📄 দাস-দাসীকে দাসত্বমুক্ত করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উৎসাহদান
দাসত্ব প্রথা ক্রমে বিলুপ্ত হউক, ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর কামনা। কিন্তু সুদীর্ঘ কাল হইতে প্রচলিত একটি ব্যবস্থাকে তৎক্ষণাৎ ঘোষণার মাধ্যমে বিলুপ্ত করিয়া সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ও মানবজাতিকে দুঃখ-ক্লেশে নিক্ষেপ করা কোনক্রমেই তাঁহার কাম্য ছিল না। তাই তিনি এমন কিছু কৌশল অবলম্বন করিয়াছেন যাহাতে ক্রমান্বয়ে দাস ও মনিব প্রথা মূলোৎপাটিত হয়। তিনি ঘোষণা করিয়াছেন, কেহ মুক্ত হইয়া গেলে পুনরায় তাহাকে দাস বানানো যাইবে না। দাসদের প্রতি অন্যায়-অবিচার করা হইলে তিনি তাহাদিগকে মুক্ত করিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিয়াছেন, এমনকি বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্ত হইতে নিজ হাতে সহযোগিতা করিয়াছেন। দাস-দাসীকে মুক্ত করিয়া দেওয়ার বিনিময়ে অফুরন্ত ছওয়াব লাভের বাণী শুনাইয়াছেন। মুকাতাব, মুদাব্বার ও উন্মু ওয়ালাদ প্রথা চালু রাখিয়াছেন (মুকাতাব বলা হয় ঐ গোলামকে যাহার মনিব বিনিময়ের মাধ্যমে তাহাকে মুক্ত করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। মুদাব্বার বলা হয় ঐ দাসকে যাহাকে তাহার মনিব বলিয়াছে, আমার মৃত্যুর পর তুমি মুক্ত। উন্মু ওয়ালাদ বলা হয় ঐ দাসীকে যে তাহার মনিবের কোন সন্তান গর্ভে ধারণ করিয়াছে)। ইরশাদ হইয়াছে:
عن ابي ذر قال سمعت رسول الله ﷺ يقول ما من مسلم يموت له ثلاثة من الولد لم يبلغوا الحنث الا ادخله الله الجنة بفضل رحمته اياهم وما من رجل اعتق مسلما الا جعل الله عز وجل كل عضو منه فكاكه لكل عضو منه (ادب المفرد - ١٥٠ ) .
"আবূ যার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: যে মুসলমানের তিনটি সন্তান মারা যায় নাবালেগ অবস্থায়, তাহাদের প্রতি আল্লাহ তাঁহার করুণা ও রহমতবশত তাহাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন। আর যেই ব্যক্তি কোন মুসলমানকে আযাদ করিয়া দিবে মহান আল্লাহ তাহার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিনিময়ে তাহার প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মুক্ত করিয়া দিবেন"। আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে এই মর্মে একটি হাদীছ রহিয়াছে।
সালমান ফারসী (রা) যদিও অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন কিন্তু চক্রান্তের শিকার হইয়া দাসত্বের জিঞ্জীরে আবদ্ধ হইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিলেন। তিনি স্বীয় উদ্যোগে স্বহস্তে কাজের বিনিময়ে তাহাকে আযাদ করাইয়াছিলেন।
عن بريدة جاء سلمان الفارسي الى رسول الله ﷺ حين قدم المدينة وكان لليهود فاشتراه رسول الله له بكذا وكذا درهما على ان يغرس لهم نخيلا فيعمل سلمان فيه حتى تطعم فغرس رسول الله النخل (رواه الترمذي في الشمائل) .
"বুরায়দা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় আগমন করিবার পর সালমান ফারসী (রা) তাঁহার দরবারে আসিলেন।........ তিনি তখন ছিলেন জনৈক ইয়াহুদীর ক্রীতদাস। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে এত এত দিরহামের বিনিময়ে এবং তিনি ইয়াহুদীকে খেজুর বৃক্ষ রোপণ করিয়া দিবেন এবং উহাতে ফলন না আসা পর্যন্ত সালমান (রা) সেখানে কর্মরত থাকিবার শর্তে ক্রয় করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বৃক্ষ রোপণ করিয়া দিলেন"।
উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় রহিয়াছে, সালমান ফারসী (রা) বলেন, একদা আমাকে রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তুমি তোমার মনিবের নিকট হইতে মুক্তিলাভের ব্যাপারে চুক্তি করিয়া লও। আমি তাহার নিকট বিষয়টি উত্থাপন করিলে সে আমাকে দুইটি জিনিসের বিনিময়ে মুক্ত করিয়া দিবার শর্তারোপ করিল। (১) চল্লিশ উকিয়া স্বর্ণ দিতে হইবে (চল্লিশ দিরহামে এক আউকিয়া); (২) তিন শতটি খেজুর বৃক্ষ রোপণ করিয়া দিয়া তাহার ফল খাওয়ার উপযোগী হওয়া পর্যন্ত পরিচর্যায় নিয়োজিত থাকা। রাসূলুল্লাহ (س) স্বয়ং তাহাকে খেজুর বৃক্ষ রোপণ করিয়া সহায়তা করিয়াছিলেন। অতঃপর কোন এক সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কিছু স্বর্ণ আসিলে তিনি তাহা সালমান (রা)-কে দিয়া বলিলেন, উহার দ্বারা মুক্তিপণ আদায় করিয়া দাও। স্বর্ণের স্বল্পতা দেখিয়া সালমান (را) বলিলেন, ইহা চুক্তির পরিমাণ হইবে না। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আল্লাহ উহা দ্বারাই যথেষ্ট করিয়া দিবেন। সুতরাং ওযন করিয়া দেখা গেল তাহা চল্লিশ উকিয়া হইয়া গিয়াছে।
عن أبي ذر قال سألت النبي ﷺ اى العمل افضل قال ايمان بالله وجهاد في سبیله قال قلت فاى الرقاب افضل قال اغلاها ثمنا وانفسها عند اهلها (متفق عليه مشكوة .
"আবূ যার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (س)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, কোন আমল সর্বাধিক উত্তম? তিনি বলিলেন, আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন ও তাঁহার পথে জিহاد। তিনি বলেন, আমি বলিলাম, কোন ধরনের গোলাম আযাদ করা সর্বাধিক উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, যাহা খুব মূল্যবান এবং যাহা তাহার পরিবারের প্রিয়"।
عن البراء بن عازب قال جاء اعرابي الى النبى ﷺ فقال علمني عملا يدخلني الجنة قال لئن كنت اقصرت الخطبة اعرضت المسئلة اعتق النسمة وفك رقبة قال أوليسا واحدا قال لا عتق النسمة ان تفرد بعتقها وفك الرقية ان تعين في ثمنها (رواه البيهقي في شعب الايمان) .
"আল-বারাআ ইব্ن আযিব (را) বলেন, জনৈক বেদুঈن রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলিয়া দিন যাহা আমাকে জান্নাতে দাখিল করিবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যদি তুমি সংক্ষিপ্তাকারে বলিতে তাহা হইলে সমস্যার সমাধান লাভ করিতে। তুমি প্রাণী (দাস) মুক্ত করিয়া দাও ও মুক্তিলাভে সহায়তা কর। লোকটি বলিল, এই দুইটি কথা কি একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি নয়? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, না, এক নয়। প্রাণীকে মুক্ত করিয়া দেওয়ার অর্থ হইল সম্পূর্ণভাবে তাহাকে তুমি মুক্ত করিয়া দিবে। আর দাসত্বমুক্ত করায় সহায়তা করার অর্থ হইল, দাসত্বমুক্ত হইবার ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধে সহায়তা করা"।
عن عمرو بن عبسة ان النبى الله قال من بنى مسجدا ليذكر الله فيه بني له في الجنة ومن اعتق نفسا مسلمة كانت فديته من جهنم ومن شاب شيبة في سبيل الله كانت له نورا يوم القيامة (رواه شرح السنة) .
“আমর ইব্ন আবাসা (را) হইতে বর্ণিত: মহানবী (س) বলিয়াছেন, যেই ব্যক্তি আল্লাহর যিকিরের উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করিবে তাহার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করা হইবে। যেই ব্যক্তি কোন মুসলিমকে দাসত্বমুক্ত করিয়া দিবে ঐ দাসত্বমুক্ত ব্যক্তি জাহান্নাম হইতে তাহার মুক্তিলাভের কারণ হইবে। আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধরত অবস্থায় যেই ব্যক্তি বৃদ্ধ হইবে তাহার জন্য কিয়ামত দিবসে জ্যোতি হইবে”।
عن سمرة بن جندب قال قال رسول الله الله افضل الصدقة الشفاعة بها تفد الرقبة (رواه البيهقي في شعب الايمان) .
“সামুরা ইব্ন জুনদুব (را) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, যেই সুপারিশের মাধ্যমে কোন দাসকে মুক্ত করা হয় তাহা হইল সর্বোত্তম সাদাকা”।