📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসলামের অবদান

📄 ইসলামের অবদান


এই পর্যায়ে ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের প্রতি আমরা একবার দৃকপাত করিব। ইহা একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, রোমকদের ইতিহাসের অন্ধকার ও ভয়ঙ্কর অপরাধের সহিত ইসলামী ইতিহাসের আদৌ কোন সম্পর্ক নাই। রোম সাম্রাজ্যে দাসেরা যে ধরনের জীবন যাপন করিত উহার বিস্তৃত সাক্ষ্য-প্রমাণ আমাদের নিকট বর্তমান। উহার আলোকে ইসলামের কারণে দাসপ্রথার ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় বিপ্লব সাধিত হইয়াছিল তাহা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। উহা ইসলামের এমন এক উজ্জ্বল অক্ষয় কীর্তি যে, উহার পর দাসপ্রথার বিলোপের জন্য অন্য কিছুর প্রয়োজন হয় নাই। ইসলাম শুধু এতটুকু করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই; বরং মানবীয় স্বাধীনতার প্রকৃত ধারণা তুলিয়া ধরার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব ক্ষেত্রে উহাকে কার্যকর করিয়া দেখাইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রোম সাম্রাজ্যে দাসদের করুণ অবস্থা

📄 রোম সাম্রাজ্যে দাসদের করুণ অবস্থা


রোমকদের রাজত্বকালে দাসদিগকে মানুষ বলিয়াই গণ্য করা হইত না। তাহারা ছিল নিছক পণ্য সামগ্রী। অধিকার বলিতে তাহাদের কিছুই ছিল না। অথচ তাহাদের পালন করিতে হইত দুঃসহ ও কঠিন দায়িত্ব। এই দাস প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল যুদ্ধ। মহান কোন উদ্দেশ্য বা নীতির জন্য এই সকল যুদ্ধ সংঘটিত হইত না, বরং অন্যকে দাস বানাইয়া নিজেদের হীনতম স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার জন্যই যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হইত। রোমকরা এই সকল যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস ও সুখ-ঐশ্বর্যের দ্রব্যসামগ্রী, ঠাণ্ডা ও গরম গোসলখানা, বহুমূল্য পোশাক-পরিচ্ছদ, মজাদার পানাহার ও আমোদ-প্রমোদের পথ প্রশস্ত করিত। পতিতাবৃত্তি, মদ্যপান, নাচ-গান, ক্রীড়া-কৌতুক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া তাহারা যেন চলিতে পারিত না। জৈবিক আনন্দ, ব্যভিচার ও বিলাস-ব্যসনের উপায়-উপাদান হাসিল করার জন্যই তাহারা অন্য এলাকাসমূহ আক্রমণ করিত এবং তথাকার নারী-পুরুষদিগকে গোলাম বানাইয়া তাহাদের ভয়ঙ্কর পশুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করিত। ইসলাম যে মিসরকে রোমকদের সাম্রাজ্যবাদী থাবা হইতে মুক্ত করিয়াছিল তাহা ছিল তাহাদের ঘৃণ্যতম পাশবিকতার নিষ্ঠুর শিকার। মিসর ছিল তাহাদের খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রধান ক্ষেত্র এবং ভোগ্যসামগ্রী সরবরাহের উল্লেখযোগ্য উৎস। মিসরের মাঠে-ময়দানে তাহাদিগকে (চতুষ্পদ প্রাণীর মত) সারাদিন পরিশ্রম করিতে হইত; কিন্তু পেট ভরিয়া আহার তাহাদের ভাগ্যে জুটিত না। সাধারণ পশুর চাইতেও তাহাদের অবস্থা ছিল নিকৃষ্ট। দিনের বেলা যাহাতে তাহারা রক্ষক বা প্রহরীদিগকে ফাঁকি দিয়া পালাইয়া যাইতে না পারে সেইজন্য তাহাদের পায়ে ও কোমরে লোহার বেড়ি পরাইয়া রাখা হইত। কারণে অকারণে তাহাদের পিঠে বৃষ্টির মত চাবুক মারা হইত। তাহাদের প্রভুগণ কিংবা স্থানীয় কর্মীগণ তাহাদিগকে ইতর জীবের মত প্রহার করিতে বড়ই আনন্দ পাইত। সন্ধ্যায় যখন তাহাদের কাজ শেষ হইত তখন তাহাদিগকে দশ-দশ, বিশ-বিশ বা পঞ্চাশ-পঞ্চাশজনের দলে বিভক্ত করিয়া অপরিষ্কার ও পূতিগন্ধময় খুপরীর মধ্যে আটকাইয়া রাখা হইত। এই খুপরীর মধ্যেও তাহাদের হাত-পা বেড়িমুক্ত করা হইত না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খৃস্টান রোমকদের একটি পাশবিক খেলা

📄 খৃস্টান রোমকদের একটি পাশবিক খেলা


দাসদের প্রতি রোমক খৃস্টানদের সবচেয়ে বর্বর ও রোমাঞ্চকর ব্যবহার তাহাদের চিত্তবিনোদন তথা আনন্দ উপভোগের প্রক্রিয়ার মধ্যে দেখা যায়। উহাতে তাহাদের স্বভাব, নিকৃষ্টতম বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতম হিংস্রতার পরিচয় পাওয়া যায়।
প্রভুদের চিত্তবিনোদন ও মনোরঞ্জনের জন্য কিছু সংখ্যক দাসের হাতে তরবারি ও বল্লম দিয়া জোর পূর্বক একটি আসরে ঢুকাইয়া দেওয়া হইত। উহার চারিদিকে তাহাদের প্রভুরা এবং অনেক সময় রোম সাম্রাজ্যের অধিপতিও উপস্থিত থাকিত। তারপর নির্দিষ্ট সময়ে দাসদিগকে হুকুম দেওয়া হইত প্রত্যেকে যেন নিজ নিজ প্রতিপক্ষ দাসের উপর সশস্ত্র হামলা চালাইয়া তাহাদিগকে ক্ষতবিক্ষত ও টুকরা টুকরা করিয়া ফেলে। তখন শুরু হইয়া যাইত তাহাদের পারস্পরিক মরণপণ যুদ্ধ। যুদ্ধ যখন শেষ হইত তখন দেখা যাইত হয়ত দুই একটি প্রাণীই কোন রকমে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় বাঁচিয়া আছে এবং অন্যরা শত-সহস্র টুকরায় বিভক্ত হইয়া সমস্ত আসরে ছড়াইয়া আছে। জীবিত দাসদিগকে তাহারা বিজয়ী ঘোষণা করিত এবং বিকট অট্টহাসি ও মুহুর্মুহু হাততালি দিয়া তাহাদিগকে অভিনন্দন জানাইত।
ইরান, ভারত ও অন্যান্য দেশের দাসগণও ছিল একইরূপ জুলুমের শিকার। খুঁটিনাটি বিষয়ে তারতম্য থাকিলেও দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে দাসদের অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য ছিল না। তাহাদের জীবনের কোন মূল্যই ছিল না। কোন নিরপরাধ দাসকে হত্যা করা এমন কোন অপরাধই ছিল না। অথচ তাহাদের উপর দায়িত্ব ও কর্তব্যের এত বোঝা চাপানো হইত যে, তাহাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়া যাইত। দুনিয়ার সব দেশেই দাসদের ব্যাপারে সকলের দৃষ্টিভংগি ছিল এক ও অভিন্ন এবং সামাজিক অধিকার সম্পর্কেও কোন পার্থক্য ছিল না, পার্থক্য ছিল কেবল নিষ্ঠুরতার পরিমাণ ও উৎপীড়নের পদ্ধতির ক্ষেত্রে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসলামের বৈপ্লবিক ঘোষণা

📄 ইসলামের বৈপ্লবিক ঘোষণা


বিশ্বমানবতার এই অধঃপতনের যুগেই ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম দাসদিগকে তাহাদের হারানো মানবিক মর্যাদা পুনরায় ফিরাইয়া দিল। প্রভু ও দাস উভয়কে সম্বোধন করিয়া ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিল:
بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضٍ. "তোমরা একে অপরের সমান" (৪: ২৫)।
ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিল, যে ব্যক্তি আমাদের কোন দাসকে হত্যা করিবে তাহাকে উহার বদলা হিসাবে হত্যা করা হইবে। কেহ তাহার নাক কর্তন করিলে তাহার নাকও কর্তন করা হইবে। যে তাহাকে খাসী (পুরুষত্বহীন) করিবে তাহাকেও তদ্রূপ করা হইবে” (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ)। "তোমরা সকলেই আদমের সন্তান এবং আদমকে সৃষ্টি করা হইয়াছে মৃত্তিকা হইতে” (মুসলিম, আবু দাউদ)। ইসলাম মনিবকে কখনও প্রভু হিসাবে মর্যাদা দেয় নাই, বরং মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের জন্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকেই ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে। বলা হইয়াছে: "তাকওয়া ছাড়া কোন আরব কোন আজমীর চেয়ে, কোন শ্বেতাংগের চেয়ে কোন কৃষ্ণাংগ কিংবা কৃষ্ণাংগের চেয়ে কোন শ্বেতাংগ মর্যাদায় উন্নত হইতে পারে না” (বুখারী)।
ইসলাম মনিবদিগকে তাহাদের অধীনস্থ দাস-দাসীর সহিত ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا. مُخْتَالاً فَخُورًا .
"মাতা-পিতার সহিত সদ্ব্যবহার কর....... তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদের প্রতি বদান্যতা প্রদর্শন কর। নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিত ব্যক্তিকে পসন্দ করেন না" (৪:৩৬)।
ইসলাম মানুষের নিকট এই সত্যও পেশ করিয়াছে যে, মনিব ও দাসের মূল সম্পর্ক মনিব ও গোলাম কিংবা হুকুমদাতা ও হুকুম পালনকারীর নয়; বরং তাহা হইল ভ্রাতৃত্ব ও ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। অতএব ইসলাম মনিবকে তাহার অধীনস্থ দাসীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করার অনুমতি দিয়াছে। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طولاً أَنْ يُنْكِحَ المُحْصَنَتِ الْمُؤْمِنِتِ فَمِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِّنْ فَتَيْتِكُمُ الْمُؤْمِنِتِ ، وَاللهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِكُمْ ، بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضَ ، فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوف .
"তোমাদের মধ্যে কাহারও স্বাধীনা ঈমানদার নারী বিবাহের সামর্থ্য না থাকিলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিবাহ করিবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান; সুতরাং তাহাদিগকে বিবাহ করিবে তাহাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং তাহাদিগকে তাহাদের মাহর ন্যায়সংগতভাবে দিবে" (৪:২৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00