক্ষতিসাধনের জন্য মনিব ও দাস উভয়ের জন্য একই প্রকার দণ্ডের ব্যবস্থা করা হইয়াছে এবং এইক্ষেত্রে তাহাদের মধ্যে আদৌ কোন পার্থক্য করা কিংবা বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় নাই। যে আমাদের কোন দাসকে হত্যা করিবে তাহাকেও হত্যা করা হইবে- ইসলামের এই সুদূরপ্রসারী বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইহা নিষ্কলুষ মানবীয় স্তরে মনিব ও দাসদের মধ্যে পূর্ণাংগ সাম্য স্থাপন করিয়াছে। উভয়ই জীবনের সকল দিক ও বিভাগে সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করুক- ইহাই ইসলামে রাসূলুল্লাহ (র)-এর-কাম্য।