📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আল্লাহ্র সম্মানের অন্তর্ভুক্ত

📄 বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আল্লাহ্র সম্মানের অন্তর্ভুক্ত


বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে রাসূলুল্লাহ (স) এতই যত্নবান ছিলেন যে, তিনি উহাকে আল্লাহর সম্মান বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن ابي موسى قال قال رسول الله ﷺ ان من اجلال الله اكرام ذي الشيبة المسلم وحامل القرآن غير الغالي فيه ولا الجافي عنه واكرام السلطان المقسط (رواه ابو داؤد والبيهقي في شعب الايمان (مشكوة) .
"আবূ মূসা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তিন ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। তাহারা হইল, প্রবীণ মুসলমান, আল-কুরআনের বাহক, যে-উহাতে হ্রাস-বৃদ্ধি করে না এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক"।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী বলেন, শারহুস্ সুন্নায় বলা হইয়াছে:
قَالَ طَاؤُسٌ مِنَ السُنّةِ اَنْ تُوقِّرَ اَرْبَعَةَ الْعَالِمَ وَذَاالشِّبَةِ وَالسُّلْطَانَ وَالوَالِدَ “ত্বাউস (রা) হইতে বর্ণিত। মহৎ কাজের অন্যতম হইল প্রবীণ ব্যক্তিকে সম্মান করা”।
“সুন্নাত হইল চার ব্যক্তিকে সম্মান করা। তাহারা হইলেন, আলিম, প্রবীণ লোক, শাসক ও পিতা”।
বক্তীর তাঁহার জামে গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন:
عَنْ أَنَسٍ اِنَّ مِنَ الْاِجْلَالِ تَوْقِيْرُ الشَّيْخِ “আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। মহৎ কাজের অন্যতম হইল প্রবীণ ব্যক্তিকে সম্মান করা”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বড়দের প্রতি সম্মানের প্রতিদান

📄 বড়দের প্রতি সম্মানের প্রতিদান


প্রবীণ লোকের প্রতি যেই লোক সম্মান প্রদর্শন করিবে আল্লাহ তা'আলা তাহাকে দীর্ঘায়ু করিবেন এবং পরিণত বয়সে অন্য লোকের দ্বারা তাহার সেবা করাইবেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
عَنْ اَنَسِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ مَا اَكْرَمَ شَابٌ شَيْخًا مِنْ اَجْلِ سِنّهِ إِلَّا قَيَّضَ اللهُ لَهُ عِنْدَ سِنِّه مَنْ يَّكْرُمُه (رواه الترمذى) -
“আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যেই যুবক কোন প্রবীণ লোককে সম্মান করিবে আল্লাহ তা'আলা তাহার পরিণত বয়সে তাহাকে সম্মান করিবার জন্য কোন লোককে নিয়োজিত করিবেন”।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী বলেন, হাদীছটি এইদিকে ইঙ্গিত করে যে, খেদমতকারী যুবকটি দীর্ঘায়ু লাভ করিবে এবং তাহার বৃদ্ধ বয়সে সে এমন একজন সঙ্গী লাভ করিবে যে তাহাকে সম্মান করিবে। কারণ প্রবাদ বাক্য আছে, خَدَمَ مَنْ خُدِمَ “যে সেবা করে সে সেবা পায়”। এই সম্পর্কে তিনি একটি ঘটনা উদ্ধৃত করেন। খোরাসানের জনৈক শিয়া মিসর অধিবাসী তাহার এক প্রবীণ মুর্শিদের খেদমতে নিয়োজিত হইয়াছিল। সে দীর্ঘকাল তাঁহার খেদমতে অবস্থান করিল। এক সময় উক্ত বর্ষীয়ান মুর্শিদের সাক্ষাত লাভের জন্য বহুসংখ্যক আলিমগণের একটি প্রতিনিধি দল তাঁহার দরবারে আগমন করিল। মুর্শিদ তখন শিয়াটির প্রতি ইঙ্গিত করিয়া নির্দেশ দিলেন, সে যেন মেহমানদের বাহনগুলি ধরিয়া রাখে। শিয়াটি সঙ্গে সঙ্গে সেই আদেশ তামিল করিল এবং মনে মনে ভাবিল, দীর্ঘ দিন মুর্শিদের সান্নিধ্যে অবস্থান করায় সম্মানিত আলিমগণের বাহনগুলি ধরিয়া রাখিবার সৌভাগ্য তাহার হাসিল হইয়াছে। সম্মানিত আলিমগণের প্রতিনিধি দল বিদায় হইয়া গেলে শিয়াটি মুর্শিদের দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি বলিলেন :
يَا وَلَدِى سَيَأْتِيْكَ الْأَكَابِرُ وَيَقْدِرُ اللَّهُ لَكَ مَنْ يَخْدِمُهُمْ
“হে বৎস! ভবিষ্যতে তোমার নিকটও আলিমগণের এক প্রতিনিধি দল আসিবে এবং আল্লাহ তা'আলা তোমার নিকট এমন লোক নিয়োজিত করিবেন যে মেহমানদের সেবা করিবে”।
মানাযিলুস সাইরীন গ্রন্থকার আবদুল্লাহ আল-আনসারী বলেন, ঠিক মুর্শিদের কথামত কিছু দিন পরই এই শিষ্যের গৃহে সম্মানিত আলিমগণের বিরাট একদল স্বীয় বাহন ঘোড়া গাধা লইয়া উপস্থিত হইয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কথা বলার সময় বড়কে প্রাধান্য দেয়ার নির্দেশ

📄 কথা বলার সময় বড়কে প্রাধান্য দেয়ার নির্দেশ


কোন সংঘটিত বিষয় সম্পর্কে অনেকেরই জানা, সকলেই বিষয়টি বলিতে পারে। এমন ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) বয়সে বড় লোকটির কথা শোনাকে পসন্দ করিতেন। এমন কি বয়সের দিক দিয়া যিনি বড় তাহাকে বাদ দিয়া ছোটরা কথা বলিলে রাসূলুল্লাহ (স) ছোটদের কথা শুনিবার পূর্বে বড়দের কথা শুনিতেন। ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীছ এই বিষয়ে। প্রণিধানযোগ্য।
عن رافع بن خديج وسهل بن ابي حشمة ان عبد الله بن سهل ومحيصة بن مسعود ایتا خيبر فتفرقا في النخل فقتل عبد الله بن سهل فجاء عبد الرحمن بن سهل وحويصة ومحيصة ابنا مسعود الى النبي ﷺ فتكلموا في أمر صاحبهم فبدأ عبد الرحمن وكان اصغر القوم فقال له النبي ﷺ اكبر كبر الى اخر الحديث) وفي رواية اخرى رواه البخاري ايضا في مثل هذا الحديث قال النبي ﷺ كبر كبر .
"রাফে ইব্‌ن খাদীজ ও সাহল ইব্‌ন আবী হাছুমা (রা) সূত্রে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইব্‌ন সাহ্‌ল ও মুহায়্যাসা ইব্‌ন মাস'উদ (রা) খায়বারে উপনীত হইবার পর খেজুর বাগানের অভ্যন্তরে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়েন। এখানে আবদুল্লাহ ইব্‌ন সাহল (রা) নিহত হন। এই বিষয়ে কথা বলিবার জন্য আবদুর রহমান ইব্‌ন সাহল ও মাস'উদ-পুত্রদ্বয় হুওয়ায়্যাসা ও মুহায়্যাসা (রা) রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে আসিলেন। তাঁহারা তাহাদের সঙ্গী এই শহীদ লোকের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত কথা বলিতে চাহিলেন। তিনজনের এই দলে আবদুর রহমান (রা) ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তিনি সবার আগে কথা বলা শুরু করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে বলিলেন, বড়কে বলিতে দাও"। অনুরূপ বুখারী কর্তৃক অন্য সূত্রে বর্ণিত হাদীছে রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, "বড়কে আগে বলিতে দাও”।
عن ابن عمر قال قال رسول الله ﷺ اخبروني بشجرة مثلها مثل المسلم تؤتى اكلها كل حين باذن ربها ولا تحت ورقها فوقع فى نفسى النخلة فكرهت ان اتكلم وثم ابو بكر وعمر فلما لم يتكلما قال النبى ﷺ هي النخلة فلما خرجت مع ابي قلت يا ابتاه وقع في نفسي النخلة قال ما منعك ان تقولها لو كنت قلتها كان احب الى من كذا وكذا قال ما منعنى الا اتى لم ارك ولا ابا بكر تكلمتما فكرهت.
“ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) বসিলেন, তোমরা আমাকে এমন একটি বৃক্ষের কথা বলিয়া দাও যাহা মুসলিম ব্যক্তিসদৃশ যাহা সর্বদা আল্লাহর নির্দেশে ফল প্রদান করিতে থাকে এবং উহার পত্র-পল্লব পতিত হয় না। তখন আমার মনে জাগ্রত হইল যে, উহা খেজুর বৃক্ষ। কিন্তু আমি সকলের আগে কথা বলিতে চাহিলাম না। কারণ সেখানে আবূ বকর ও উমার (রা) ছিলেন, তাঁহাদের কেহই কথা বলেন নাই। রাসূলুল্লাহ (س) নিজেই বলিলেন, উহা হইল খেজুর বৃক্ষ। আমি আমার পিতার সহিত ফিরিবার সময় তাঁহাকে বলিলাম, হে আব্বা! আমার মনে আসিয়াছিল যে, তাহা হইবে খেজুর বৃক্ষ। তিনি (উমার) বলিলেন, তোমাকে সেই জিনিসটির নাম বলিয়া দিতে কিসে বারণ করিল? তুমি তাহা বলিলে উহা আমার নিকট লাল উটের চেয়েও প্রিয় হইত। তিনি উত্তর দিলেন, আমাকে অন্য কিছু বারণ করে নাই। একমাত্র কারণ হইল, আপনি স্বয়ং সেখানে রহিয়াছেন, আবু বক্স (রা)-ও সেখানে উপস্থিত। এই অবস্থায় আমি আগে কথা বলিব তাহা পসন্দ করি নাই”।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় আল্লামা আহমাদ আলী সাহারানপুরী বলেন, উহাতে রহিয়াছে বড়দের প্রতি সম্মান ও কথা বলার সময় তাহাদের অগ্রাধিকারের উপদেশ। এই দুইটি কাজ হইল ইসলামের শিষ্টাচার।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বড়দেরকে ইমাম নিয়োগ

📄 বড়দেরকে ইমাম নিয়োগ


রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং তাঁহার অনুপস্থিতিতে এবং বয়সে তুলনামূলকভাবে প্রবীণ ব্যক্তিকে সর্বোত্তম ইবাদত সালাতে ইমাম নিয়োগ করিয়াছেন এবং অন্যদেরকেও ইমাম নিয়োগ করিবার ক্ষেত্রে এইরূপ নির্দেশ দান করিয়াছেন। তিনি আবূ বকর (রা)-কে তাঁহার কঠোর পীড়ার সময় ইমাম নিয়োগ করিবার আদেশ করিলেন। আবূ বক্স (রা)-এর কন্যা উম্মত জননী 'আইশা (را) তাঁহার কোমল হৃদয়ের কথা ভাবিয়া তাঁহার স্থলে অন্য কাহাকেও ইমাম নিয়োগ করিবার পরামর্শ দিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাহা কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। হাদীছটি হইল:
عن حمزة بن عبد الله انه اخبره عن ابيه قال لما اشتد برسول الله ﷺ وجعه قيل له في الصلوة فقال مروا ابا بكر فليصل بالناس قالت عائشة ان ابا بكر رجل رقيق اذا قرأ غلبه البكاء قال مروه فليصل فعاودته فقال مروه فليصل انكن صواحب يوسف .
“হামযা তদীয় পিতা আবদুল্লাহ (را) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (س)-এর অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করিল তখন তাঁহার নিকট সালাতের কথা বলা হইল। তিনি বলিলেন, তোমরা আবূ বকরকে আদেশ কর সে সালাতে ইমামতি করিবে। 'আইশা (را) তাহা শুনিয়া বলিলেন, আবূ বকর (রা) কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি কিরাত পাঠ করিতে লাগিলে কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়েন। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তাঁহাকে আদেশ দাও সেই সালাত পড়াইবেন। উহাতেও 'আইশা সেই কথার পুনরাবৃত্তি করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) পুনরায় সেই আদেশ দিয়া বলিলেন, তোমরা মহিলারাই ইউসুফ (আ)-কে বিরক্তকারী ছিলে” (বুখারী, ১খ., পৃ. ৯৩)।
সহীহ বুখারীর অপর একটি রিওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (س) আবূ বক্র (রা)-কে ইমাম নিয়োগ করিবার পর তিনি ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিলেন:
يا عمر صل بالناس فقال له عمر انت احق بذلك .
“হে উমার! আপনি সালাতে ইমামতি করুন। উমার (রা) বলিলেন, আপনিই ইমাম হইবার সর্বাধিক উপযুক্ত” (বুখারী, ১খ., পৃ. ৯৫)।
মালিক ইবনুল হুওয়ায়রিছ (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছে রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س) মৌখিকভাবে তাহাদের ইমাম নিয়োজিত করিবার জন্য বয়স্ক লোককে নির্দেশ দিয়াছিলেন। ইরশাদ 'হইয়াছে:
عن مالك بن الحويرث قال قدمنا على النبي الله ونحن شببة فلبثنا عنده نحوا من عشرين ليلة وكان النبي الله رحيما فقال لو رجعتم الى بلادكم فعلمتموهم ومروهم فليصلوا بصلوة كذا في حين كذا وصلوة كذا في حين كذا فاذا حضرت الصلوة فليؤذن لكم احدكم وليؤمكم اكبركم ..
"মালিক ইবনুল হুওয়ায়রিছ (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলাম। আমরা ছিলাম যুবক। আমরা তাঁহার নিকট বিশ দিনের মত অবস্থান করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তিনি বলিলেন, যদি তোমরা এখন দেশে ফিরিয়া গিয়া সেখানকার লোকদিগকে শিক্ষাদানে নিয়োজিত হইতে, তাহাদিগকে সালাতের আদেশ দিতে এবং তাহারা অমুক অমুক ওয়াক্তে অমুক অমুক সালাত আদায় করিত। সালাতের সময় উপস্থিত হইলে তাহাদের মধ্যে একজন যেন আযান দেয় এবং সবার চেয়ে বয়স্ক লোক যেন ইমামতি করে” (বুখারী, ১খ., পৃ. ৯৫)।
অবশ্য সহীহ রিওয়ায়াত দ্বারা এই কথা প্রমাণিত ও সর্বস্তরের উলামায়ে কিরামের দ্বারা গৃহীত যে, কেবল বয়স্ক হওয়া ইমামতিতে অগ্রগণ্য হইবার মাপকাঠি নহে। ‘ইলম বা কিরাআতে কুরআনেও পারদর্শী হইতে হইবে। সেই ক্ষেত্রেই কেবল বয়স্ক লোক অন্যদের চাইতে অগ্রাধিকার পাইবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00