📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঋণগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি

📄 ঋণগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি


রাসূলুল্লাহ (স) ঋণগ্রস্তের প্রতি পরম সহানুভূতিশীল ছিলেন। কখনও ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করিতেন। কাবীসা নামক জনৈক সাহাবী ঋণভারে জর্জরিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলেন এবং কিছু সাহায্য চাহিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে ঋণমুক্ত করিবার আশ্বাস দিয়া বলিলেন, দেখ কাবীসা! সওয়াল করা শুধু তিন ধরনের লোকের জন্যই জায়েয : ১. যদি কেহ ঋণের ভারে জর্জরিত হইয়া পড়ে, তাহার ঋণ পরিশোধ করিবার জন্য। তবে ঋণের দায়মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তাহাকে বিরত হইতে হইবে; ২. হঠাৎ আপতিত বিপদ হইতে উদ্ধারের জন্য; ৩. ক্ষুধার্ত ব্যক্তির ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। এই তিন ধরনের লোক ব্যতীত যদি কেহ অন্যের নিকট হাত পাতিয়া গ্রহণ করে তবে সে হারাম খায়।
কখনও ঋণগ্রস্তকে সুযোগ দেওয়ার জন্য ঋণদাতার নিকট তিনি সুপারিশ করিতেন। জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) বর্ণনা করেন, মদীনার এক ইয়াহুদীর নিকট হইতে আমি মাঝে-মধ্যে ঋণ গ্রহণ করিতাম। এক বছর খেজুরের ফলন না হওয়ায় ঋণ পরিশোধ করিতে পারিলাম না। বৎসর ঘুরিয়া আবার বসন্ত কাল আসিল। এইবারও খেজুরের ফলন ভাল হইল না। আমি পরবর্তী ফসল পর্যন্ত সময় চাহিলে ইয়াহুদী কিছুতেই রাজী হইল না। সে উপর্যুপরি তাকীদ দিতে লাগিল। আমি বিষয়টি নবী করীম (س)-এর নিকট জানাইলাম। পূর্বাপর ঘটনা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (س) কয়েকজন সাহাবী লইয়া সেই ইয়াহুদীর বাড়িতে চলিয়া গেলেন এবং তাহাকে বারবার বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ইয়াহুদী কোন অবস্থাতেই সময় দিতে রাজী হইলনা। সে বলিতে লাগিল, আবুল কাসেম! আপনি যত অনুরোধই করুন না কেন আমি কিছুতেই সময় দিবনা। রাসূলুল্লাহ (স) উঠিয়া খেজুরের বাগানের দিকে চলিয়া গেলেন এবং কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করিয়া ফিরিয়া আসিয়া পুনরায় তাহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। কিছুতেই যখন কিছু হইল না, তখন বাগানে আসিয়া ছায়ার নীচে দাঁড়াইলেন এবং খেজুর তুলিতে নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বরকতে সবগুলি কাঁদি কাটিয়া নামানোর পর দেখা গেল, এত বেশী খেজুর নামিয়াছে যে, ইয়াহুদীর ঋণ পরিশোধ করিয়াও যথেষ্ট পরিমাণ খেজুর রহিয়া গিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রত্যেককে স্ব স্ব অধিকার প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন 'মদীনা সনদ'। ইহার একটি ধারা ছিল ঋণগ্রস্তের সহায়তার ব্যাপারে। তাহা হইল— "ঈমানদারগণ নিজেদের মধ্যকার ঋণভারে জর্জরিত কোনও ব্যক্তিকে অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া রাখিবে না, বরং মুক্তিপণ, রক্তপণ ও জরিমানা আদায়ের ব্যাপারে যথারীতি সহায়তা করিবে”।
ঋণ প্রদানের ব্যাপারে তিনি অন্যদেরকে উৎসাহিত করিতেন এবং বর্ণনা করিতেন ঋণ প্রদানের ফযীলত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضْعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً.
“কে সে যে আল্লাহকে করযে হাসানা (যেই ঋণ নিঃস্বার্থভাবে দেওয়া হয়) প্রদান করিবে? তিনি তাহার জন্য ইহা বহু গুণে বৃদ্ধি করিবেন" (২ঃ ২৪৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, প্রতিটি করযই একটি দানবিশেষ।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মি'রাজ রজনীতে আমি জান্নাতের দরজায় এই কথাটি লেখা দেখিয়াছি, "দানের ছওয়াব দশ গুণ, আর করয প্রদানের ছওয়াব আঠার গুণ” (প্রাগুক্ত, হা. ৭৩৩)।
কেহ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা গেলে রাসূলুল্লাহ (স) নিজে তাহার ঋণ পরিশোধের যিম্মাদারি গ্রহণ করিতেন। তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি তাহার ওয়ারিছদের আর তাহার ঋণের যিম্মাদার আমি। এইভাবে ঋণগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়া তিনি সর্বকালের জন্য অনিন্দ্য সুন্দর আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দরিদ্র শিক্ষার্থীর প্রতি সহানুভূতি

📄 দরিদ্র শিক্ষার্থীর প্রতি সহানুভূতি


সাহাবীগণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অভাবগ্রস্ত ও অসহায় ছিলেন আসহাবে সুফফা। সুফ্ফা অর্থ, চাতাল বা চবুতরা। আর যেই সমস্ত ধর্মশিক্ষার্থী মসজিদে নববী সংলগ্ন এই চবুতরায় থাকিয়া ধর্মশিক্ষা করিতেন, তাহাদিগকে 'আসহাবুস সুফফা' বলা হয়। এই শিক্ষার্থিগণ ছিলেন নিতান্ত দরিদ্র। ইঁহাদের অনেকেরই একাধিক বস্ত্র ছিল না। একখানা চাদর গলা হইতে হাটুর নিম্ন পর্যন্ত লটকাইয়া রাখিতেন। তাঁহারা অনাহারে এত দুর্বল হইয়া পড়িতেন যে, অনেক সময় দাঁড়াইয়া-নামায পড়িতে পারিতেন না এবং পড়িয়া যাইতেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাঁহার নিকট যখন সাদাকার খাবার আসিত, তিনি সম্পূর্ণভাবে তাহা আসহাবে সুফফার জন্য পাঠাইয়া দিতেন। যখন দাওয়াত বা ওলীমার খাবার আসিত তখন তাহদিগকে ডাকিয়া একই সঙ্গে আহার করিতেন। কখনও নিজ পরিবার পরিজনের অসুবিধা সত্ত্বেও ইঁহাদের সেবাকে অগ্রাধিকার দিতেন। একদা নবী-কন্যা ফাতিমা (রা) রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, আব্বাজান! যাঁতা পিষিতে পিষিতে আমার হাতে ফোসকা পড়িয়া গিয়াছে। আপনি একটি বাঁদী আমার জন্য রাখিয়া দিন। কন্যার এই নিবেদনের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ফাতিমা! আসহাবে সুফফা অন্নাভাবে মরিয়া যাইবে আর আমি তোমাকে বাঁদী দিব, ইহা কি সঙ্গত হইবে?
একদা 'আলী (রা) কোন কিছুর জন্য আবেদন করিলে তিনি বলিলেন, তোমাকে কিছু দিব আর আসহাবে সুফফার ছিন্নমূল শিক্ষার্থীরা ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করিয়া বেড়াইবে, তাহা হইতে পারে না।
আসহাবে সুফফার অন্যতম সদস্য আবূ হুরায়রা (রা)। তিনি তাঁহার সেই কৃষ্ণতার স্মৃতিচারণ করিতে যাইয়া বর্ণনা করেন, আমি একদিন ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হইয়া রাস্তার এক পাশে বসিয়া পড়িলাম। এমন সময় আবূ বকর (রা)-কে যাইতে দেখিয়া আমার অবস্থার কথা পরোক্ষভাবে বুঝাইবার জন্য আমি তাঁহার নিকট কুরআন শরীফের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। কিন্তু তিনি আমার অবস্থা বুঝিতে পারিলেন না, সোজা চলিয়া গেলেন। ইহার পর ওমর (রা)-কে দেখিলাম। তাহার সঙ্গেও ঠিক একই ব্যাপার হইল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (س)-কে আসিতে দেখিলাম। তিনি আমাকে দেখিয়াই মুচকি হাসিয়া বলিলেন, আমার সঙ্গে চল। বাড়ি পৌঁছিয়া দুধ ভর্তি একটি পাত্র দেখিলেন। জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল ইহা হাদিয়ার দুধ। আমাকে নির্দেশ দিলেন, আসহাবে সুফফার সবাইকে ডাকিয়া লইয়া আস। আমরা সবাই সমবেত হইলে দুধের পাত্রটি আমার হাতে দিয়া বলিলেন, সকলের মধ্যে বণ্টন করিয়া দাও। আমি বণ্টন করিয়া অবশেষে তৃপ্তিসহকারে পান করিলাম।
দরিদ্রের বন্ধু রাসূলুল্লাহ (س)-এর অফুরন্ত সহানুভূতির ফলে উঠিয়া গিয়াছিল ধনী-দরিদ্র, মালিক-শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার মধ্যকার অসম ব্যবধান। নিঃস্ব ইয়াতীম ও অসহায় বিধবা পাইয়াছিল তাহাদের আশ্রয়ের ঠিকানা। নির্যাতিত দাস-দাসিগণ লাভ করিয়াছিল স্বাধীনতার সহজ পথ। ঋণের কষাঘাত হইতে মুক্ত হইয়া ছিল ঋণগ্রস্ত। দরিদ্র শিক্ষার্থিগণ লাভ করিয়াছিল জ্ঞানাহরণের সুবর্ণ সুযোগ। এইভাবে লাঞ্ছিত অবহেলিত দরিদ্র শ্রেণী পাইয়াছিল তাহাদের যথার্থ অধিকার। ধাপে ধাপে অগ্রসর হইয়াছিল তাহারা সমৃদ্ধির পথে, গড়িয়া উঠিয়াছিল বৈষম্যমুক্ত একটি জান্নাতী পরিবেশ ও আদর্শ সমাজ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00