📄 দরিদ্র শিক্ষার্থীর প্রতি সহানুভূতি
সাহাবীগণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অভাবগ্রস্ত ও অসহায় ছিলেন আসহাবে সুফফা। সুফ্ফা অর্থ, চাতাল বা চবুতরা। আর যেই সমস্ত ধর্মশিক্ষার্থী মসজিদে নববী সংলগ্ন এই চবুতরায় থাকিয়া ধর্মশিক্ষা করিতেন, তাহাদিগকে 'আসহাবুস সুফফা' বলা হয়। এই শিক্ষার্থিগণ ছিলেন নিতান্ত দরিদ্র। ইঁহাদের অনেকেরই একাধিক বস্ত্র ছিল না। একখানা চাদর গলা হইতে হাটুর নিম্ন পর্যন্ত লটকাইয়া রাখিতেন। তাঁহারা অনাহারে এত দুর্বল হইয়া পড়িতেন যে, অনেক সময় দাঁড়াইয়া-নামায পড়িতে পারিতেন না এবং পড়িয়া যাইতেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাঁহার নিকট যখন সাদাকার খাবার আসিত, তিনি সম্পূর্ণভাবে তাহা আসহাবে সুফফার জন্য পাঠাইয়া দিতেন। যখন দাওয়াত বা ওলীমার খাবার আসিত তখন তাহদিগকে ডাকিয়া একই সঙ্গে আহার করিতেন। কখনও নিজ পরিবার পরিজনের অসুবিধা সত্ত্বেও ইঁহাদের সেবাকে অগ্রাধিকার দিতেন। একদা নবী-কন্যা ফাতিমা (রা) রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, আব্বাজান! যাঁতা পিষিতে পিষিতে আমার হাতে ফোসকা পড়িয়া গিয়াছে। আপনি একটি বাঁদী আমার জন্য রাখিয়া দিন। কন্যার এই নিবেদনের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ফাতিমা! আসহাবে সুফফা অন্নাভাবে মরিয়া যাইবে আর আমি তোমাকে বাঁদী দিব, ইহা কি সঙ্গত হইবে?
একদা 'আলী (রা) কোন কিছুর জন্য আবেদন করিলে তিনি বলিলেন, তোমাকে কিছু দিব আর আসহাবে সুফফার ছিন্নমূল শিক্ষার্থীরা ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করিয়া বেড়াইবে, তাহা হইতে পারে না।
আসহাবে সুফফার অন্যতম সদস্য আবূ হুরায়রা (রা)। তিনি তাঁহার সেই কৃষ্ণতার স্মৃতিচারণ করিতে যাইয়া বর্ণনা করেন, আমি একদিন ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হইয়া রাস্তার এক পাশে বসিয়া পড়িলাম। এমন সময় আবূ বকর (রা)-কে যাইতে দেখিয়া আমার অবস্থার কথা পরোক্ষভাবে বুঝাইবার জন্য আমি তাঁহার নিকট কুরআন শরীফের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। কিন্তু তিনি আমার অবস্থা বুঝিতে পারিলেন না, সোজা চলিয়া গেলেন। ইহার পর ওমর (রা)-কে দেখিলাম। তাহার সঙ্গেও ঠিক একই ব্যাপার হইল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (س)-কে আসিতে দেখিলাম। তিনি আমাকে দেখিয়াই মুচকি হাসিয়া বলিলেন, আমার সঙ্গে চল। বাড়ি পৌঁছিয়া দুধ ভর্তি একটি পাত্র দেখিলেন। জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল ইহা হাদিয়ার দুধ। আমাকে নির্দেশ দিলেন, আসহাবে সুফফার সবাইকে ডাকিয়া লইয়া আস। আমরা সবাই সমবেত হইলে দুধের পাত্রটি আমার হাতে দিয়া বলিলেন, সকলের মধ্যে বণ্টন করিয়া দাও। আমি বণ্টন করিয়া অবশেষে তৃপ্তিসহকারে পান করিলাম।
দরিদ্রের বন্ধু রাসূলুল্লাহ (س)-এর অফুরন্ত সহানুভূতির ফলে উঠিয়া গিয়াছিল ধনী-দরিদ্র, মালিক-শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার মধ্যকার অসম ব্যবধান। নিঃস্ব ইয়াতীম ও অসহায় বিধবা পাইয়াছিল তাহাদের আশ্রয়ের ঠিকানা। নির্যাতিত দাস-দাসিগণ লাভ করিয়াছিল স্বাধীনতার সহজ পথ। ঋণের কষাঘাত হইতে মুক্ত হইয়া ছিল ঋণগ্রস্ত। দরিদ্র শিক্ষার্থিগণ লাভ করিয়াছিল জ্ঞানাহরণের সুবর্ণ সুযোগ। এইভাবে লাঞ্ছিত অবহেলিত দরিদ্র শ্রেণী পাইয়াছিল তাহাদের যথার্থ অধিকার। ধাপে ধাপে অগ্রসর হইয়াছিল তাহারা সমৃদ্ধির পথে, গড়িয়া উঠিয়াছিল বৈষম্যমুক্ত একটি জান্নাতী পরিবেশ ও আদর্শ সমাজ।