📄 ছোটদের প্রতি স্নেহ
রাসূলুল্লাহ (স) ছোটদেরকে অত্যধিক স্নেহ করিতেন, তাহাদেরকে কোলে টানিয়া লইতেন, পথে তাহাদেরকে আগেই সালাম দিতেন, আদরের আতিশয্যে তাহাদেরকে চুম্বন করিতেন। কোন কোন সময় সফর হইতে ফিরিবার প্রাক্কালে স্বীয় বাহনে তুলিয়া লইতেন। তাহাদের মাথায় হাত বুলাইতেন। তাহাদের বিরুদ্ধে কোন নালিশ আসিলে অন্যায়-অপরাধে জড়িত না হইবার জন্য তাহাদেকে বুঝাইতেন। ছোটদের খেলাধুলায় বাধা দিতেন না, বরং তাহা উপভোগ করিতেন। তাহাদের কাজে উৎসাহ প্রদান করিতেন। কাহাকেও ছোটদেরকে ধমক দিতে বা যাতনা দিতে দেখিলে তাহাকে এরূপ কাজ হইতে বারণ করিতেন। ছোটদের প্রতি স্নেহ করিতে তিনি ধর্ম-বর্ণের কোন ভেদাভেদ করিতেন না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি সকল শিশুকেই পিতৃতুল্য স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করিতেন। শিশুদেরকে কোলে তুলিয়া লইতেন। উহাতে শিশুরা কোন কোন সময় তাঁহার কোলে পেশাব করিয়া দিত, তবুও তিনি বিরক্ত বোধ করিতেন না। ইরশাদ হইয়াছে:
عن عائشة أن النبى ﷺ وضع صبيا في حجره فحنکه فبال عليه فدعا بماء فاتبعه
"হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) একটি শিশুকে কোলে তুলিয়া তাহাকে তাহনীক (মিষ্টিমুখ) করাইতেছিলেন। এমতাবস্থায় সে তাঁহার কোলে পেশাব করিয়া দিল। তিনি পানি আনাইয়া সেখানে তাহা ঢালিয়া দিলেন”।
এই শিশু কে ছিল সেই সম্পর্কে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। আল্লামা আহমদ আলী সাহারানপুরী বলেন, আদ-দারু কুতনীর বর্ণনামতে সে ছিল আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবায়র (রা)। আর মুসতাদরাকে হাকেমের বর্ণনানুযায়ী ররাসূলুল্লাহ (স)-এর দৌহিত্র হুসায়ন ইবন আলী (রা) (পাদটীকা, সহীহ বুখারী, প্রাগুক্ত)।
উম্মু কায়স বিন্ত মিহসান (রা)-এর দুগ্ধপোষ্য ছেলেকেও রাসূলুল্লাহ (স) অনুরূপ সোহাগ করিয়াছিলেন বলিয়া বর্ণিত আছে। ইরশাদ হইন্ডেছে:
عن ام قيس بنت محصن انها انت بابن لها صغير لم ياكل الطعام الى رسول الله ﷺ فاجلسه رسول الله ﷺ في حجره فمال على ثوبه فدعا بماء فنضجه ولم يغسله .
"উম্মু কায়س বিন্ত মিহসান (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি তাঁহার এমন দুগ্ধপোষ্য শিশু ছেলেকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিয়াছিলেন যে তখনও খাদ্য গ্রহণে সক্ষম হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে নিজের কোলে বসাইলেন। সে তাঁহার কাপড়ে পেশাব করিয়া দিল। তিনি পানি আনাইয়া তাহাতে ছিটাইয়া দিলেন, উহা ধৌত করিলেন না”।
📄 শিশুদের প্রতি করুণা
ছোটদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) এতই দয়ার্দ্র ছিলেন যে, সালাতরত অবস্থায় যদি তিনি কোন শিশুর কান্না শুনিতে পাইতেন তাহা হইলে সর্বোত্তম এই ইবাদতটিও সংক্ষেপে আদায় করিয়া লইতেন, যাহাতে জামআতে শরীক মাতা সালাত শেষে শিশুটিকে পরিচর্যা করিয়া লয়। এই সম্পর্কে ইমাম বুখারী সালাত অধ্যায়ে স্বতন্ত্র একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেন। তাহা হইল এইরূপ:
باب من اخف الصلوة عند بكاء الصبي.
"অনুচ্ছেদ: শিশুর কান্নায় যিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করেন"। এই অনুচ্ছেদের অধীনে ইমাম বুখারী এই সম্পর্কিত চারিটি হাদীছ বর্ণনা করেন। একটি হাদীছ হইল এইরূপ:
عن انس بن مالك يقول ما صليت وراء امام قط اخف صلوة ولا اتم من النبي ﷺ وان كان ليسمع بكاء الصبي فيخفف مخافة ان تفتن امه .
"আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অন্য কোন ইমামের পিছনে এত সংক্ষিপ্ত এবং এত পরিপূর্ণ সালাত আদায় করি নাই। তিনি যদি কোন শিশুর কান্না শুনিতে পাইতেন তাহা হইলে সালাত সংক্ষিপ্ত করিতেন যাহাতে তাহার কান্নায় তাহার মাতার সালাতে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়”।
📄 শিশুদের চুম্বন
রাসূলুল্লাহ (স) আপন-পর নির্বিশেষে সব শিশুকেই চুম্বন করিতেন। তিনি চুম্বন করাকে করুণা ও তাহা বর্জন করাকে নির্দয়তা বলিয়া অভিহিত করিতেন।
عن عائشة قالت قدم ناس من الاعراب على رسول الله ﷺ فقالوا اتقبلون صبيانكم فقال نعم فقالوا لكنا والله ما نقبل فقال رسول الله ﷺ او املك ان كان الله نزع منكم الرحمة.
"আইশা (রা) বলেন, কতক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে আগমন করিল। তাহারা বলিল, আপনারা কি আপনাদের শিশুদেরকে চুম্বন করিয়া থাকেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। তাহারা বলিল, আল্লাহর শপথ! আমরা কিন্তু চুম্বন করি না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরকে করুণা বঞ্চিত করিয়া দেন তাহা হইলে আমি কি সেইজন্য দায়ী হইব"।
عن ابي هريرة أن الاقرع بن حابس ابصر النبي الله يقبل الحسن فقال ان لي عشرة من الولد ما قبلت واحدا منهم فقال رسول الله الله انه من لا يرحم لا يرحم.
"আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। আকরা' ইবন হাবিস (রা) দেখিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) হাসান (রা)-কে চুম্বন করিতেছেন। তিনি বলিলেন, আমার দশটি সন্তান রহিয়াছে, অথচ আমি উহাদের কাহাকেও চুম্বন করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যে ব্যক্তি করুণা করে না সে করুণা প্রাপ্ত হয় না"।
উহা ছাড়া সহীহ মুসলিমে আনাস ইবন মালিক (را) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর শিশু পুত্র ইবরাহীম মদীনার বাহিরে কোন এক ধাত্রীর দুধ পান করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দেখার জন্য সেখানে চলিয়া যাইতেন এবং তাহাকে কোলে উঠাইয়া আদর ও চুম্বন করিতেন। আনাস (রা) বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (س) হইতে অন্য কোন লোককে সন্তানাদির প্রতি এত বেশী করুণাশীল দেখিতে পাই নাই।
শিশু বলিতে সবাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদরের পাত্র, তা সেই মুসলিম হউক আর অমুসলিম।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) অন্য ধর্মাবলম্বী শিশুদেরকে হত্যা করা হইতে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করিতেন। উহা দ্বারা তিনি তাহাদের প্রতি তাঁহার অগাধ মায়া-মমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن عبد الله ان امرأة وجدت في بعض مغازى رسول الله ﷺ مقتولة فانكر رسول الله قتل النساء والصبيان .
"আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। এক স্ত্রীলোককে রাসূলুল্লাহ (س)-এর কোন এক গাযওয়ায় নিহত পাওয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (س) তাহা অপছন্দ করিলেন এবং মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করিতে নিষেধ করিলেন”।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে, কোন এক যুদ্ধে আক্রমণের মুখে শত্রুপক্ষের কয়েকটি শিশু নিহত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া খুবই ব্যথিত হইলেন। উপস্থিত লোকজন বলিল, উহারা মুশরিকদের সন্তান। উত্তরে তিনি বলিলেন: মুশরিকদের শিশুরা তোমাদের হইতে উত্তম। সাবধান! কখনও শিশুদেরকে হত্যা করিও না। প্রতিটি শিশু আল্লাহর স্বভাবজাত ধর্মের উপর জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে।
📄 শিশুদের আনন্দ উপভোগ
কচি-কাঁচাদের আনন্দ-উল্লাসে রাসূলুল্লাহ (স) বাধা প্রদান করিতেন না, বরং তাহা উপভোগ করিতেন। কেহ বাধা দিলে তিনি তাহাকে বাধাদান হইতে বিরত থাকার পরামর্শ দিতেন। তিনি তাহাদের বৈধ সংগীত শ্রবণ করিতেন। অবশ্য আবৃত্তিকালে অসার কোন উক্তি করিলে তাহা তাৎক্ষণিক শোধরাইয়া দিতেন। হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনায় প্রবেশকালে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে শিশুরা দাঁড়াইয়া তাঁহাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করিতেছিল। তখন বালিকারা 'দফ' বাজাইয়া এই গান গাহিতেছিল:
نحن جوار من بنى النجار - يا حبذا محمدا من جار.
"আমরা নাজ্জার বংশের কন্যা। আমাদের কি সৌভাগ্য! মুহাম্মাদ আমাদের প্রতিবেশী"।
রাসূলুল্লাহ (س) তখন তাহাদেরকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি আমাকে ভালবাসিবে, আদর করিবে? তাঁহারা উত্তর দিল, হাঁ, অবশ্যই আমরা ভালবাসিব। তিনি সহাস্যে তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, আচ্ছা! আমিও তোমাদেরকে ভালবাসি।
عن عائشة ان ابا بكر دخل عليها والنبي الله عندها يوم فطر او اضحى وعندها فتيتان تغنيان بما تعازفت الانصار يوم بعاث فقال ابو بكر مزمار الشيطان مرتين فقال النبي له دعهما يا ابا بكر ان لكل قوم عيدا وان عيدنا هذا اليوم.
"আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। আবূ বকর (রা) তাঁহার নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তখন তাঁহার নিকট অবস্থানরত ছিলেন। উহা ছিল ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিন। 'আইশা (রা)-এর নিকট তখন দুইটি বালিকা বু'আছ যুদ্ধ সম্পর্কে তাহাদের মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধসংগীত গাহিতেছিল। আবূ বকর (রা) দুইবার বলিলেন, ইহা তো শয়তানের বাদ্য)। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বক্স (রা)-কে বলিলেন, উহাদেরকে গাহিতে দাও। কারণ প্রতিটি জাতির জন্য রহিয়াছে ঈদ। আর আমাদের ঈদ হইল এই দিন” (বুখারী, কিতাবুল-মানাকিব, বাব মাকদামিন নবী (س) ওয়া আসহাবিহি ইলাল-মাদীনা, ১খ., পৃ. ৫৯ ও ১৩০)।
عن الربيع بنت معوذ قالت جاء النبي الله فدخل حين بني على فجلس على فراشی کمجلسك منى فجعلت جويريات لنا يضربن بالدف ويندبن من قتل من ابائ يوم بدر اذ قالت احدهن وفينا نبي يعلم ما في غد فقال دعى هذه قولى بالذي كنت تقولين .
"আর-রুবায়্যি' বিন্ত মু'আব্বিয ইব্ন আফরা (রা) বলেন, আমার বাসর রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে আসিলেন এবং আমার বিছানায় বসিলেন যেইভাবে তুমি, এখন আমার সম্মুখে বসিয়াছ। তখন কিছু কচিকাঁচা মেয়ে 'দুফ' বাজাইয়া বদরের যুদ্ধে তাহাদের নিহত বাব-দাদার গুণকীর্তন করিতেছিল। একটি বালিকা বলিয়া উঠিল, আমাদের মধ্যে রহিয়াছেন এমন একজন নবী যিনি আগামী কাল কি ঘটিবে সেই সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: এই কথা বর্জন কর, যাহা পূর্বে বলিতেছিলে তাহা বলিতে থাক"।
عن ابن عباس قال انكحت عائشة ذات قرابة لها من الانصار فجاء رسول الله ﷺ فقال اهديتم الفتاة قالوا نعم قال ارسلتم معها من تغنى قالت لا فقال رسول الله ﷺ ان الانصار قوم فيهم غزل فلو بعثتم معها من يقول اتيناكم اتيناكم فحيانا وحياكم (رواه ابن ماجة ) .
"ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, 'আইশা (রা) তাঁহার জনৈক আনসার গোত্রের নিকটাত্মীয়াকে বিবাহ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি মেয়েটিকে স্বামীর গৃহে প্রেরণ করিয়াছ? তাহারা বলিলেন, হাঁ। তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহার সঙ্গে কি এমন কাহাকেও পাঠাইয়াছ যে বিজয়গাথা গাহিবে? 'আইশা (রা) বলিলেন, তাহাতো করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আনসার সম্প্রদায় গযলের প্রতি আকৃষ্ট। যদি তোমরা তাহার সঙ্গে এমন কাহাকেও প্রেরণ করিতে যে গাহিত: আমরা তোমাদের নিকট আসিয়াছি, আমরা তোমাদের নিকট আসিয়াছি—তিনি আমাদেরকে জীবিত রাখুন এবং তোমাদেরকে জীবিত রাখুন"।