📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাস-দাসীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর আচরণ

📄 দাস-দাসীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর আচরণ


যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর একজন দাস। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে এতই আদর-স্নেহে লালন-পালন করিতেন যে লোকজন তাঁহাকে মুহাম্মাদ (স)-এর পুত্র বলিয়া আহ্বান করিত। এমনকি তিনিও তাঁহাকে পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাকে 'আযাদ' করিয়া দিয়াছিলেন। বংশীয় আভিজাত্যের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া তিনি তদীয় ফুফাত ভগ্নি যায়নাব বিন্ত জাহ্শ (রা)-এর সহিত এই যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা)-র বিবাহ দিয়াছিলেন। ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া তিনি এই যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা)-কে মুতার যুদ্ধের সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। তিন হাজার সম্ভ্রান্ত বংশীয় মুহাজির ও আনসারের নেতা নিযুক্ত হইলেন একজন সাবেক দাস, যেখানে রহিয়াছেন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর চাচাত ভাই জা'ফার ইব্‌ন আবী তালিব (রা), অভিজাত আনসার কবি আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা), প্রসিদ্ধ বীর খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) প্রমুখ। দাসদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইহার তুলনায় আর কী হইতে পারে! অথচ তখন দাসদের সহিত পশুর মত আচরণ করা হইত।
এই যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর বৃত্তান্ত ছিল নিম্নরূপ : যায়দ ছিলেন বানু কাল্ব গোত্রের এক বালক। তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া তাঁহার মাতা স্বগোত্রীয় লোকদিগকে দেখিতে রওয়ানা করিয়াছিলেন। আকস্মিক তিনি অপহরণকারীদের কবলে পড়িলেন। ডাকাত দল যায়দকে অপহরণ করিয়া লইয়া যায় এবং তাহাকে 'উকায বাজারে বিক্রয় করে। হাকীম ইন্ন হিযাম তাহাকে স্বীয় ফুফু খাদীজা (রা)-এর জন্য চার শত দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করিয়া লইলেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) খাদীজা (রা)-কে বিবাহ করিলে খাদীজা (রা) তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (س)-কে উপহারস্বরূপ দান করেন। পরবর্তী কালে যায়দের পিতা ও চাচা মক্কায় আসিলেন। তাহারা তাহাকে বিনিময় দানের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে মুক্ত করিতে চাহিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তখন তাঁহাকে এই এখতিয়ার প্রদান করিলেন যে, সে চাহিলে চলিয়া যাইতে পারে এবং চাহিলে তাঁহার নিকট থাকিতে পারে। যায়দ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিয়া যাওয়াকে পসন্দ করিলেন। ইন্ন মানদা কর্তৃক প্রণীত মা'রিফাতুস সাহাবা গ্রন্থের বর্ণনামতে যায়দ (রা)-এর পিতা সেই সময় ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পালক পুত্র হিসাবে ঘোষণা করিলেন। জামি তিরমিযীতে নিম্নরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়:
قال قلت يا رسول الله ابعث معى اخى زيداً قال ان انطلق معك لم امنعه فقال زيد يا رسول الله والله لا اختار عليك احدا (رواه الترمذي) .
"জাবালা ইবন হারিছা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সহিত আমার ভাই যায়দকে পাঠাইয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, সে যদি তোমার সহিত চলিয়া যায় তাহা হইলে আমি বারণ করিব না। তখন যায়দ বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনাকে ত্যাগ করিয়া আমি অন্য কাহাকেও পসন্দ করি না"।
قالت عائشة ما بعث رسول الله الله زيد بن حارثة في جيش قط الا امره عليهم (رواه النسائي).
"আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) যেই বাহিনীতেই যায়د ইব্‌ন হারিছাকে প্রেরণ করিতেন উহাতে তাহাকেই সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন (নাসাঈ)।" যায়দ ইবন হারিছা (রা) মুতার যুদ্ধে শহীদ হইয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পরিধেয় ও আহার্যের ব্যাপারে সমতা

📄 পরিধেয় ও আহার্যের ব্যাপারে সমতা


রাসূলুল্লাহ (س) দাস-দাসীকে মনিবদের ভাই হিসাবে গ্রহণ করিবার নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। তিনি আরও আদেশ দিয়াছেন যে, মনিবরা যাহা ভক্ষণ করিবে, যাহা পরিধান করিবে তাহা দাস-দাসীদেরকে সরবরাহ করিবার।
ইরশাদ হইয়াছে:
عن المعرور بن سويد قال رأيت أبا ذر الغفارى وعليه حلة وعلى غلامه حلة فسالناه عن ذلك فقال انى ساببت رجلا فشكانى الى النبي الله فقال لي النبي ﷺ اعيرته بأمه ثم قال ان اخوانكم خولكم جعلهم الله تحت ايديكم فمن كان اخوه تحت يده فليطعمه مما يأكل وليلبسه مما يلبس ولا تكلفوهم ما يغلبهم فان كلفتموهم ما يغلبهم فاعينوهم (رواه البخاري) .
"আল-মা'রূর ইব্‌ن সুওয়ায়দ (র) বলেন, আমি আবূ যার আল-গিফারী (রা)-কে একজোড়া দামী কাপড় পরিহিত দেখিলাম। তাঁহার গোলামের শরীরেও অনুরূপ একজোড়া কাপড় ছিল। আমরা তাঁহাকে উহা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন, আমি এক ব্যক্তিকে গালি দিয়াছিলাম। সে আমার বিরুদ্ধে উহার নালিশ দায়ের করিল মহানবী (س)-এর দরবারে। মহানবী (س) আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি তাহাকে তাহার মাতার সহিত সম্পর্কিত করিয়া লজ্জা দিলে? অতঃপর বলিলেন, তোমাদের দাসগণ হইল তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাহাদিগকে তোমাদের অধীন করিয়াছেন। যাহার অধীনে তাহার এইরূপ ভাই রহিয়াছে সে যাহা খাইবে তাহাকেও. অনুরূপ খাইতে দিবে। সে যাহা পরিধান করিবে তাহাকেও অনুরূপ পরিতে দিবে। তাহাদের কষ্ট হয় এইরূপ কিছু করিবার জন্য তাহাদিগকে তোমরা বাধ্য করিবে না। এমন কোন কিছু করার জন্য যদি একান্ত বাধ্য করা হয় তাহা হইলে এইরূপ কাজে তাহাদিগকে তোমরা সহায়তা করিবে”।
ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (س) সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে দাস-দাসীদের প্রতি সদাচরণ করিতে, তাহাদেরকে মানুষ হিসাবে গণ্য করিতে এবং তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইতে নির্দেশ প্রদান করেন:
ارقاء كم ارقاءكم اطعموهم مما تاكلون واكسوهم مما تكسون ... "তোমাদের দাসগণ, তোমাদের দাসগণ। তোমরা যাহা ভক্ষণ কর তাহাই তাহাদিগকে ভক্ষণ করিতে দিবে। তোমরা যেইরূপ কাপড় পরিধান করিবে তদ্রূপ কাপড় তাহাদিগকেও পরিধান করিতে দিবে”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাস-দাসীদের কাজে সহায়তা দানের নির্দেশ

📄 দাস-দাসীদের কাজে সহায়তা দানের নির্দেশ


দাস-দাসীরা সাধারণত মনিবের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকে। তবে মনিবরা শুধু কাজ আদায়ই করিবে এবং কাজ বুঝিয়া লইবে, তাহাদিগকে কোন কাজে সহযোগিতা দিবে না এমনটি রাসূলুল্লাহ (س) পছন্দ করিতেন না। ইরশাদ হইয়াছে:
قال النبى ﷺ ارقا كم اخوانكم فاحسنوا اليهم استعينوهم على ما غلبكم واعينوهم على ما غلبوا (اخرجه احمد ) .
“রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, তোমাদের দাসগণ তোমাদেরই ভাই। তোমরা তাহাদের সহিত সদাচরণ কর। তোমাদের জন্য যাহা দুরূহ হয় তাহাতে উহাদের সাহায্য গ্রহণ করিও এবং তাহাদের জন্য যাহা কষ্টকর হয় তাহাতেও তোমরা তাহাদিগকে সহায়তা কর”।
عن ابى هريرة قال اعينوا العامل من عمله فان عامل الله لا يخيب يعنى الخادم .
“আবু হুরায়রা (রা) বলেন, তোমরা তোমাদের সেবায় নিয়োজিতদেরকে সহায়তা কর। কারণ আল্লাহ যাহাদিগকে সেবায় নিয়োজিত করেন তাহারা (তাহাদের দু‘আ) নিষ্ফল যায় না”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সৎ দাস-দাসীগণের সওয়াব দ্বিগুণ

📄 সৎ দাস-দাসীগণের সওয়াব দ্বিগুণ


ইহলৌকিক দৃষ্টিতে একজন হইতে পারে মনিব আর অন্যজন দাস। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে ইহার বিশেষ কোন মূল্য নাই; বরং যে যত বেশী কর্তব্যপরায়ণ, চাই তাহা পার্থিব বিষয় হউক আর পারলৌকিক বিষয় হউক সে ততই বেশী মর্যাদাশীল। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, মনিবের অনুগত দাস দ্বিগুণ হওয়ারের অধিকারী হইবে। ইরশাদ হইয়াছে:
عَنْ أَبِي بُردة سَمِعَ اباهُ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ ثَلاَثةٌ يُؤتَوْنَ اجْرَهُمْ مَرتين الرَّجُلُ تَكُونُ لَه الامَةُ فَيُعلمُهَا فَيُحسِنُ تَعلِيمَهَا وَيُؤدبهَا فَيُحسِنُ أَدَبَهَا ثُمَّ يُعتِقُهَا فَيَتَزَوَّجُهَا فَلَهُ اجران ومؤمن اهل الكتاب الذي كان مؤمنا ثم امن بالنبي ﷺ فله اجران والعبد الذي يؤدى حق الله وينصح لسيده (رواه البخاري) .
“আবু বুরদা (را) তাহার পিতা হইতে শুনিয়াছেন, যে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, তিন শ্রেণীর লোককে দ্বিগুণ হওয়ার প্রদান করা হইবে। (এক) সেই ব্যক্তি যাহার অধীনে রহিয়াছে একজন দাসী। দাসীটিকে সে উত্তমভাবে শিক্ষা প্রদান করে এবং উত্তম শিষ্টাচার শিখায়, অতঃপর তাহাকে আযাদ করিয়া বিবাহ করে। (দুই) আহলে কিতাবের কোন ঈমানদার ব্যক্তি পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছে। (তিন) ঐ দাস যে আল্লাহর অধিকারও আদায় করে এবং তাহার মনিবের কল্যাণ কামনা করে”।
عَنْ أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ لِلمَملوكِ الذي يحسن عبادة ربه ويؤدى الى سيده الذي له عليه من الحق والنصيحة والطاعة اجران (رواه البخاري) .
“আবু মুসা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, যেই দাস উত্তমভাবে তাহার রবের ইবাদত করে এবং তাহার মনিবের তাহার উপর যেই হক রহিয়াছে তাহাও আদায় করে, তাহার কল্যাণ কামনা করে এবং তাহার আনুগত্য করে তাহার জন্য দুইটি হওয়ার রহিয়াছে”।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ للعَبدِ المَمْلُوكِ ا لصَالِحُ اجْرَانِ وَالَّذِي نَفسي بِيَده لولا الجِهَادُ في سَبِيلِ اللهِ وَالحَجُّ وَبِرُّ اُمي لَاحببت ان اموت وانا مملوك (رواه البخاري) .
“আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, সৎ গোলামের জন্য রহিয়াছে দুইটি হওয়ার। সেই সত্তার শপথ যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হজ্ব ও মায়ের সহিত সদ্ব্যবহার করার বিধান না থাকিত তাহা হইলে আমি গোলাম হইয়া মৃত্যুবরণ করাকে পছন্দ করিতাম”।
عن عبد الله بن عمر ان رسول الله ﷺ قال ان العبد اذا نصح لسيده واحسن عبادة ربه فله اجر مرتين (رواه البخاري) .
"আবদুল্লাহ ইবন উমার (را) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যে দাস তাহার মনিবের কল্যাণ কামনা করে এবং তাহার রবের ইবাদত উত্তমভাবে আদায় করে তাহার জন্য রহিয়াছে দ্বিগুণ ছওয়াব”।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00