📄 শিশুদের প্রতি করুণা
ছোটদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) এতই দয়ার্দ্র ছিলেন যে, সালাতরত অবস্থায় যদি তিনি কোন শিশুর কান্না শুনিতে পাইতেন তাহা হইলে সর্বোত্তম এই ইবাদতটিও সংক্ষেপে আদায় করিয়া লইতেন, যাহাতে জামআতে শরীক মাতা সালাত শেষে শিশুটিকে পরিচর্যা করিয়া লয়। এই সম্পর্কে ইমাম বুখারী সালাত অধ্যায়ে স্বতন্ত্র একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেন। তাহা হইল এইরূপ:
باب من اخف الصلوة عند بكاء الصبي.
"অনুচ্ছেদ: শিশুর কান্নায় যিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করেন"। এই অনুচ্ছেদের অধীনে ইমাম বুখারী এই সম্পর্কিত চারিটি হাদীছ বর্ণনা করেন। একটি হাদীছ হইল এইরূপ:
عن انس بن مالك يقول ما صليت وراء امام قط اخف صلوة ولا اتم من النبي ﷺ وان كان ليسمع بكاء الصبي فيخفف مخافة ان تفتن امه .
"আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অন্য কোন ইমামের পিছনে এত সংক্ষিপ্ত এবং এত পরিপূর্ণ সালাত আদায় করি নাই। তিনি যদি কোন শিশুর কান্না শুনিতে পাইতেন তাহা হইলে সালাত সংক্ষিপ্ত করিতেন যাহাতে তাহার কান্নায় তাহার মাতার সালাতে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়”।
📄 শিশুদের চুম্বন
রাসূলুল্লাহ (স) আপন-পর নির্বিশেষে সব শিশুকেই চুম্বন করিতেন। তিনি চুম্বন করাকে করুণা ও তাহা বর্জন করাকে নির্দয়তা বলিয়া অভিহিত করিতেন।
عن عائشة قالت قدم ناس من الاعراب على رسول الله ﷺ فقالوا اتقبلون صبيانكم فقال نعم فقالوا لكنا والله ما نقبل فقال رسول الله ﷺ او املك ان كان الله نزع منكم الرحمة.
"আইশা (রা) বলেন, কতক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে আগমন করিল। তাহারা বলিল, আপনারা কি আপনাদের শিশুদেরকে চুম্বন করিয়া থাকেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। তাহারা বলিল, আল্লাহর শপথ! আমরা কিন্তু চুম্বন করি না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরকে করুণা বঞ্চিত করিয়া দেন তাহা হইলে আমি কি সেইজন্য দায়ী হইব"।
عن ابي هريرة أن الاقرع بن حابس ابصر النبي الله يقبل الحسن فقال ان لي عشرة من الولد ما قبلت واحدا منهم فقال رسول الله الله انه من لا يرحم لا يرحم.
"আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। আকরা' ইবন হাবিস (রা) দেখিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) হাসান (রা)-কে চুম্বন করিতেছেন। তিনি বলিলেন, আমার দশটি সন্তান রহিয়াছে, অথচ আমি উহাদের কাহাকেও চুম্বন করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যে ব্যক্তি করুণা করে না সে করুণা প্রাপ্ত হয় না"।
উহা ছাড়া সহীহ মুসলিমে আনাস ইবন মালিক (را) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর শিশু পুত্র ইবরাহীম মদীনার বাহিরে কোন এক ধাত্রীর দুধ পান করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দেখার জন্য সেখানে চলিয়া যাইতেন এবং তাহাকে কোলে উঠাইয়া আদর ও চুম্বন করিতেন। আনাস (রা) বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (س) হইতে অন্য কোন লোককে সন্তানাদির প্রতি এত বেশী করুণাশীল দেখিতে পাই নাই।
শিশু বলিতে সবাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদরের পাত্র, তা সেই মুসলিম হউক আর অমুসলিম।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) অন্য ধর্মাবলম্বী শিশুদেরকে হত্যা করা হইতে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করিতেন। উহা দ্বারা তিনি তাহাদের প্রতি তাঁহার অগাধ মায়া-মমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن عبد الله ان امرأة وجدت في بعض مغازى رسول الله ﷺ مقتولة فانكر رسول الله قتل النساء والصبيان .
"আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। এক স্ত্রীলোককে রাসূলুল্লাহ (س)-এর কোন এক গাযওয়ায় নিহত পাওয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (س) তাহা অপছন্দ করিলেন এবং মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করিতে নিষেধ করিলেন”।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে, কোন এক যুদ্ধে আক্রমণের মুখে শত্রুপক্ষের কয়েকটি শিশু নিহত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া খুবই ব্যথিত হইলেন। উপস্থিত লোকজন বলিল, উহারা মুশরিকদের সন্তান। উত্তরে তিনি বলিলেন: মুশরিকদের শিশুরা তোমাদের হইতে উত্তম। সাবধান! কখনও শিশুদেরকে হত্যা করিও না। প্রতিটি শিশু আল্লাহর স্বভাবজাত ধর্মের উপর জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে।
📄 শিশুদের আনন্দ উপভোগ
কচি-কাঁচাদের আনন্দ-উল্লাসে রাসূলুল্লাহ (স) বাধা প্রদান করিতেন না, বরং তাহা উপভোগ করিতেন। কেহ বাধা দিলে তিনি তাহাকে বাধাদান হইতে বিরত থাকার পরামর্শ দিতেন। তিনি তাহাদের বৈধ সংগীত শ্রবণ করিতেন। অবশ্য আবৃত্তিকালে অসার কোন উক্তি করিলে তাহা তাৎক্ষণিক শোধরাইয়া দিতেন। হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনায় প্রবেশকালে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে শিশুরা দাঁড়াইয়া তাঁহাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করিতেছিল। তখন বালিকারা 'দফ' বাজাইয়া এই গান গাহিতেছিল:
نحن جوار من بنى النجار - يا حبذا محمدا من جار.
"আমরা নাজ্জার বংশের কন্যা। আমাদের কি সৌভাগ্য! মুহাম্মাদ আমাদের প্রতিবেশী"।
রাসূলুল্লাহ (س) তখন তাহাদেরকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি আমাকে ভালবাসিবে, আদর করিবে? তাঁহারা উত্তর দিল, হাঁ, অবশ্যই আমরা ভালবাসিব। তিনি সহাস্যে তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, আচ্ছা! আমিও তোমাদেরকে ভালবাসি।
عن عائشة ان ابا بكر دخل عليها والنبي الله عندها يوم فطر او اضحى وعندها فتيتان تغنيان بما تعازفت الانصار يوم بعاث فقال ابو بكر مزمار الشيطان مرتين فقال النبي له دعهما يا ابا بكر ان لكل قوم عيدا وان عيدنا هذا اليوم.
"আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। আবূ বকর (রা) তাঁহার নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তখন তাঁহার নিকট অবস্থানরত ছিলেন। উহা ছিল ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিন। 'আইশা (রা)-এর নিকট তখন দুইটি বালিকা বু'আছ যুদ্ধ সম্পর্কে তাহাদের মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধসংগীত গাহিতেছিল। আবূ বকর (রা) দুইবার বলিলেন, ইহা তো শয়তানের বাদ্য)। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বক্স (রা)-কে বলিলেন, উহাদেরকে গাহিতে দাও। কারণ প্রতিটি জাতির জন্য রহিয়াছে ঈদ। আর আমাদের ঈদ হইল এই দিন” (বুখারী, কিতাবুল-মানাকিব, বাব মাকদামিন নবী (س) ওয়া আসহাবিহি ইলাল-মাদীনা, ১খ., পৃ. ৫৯ ও ১৩০)।
عن الربيع بنت معوذ قالت جاء النبي الله فدخل حين بني على فجلس على فراشی کمجلسك منى فجعلت جويريات لنا يضربن بالدف ويندبن من قتل من ابائ يوم بدر اذ قالت احدهن وفينا نبي يعلم ما في غد فقال دعى هذه قولى بالذي كنت تقولين .
"আর-রুবায়্যি' বিন্ত মু'আব্বিয ইব্ন আফরা (রা) বলেন, আমার বাসর রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে আসিলেন এবং আমার বিছানায় বসিলেন যেইভাবে তুমি, এখন আমার সম্মুখে বসিয়াছ। তখন কিছু কচিকাঁচা মেয়ে 'দুফ' বাজাইয়া বদরের যুদ্ধে তাহাদের নিহত বাব-দাদার গুণকীর্তন করিতেছিল। একটি বালিকা বলিয়া উঠিল, আমাদের মধ্যে রহিয়াছেন এমন একজন নবী যিনি আগামী কাল কি ঘটিবে সেই সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: এই কথা বর্জন কর, যাহা পূর্বে বলিতেছিলে তাহা বলিতে থাক"।
عن ابن عباس قال انكحت عائشة ذات قرابة لها من الانصار فجاء رسول الله ﷺ فقال اهديتم الفتاة قالوا نعم قال ارسلتم معها من تغنى قالت لا فقال رسول الله ﷺ ان الانصار قوم فيهم غزل فلو بعثتم معها من يقول اتيناكم اتيناكم فحيانا وحياكم (رواه ابن ماجة ) .
"ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, 'আইশা (রা) তাঁহার জনৈক আনসার গোত্রের নিকটাত্মীয়াকে বিবাহ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি মেয়েটিকে স্বামীর গৃহে প্রেরণ করিয়াছ? তাহারা বলিলেন, হাঁ। তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহার সঙ্গে কি এমন কাহাকেও পাঠাইয়াছ যে বিজয়গাথা গাহিবে? 'আইশা (রা) বলিলেন, তাহাতো করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আনসার সম্প্রদায় গযলের প্রতি আকৃষ্ট। যদি তোমরা তাহার সঙ্গে এমন কাহাকেও প্রেরণ করিতে যে গাহিত: আমরা তোমাদের নিকট আসিয়াছি, আমরা তোমাদের নিকট আসিয়াছি—তিনি আমাদেরকে জীবিত রাখুন এবং তোমাদেরকে জীবিত রাখুন"।
📄 মেয়ে শিশুর খেলনা ও দোলনা
খেলনা তৈরি করা মেয়ে শিশুদের স্বভাবজাত বিষয়। সেই দিকে শিশুর মন আকৃষ্ট হয়। ধনী- গরীব, আমীর-ফকীর এই ব্যাপারে কোন পার্থক্য নাই। উম্মত জননী 'আইশা (রা)-ও ছিলেন তাঁহার দাম্পত্য জীবনের সূচনা ক্ষণে একজন বালিকা। বালিকা আচরণ তাঁহার মধ্যে প্রতিভাত হইত। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে উহাতে বাধা দিতেন না, আনন্দিত মনে তাঁহার সহিত খেলনা সামগ্রী সম্পর্কে কথা বলিতেন। 'আইশা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সহিত উহার জওয়াব প্রদান করিতেন।
عن عائشة قالت كنت العب بالبنات فربما دخل على رسول الله ﷺ وعندى الجواري فاذا دخل خرجن واذا خرج دخلن رواه ابو داواد ) .
"আইশা (রা) বলেন, আমি পুতুল নিয়া খেলা-ধুলা করিতাম। এমতাবস্থায় কখনও কখনও রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট প্রবেশ করিতেন। আমার সহিত বালিকারাও থাকিত। রাসূলুল্লাহ (স) প্রবেশ করিলে তাহারা চলিয়া যাইত এবং তিনি প্রস্থান করিলে তাহারা পুনরায় প্রবেশ করিত”।
عن عائشة قالت قدم رسول الله ﷺ من غزوة تبوك او خيبر وفي سهوتها ستر فهبت الريح فكشفت ناحية السطر عن بنات لعائشة لعب فقال ما هذا يا عائشة قالت بناتی ورای بینهن فرسا له جناحان من رقاع فقال ما هذا الذى ارى وسطهن قالت فرس قال وما هذا الذي عليه قلت جناحان قال فرس له جناحان قالت اما سمعت ان السليمان خيلا لها اجنحة قالت فضحك رسول الله ﷺ حتى رأيت نواجذه (رواه ابو داود ) .
"আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক অথবা খায়বার যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। 'আইশা (রা)-এর ছোট কুটিরে একটি পর্দা ছিল। বাতাসে পর্দার আড়ালে রাখা 'আইশার খেলনার পুতুলগুলি দৃশ্যমান হইতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, হে 'আইশা! এইগুলি কি? তিনি বলিলেন, এইগুলি আমার খেলনার পুতুল। এইগুলির মধ্যে দুই পাখাবিশিষ্ট টুকরা কাপড়ের একটি ঘোড়াও ছিল। তিনি বলিলেন, এইগুলির মধ্যভাগে আমি যাহা দেখিতেছি উহা কি? 'আইশা (রা) বলিলেন, উহা ঘোড়া। বলিলেন, ঘোড়ার উপর উহা কি? আমি বলিলাম, তাহার দুই ডানা। আবারও বলিলেন, ঘোড়ার আবার দুইটি ডানা হয় কি করিয়া? 'আইশা (রা) বলিলেন, আপনি কি শুনেন নাই, সুলায়মান (আ)-এর দুই ডানাবিষ্টি একটি ঘোড়া ছিল। তিনি বলেন, এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) এমনভাবে হাসিলেন যে, তাঁহার মাড়ির দাঁতগুলি আমি দেখিতে পাইলাম”।
عن عائشة قالت فلما قدمنا المدينة جاءنى نسوة وانا العب على ارجوحة وانا مجمعة فذهبن بي فهيأنني وصنعنني ثم اتين بى رسول الله ﷺ فبنى بي وانا بنت تسع سنين (وراه ابو داود ) .
"আইশা (রা) বলেন, আমরা যখন মদীনায় আগমন করিলাম, আমার নিকট কতিপয় মহিলা আগমন করিলেন, আমি তখন দোলনায় খেলা করিতেছিলাম। আমার চুল তখন এলোমেলো ছিল। মহিলারা আমাকে লইয়া গেল, আমার কেশবিন্যাস করিল ও সুসজ্জিত করিল। অতঃপর আমাকে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া গেল। তিনি আমার সহিত বাসর যাপন করিলেন। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র নয় বৎসর"। আইশা (রা) দোলনায় খেলা সম্পর্কিত আরও দুইটি হাদীছ আবূ দাউদে বর্ণিত রহিয়াছে।