📄 ক্রীতদাসদের প্রতি মমত্ববোধ
দাস-দাসীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। বিশ্ব ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম ক্রীতদাসদিগকে তাহাদের বৈধ ও মৌলিক অধিকার প্রদানের জন্য নানাবিধ বাস্তব পন্থা অবলম্বন করিয়াছেন এবং বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যে দাসমুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। যেমন কেহ পবিত্র রমাযান মাসে স্ত্রী-সহবাস করিলে কিংবা ভুলবশত কাহাকেও হত্যা করিলে অথবা আল্লাহর নামে শপথ করিয়া ভঙ্গ করিলে ইহার কাফফারাসমূহের একটি হইল দাসমুক্ত করা।
এমনিভাবে তিনি দাসমুক্তির ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করিয়াছেন, বর্ণনা করিয়াছেন দাসমুক্তির অনেক ফযীলত। তিনি ইরশাদ করেন, যেই ব্যক্তি কোন গোলাম আযাদ করিল আল্লাহ তা'আলা আযাদকৃত গোলামের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নাম হইতে মুক্তি দিবেন, এমনকি গোলামের গোপনাঙ্গের বিনিময়ে তাহার গোপনাঙ্গকে জাহান্নাম হইতে মুক্তি দিবেন।
বারা'আ (রা) বলেন, একজন লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আগমন করিয়া বলিলেন, আমাকে এমন কাজের কথা বলিয়া দিন যাহা জান্নাতকে নিকটবর্তী করিবে, আর জাহান্নামকে করিবে দূরে। তিনি ইরশাদ করিলেন, দাসমুক্ত কর এবং দাসমুক্তিতে সহযোগিতা কর।
রাসূলুল্লাহ (স) দাসদিগকে নিজেদেরই সমতুল্য মানুষ মনে করিতেন এবং তাহাদের মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখিতেন। মাসরূক ইব্ন মু'আয়ি্যদ (র) বর্ণনা করেন, আমি একবার আবু যার গিফারী (রা)-কে দেখিলাম, তাঁহার শরীরে যেই পোশাক তাঁহার দাসের শরীরেও সেই পোশাক। আমি ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি উত্তরে বলিলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগে এক ব্যক্তিকে বকাঝকা করিয়াছিলেন। ইহাতে রাসূল (স) বলিলেন, এখনও তোমার মধ্যে মূর্খ যুগের অহমিকা বিদ্যমান। দেখ, ইহারা তোমাদেরই ভাই, তোমাদেরই সহযোগী। মহান আল্লাহ্ তাহাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করিয়াছেন। সুতরাং তোমরা যাহা আহার করিবে তাহাদিগকে তাহাই আহার করাইবে। যাহা পরিবে, অহাই পরাইবে। আর তাহাদেরকে এমন কাজ দিবে না যাহা তাহারা করিতে পারিবে না। যদি দাও তাহা হইলে তাহাদেরকে সাহায্য করিবে।
আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, ক্রীতদাসকে তাহার পানাহার দাও, পরিধেয় বস্ত্র দাও এবং তাহাকে সাধ্যাতীত কাজে বাধ্য করিও না।
জীবনের সর্বশেষ ওসিয়াতেও রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করিতে ভুলেন নাই। আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর শেষ কথা ছিল, সালাতের পাবন্দী কর এবং ক্রীতদাসদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মালিকানায় কোন দাস-দাসী আসিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে মুক্ত করিয়া দিতেন। কিন্তু তাহারা নবী করীম (স)-এর সহানুভূতির বন্ধন হইতে কোন কালেই মুক্ত হইতে চাহিত না। মাতা-পিতার স্নেহ এবং আত্মীয়-স্বজনের মায়া-মমতা উপেক্ষা করিয়া তাহারা আজীবন এই মহান দরবারের দাসত্ব করিয়াই কাটাইয়া দিত। তিনি নিজ ক্রীতদাস যায়দ (রা)-কে মুক্তি দিয়া দত্তক গ্রহণ করিয়াছিলেন। যায়দের পিতা তাহাকে লইয়া যাইতে আসিলে দরবারে রিসালাতের মমতার বন্ধনের কাছে পিতৃস্নেহের দাবি হার মানিল। যায়দ (রা) বাকি জীবন এই দরবারেই থাকিয়া গেলেন।
তিনি যায়দ পুত্র উসামাকে এত অধিক ভালবাসিতেন যে, কোন স্বজনের প্রতিও অনুরূপ ভালবাসা পরিলক্ষিত হইত না। এক উরুতে উসামাকে ও অন্য উরুতে হাসান (রা)-কে বসাইয়া বলিতেন, হে আল্লাহ! আমি তাহাদিগকে যেমন ভালবাসি, অনুরূপ তুমিও ভালবাসিও। একবার কয়েক ব্যক্তির পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে সুপারিশের প্রয়োজন হইলে উসামা (রা) অপেক্ষা তাঁহাদের নিকট অধিক প্রিয় আর কাহাকেও তাহারা ধারণা করিল না।
সাহাবীগণ তাঁহাকে হিব্বুর-রাসূল (রাসূলের স্নেহভাজন) আখ্যা দিতেন। তাঁহাকে তিনি এত অধিক স্নেহ করিতেন যে, নিজ হাতে তাহার নাক পর্যন্ত পরিষ্কার করিয়া দিতেন। তিনি বলিতেন, উসামা যদি মেয়ে হইত তবে আমি তাহাকে অলঙ্কার তৈরি করিয়া দিতাম। তিনি আরও বলিতেন, হে 'আইশা! আমি তাহাকে ভালবাসি, সুতরাং তুমিও তাহাকে ভালবাসিও।
দাস-দাসীদের কল্যাণ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি তিনি এত অধিক যত্নবান ছিলেন যে, তাহাদিগকে গোলাম নামে অভিহিত করা তিনি কখনও পসন্দ করিতেন না। তিনি বলিতেন, তোমাদের কেহ যেন স্বীয় দাস-দাসীকে আমার গোলাম, আমার দাসী বলিয়া উল্লেখ না করে। অনুরূপ ক্রীতদাসও যেন তাহার মালিককে আমার প্রভু না বলে; বরং মনিব বলিবে, আমার পুত্র (ইবনী) বা কন্যা (বিনতী) এবং ক্রীতদাস বলিবে, আমার নেতা।
কা'ব ইবন 'উযরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, দাস-দাসীরা তোমাদের থালা-বাটি ভাঙ্গিয়া ফেলিলে তাহাদিগকে মারধর করিও না। কারণ পাত্রেরও মেয়াদ আছে তোমাদের ন্যায়।
তিনি বলিতেন, যেই ব্যক্তি তাহার দাস-দাসীকে থাপ্পড় মারে কিংবা অন্য কোনরূপ প্রহার করে, তাহার এইরূপ আচরণের প্রতিকার হইল সেই দাস-দাসীকে মুক্তি প্রদান।
যদি তিনি জানিতে পারিতেন যে, কোন ব্যক্তি তাহার দাসকে প্রহার করিয়াছে, তবে তিনি তাহাকে উপদেশ দিতেন সে যেন দাসটিকে মুক্তি দিয়া দেয়।
নিঃস্ব ইয়াতীম ও অসহায় বিধবার প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তাহাদের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট থাকিতেন, অন্যদিগকেও ইহার প্রতি উৎসাহিত করিতেন এবং উল্লেখ করিতেন তাহাদের পরিচর্যাকারীদের অনেক ফযীলত। তিনি বলেন, যে কেহ কোন বিধবা ও মিসকীনের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট থাকে, সে আল্লাহ্ পথে জিহাদরত কিংবা ঐ ব্যক্তির সমতুল্য, যে দিনে রোযা রাখে এবং সারা রাত ইবাদতে কাটায়।
সাহল ইবন সা'দ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দুইটি আঙ্গুল উচু করিয়া বলেন, আমি ও ইয়াতীমের অভিভাবক বেহেশতের মধ্যে এইভাবে থাকিব। অর্থাৎ এই আঙ্গুল দুইটির অবস্থান যেমন একেবারে কাছাকাছি, আমার ও ইয়াতীমের অভিভাবকের অবস্থানও হইবে ঠিক তেমনি কাছাকাছি।
আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলেন, মুসলমানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গৃহ হইল যেখানে একজন ইয়াতীম বসবাস করে এবং তাহার সাথে সদাচরণ করা হয়। আর সর্বনিকৃষ্ট গৃহ ঐটি যেখানে কোন ইয়াতীম বসবাস করে এবং তাহার সাথে অসদাচরণ করা হয়। আর সর্বনিকৃষ্ট গৃহ হইল যেখানে কোন ইয়াতীম বাস করে কিন্তু তাহার সহিত দুর্ব্যবহার করা হয়।
আবূ উমামা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলেন, যেই ব্যক্তি কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাইবে, তাহার হাতের নীচের প্রতিটি চুলের পরিবর্তে সে অসংখ্য নেকী পাইবে। আর যেই ব্যক্তি তাহার নিকট প্রতিপালিত কোন ইয়াতীম মেয়ে অথবা ছেলের সাথে সদ্ব্যবহার করিবে, আমি ও সে জান্নাতে এইভাবে থাকিব, এই বলিয়া তিনি নিজের দুইটি আঙ্গুল একত্রে মিলাইলেন।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া নিজের পাষাণ হৃদয় হওয়ার অভিযোগ পেশ করিল। তিনি বলিলেন, ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাও এবং অসহায় মিসকীনকে খাবার দাও। অন্যত্র তিনি বলেন, যেই ব্যক্তি মুসলমানদের কোন ইয়াতীমকে তাহার পানাহারে অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইবে, অনন্তর সে অভাবমুক্ত হয়, তাহার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াতীম ছিলেন, ইয়াতীমদের দুঃখ-বেদনা বুঝিতেন সহজে, অনুভব করিতেন হৃদয় দিয়া। আল্লাহ তা'আলাও ইয়াতীম-মিসকীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলেন:
اَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَأَوَى وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى وَوَجَدَكَ عَائِلاً فَاَغْنَى فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلاَ تَقْهَرْ وَأَمَّا السَّائِلَ فَلاَ تَنْهَرْ، وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدَّثْ
"তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নাই, আর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নাই? তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর পথের নির্দেশ দিলেন। তিনি তোমাকে পাইলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাবমুক্ত করিলেন। সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হইও না এবং প্রার্থীকে ভর্ৎসনা করিও না। তুমি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা জানাইয়া দাও" (৯৩ঃ ৬-১১)।
রাসূলুল্লাহ (স) এই আয়াতের উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করিয়াছেন। বশীর ইব্ন আকরাবা আল-জুহানী (রা) বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন মহানবী (س)-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাত হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, আমার পিতার কি অবস্থা? তিনি উত্তর দিলেন, সে তো শহীদ হইয়াছে। তাহা শুনিয়া আমি কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলাম। তখন স্বস্নেহে রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ধরিলেন, আমার মাথায় তাঁহার কোমল হাত বুলাইলেন, তুলিয়া লইলেন স্বীয় বাহনে এবং বলিলেন, আমি তোমার পিতা, আ'ইশা তোমার মাতা, ইহাতে কি তুমি সন্তুষ্ট নও? প্রিয় নবী (স)-এর এই স্নেহাচারণে বিমোহিত হইল ইয়াতীম, ভুলিয়া গেল পিতৃ বিয়োগের সকল যাতনা।
রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াতীম মিসকীনকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন, তাহাদের পরিচর্যা করিতেন। মূলত ইয়াতীমের পরিচর্যা করা, ভালবাসার পরশে তাহাদের মাথায় হাত বুলাইয়া দেওয়া ঈমানের অঙ্গ এবং তাহাদিগকে বিমুখ করা, তাড়াইয়া দেওয়া কুফরীর নামান্তর। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
ارَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ. فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُ الْيَتِيمَ، وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ المِسْكِينِ .
"তুমি কি দেখিয়াছ তাহাকে, যে বিচারের দীনকে অস্বীকার করে? সে তো সে-ই যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়াইয়া দেয় এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দানে উৎসাহ দেয় না" (১০৭:১-৩)।
ইয়াতীম-মিসকীনের প্রতি একান্ত সহানুভূতিশীল রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র জীবন ছিল আল-কুরআনের বাস্তব নমুনা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتْمَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلُونَ سَعِيراً .
“যাহারা ইয়াতীমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তাহারা তো তাহাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। তাহারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে জ্বলিবে” (৪ : ১০)।
আল্লাহ তা'আলার এই ঘোষণা রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কর্মজীবনে বাস্তবায়িত করিতে যাইয়া সবাইকে নির্দেশ করেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকর বিষয় হইতে বিরত থাক: ১. আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা; ২. যাদু করা; ৩. অহেতুক আল্লাহর নিষিদ্ধ জীব হত্যা করা; ৪. সূদ খাওয়া; ৫. ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা; ৬. জিহাদ হইতে পালাইয়া যাওয়া; ৭. সতী-সাধ্বী মুসলিম নারীর উপর ব্যভিচারের দোষারোপ করা।
রাসূলুল্লাহ (স) গনীমতের মালেও নির্দিষ্টি করিয়াছেন ইয়াতীমের অংশ। গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের চার-পঞ্চমাংশ তিনি বণ্টন করিতেন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের এবং অবশিষ্টাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুল-মাল বা জাতীয় ধনভাণ্ডারের মাধ্যমে মাতৃ-পিতৃহীন নাবালক-মিসকীন, অসহায় পথিক এবং আল্লাহর রাসূল ও তাঁহার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করিতেন। কারণ পবিত্র করআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتْمَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنِ السَّبِيلِ.
"আরও জানিয় রাখ যে, যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ কর তাহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের" (৮:৪১)।
তিনি ইয়াতীমদের প্রতি এত সহানুভূতিশীল ছিলেন যে, তাহাদিগকে নিজ কন্যা ও আত্মীয়-স্বজনের উপর অগ্রাধিকার দিতেন। একবার কোন এক যুদ্ধের পর ফাতিমা (রা) ও যুবায়র (রা)-এর কন্যাগণ উপস্থিত হইয়া তাহাদিগের অভাব ও দারিদ্র্যের কথা উল্লেখ করিয়া যুদ্ধলব্ধ বাঁদীদের মধ্য হইতে দুই-একটি তাহাদিগকে দেওয়ার জন্য আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই বলিয়া তাহাদিগকে নিবৃত্ত করিলেন যে, বদরের ইয়াতীমগণ তোমাদের পূর্বেই আবেদন করিয়া রাখিয়াছে। তাহাদের দাবি তোমাদের তুলনায় অগ্রগণ্য।
অসহায় বিধবার প্রতি তাঁহার সহানুভূতি ছিল অপরিসীম। তিনি তাহাদের কাজ করিয়া দিতেন। বিধবাদের প্রতি তাঁহার কি পরিমাণ সহানুভূতি ছিল তাহা উপলব্ধি করা যায় তাহাদের সার্বিক উন্নয়নে তাঁহার কর্মপন্থা হইতে। তৎকালীন আরবের লোকেরা বিধবাদিগকে বিবাহ করা পসন্দ করিত না, বরং তাহাদিগকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক হইতে বঞ্চিত রাখিত। এই সামাজিক অবিচার ও কুপ্রথা নির্মূল করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স) শুধু অন্যকেই বিধবা বিবাহে উৎসাহ প্রদান করেন নাই, বরং তিনি নিজেও একমাত্র 'আইশা (রা) ব্যতীত আর সকল বিবাহ বিধবা স্ত্রীলোকদিগকেই করিয়াছেন। এইভাবে তিনি বিধবাদের নৈতিক ও সামাজিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন।
📄 অধীনস্থদের প্রতি সদাচার
অধীনস্থ কর্মচারীর প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহানুভূতি ছিল সীমাহীন। তিনি তাহাদের সঙ্গে আহার করিতেন এবং আটার খামির তৈরি করিয়া দিতেন। তিনি তাহাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য অন্যদেরকে উৎসাহিত করিতেন। তিনি বলেন, তোমাদের কাহারও খাদেম যখন খাবার তৈরি করিয়া লইয়া আসে, তখন সে যেন তাহাকে সঙ্গে বসায় এবং খাইতে দেয়। আর যদি খাবার কম হয়, তাহা হইলে এক লোকমা দুই লোকমা হইলে এক দুই গ্রাস যেন তাহার হাতে তুলিয়া দেয়। কারণ সে এই খাবার রান্না করিতে গিয়া আগুনের ধোঁয়ার জ্বালা সহ্য করিয়াছে।
কর্মচারীর প্রতি তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেন নাই। আনাস (রা) বলেন, আমি দশ বৎসর রাসূলুল্লাহ (স)-এর খidমত করিয়াছি। তিনি কখনও আমাকে উফ শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেন নাই। আমি কোন কাজ করিলে বলেন নাই—কেন তুমি করিলে। আর কোন কাজ না করিলে বলেন নাই, কেন তুমি করিলে না। উপরন্তু তিনি দু'আ করিয়াছেন, হে আল্লাহ! তাহার সম্পদ ও সন্তান বাড়াইয়া দাও এবং যাহা তুমি তাহাকে দিয়াছ তাহাতে বরকত দাও। 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) নিজ হাতে কোন কর্মচারীকে প্রহার করেন নাই।
📄 দরিদ্র প্রতিবেশীর প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহানুভূতি
সুখে-দুঃখে সর্বাধিক নিকটের মানুষ হইল প্রতিবেশী। জীবনের নানা পর্যায়ে তাহাদের উপস্থিতি ও সহযোগিতা ব্যতীত স্বাচ্ছন্দে জীবন চলা কষ্টকর। দরিদ্র হইলে তো কোন কথাই নাই। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) দরিদ্র প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়াছেন। আনাস (রা) হইতে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, সেই ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান আনে নাই, যে নিজে আহারে পরিতৃপ্ত এবং তাহার পাশে তাহার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত অথচ সে তাহা জানে।
আবদুল্লাহ ইব্ন আমর ইব্ন আস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যদি তুমি ফল ক্রয় কর তাহা হইলে উহা হইতে প্রতিবেশীর ঘরে হাদিয়া পাঠাও, অন্যথা চুপিসারে ঘরে ঢুকাও, তাহা লইয়া তোমার সন্তান যেন বাহিরে না আসে। কেননা ইহাতে তাহার (প্রতিবেশীর) সন্তান কষ্ট পাইবে।
আবু যর গিফারী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তুমি যখন তরকারী রান্না করিবে, তাহার ঝোল বাড়াইয়া দাও এবং উহা হইতে প্রতিবেশীকে কিছু হাদিয়া পাঠাও।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী অসুস্থ হইলে তাহার দেখাশুনা করিবে, সে ইন্তিকাল করিলে জানায় শরীক হইবে, ঋণ চাহিলে ঋণ দিবে, অসহায় হইয়া পড়িলে সাহায্য করিবে, বিপদে পড়িলে সান্ত্বনা দিবে। স্বীয় ঘর তাহার চাইতে উঁচু করিবে না যাহাতে তাহার বাতাস বন্ধ হইয়া যায়। তরকারী পাকাইলে তাহাকে কিছু দিবে। অন্যথা তাহার ঘরে কিছু না থাকার কারণে তোমার তরকারীর গন্ধে সে শোকাহত হইবে।
📄 ঋণগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি
রাসূলুল্লাহ (স) ঋণগ্রস্তের প্রতি পরম সহানুভূতিশীল ছিলেন। কখনও ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করিতেন। কাবীসা নামক জনৈক সাহাবী ঋণভারে জর্জরিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলেন এবং কিছু সাহায্য চাহিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে ঋণমুক্ত করিবার আশ্বাস দিয়া বলিলেন, দেখ কাবীসা! সওয়াল করা শুধু তিন ধরনের লোকের জন্যই জায়েয : ১. যদি কেহ ঋণের ভারে জর্জরিত হইয়া পড়ে, তাহার ঋণ পরিশোধ করিবার জন্য। তবে ঋণের দায়মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তাহাকে বিরত হইতে হইবে; ২. হঠাৎ আপতিত বিপদ হইতে উদ্ধারের জন্য; ৩. ক্ষুধার্ত ব্যক্তির ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। এই তিন ধরনের লোক ব্যতীত যদি কেহ অন্যের নিকট হাত পাতিয়া গ্রহণ করে তবে সে হারাম খায়।
কখনও ঋণগ্রস্তকে সুযোগ দেওয়ার জন্য ঋণদাতার নিকট তিনি সুপারিশ করিতেন। জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) বর্ণনা করেন, মদীনার এক ইয়াহুদীর নিকট হইতে আমি মাঝে-মধ্যে ঋণ গ্রহণ করিতাম। এক বছর খেজুরের ফলন না হওয়ায় ঋণ পরিশোধ করিতে পারিলাম না। বৎসর ঘুরিয়া আবার বসন্ত কাল আসিল। এইবারও খেজুরের ফলন ভাল হইল না। আমি পরবর্তী ফসল পর্যন্ত সময় চাহিলে ইয়াহুদী কিছুতেই রাজী হইল না। সে উপর্যুপরি তাকীদ দিতে লাগিল। আমি বিষয়টি নবী করীম (س)-এর নিকট জানাইলাম। পূর্বাপর ঘটনা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (س) কয়েকজন সাহাবী লইয়া সেই ইয়াহুদীর বাড়িতে চলিয়া গেলেন এবং তাহাকে বারবার বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ইয়াহুদী কোন অবস্থাতেই সময় দিতে রাজী হইলনা। সে বলিতে লাগিল, আবুল কাসেম! আপনি যত অনুরোধই করুন না কেন আমি কিছুতেই সময় দিবনা। রাসূলুল্লাহ (স) উঠিয়া খেজুরের বাগানের দিকে চলিয়া গেলেন এবং কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করিয়া ফিরিয়া আসিয়া পুনরায় তাহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। কিছুতেই যখন কিছু হইল না, তখন বাগানে আসিয়া ছায়ার নীচে দাঁড়াইলেন এবং খেজুর তুলিতে নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বরকতে সবগুলি কাঁদি কাটিয়া নামানোর পর দেখা গেল, এত বেশী খেজুর নামিয়াছে যে, ইয়াহুদীর ঋণ পরিশোধ করিয়াও যথেষ্ট পরিমাণ খেজুর রহিয়া গিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রত্যেককে স্ব স্ব অধিকার প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন 'মদীনা সনদ'। ইহার একটি ধারা ছিল ঋণগ্রস্তের সহায়তার ব্যাপারে। তাহা হইল— "ঈমানদারগণ নিজেদের মধ্যকার ঋণভারে জর্জরিত কোনও ব্যক্তিকে অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া রাখিবে না, বরং মুক্তিপণ, রক্তপণ ও জরিমানা আদায়ের ব্যাপারে যথারীতি সহায়তা করিবে”।
ঋণ প্রদানের ব্যাপারে তিনি অন্যদেরকে উৎসাহিত করিতেন এবং বর্ণনা করিতেন ঋণ প্রদানের ফযীলত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضْعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً.
“কে সে যে আল্লাহকে করযে হাসানা (যেই ঋণ নিঃস্বার্থভাবে দেওয়া হয়) প্রদান করিবে? তিনি তাহার জন্য ইহা বহু গুণে বৃদ্ধি করিবেন" (২ঃ ২৪৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, প্রতিটি করযই একটি দানবিশেষ।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মি'রাজ রজনীতে আমি জান্নাতের দরজায় এই কথাটি লেখা দেখিয়াছি, "দানের ছওয়াব দশ গুণ, আর করয প্রদানের ছওয়াব আঠার গুণ” (প্রাগুক্ত, হা. ৭৩৩)।
কেহ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা গেলে রাসূলুল্লাহ (স) নিজে তাহার ঋণ পরিশোধের যিম্মাদারি গ্রহণ করিতেন। তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি তাহার ওয়ারিছদের আর তাহার ঋণের যিম্মাদার আমি। এইভাবে ঋণগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়া তিনি সর্বকালের জন্য অনিন্দ্য সুন্দর আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন।